বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ অনেক কম। এছাড়া বরাদ্দকৃত বাজটও ঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সমন্বয়, নজরদারি ও সুশাসনের অভাবে মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটে স্বল্প বরাদ্দ, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন—এ তিন বড় চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন আস্থার সংকটে ভুগছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের জিডিপির মাত্র দশমিক ৬৭ ও জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, কারণ স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৪-৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই রোগীদের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ সরাসরি জনগণকে পরিশোধ করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবলের সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক প্রায় ১৭ শতাংশ কম রয়েছে। নার্সের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ৩২ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল দিয়েই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হচ্ছে, যা সেবার মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

দেশে স্বাস্থ্য শিক্ষার মানও প্রশ্নবিদ্ধ। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা সেবার গুণগত মানে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৬৫টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ৭১ হাজার শয্যা রয়েছে। অন্যদিকে ছয় হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার শয্যা থাকলেও দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় এটি এখনো অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য অন্তত তিনটি শয্যা থাকা প্রয়োজন, অথচ দেশে রয়েছে মাত্র দশমিক ৮৮টি শয্যা। ফলে প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য খাতের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসা ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।