জ্বালানি খাতে ভর্তুকি স্বচ্ছভাবে যৌক্তিক করতে হবে। আরেকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণে বাস্তবতা বিবেচনায় আনতে হবে। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করলে, তা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান ভর্তুকি ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন দরকার। সর্বজনীন ভর্তুকি সাধারণত অকার্যকর ও পশ্চাৎমুখী। এর পরিবর্তে আধুনিক ডিজিটাল পরিচিতি ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া শহরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা সেবাগুলো এখনো অপর্যাপ্ত। মূল্যস্ফীতির সময় এ পরিস্থিতির পরিবর্তন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, শিল্পনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হবে এবং এ খাতকে প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের নানা ধরনের মার্কেটে প্রবেশের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে করে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের একটি বড় অংশ দেশে আসতে পারে।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ করনীতি, কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর জন্য ঋণ গ্যারান্টি স্কিমের পাশাপাশি ইকুইটি-ভিত্তিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন, যাতে করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সাহস করে ঝুঁকি নিয়ে তাদের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করতে পারেন। এ খাতকে বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, মানবসম্পদ উন্নয়নকে সামাজিক ব্যয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে রফতানি বৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে মানুষের ব্যক্তিগত খরচ কমানো জরুরি। জনমিতিক সুবিধার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, এখানে ভুল বিনিয়োগের সুযোগ নেই।

ষষ্ঠত, জলবায়ু ঝুঁকি এখন সরাসরি আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বাজেটে জলবায়ু-সংবেদনশীল ব্যয় চিহ্নিত করা, অভিযোজন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আহরণ ও কার্যকর ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী কৌশল নিতে হবে।

বাজেট প্রণয়নে অতীতের কিছু ভুল পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন কর্মসূচি কাগজে সুন্দর লাগলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে ব্যর্থতার খাতা ভারী করে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কর অব্যাহতির অপসংস্কৃতি দেশের রাজস্ব ভিত্তিকে দুর্বল করে। অতীতে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার বা চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে টাকার মান ডলারের বিপরীতে কম-বেশি করে, যা কৃত্রিম বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের কাজ অদৃশ্য রাজস্ব ব্যয় সৃষ্টি করে। এছাড়া ব্যাংক খাতে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে, ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আসন্ন বাজেটে এসব বিষয়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ না থাকলে এটি হবে একটি ‘অভিপ্রায়ের দলিল’ যার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে প্রশ্নবিদ্ধ।

বাজেট কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিফলনও। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল বার্তা হওয়া উচিত ‘যেকোনো মূল্যে প্রবৃদ্ধি’ থেকে ‘স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’-তে রূপান্তর। একটি বিশ্বাসযোগ্য বাজেটের মূল শক্তি ব্যয়ের পরিমাণে নয়, বরং সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলোর ওপর মানুষের আস্থায় নিহিত।