অন্যদিকে গত দুই বছর ধরে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেননি উদ্যোক্তারা। সামগ্রিকভাবে আস্থা সংকটের কারণেই উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক যুগে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এসেছিল। এরপরের দুই অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ কমলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়েছিল। তবে এর পর থেকেই পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়েও বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের শিল্পায়নে মূলধনের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংক খাত, যেখানে পুঁজিবাজারের অবদান তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে আইপিওর মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্প খাতে পুঁজিবাজার থেকে কোনো অর্থায়ন আসছে না।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা ভাব এবং শেয়ারের প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্যোক্তারা আইপিওতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। পাশাপাশি অতীতে আইপিওকে ঘিরে অনিয়ম, কারসাজি ও বিতর্কের ঘটনাও অনেক ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে। গত দেড় দশকে আইপিওর মাধ্যমে ১৪৯টি কোম্পানি প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও এদের অনেকগুলোই এখন আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ৩২টির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ৩৮টি কোম্পানির ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে নিরীক্ষকের মতামতে উঠে এসেছে। এর বাইরেও আরো অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ফলে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার মতো ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুব বেশি নয়। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ ও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা বেশকিছু কোম্পানির শেয়ারদর সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। কারসাজির মাধ্যমে এসব কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ানোর অভিযোগ থাকলেও এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা সেভাবে দৃশ্যমান নয়। সব মিলিয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে সূচক ও লেনদেনে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়েও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বেশ তলানিতে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধন মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এমনকি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে শ্রীলংকায় তা ২৬ দশমিক ৩৯ এবং পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।










