এসব প্রকল্পের আর্থিক মূল্য প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে—বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, ৫০ হাজারের বেশি উন্নয়ন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। এমনকি একটি বড় স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানেই এক হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ আকস্মিক চাকরি হারানো কেবল ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষতি নয়; এটি একটি দক্ষ মানবসম্পদের অপচয়। বহু বছর ধরে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ এ পেশাজীবীরা স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা এবং জলবায়ু অভিযোজনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করেছেন। হঠাৎ করে তাদের এ অভিজ্ঞতা সিস্টেমের বাইরে চলে যাওয়া মানে উন্নয়ন খাতে ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমরি’ বা প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও জ্ঞান হারানো, যা পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। অন্যদিকে এ চাকরি হারানোর প্রভাব সরাসরি তাদের পরিবারগুলোর ওপর পড়ছে।

এ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুতর দিক হলো উন্নয়ন কার্যক্রমে হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্টি হওয়া। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও মানবিক সহায়তা খাতে যেসব প্রকল্প চলমান ছিল, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো পরিবার পরিকল্পনা (এফপি) খাতের ওপর এর প্রভাব। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মার্কিন সহায়তা কমে গেলে পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়, গর্ভনিরোধক সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং সেবাগ্রহীতারা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এটি সরাসরি প্রজননশীলতা হার বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে শ্লথতা এবং মাঠপর্যায়ে সেবার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি সুপারিশ প্রাসঙ্গিক:

 প্রথমত, সরকারকে দ্রুত একটি ‘উন্নয়ন কর্মীদের কাজে লাগানোর কৌশল’ (ডেভলাপমেন্ট ওয়ার্কফোর্স রেইনটিগ্রেশন স্ট্র্যাটিজি) গ্রহণ করতে হবে, যাতে চাকরিচ্যুত পেশাজীবীদের সরকারি ও বেসরকারি খাতে পুনর্বিন্যাস করা যায়।

 দ্বিতীয়ত, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিকল্প অর্থায়ন (ডমেস্টিক ফাইন্যান্সিং বা নতুন উন্নয়ন সহযোগী) নিশ্চিত করতে হবে।

 তৃতীয়ত, একটি জাতীয় দক্ষতা রূপান্তর কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যাতে এ পেশাজীবীরা নতুন খাতে অবদান রাখতে পারেন।

 চতুর্থত, উন্নয়ন খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

 পঞ্চমত, একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা প্যাকেজ চালু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, এ সংকট শুধু একটি অর্থায়ন সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোর একটি মৌলিক পরীক্ষার সময়। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি টেকসই, স্বনির্ভর উন্নয়ন মডেলে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। তবে সেই রূপান্তর হতে হবে পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক—যেখানে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি, অর্থাৎ মানুষ, উপেক্ষিত হবে না।