গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ২০টি এনবিএফআইকে চিহ্নিত করে, যার মধ্যে নয়টিকে অবসায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে অবশ্য তিনটিকে পুনরুদ্ধারের জন্য সময় দেয়া হয়। চলমান এ সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এনবিএফআইর সংখ্যা ৩৫—এর মধ্যে তিনটি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি নন-ডিপোজিটরি, অর্থাৎ তারা আমানত সংগ্রহ করে না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এনবিএফআইগুলোর মোট ঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৮২৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে শিল্প খাতে ৪৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ঋণ গেছে। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, নির্মাণে ১৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং ভোক্তা খাতে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ ঋণ বিতরণ হয়েছে। একই সময়ে এ খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশে।

বাংলাদেশে এনবিএফআই খাত শুরু থেকেই একটি ত্রুটিপূর্ণ মডেলে পরিচালিত হয়েছে। ভারতে এ খাতে অনেক বড় বড় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে—যেমন এইচডিএফসি, আইসিআইসিআই বা মাহিন্দ্রা ফাইন্যান্স—যারা নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সেবা দিয়ে থাকে। কেউ কৃষি, কেউ স্বর্ণঋণ, কেউ মর্টগেজ, আবার কেউ অবকাঠামো বা ভোক্তা অর্থায়নে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে এবং ব্যাংক যেখানে অর্থায়ন করে না, সেখানে তারা ভূমিকা রাখে। বিপরীতে বাংলাদেশে এনবিএফআইগুলো অনেকটাই ‘ছায়া ব্যাংক’ হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংক থেকে তহবিল নিয়ে একই গ্রাহককে ঋণ দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বন্ড বা বিভিন্ন আমানত স্কিমের মাধ্যমে বিকল্প তহবিল সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। একই সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রক নজরদারিও সংকটকে বাড়িয়েছে।

তবে সংকটের মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। দেখা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠান খাতভিত্তিক ব্যবসায়িক কৌশল ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। বিপরীতে দুর্বল সুশাসন, নিয়ম ভঙ্গ করে ঋণ বিতরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পর্ষদ ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে, যা পুরো খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

কেবল পর্ষদ পুনর্গঠন বা সীমিত তারল্য জোগান দিয়ে এ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন একটি কঠোর ও বাস্তবসম্মত ‘এক্সিট পলিসি’ বা একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া। যেসব প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারযোগ্য, তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বা বিশেষ তারল্য সহায়তা প্রয়োজন। তবে তার আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এনবিএফআইগুলোকে আবাসন, গাড়ি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা সবুজ অর্থায়নের মতো বিশেষায়িত খাতে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তাদের অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে।

আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার তদারকি আরো শক্তিশালী করতে হবে এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় এনে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। সঠিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এবং খাতভিত্তিক মডেলে রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হলে এনবিএফআইগুলো আবারো দেশের অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।