বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে বাংলাদেশের। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। তবে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে উন্নতি হয়েছে তার মূলে রয়েছে ব্যক্তি খাত। সেই ব্যক্তি খাতে শুরুর তিন দশকে নারীর অবদান খুঁজে পাওয়া বড়ই মুশকিল। তবে সম্প্রতি নারী উদ্যোক্তা বিকশিত হচ্ছে। শুরুটা কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোগের মাধ্যমে হলেও বিকশিত হচ্ছে নারীরা।

অর্থনীতির মূল খাতে বাংলাদেশের নারীর অংশগ্রহণ আশির দশকের শেষভাগে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও নারী সর্বদাই এ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এসেছে। তৈরি পোশাক খাত ছাড়াও অন্যান্য খাতে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক এবং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি তাদের সনাতনী কর্মক্ষেত্র কৃষিতেও তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য হতে দেখা যায়, গত ১০ বছরে কৃষিক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণের হার যেখানে হ্রাস পেয়েছেম সেখানে নারীর অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। সেগুলো জাতীয় আয়ে নারীর অবদান অতি নগণ্য। এর মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় সেগুলো হলো উৎপাদনশীল পরিমণ্ডলের সিংহভাগ ক্ষেত্রে নারীকে অনুৎপাদনশীল ও কেবল ভোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা। উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে, যেমন কৃষিক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে যথাযথভাবে জাতীয় পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত না করা, নারীর গৃহস্থালির কাজ অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে গণ্য না হওয়া। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে ও গৃহস্থালির কাজে নারীর সমন্বিত অংশগ্রহণকে একটি পরিমাপযোগ্য একক মানদণ্ডে এনে তুলনামূলক পরিসংখ্যান পদ্ধতির অভাব। (তথ্যসূত্র: হোমায়রা আহেমদ, জাতীয় আয়ে নারীর অবদান: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ, বিআইডিএস)

আবহমানকাল ধরেই বাংলাদেশে কুটির শিল্পে নারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। চুন তৈরি, ঠোঙা তৈরি, বাঁশ ও বেত শিল্প, তাঁত বোনা, জাল বোনা, ছোবড়া শিল্প, মাদুর বোনা শিল্প ইত্যাদিতে নারীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া নকশিকাঁথা তৈরি, কাচ, মোম, শোলা ইত্যদি দিয়ে বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী তৈরির শিল্পে, ব্লক বাটিক, টাই ডাই ইত্যাদি শিল্পে প্রায় এককভাবে নারীরা অবদান রেখে যাচ্ছেন। নব্বইয়ের দশক থেকে ‘বুটিক’ শিল্পের মাধ্যমে যে নবজাগরণ এসেছে তাতে কুটির শিল্পে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে বহুগুণে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কুটির শিল্পে নারীর কাজগুলোকে নারীর গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলা হয়। ফলে কুটির শিল্পে নারীর এ বিস্তৃত অংশগ্রহণ একদিকে যেমন জাতীয় পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় সামান্যই, অন্যদিকে তেমনি জাতীয় আয়েও নারীর এ অবদান স্বীকৃতি পায় সামান্যই। শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি নানা ধরনের নারীবান্ধব কর্মসূচির ফলে কুটির শিল্প খাতে নিয়োজিত নারীদের অনেকেই আনুষ্ঠানিক খাতে উদ্যোগ নিচ্ছেন। কুটির শিল্পে নিয়োজিত অনেক নারী তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণে কারখানা বর্ধিত করে ক্ষুদ্র শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বাংলাদেশে বড় নারী উদ্যোক্তাদের যাত্রাটা শুরু হয়েছে মূলত পারিবারিকভাবে বিশেষ করে বাবার ব্যবসার হাল ধরে কিংবা স্বামীর অংশীদার হয়ে উদ্যোক্তা সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে ৯০-এর দশক থেকে নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঘিরে। আর সাম্প্রতিক কালে ই-কমার্স বা অনলাইনভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা নতুনভাবে পথ দেখাচ্ছে। অনলাইনে এখন বস্ত্র, গয়না, সাংসারিক পণ্য, শিশুখাদ্য, প্রসাধনসামগ্রী থেকে শুরু করে শিক্ষণীয় বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গান শেখা, গিটার শেখা, আর্ট, কেয়ার গিভার, স্বাস্থ্যসেবাসহ যাবতীয় বিষয় এখন অনলাইনে শেখানো হয়। এসবও এক ধরনের উপার্জনের মাধ্যম। এই অনলাইন মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি।

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও অর্থনীতিতে নারীদের অবদান খুব বেশি পরিশীলিত হয়নি। অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের অবদান প্রায় ৯২ শতাংশ। তবে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারী শুধু চাকরি নয়, বরং নিজে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। আর বর্তমানে নারীরা সেই দিকটিই বেছে নিচ্ছেন। পৃথিবীর মাত্র ২ শতাংশ নারীর কাছে তাদের ব্যবসা পরিচালনার মূলধন থাকে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি কেমন তা বিভিন্ন গবেষনায় উঠে এসেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী শিল্পোদ্যোক্তাদের বার্ষিক ঋণ চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করতে পারছে না ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ পাওয়া সহজ করতে জামানত ছাড়াই ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়ার নির্দেশ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এখনো কার্যকর উদ্যোগে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংক খাত। নারীদের উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যাংকের অবদান মাত্র ২৩ শতাংশ। সেখানে অর্ধেকের বেশি আসছে উচ্চসুদের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) ঋণ। এছাড়া পরিবার ও ব্যক্তিনির্ভরতার মাধ্যমে আসছে অর্থায়নের বড় অংশ। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়ন টেকসই হতে বাধাগ্রস্ত করছে।

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যমতে, এক দশকের ব্যবধানে নারী প্রধান অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৩ সালে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ৩ শতাংশ নারী প্রতিষ্ঠান প্রধান হলেও ২০১৩ সালে তা ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। সুযোগ-সুবিধা ও নীতিসহায়তা পেলে নারীপ্রধান অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। বাজেটে করমুক্ত লেনদেনের বা আয়ের এ সীমা বাড়ানোর ফলে নারীদের কিছুটা হলেও সহযোগিতা হবে। তবে নারীদের জন্য আরো বেশি সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন নারী উদ্যোক্তারা।

নারী উদ্যোক্তাদের মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হিসেবে কৃষি ও মত্স্য খাত ছাড়াও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, পর্যটন, ফ্যাশন ও সৌন্দর্য পণ্য, স্বাস্থ্যবিষয়ক পণ্য এবং অনলাইন ব্যবসায় বেশি আগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি গার্মেন্টস ও অ্যাকসেসরিজ, বিউটি পার্লার, টেইলারিং, রিটেইল শপ, আইটি, ইলেকট্রনিকস, সফটওয়্যার, পাটজাত পণ্য ও হ্যান্ডিক্রাফটস খাতে নারী উদ্যোক্তা বাড়ছে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) চালু করলে নারীদের অনেক সমস্যা দূর হবে। ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া থেকে শুরু করে মালামাল গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতিটি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে নারীদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের অর্থায়ন বাধা দূর করতে হবে।

নারীরা ব্যবসা পরিচালনা ক্ষেত্রে এখনো বেশ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছেন। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য ও নারীর সুনির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করতে গবেষণা পরিচালনা করেছে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। ‘চ্যালেঞ্জেস অব ট্রেডিং অ্যাক্রস বর্ডারস ফেসিং দ্য উইমেন ট্রেডারস অব বাংলাদেশ: রিসেন্ট ফাইন্ডিংস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমদানি ও রফতানি-সংক্রান্ত বিশেষ করে ঋণপত্র (এলসি), নগদ সুবিধা ও জিএসপি সনদ পেতে সংগ্রহ ও নবায়ন করতে পুরুষ উদ্যোক্তাদের তুলনায় নারী উদ্যোক্তাদের বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় বহন করতে হয়। নারীদের নানান প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের বিষয়ে সংগঠনটি সুপারিশ করেছে। নারীদের জন্য ট্রেড ও বন্ড লাইসেন্স, এলসি খোলা ও নগদ সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এছাড়া নারীদের সক্ষমতা তৈরি, প্রচ্ছন্ন ব্যয় (হিডেন চার্জ) বন্ধ করা, লিড টাইম কমানো, ব্যাংকিং অর্থায়ন পেতে নারী উদ্যোক্তাদের গ্যারান্টরের সংখ্যা কমানো, নারীদের জন্য সক্রিয় হেল্প ডেস্ক চালু করতে হবে। সনদায়ন ও অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ ও এইচএস কোড-সংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে হবে।

বাজেটে নারীদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি নারী উদ্যোক্তাদের সহায়ক হবে। দেশের নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি। ফলে বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা ও সেই অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। তবে আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালকগত অসুবিধাগুলো অপসারণ করতে হবে। কেননা ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তারা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে। লাইসেন্স জটিলতার কারণে অনেক নারী ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নারীদের ঋণ ও ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ করা দরকার। নারীদের ঋণপত্র (এলসি) খোলা, নগদ সুবিধা ও সনদ পেতে নারী উদ্যোক্তাদের সাধারণত পুরুষের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এ ধরনের বৈষম্যগুলো দূর করা প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি দেশের আর্থসামাজিক সমতার ক্ষেত্রে বড় অর্জন। অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়াতে হলে নারী শ্রমশক্তিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাজে নিয়োজনের পথ সুগম করতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী নারীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় বিশেষ হেল্প ডেস্ক থাকলেও সেগুলোতে হালনাগাদ তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালনগত অসুবিধাগুলো অপসারণ করতে হবে। কেননা ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তারা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে। লাইসেন্স জটিলতার কারণে অনেক নারী ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নারীদের ঋণ ও ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ করা দরকার। নারীদের ঋণপত্র (এলসি) খোলা, নগদ সুবিধা ও সনদ পেতে নারী উদ্যোক্তাদের সাধারণত পুরুষের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এ ধরনের বৈষম্যগুলো দূর করা প্রয়োজন। ব্যবসা শুরু থেকে বিপণনের সকল পর্যায়ে প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি নীতিসহায়তা বাড়াতে হবে। দেশের নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ফলে বাজেটে নারীদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা ও সেই অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও সুযোগ-সুবিধা ও পরিবারের প্রয়োজনেই প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করেই উদ্যোক্তা হচ্ছেন নারী। তবে কভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি নারীদের জন্য নতুনভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ই-কমার্সভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য নারীরা বেশ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে। প্রথমত ডেলিভারি সিস্টেম ও পরিবহন সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে নারীদের। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে এ দুটি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে নারীদের আরো বেশি উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি ইন্টারনেট সুবিধা আরো সাশ্রয়ী ও ভোক্তাবান্ধব করা প্রয়োজন। অর্থায়ন ও সনদায়ন প্রক্রিয়ায় নারীরা যেন অংশগ্রহণ করতে পারে সে ব্যবস্থাটা আরো সহজ করা দরকার। উই প্লাটফর্মে চার লাখের বেশি নারী উদ্যোক্তা থাকলেও ট্রেড লাইসেন্স অনেকেরই নেই। ফলে অনেক নারী উদ্যোক্তা সরকারের হিসেবের মধ্যে আসতে পারছে না। তারা আবার সরকারের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দেশের নারীদের উদ্যোক্তা তৈরি পরিস্থিতি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের ওপর গবেষণা করেছে। ‘সিচুয়েশন অব উইম্যান সিএএসএমই অন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যান্ড ইনফরমাল সেক্টর ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীরা কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে অর্থায়ন নিয়েছেন। সেখানে অর্থায়নের উৎস হিসেবে এনজিওদের অবদান ৪৯ শতাংশ। এর পরই ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে আসছে ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ, পারিবারিক উৎস থেকে ২৭.৭ শতাংশ। ব্যাংকের সাধারণ ঋণের খাত থেকে নারীদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে ১৩ শতাংশ এবং ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা ঋণ খাত থেকে আসছে আরো প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাংকের অর্থায়ন অবদান মাত্র ২৩ শতাংশ। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে আসছে ১০ শতাংশ, অন্যান্য ব্যবসায়িক খাত বা আয়ের উৎস থেকে ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য খাত থেকে আসছে প্রায় ১ শতাংশ অর্থায়ন। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখাকে নতুন নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত ছাড়াই ঋণ দেয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। তবে সেসব সুযোগ যথেষ্ট ভালোভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না বিধায় নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে জনপ্রিয়হীন ব্যাংক খাত।

নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে তাই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। যেমন পেশাদারদের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা ও এসএমইদের সেবা প্রদান করা, নারীদের জন্য এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা, নগদ সুবিধা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা, সক্ষমতা তৈরি, প্রচ্ছন্ন ব্যয় (হিডেন চার্জ) বন্ধ করা, লিড টাইম কমানো, সিজনাল ফাইন্যান্সিং ত্বরান্বিত করা, নারী উদ্যোক্তাদের গ্যারান্টরের সংখ্যা কমানো, নারীদের জন্য সক্রিয় হেল্প ডেস্ক চালু করা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ, বন্ড লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, এইচএস কোড-সংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে নতুন এইচএস কোড চালু করা ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের জ্ঞানস্বল্পতার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। ৫০ বছর ধরে যেসব নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে তাদের সিংহভাগই ছোট ও ক্ষুদ্র। তবে সুযোগ ও সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে বড় হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। সময় এখন বড় হওয়ার। সেখানে প্রতিবন্ধকতা গৌণ কোনো বিষয় হবে না।

 

নাসরিন ফাতেমা আউয়াল: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব), ভাইস চেয়ারম্যান, মাল্টিমোড গ্রুপ