আমার জন্ম সৌদি আরবে, আশির দশকের মাঝামাঝি। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। তবে জন্মের পর থেকে বেশ কয়েক বছর আমার সৌদিতে কেটেছে। খুবই অল্পসল্প স্মৃতি আছে সেখানকার। যেমন আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকতাম, তার বাড়িওয়ালার মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করা। বাড়িওয়ালি আন্টি আমাকে অনেক আদর করতেন। আসলে আমার আম্মু তার অনেক পছন্দের মানুষ ছিল। তারা অনেকটা বান্ধবীর মতো মিশেছেন। ওই গ্রামের নাম ছিল তোয়াল। ওদের জীবনধারা সম্পর্কে আমার যা কিছু মনে আছে তা হলো, ওদের বাড়িতে পুরুষ আর নারীদের চলাচল সীমিত। আলাদা করে গণ্ডি বা দেয়াল করা। দুটো বসার ঘর। একটা বাইরের, যেখানে পুরুষরা বসে। অন্যটা অন্দরমহলের, মেয়েদের জন্য। ওদের খাওয়া-দাওয়ার রীতি আমাদের থেকে অন্য রকম। ডাইনিং টেবিলও পুরুষ আর নারীদের জন্য আলাদা। বড় থালায় একসঙ্গে সবার খাবার দেয়া হয়। সবাই সে থালার চারপাশে গোল হয়ে বসে। এরপর একসঙ্গে এক থালা থেকেই খাওয়া-দাওয়া করে। ওরা শিশুদের দোলনা বানায় লম্বা কাপড় দিয়ে, খাটের এক পায়া থেকে আরেক পায়া পর্যন্ত বেঁধে। শিশুকে ওই কাপড়ের মধ্যে শুইয়ে ওরা বিছানায় বসে পা দিয়ে দোলায়। এমন কয়েকজন মাকে দেখেছি পা দিয়ে সন্তানকে দোলাচ্ছে আর হাত দিয়ে কোনো কাজ করছে। ওদের পরনের জামা হচ্ছে লম্বা ফ্রক, কোমর থেকে কুচি দেয়া, আজকাল যেটাকে ফ্লোর টাচ বা লং গাউন বলা হয়। কেউ কেউ ম্যাক্সির মতো এক ছাটের লং ফ্রকও পরে। এর ওপরে ওরা আলগা একটা কালো কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকে। সে কাপড়ের দুই পাশে বোতাম করা থাকে। ওটা সামনে এনে চিবুক থেকে নিচ পর্যন্ত লাগানো হয়। দেখতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত বোরকার মতো। এরপর মুখে নেকাব বাঁধে। আলাদা কোনো ওড়না বা হিজাব মাথায় ব্যবহার করে না। মেয়েরা সাজগোজের অংশ হিসেবে হাতে ও পায়ে মেহেদি দেয়। সোনার অলংকার পরে। ছেলেরা গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা জামা পরে আর মাথায় কাপড় দেয়, একটা ব্যান্ড দিয়ে আটকে রাখে। এরা মেহেদি দেয় না। ছেলেদের স্বর্ণালংকার আর সিল্কের জামা পরা নিষেধ।

এরপরে জেদ্দা থেকে আমরা জিজান চলে যাই, আব্বুর জব ট্রান্সফারের জন্য। ওখানে আমরা সম্পূর্ণ একটা বাড়ি ভাড়া নিই। বাড়িওয়ালা অন্য জায়গায় থাকত। বাড়ির সামনে কবরস্থান ছিল। ওখানে কবরস্থান নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বা ভয়ের কিছু শুনিনি যেমনটা বাংলাদেশে শোনা যায়। ওদের দৃষ্টিতে কবরস্থান একটি পবিত্র জায়গা।

মানুষ হিসেবে ওরা অন্তঃপ্রাণ। কিন্তু একবার কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে বা ধারণা হলে ওরা খুব খারাপ ব্যবহার করে। আমার আব্বু ন্যাশনাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে জব করত। ব্যাংকের সবাই তাকে খুব সম্মান করত, ভালোবাসত। আম্মুকেও যথাযথ সম্মান করতে দেখেছি। কারো সঙ্গে দেখা হলে বা কারো বাসায় গেলে অথবা কেউ বাসায় এলে সঙ্গের ছোট ছেলেমেয়েকে টাকা দেয়ার প্রথা আছে। আমার শৈশবে জনপ্রতি সর্বনিম্ন আশারা রিয়াল দিতে দেখেছি।

দেশে ফিরে এসে প্রথম উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে এবং পরে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করি। এইচএসসির পর ব্যবসায় প্রশাসনে স্মাতক পড়তে শুরু করি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। চতুর্থ বর্ষের শেষ সেমিস্টার শেষ না করেই যুক্তরাজ্যে চলে আসি ২০০৯ সালে, পড়াশোনার উদ্দেশ্যেই। পড়া শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন জটিলতার কারণে আর দেশে যাওয়া হয়নি। সাড়ে ১৩ বছর হলো যুক্তরাজ্যে বসবাস করছি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যেরই একটা অঙ্গরাজ্য স্কটল্যান্ডের অধিবাসী। পড়াশোনার পাশাপাশি এ দেশে দাম্পত্য জীবনও শুরু হয়। আমার স্বামী আগে থেকেই যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিল। এখানে আসার তিন বছরের মাথায় আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তী চার বছরে আরো দুই সন্তান পৃথিবীতে এসেছে।

আমি স্ট্রেইথক্লাইড ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসনের ওপর স্নাতক সম্পন্ন করেছি। এরপর এসিসিএ পড়া শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশে থাকাকালেই আমি এসিসিএর প্রথম পার্ট সমমানের কোর্স সিএটি সম্পন্ন করেছিলাম। এরপর পরিবারের চাপে স্নাতক পড়তে হয়েছে। পরে নতুন উদ্যমে এসিসিএ পড়তে শুরু করলেও ছেলেদের দেখাশোনা করতে গিয়ে আর শেষ করা হয়নি। চাকরিও করিনি কখনো। সে রকম ইচ্ছে ছিলই না। নয়টা-পাঁচটার রুটিনে বাঁধা পড়াটা আমার জন্য খানিক অস্বস্তির। আমি মুক্ত পাখির মতো জীবনযাপন করতে ভালোবাসি। তাই শুরু থেকেই ইচ্ছে ছিল বাসায় বসে কিছু একটা করার। মাঝেমধ্যে অল্পসল্প সুযোগ হয়েছে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার। যেমন ছেলেদের স্কুলে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি খণ্ডকালীন। আসলে ছেলেদের সঠিকভাবে লালনপালন করার, ওদের সুমানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজকেই আমি পেশা হিসেবে নিয়েছি। পেশা বললাম এজন্য, ভিনদেশে জন্ম নেয়া আর বেড়ে ওঠায় বাংলাদেশের সঙ্গে ওদের আত্মিক বন্ধন সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই বলে বাংলাদেশী মা হয়ে চুপচাপ বসে থাকা আমাকে দিয়ে হয় না। আমার মনে হয়েছে, ঘরের বাইরে গিয়ে চাকরি করার চেয়ে ছেলেদের বাংলাদেশী হিসেবে গড়ে তোলাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি ওদের বাংলা ভাষা শেখাই। বাংলা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ওদের বাংলাদেশের গল্প, বাংলাদেশের ইতিহাস শোনাই। কখনো আমার ছোটবলার গল্প বলি। হ্যাঁ, আমি বেতন পাই না। তবু কাজটা আমি খুব আনন্দের সঙ্গে করি।

জীবনে যা-ই করা হোক, তা হওয়া উচিত আনন্দের। তাতে পারিশ্রমিক কম হোক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক না মিলুক, ইচ্ছাধীন কাজ করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তার সঙ্গে কখনোই অন্যকিছু দিয়ে সমঝোতা করা উচিত নয়। আমার থিউরি এটা। এ দেশের চাকরি করলে আমি হয়তো অনেক বড় অংকের স্যালারি পাব। সে অর্থে আমার জীবন, আমার পরিবার প্রচণ্ড বিলাসিতায় চলতে পারবে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ওই যে মন থেকে উঠে আসা যে আনন্দ, ওটা আর পাব না। ওই আনন্দের দাম আমার কাছে বিলাসী জীবনের চেয়েও অনেক মূল্যবান। তাই হাজব্যান্ডকে বলেছি, জীবিকার তাগিদে যতটুকু সে একা আয় করতে পারে, অতটুকু দিয়েই আমরা চলব। হোক মধ্যবিত্ত ঘরানা, তবু চলব। আমি জীবনকে এভাবেই দেখতে ভালোবাসি।

গত ১৩ বছরে একবারও বাংলাদেশে যাইনি। কিন্তু খুব অনুভব করি দেশকে। আমি চেষ্টা করি, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে থাকলেও যেন বাংলাদেশ আমার অন্তরে গেঁথে থাকে সারাক্ষণ। তাই পোশাক হিসেবে আমি শাড়িকে প্রাধান্য দিই। কনকনে শীতে কিংবা বরফজমা দিনেও আমি ওভারকোটের নিচে শাড়ি পরি। শাড়ির সঙ্গে হাঁটুসম বুট জুতা পরি। গলায় মাফলার, মাথায় হিজাবের ওপর টুপি আর হাতে গ্লাভস পরি। আমি স্কটল্যান্ডের আবহাওয়ার সঙ্গে শাড়িকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেছিলাম। সফলও হয়েছি বলা যায়! আমি বাংলা গান শুনি। ঘরের বাইরে ফুল সাউন্ডে বাংলা গান শুনতে আমার একটুও অস্বস্তি হয় না। ভিনদেশের মানুষগুলোকে দেশের গল্প শোনাতে ভালোবাসি।

প্রথমে পড়াশোনা এরপর সন্তান লালনপালন, নানাবিধ কারণে আমি ভিনদেশীদের সঙ্গে খুব একটা মিশিনি। ঠিক যতটুকু না হলেই নয়, ততখানি মিশতে হয়েছে নানা প্রয়োজনে। স্কটিশরা অবশ্য খুবই মিশুক। শুরুর দিকে আমার টাউনে আমি ও আমার পরিবারই একমাত্র বাংলাদেশী ছিল। ওরা সানন্দে আমাদের গ্রহণ করেছে। আমার ছেলেরা যখন নার্সারিতে জয়েন করেছে, ওখানের টিচারদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। কখনো তারা আমাকে একাকী অনুভব করতে দেয়নি। সত্যি বলতে, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে আমি কখনোই একা মনে করিনি। রাস্তাঘাটে সবসময়ই সাহায্য বা সমর্থনের বাড়ানো হাত ধরেছি। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডে রেফারেন্ডাম নিয়ে প্রবল তোলপাড় চলছিল, যুক্তরাজ্য থেকে তারা আলাদা হতে চাইছিল। আমি সরকারি দলের মেম্বার হিসেবে যোগ দিই। ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করি ওদের সঙ্গে। সে সময়ে আমি প্রচুর স্কটিশের সঙ্গে মিশেছি। ওদের আমার নিজের দেশ সম্পর্কে বলেছি। আমার ধর্ম সম্পর্কেও ওদের জানিয়েছি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, স্কটিশরা মুসলমানদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। আমার টাউনে বিশাল বড় পরিসরে মসজিদ তৈরি হয়েছে সরকারি আর ব্যক্তিগত অনুদান মিলিয়ে। আমার হিজাবকে ওরা কখনই হেয় করেনি। বরং হিজাব পরিহিত কাউকে সম্মানের সঙ্গে পথ বাতলে দিয়েছে।

স্কটল্যান্ডে আমি গ্লাসগোর পাশে একটা ছোট টাউনে থাকি। সাড়ে ১০ বছর আগে এখানে এসেছিলাম। তখন টাউনে সবাই স্কটিশ ছিল। একমাত্র আমরাই বিদেশী। পরবর্তী সময়ে অন্য কমিউনিটির মানুষও আসতে শুরু করে। বেশির ভাগই ইউরোপিয়ান। অল্পকিছু আফ্রিকান আছে। এশিয়ান বলতে ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি আছে। পাকিস্তানিই বেশি। বাংলাদেশী কাউকে আমি এখনো দেখিনি এ টাউনে। বাংলাদেশীরা মূলত গ্লাসগো শহরেই থাকে। শহরের বাইরে যেতে তাদের আগ্রহ কম।

আসলে ভিনদেশীদের কাছ থেকে ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেয়ে আমার দেশ সম্পর্কে, আমার সংস্কৃতি সম্পর্কে ওদের জানাতে বেশি আগ্রহী আমি। হয়তো এজন্যই ১৩ বছর বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করেও আমি বাংলাদেশকে অন্তরে লালন করি। যেকোনো আসরে নিজের দেশ সম্পর্কে বলতে চেষ্টা করি আমি। নিজের ধর্ম সম্পর্কে জানাতে চেষ্টা করি। আমার চালচলন আর বেশভূষাতেও বাংলাদেশের ছোঁয়া থাকে। যেমন আমি নিয়মিত শাড়ি পরি। ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ওদের আগ্রহ অনেক। তাই সহজেই ওদের বাংলাদেশ, বাঙালিয়ানা, আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য সম্পর্কে জানানো যায়। ওরা মন দিয়ে শোনে। বাসায় ছেলেদের বন্ধুরা যদি তাদের বাবা-মাকে নিয়ে আসে, আমি সবসময় বাঙালি খাবার দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করি। কখনো সখনো আমাদের ভাষা নিয়েও বলি। ইতিহাস নিয়ে বলি গল্পের ছলে। বাসায় সবসময় বাঙালিয়ানা চলে। তাই আশপাশের প্রতিবেশী বা পরিচিতরা বাংলাদেশ আর বাঙালি সম্পর্কে কমবেশি জানে। ওরা বেশি অ্যাপ্রিশিয়েট করে, আমি ভিনদেশে থেকেই নিজের দেশের সংস্কৃতি চর্চা করি।

এখানে চাকরিজীবন বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন। এখানে দুই ধরনের জব আছে। একটা হচ্ছে অফিশিয়াল, অন্যটা নন-অফিশিয়াল। অফিশিয়াল চাকরি করতে গেলে অবশ্যই শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে। তবে ওরা শিক্ষার চেয়ে অভিজ্ঞতাকে প্রায়োরিটি দেয় বেশি। যেমন কেউ হয়তো হাইলি এডুকেটেড নয়, কিন্তু কাজ পারে ভালো। তাদের সহজেই চাকরিতে নিয়ে নেয়। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরও সুযোগ মেলে। সেক্ষেত্রে তিন মাসের রিভিউ টাইম থাকে। এ তিন মাসে ভালো কাজ করে দেখাতে পারলে চাকরি পারমানেন্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার এখানে রিকমেন্ডেশনের সুযোগ থাকলেও ইন্টারভিউ আর কাজের পারফরম্যান্সই আসল। মামা-চাচা ধরনের ব্যাপার নেই। অফিশিয়ালি বেতন হয় মূলত অ্যানুয়াল। মান্থলিও থাকে কোথাও।

নন-অফিশিয়াল জব হচ্ছে, অফিসের বাইরের জবগুলো। যেমন সুপারমার্কেট, ফাস্টফুড, রেস্টুরেন্ট কিংবা দোকানপাট, ফ্যাশন শপ। সেখানে চাকরি করতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। এ দেশে প্রাইমারি স্কুল সেভেন পর্যন্ত। আর হাই স্কুল টুয়েলভ পর্যন্ত। যাকে বাংলাদেশে এইচএসসির সমমান ধরা হয়। এ পর্যন্ত পড়াশোনা করাটা দেশটিতে বাধ্যতামূলক এবং আর্থিক বিষয় যেন পড়ার বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেজন্য সরকার পুরোটাই ফ্রি করে দিয়েছে। স্কুলের মিল বা লাঞ্চও প্রাইমারি লেভেলে ফ্রি। তাই এরা মূলত টুয়েলভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেই।

১৬ বছর বয়স থেকে পার্ট টাইম জব করার সুযোগ আছে এখানে। মানে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা। স্কুল লিভারদের জন্য অনেক কোম্পানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার থাকে। সরকারি অফিসগুলোতেও স্কুল লিভারদের নেয়া হয়। কিছু চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে দেয়াই থাকে স্কুল লিভাররা অ্যাপ্লাই করবে। বয়স দেয়া থাকে ১৬-২৪ পর্যন্ত। ১৮ বছর থেকে ফুল টাইম জব করতে পারবে। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা। তো মিনিমাম শিক্ষাগত যোগ্যতা সবারই একরকম। তাই এদিকে খুব একটা প্রায়োরিটি দেয়া হয় না। ইন্টারভিউ বেজড থাকে, মানে ইন্টারভিউতে কেমন প্রেজেন্টেশন করবে। আর তিন মাসের রিভিউ টাইম তো থাকেই। এ কারণে অনেকের বেলায় দেখা যায় স্কুল শেষ করেই আর পড়াশোনা করেনি। কাজে ঢুকে গিয়েছে আর সেখানে একের পর এক প্রমোশন হয়ে শেষমেশ ক্যারিয়ার তৈরি হয়ে গিয়েছে। আমার হাজব্যান্ড এখানে ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করেছে অনেক বছর। ক্রু মেম্বার হিসেবে জয়েন করেছিল। শেষ অবধি শিফট ম্যানেজার পোস্টে ছিল। ইমিগ্রেশন জটিলতা না থাকলে এতদিনে স্টোর ম্যানেজার বা হায়ার ম্যানেজমেন্টে চলে যেত। ইমিগ্রেশন জটিলতা পার হওয়ার পর সে আর ম্যাকডোনাল্ডসে জয়েন করেনি। এখন স্কটিশ পাওয়ার নামে একটা ইউটিলিটি কোম্পানিতে কাস্টমার সার্ভিস অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করছে।

নন-অফিশিয়াল জবগুলো সাধারণত পার ঘণ্টায় বেতন হয়। এ দেশের ন্যাশনাল মিনিমাম ওয়েজ নির্ধারণ করে দেয়া আছে। ৯ দশমিক ৫০ পাউন্ড প্রতি ঘণ্টা হিসেবে। এর মানে হচ্ছে, কেউ এ দেশে জব করলে তাকে ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম এ টাকা দিতে বাধ্য এমপ্লয়ার। কোম্পানিভেদে এর চেয়ে বেশিও হতে পারে। কিন্তু এর নিচে দেয়া যাবে না। তাই বলে সবাই এই রেটে কাজ করে, তা না। কেউ কেউ এর নিচের রেটেও কাজ করে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় কারো পেপারস নেই। কারো কাজ করার অনুমতি নেই। আবার কিছু জব থাকে ক্যাশ ইন হ্যান্ড। ওগুলোয় বেতন এমপ্লয়ার আর এমপ্লয়ি আলোচনা করে নেয়।

এখানকার অধিবাসীরা খানিকটা কনজারভেটিভ মাইন্ডের। শুরুতেই হুট করে নতুন কারো সঙ্গে মেশে না। কিন্তু একবার কোনোভাবে মিশতে শুরু করলে জানপ্রাণ ঢেলে দেবে। রেসিজম এদের মধ্যে আমি দেখিনি। তবে অন্য কমিউনিটির লোকজনের সঙ্গে মিশতে গেলে একটা দূরত্ব বজায় রাখে। এখানকার মানুষ এমনিতে খুব মিশুক। রাস্তাঘাটে কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে হাই-হ্যালো বলা, কুশল বিনিময় করা ওদের স্বভাব। হোক অপরিচিত। একদমই কথা না বললে ওরা হাসি বিনিময় করে। রাস্তাঘাটে কেউ বিপদে পড়লে এরা অবশ্যই এগিয়ে আসবে। ছোট শিশু সঙ্গে আছে, এমন মা বা বয়স্ক অথবা যেকোনো বয়সী মহিলাদের এরা সম্মান দেয়, শিশুদের বিশেষভাবে আদর করে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে অনেকবার আমার সন্তানরা অন্য প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে গল্প করেছে। ব্যাগে চকোলেট থাকলে নির্দ্বিধায় বের করে দেয় শিশুদের হাতে, তবে অবশ্যই মাকে জিজ্ঞেস করে নেয়। স্কুলে সব শিশুই সমান প্রায়োরিটি পায়। আমার মনে হয়েছে, স্কটিশরা শিশুদের প্রচুর ভালোবাসে। হোক নিজের, কি অন্যের। এদের মধ্যে একটা প্রথা আছে, নিজের সন্তানের জামাকাপড় বা ব্যবহূত জিনিসপত্র এরা অনেক যত্ন করে রাখে। একেবারে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলেও ফেলে দেয় না। পরিচিত বা অপরিচিত কাউকে দিয়ে দেয়। এগুলোকে এরা বলে প্রি-লাভড। শুধু সন্তানদের না, ঘরের যেকোনো জিনিসপত্র এরা ফেলে দেয় না। দরকার না পড়লে অন্য কাউকে ফ্রিতে দিয়ে দেবে। দরকার পড়লে নিজে দিয়ে আসবে। অথবা গাড়ির তেল খরচ করে পৌঁছে দেবে, কিন্তু ফেলে দেবে না। এভাবে ধনী-গরিবের মধ্যে এরা ব্যালান্স করে। যার কারণে হুট করে কেউ বুঝতে পারে না কে ধনী, কে গরিব।

পড়াশোনা করতে গিয়েও আমি ওদের কাছ থেকে অনেক হেল্প পেয়েছি। আমার সমস্যা ছিল, ওদের কথা বুঝতে না পারা। ইংলিশে কথা বললেও একসেন্ট অন্য রকম। তবু ঠেকেঠুকে ভালোই হেল্প পেয়েছি। যদিও আমার পক্ষে ওদের সঙ্গে খুব একটা মেশা সম্ভব হয়নি। ক্লাসের বাইরে আমি মিশতাম না। সংসার আর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। কোনো বন্ধু ছিল না। তবে ক্লাসমেটরা ছিল ফ্রেন্ডলি।

দুই দেশের লেখাপড়ার সিস্টেমে অনেক তফাত আছে। বাংলাদেশে আমি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। সেমিস্টার ওয়াইজ আমাকে চারটা সাবজেক্ট নিতে হয়েছে। সেগুলোয় রীতিমতো কোমরে আঁচল বেঁধে পড়াশোনা করতে হয়েছে স্কুল-কলেজের মতো। বইপত্র কিনে মুখস্থ করার ব্যাপার আর কি। প্রতি সেমিস্টারে মিড টার্ম আর ফাইনাল টার্ম এক্সাম দিতে হয়েছে। এখানে সিস্টেম আলাদা। আমরা ক্লাসে বইপত্র কিনেছি। কিন্তু লেকচারগুলো কখনই বই থেকে দেয়া হয়নি। বইয়ের থিউরিকে বেস করে লেকচারগুলো দেয়া হতো প্র্যাকটিক্যাল আঙ্গিকে। একেক লেকচারারের একেক রকম লেকচার দেয়ার ধরন ছিল। আর পরীক্ষা বলতে এখানে অ্যাসাইনমেন্ট আর ডিজারটেশন। টপিক দিতে হয় প্র্যাকটিক্যাল বেজড। মানে বই থেকে আমি থিউরি নিতে পারব। ফলো করতে পারব। কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে প্র্যাকটিক্যালি কোনো টপিকের ওপর। রেজাল্ট দেয়া হয় তিনটা গ্রেডে। পি মানে পাস, এম মানে মেরিট আর ডি মানে ডিসটিংশন। বইয়ের লেখা গত্বাঁধা মুখস্থ করে পরীক্ষা দেবার ব্যাপার স্যাপার এখানে নেই।

বাংলাদেশের আর এখানকার স্কুলগুলোয়ও অনেক পার্থক্য আছে। এখানকার স্কুলে প্রাইমারি লেভেল পর্যন্ত মানে ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত কোনো এক্সাম হয় না। কেবল ছয় মাস ও বারো মাসের রিভিউ সিস্টেম আছে। একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে প্যারেন্টসকে ডাকা হয়। ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় হাতে নিয়ে পিউপিলের পড়াশোনা ও অন্যসব অ্যাক্টিভিটিজ নিয়ে আলোচনা হয়। টিচার সবসময় পজিটিভ জিনিসগুলোয় ফোকাস করে। নেগেটিভ কিছু থাকলেও সেটাকে অন্যভাবে হ্যান্ডেল করে বা ইগনোর করে। স্কুলে পড়াশোনাও সম্পূর্ণ বইবেজড না। আউটডোর আর ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজ আছে। আসলে এদের পড়াশোনা শুরু হয় নার্সারি থেকে। স্কটল্যান্ডে নার্সারি শুরু হয় দুই বছর বয়স থেকে। এখানে বাচ্চারা খেলার ছলে এবিসিডি, ওয়ানটুথ্রি, রাইমস বিভিন্ন কিছু শেখে। এর সঙ্গে ঘরের কাজকর্মও শেখে। নিজের কাজ কীভাবে নিজে করতে হয়, কীভাবে নিজে হাত দিয়ে খাবার খেতে হয়, কীভাবে মাকে ঘরের কাজে হেল্প করতে হয়, ম্যানারস ইত্যাদি সবকিছু নার্সারিতেই শেখে শিশুরা। ফলে প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে ক্লাস ওয়ানে যেসব শিশু ভর্তি হয়, তারা অলরেডি বেসিক পড়াশোনা জানে। তাদের পড়াশোনা শুরু হয় অ্যাডভান্সড লেভেলে গিয়ে। একই সঙ্গে ক্লাসের কিছু কাজকর্মও এরা করে। যেমন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, ক্লাস ক্যাপ্টেন, ক্লাস ক্লিনার, ক্লাস অর্গানাইজার, ডোর স্টপার ইত্যাদি। এসব কাজের জন্য এদের স্কুল থেকে বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। যেমন হেড টিচার অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট পিউপিল অ্যাওয়ার্ড। হাতের লেখা ও গুড ম্যানারসের জন্যও অ্যাওয়ার্ড থাকে। সপ্তাহে একদিন পিই ক্লাস থাকে। একদিন আউটডোর ক্লাস থাকে। আউটডোরে ওরা নেচার সম্পর্কে প্র্যাকটিক্যালি জানে। কীভাবে নেচারের মধ্যে নিজেকে হ্যান্ডেল করতে হয়, কীভাবে রক্ষা করতে হয়। এনভায়রনমেন্ট পলিউশন যেন না হয়। গাছ লাগানো কর্মসূচি থাকে। বাসায় গাছ লাগানোর হোম স্টাডি থাকে। পোষা প্রাণী নিয়েও সিলেবাস থাকে। এদের সম্পর্কে জানা, টেককেয়ার বা রোগবালাই সম্পর্কে জ্ঞান দেয়া হয় সেখানে। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার নিয়ম শেখানো হয়। স্কুলের জিনিসপত্র কেনার কাজে পিউপিলদের ব্যবহার করা হয়। যেমন স্টেশনারি কিছু কিনতে হবে, লাঞ্চের জন্য খাবার কিনতে হবে, টিচার নিজে গাইড করে এদের নিয়ে যায় সুপারমার্কেটে। এরা নিজেরাই লিস্ট ধরে খাবার পিক করে ট্রলিতে, এরপর স্ক্যান করে, টিচারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পে করে, আবার নিজ হাতে বয়ে আনে। টিচার কিছু করবে না। শুধু গাইড দেবে। বিভিন্ন অকেশন যেমন ক্রিসমাস বা হ্যালোউইন, ইস্টার এগুলোয় স্কুল সাজানোর কাজ এরাই করে। স্কুল ক্লিন করার কাজও করে।

অর্থাৎ কেবল বইয়ের পড়াই নয়, এর বাইরেও অনেক অ্যাক্টিভিটিজ থাকে সিলেবাসে। বছরে দুই-তিনবার স্টাডি ট্যুরে নিয়ে যাওয়া হয়। এদের বইয়ের পড়াশোনা শুরু হয় হাইস্কুলে। সেখানে বিভিন্ন সাবজেক্ট থাকে। ক্লাসে এক্সাম চলে। ক্লাস টেনের পর এসএসসি সমমানের এক্সাম হয়। টুয়েলভ ক্লাসের পর এইচএসসি সমমানের এক্সাম দিতে হয়।

আমি এখানে অবসর সময়ে লিখি। আমার লেখালেখির জগতে পা দেয়ার শুরুটা একটু অন্য রকম। প্রথমে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতাম। অনেকটা দিনলিপির মতো। আমার পালক ছেলে মান্নাতকে নিয়ে লিখলাম। মান্নাত মূলত খরগোশ। আমার বিয়ের পরের বছরই ওকে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে নিয়ে আসি। ওর মা ওর জন্মের পরই মারা গেছে। প্রতিবেশী এই ছোট বাচ্চাকে লালন-পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেত। আমি তখন ওকে লালন-পালন করতে শুরু করলাম। একসময় আমার নিজের সন্তান এল দুনিয়ায়। ওর সঙ্গে তার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়ে গেল অনায়াসে। সে হয়ে উঠল আমার বড় সন্তান। আমার ছেলেদের বড় ভাই। ওকে নিয়ে লিখতে গিয়েই মূলত বড়সড় পাঠক দলের মধ্যখানে নিজেকে আবিষ্কার করি। ধারাবাহিক লেখা শেষ হওয়ার পরও অনেকে অনুরোধ করত ইনবক্সে, মান্নাতকে নিয়ে আরো কিছু লিখতে। হোক বানিয়ে বানিয়ে, তবু যেন লিখি। সেই থেকে কাল্পনিক বিষয়টা মাথায় ঢুকে গেল। কদিন পর একজনের জীবন থেকে নেয়া কিছু অভিজ্ঞতা ধার করে উপন্যাস লিখলাম। সে উপন্যাস প্রবল জনপ্রিয়তা পেল, যা ছিল কল্পনাতীত। নতুন লেখক, কাঁচা হাতের লেখা অবশ্যই। এমনও হয়েছে, কারো আমার লেখা উপন্যাস পছন্দ হয়নি। কিন্তু সে অপছন্দের রাস্তায় না হেঁটে আমাকে পরামর্শ দিয়েছে লেখালেখি যেন আরো চালিয়ে যাই। আরো বেশি যেন পড়াশোনা করি এ সেক্টরে। তাতে আমার লেখা ধীরে ধীরে পরিপক্ব হবে। নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও যে একদমই হয়নি, তা নয়। অনেকে আমার লেখা এ উপন্যাস নিজের নামে কপি করে বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করতে লাগল। আমি হতাশায় ভুগছিলাম। এভাবে লেখা চুরি হতে থাকলে আমি আর আগ্রহ পাব বলে তো মনে হয় না। লেখালেখি ছেড়ে দেব কিনা ভাবছি, এমন সময় পেন্সিল এগিয়ে এল। আমি তাদের ফেসবুক গ্রুপে লিখতে শুরু করলাম। আমার পাঠক বাড়তে লাগল। ২০১৮ সালে পেন্সিল সিদ্ধান্ত নিল তারা নিজেদের প্রকাশনা শুরু করবে। সে মোতাবেক আমাকে বলা হলো পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে। আমি তখনো বই প্রকাশের অ-আ-ক-খ কিছুই জানি না। তারাই আমাকে হাতে ধরে শেখাল কীভাবে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হয়। অতঃপর সেই তুমুল জনপ্রিয় উপন্যাস, যা কিনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন নিজ নামে কপি করেছে, প্রকাশ হলো পেন্সিল পাবলিকেশনস থেকে। অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন প্রকাশনী আর নতুন লেখকের জন্য বিক্রির সংখ্যা ছিল প্রচুর। সেই থেকে লেখক হিসেবে আমার আত্মপ্রকাশ আর লেখালেখির জগতে পথচলা। পরবর্তী সময়ে পেন্সিল পাবলিকেশনস থেকে আরো দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন প্রকাশনী আমার বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হলেও আমি মনস্থির করলাম, বছরে একটা কি দুটো বই প্রকাশ করব।

আমি এ পথে হাঁটতে চাই বহুদূর। নীরবে লিখে যেতে চাই। কোনো শোরগোল নয়, কোনো হই-হল্লা নয়, আমি চাই আমার লেখা উপন্যাসগুলো দেশের প্রতিটি পাঠক পড়ুক। তাদের ইতিবাচক পাঠপ্রতিক্রিয়া আমাকে অনুপ্রেরণা দেবে আরো ভালো লিখতে। আর নেতিবাচক পাঠ প্রতিক্রিয়া আমাকে ধরিয়ে দেবে খুঁতগুলো।

 

রেশমী রফিক: স্কটল্যান্ড প্রবাসী