আমি জার্মানি আসি ২০১৯ সালের অক্টোবরে, ক্লাস শুরু ১৪-এ। এসে পৌঁছেছিলাম ১২ তারিখ সন্ধ্যায়। পরদিন রোববার। এদিন জার্মানিতে রেস্টুরেন্ট বাদে সব দোকানপাট বন্ধ থাকে। বন্ধ মানে বন্ধ, এমনকি ফার্মেসিও খোলা থাকে না। তাতে কী সমস্যা? এখানে তো আর দেশী সিম কার্ড চলে না, একটা কেনা দরকার ছিল। দোকানপাট বন্ধ মানে সোমবার পর্যন্ত কানা হয়ে বসে থাকা। এই ছিল জার্মানিতে আমার ইন্ট্রোডাকশন এবং প্রথম কালচারাল শক।

আমি এখানে মাস্টার্স করছি (বা করে ফেলেছি বললেও চলে, থিসিস ডেডলাইন জানুয়ারিতে, এরপর মাস্টার্স শেষ) ইউনিভার্সিটি অব স্টুটগার্টে কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকস নিয়ে। তা এ বদখত নামের সাবজেক্টের ফোকাস কী নিয়ে? একটা উদাহরণ দিই। স্মার্টফোনে, স্মার্ট স্পিকারে আজকাল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকে যেমন গুগল নাও, সিরি, এলেক্সা ইত্যাদি। আপনি যখন সাবলীল সুন্দর ভাষায় কোনো কমান্ড দেন বা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন তখন এই অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো সেটা বুঝে আপনাকে উত্তর দিতে পারে। এখানে স্পিচ রিকগনিশন, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কোয়েশ্চন অ্যানসারিং ইত্যাদি অনেক টেকনিক্যাল ফিল্ডে মানুষের বছরের পর বছর ধরে করা গবেষণার ফলাফল ব্যবহার করা হয়। আপনার কাছে যেটা ইনস্ট্যান্ট ন্যাচারাল অ্যান্সার মনে হয়, সেটাকে এই ‘ন্যাচারাল’ পর্যায়ে আনতে মানুষের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আমার এই সাবজেক্টের একটা সাবফিল্ড হচ্ছে এটা নিয়ে কাজ করা। সমসাময়িক প্রযুক্তির ব্যাপারে খোঁজ রাখলে ওপেনএওয়ান ড্যাল-ই টুয়ের কথা জানার কথা। যেখানে একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু বলতে হয়, আপনি কী ধরনের ছবি চান­। সে আপনাকে সে ছবি বানিয়ে দেবে। এটাও আমার সাবজেক্টের একটা সাবফিল্ড, এটাকে আমরা মাল্টিমোডাল সিমান্টিকসের আন্ডারে ধরি। এ রকম আরো অনেক সাবফিল্ড আছে। আমাদের কাজ মানুষের ভাষা নিয়ে এবং এখানে একেকজন তার পছন্দমতো সাবফিল্ড নিয়ে কাজ করে।

জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স বা হোখশুলে, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও ফুল স্টেট ইউনিভার্সিটি। এই বিভাজন করা হয় এরা যে ডিগ্রি দেবে সে ডিগ্রি অর্জন করার পর শিক্ষার্থী কী করতে পারবে এবং তার ডিগ্রির উদ্দেশ্য কী হবে। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও ফুল স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিগ্রির উদ্দেশ্য এবং সামগ্রিক পাঠ্যক্রম খুব একটা আলাদা হয় না। দুটোই প্রচুর গবেষণাকেন্দ্রিক এবং এদের মূল উদ্দেশ্য থাকে, যে যেই ফিল্ড নিয়ে পড়তে আগ্রহী, সে সেই ফিল্ডের একজন এক্সপার্ট হবে বা ভবিষ্যতে এই ফিল্ড নিয়ে কাজ করবে। হোখশুলের উদ্দেশ্য আবার ভিন্ন। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্কিলড প্রফেশনাল তৈরি করা এবং তাদের পাঠ্যক্রমও ওইভাবেই সাজানো থাকে। ইউনিভার্সিটি অব স্টুটগার্ট ফুল স্টেট ইউনিভার্সিটি। এরা গবেষণাকেন্দ্রিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কাঠামো ওভাবেই তৈরি করা। এখানে বলা বাহুল্য, জার্মানিতে হাতেগোনা কিছু বিজনেস স্কুল বাদ দিলে বাদবাকি সব বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অর্থায়নে চলে এবং যে বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রদেশে, সেখানকার প্রাদেশিক সরকারের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থার জন্য দায়ী থাকে। এমনিতে সব বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত।

জার্মানির প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রচুর মাত্রায় বিকেন্দ্রিক। একটা উদাহরণ দিই। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় কখন কিসের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করবে সেটা ঠিক করতে পারে না। অনুষদও পারবে না। বরং অ্যাডমিশন রিকোয়ারমেন্ট ঠিক করবে সাবজেক্ট যে ডিপার্টমেন্ট পড়ায় তারা। এ কারণে একেক স্টাডি প্রোগ্রাম বা সাবজেক্টের অ্যাডমিশন রিকোয়ারমেন্ট একেক রকম। কোনো কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটিও থাকে না। ডিপার্টমেন্ট নিজের ভর্তি আবেদন সব নিজেই প্রসেস করে, রেজাল্ট দেয়। যারা অ্যাডমিশন লেটার পায়, তাদের আইডি কার্ড, পরীক্ষা আর টিউশন ফি শুধু সেন্ট্রাল অফিসের হাতে থাকে।

জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বেশির ভাগ মাস্টার্স প্রোগ্রাম ইংরেজিতে পড়ায়। অল্প কিছু প্রোগ্রাম আছে যেগুলো শুধু জার্মান কিংবা জার্মান-ইংরেজি দুই ভাষায়ই পড়ায়। আমার স্টাডি প্রোগ্রাম ইংরেজিতে। অনার্স পর্যায়ে আবার উল্টো হয়। অধুনা কিছু বাছা বাছা প্রোগ্রাম তারা ইংরেজিতে পড়ালেও, বাদবাকি সব অনার্স প্রোগ্রামেই ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইনস্ট্রাকশন হচ্ছে জার্মান।

মাস্টার্স যেহেতু ইংরেজিতে পড়াচ্ছে, তাই ভর্তি আবেদনের সময় আইইএলটিএস কিংবা টোফেল পরীক্ষার ফলাফল ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা দেখাতে হয়। একেক প্রোগ্রামের জন্য আইইএলটিএস বা টোফেল স্কোরের মান একেক রকম। কিছু প্রোগ্রামে আইইএলটিএসে সাতের নিচে পেলে আবেদনই করা যায় না। কিছু প্রোগ্রামে আবার সাড়ে পাঁচ পেয়েও লোকে ভর্তি হতে পারে। তাই যারা আবেদন করবেন, তাদের প্রোগ্রামের ওয়েবসাইট ভালো করে ঘেঁটে দেখা উচিত। সেখানে কী কী লাগবে, কখন আবেদন করতে হবে সব বিস্তারিত বলা থাকে। কিন্তু আপনি যদি অনার্স প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করেন তখন আপনাকে জার্মান ভাষায় সম্পূরক কোনো সার্টিফিকেট দেখাতে হবে। কিন্তু আপনাকে আগে জানতে হবে কী কী প্রোগ্রাম কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, তারপর বাছাই করে আবেদন করবেন! এজন্য জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জের (ডাড) ওয়েবসাইট আছে। ওখানে গিয়ে আপনি ভাষা, শহর, অনার্স, মাস্টার্স ইত্যাদি ফিল্টার বসিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রোগ্রাম খুঁজতে পারবেন।

জার্মানিতে কয়েক বছর ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পড়তে টিউশন ফি লাগে না। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন স্টুটগার্ট, টুবিঙ্গেন, হাইডেলবার্গ, কার্লশ্রুহে, উল্ম, এসলিংগেন ইত্যাদি। এলাকাগুলো বাদেন ভুর্তেমবার্গ প্রদেশে অবস্থিত। এ প্রদেশের সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর নাগরিক বাদে সবাইকে প্রতি সেমিস্টারে ১৫০০ ইউরো করে ফি দিতে হবে। এই ফি না থাকলে সবাইকে সেমিস্টার কন্ট্রিবিউশন ফি দিতে হয়, যা খুব বেশি হলে ২৫০ ইউরোর মতো। এই ফিতে শিক্ষার্থীদের জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টের টিকিটও থাকে। (আবারো এই এক প্রদেশ বাদে আলাদা করে সেমিস্টার টিকিট কিনতে হয়। কী এক মুসিবত!)

ধরুন, আপনি অ্যাডমিশন লেটার পেয়েছেন, এরপর কী করবেন? সোজা ঢাকার জার্মান দূতাবাসের ওয়েবসাইটে যাবেন। দেখবেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লিস্টের কী অবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে তারা ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেমে বেশ রদবদল করেছে এবং তাদের সুবিধামতো তারা এটি যখন খুশি বদলাতে পারে। ওয়েবসাইটে আপনাকে দুটো জিনিস খেয়াল করতে হবে। তারা আইইএলটিএস বা টোফেলের স্কোর কত চেয়েছে। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় যদি তাদের চাওয়া স্কোরের চেয়ে কমে আপনাকে অ্যাডমিশন লেটার দিয়ে দেয়, ভিসা দেবে না। এক্সসেপশনাল কেসে অনেককে ছাড় দেয় অনেক সময়। কিন্তু সব কেস এক্সসেপশনাল কেস নয়। আরেকটি হচ্ছে ব্লক অ্যাকাউন্টে কত টাকা রাখতে হবে। ব্লক অ্যাকাউন্ট একটা সিকিউরিটি ডিপোজিটের মতো। এটি জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারণ করে। তারা ফি বছর হিসাব করে, জার্মানিতে এক বছর থাকতে একজন মানুষের নিদেনপক্ষে কী পরিমাণ খরচ লাগতে পারে, সে অনুযায়ী এ ব্লকের পরিমাণ নির্ধারণ করে। আপনি যখন ব্লক অ্যাকাউন্ট খুলবেন, তখন এই পরিমাণ ইউরো আপনাকে জার্মানিতে পাঠাতে হবে। আপনি জার্মান পৌঁছানোর পর মাসে মাসে আপনাকে সরকার পরিমাণ অনুযায়ী টাকা এ ব্লক থেকেই দেবে। পুরো টাকা একসঙ্গে দেবে না। উইথড্রো করার একটাই সুযোগ আছে যদি আপনি তাদের বলেন, আর জার্মানিতে থাকবেন না, দেশে চলে যাবেন। তখন দেশে এসে জার্মান দূতাবাসকে জানালে তারা ব্যাংকে চিঠি দেবে, এরপর আপনার টাকা দেশে ফেরত আসবে।

তো ব্লকে এত টাকা কাকে কীভাবে পাঠাবেন? জার্মান দূতাবাসের ওয়েবসাইটে কিছু প্রোভাইডারের নাম দেয়া আছে (ফিনটিবা, কোরাকল)। এদের মাধ্যমে ব্লকের প্রসেস শুরু করতে পারবেন। আর দেশে কোনো এক ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খুলে আপনাকে টাকা পাঠাতে হবে। এজন্য যা কাগজ লাগবে সেটা আপনার ব্লক প্রোভাইডার দিয়ে দেবে। আর আপনার দেশী ব্যাংকে কথা বলতে হবে, এর বাইরে তাদের আর কোনো ডকুমেন্ট লাগবে কিনা।

আগে যেমন বলেছিলাম, এখানে সব বিকেন্দ্রীকরণ করা। ভিসার জন্য এখানে কোনো সেন্ট্রাল অথরিটি নেই। বরং আপনার ভিসা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রসেস করবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শহরের পৌরসভার ইমিগ্রেশন অফিস। যদি এমন হয়, জার্মান যাওয়ার পর আপনি মূল শহরে না থেকে আশপাশের কোনো ডিস্ট্রিক্টে থাকার জায়গা পেয়েছেন, তাহলে সে ডিস্ট্রিক্টের যে ইমিগ্রেশন অফিস তারা আপনার ভিসার বাকি কাজ দেখবে। একেক অফিসের নিয়ম একেক রকম। কিছু জায়গায় প্রতি বছর ভিসা এক্সটেনশনের সময় ব্লকের সমান পরিমাণ টাকা চলতি হিসেবের জার্মান ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেখাতে হয়, কিছু অফিসে তারা এগুলো নিয়ে এত মাথা ঘামায় না। এখানে নিয়ম হচ্ছে নতুন কেউ শহরে এলে তাদের ঠিকানা রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। আপনি যদি বাসা বা ডর্ম পান, আপনাকে রেন্টাল কন্ট্রাক্ট দেবে। সেটা নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসে যাবেন, ওরা আপনার ঠিকানা রেজিস্ট্রার করে নেবে। রেজিস্ট্রেশনের পর থেকে আপনার ভিসা এবং বাদবাকি সব কাজের জন্য এই এক শহরের অফিসেই যেতে হবে। অন্য কেউ আপনার ভিসায় হাত দিতে পারবে না। কারণ এখানে কোনো সেন্ট্রাল ডাটাবেজ নেই। আপনি যদি বার্লিনে রেজিস্টার্ড হন, মিউনিখের ইমিগ্রেশন অফিসের জানার কোনো এখতিয়ার নেই, আপনি আদৌ জার্মানিতে আছেন কিনা। সেটা বার্লিনের ইমিগ্রেশন অফিস বা ‘আউসল্যান্ডারবিহোর্দে’ বা ‘বুরগেরামতআইনভান্দারুং’-এর কাজ।

ভিসার বিষয় গেল। জার্মানিতে আসবেন কীভাবে, থাকবেন কোথায়? দেশ থেকে আসার উপায় হচ্ছে টার্কিশ এয়ারলাইনস, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস। আপনার বাজেট ও কখন কোন ফ্লাইট আছে সেটা দেখে টিকিট নেবেন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজের কোনো হোস্টেল নেই। সব শহরের একটা সেন্ট্রাল স্টুডেন্ট সার্ভিস থাকে, হোস্টেল সব তাদের। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় যে শহরের সেখানকার স্টাডিরেন্ডেনওয়ের্কের ওয়েবসাইটে যাবেন (গুগলে সার্চ দিলেই পাবেন), দেখবেন তাদের হোস্টেলগুলোয় রুমের অফার দেয়া আছে। আবেদন করবেন, ওরা আপনাকে বাদবাকি জানাবে। যদি হোস্টেলে না থাকতে চান, তাহলে খরচ অনেক বাড়বে এবং জার্মানিতে না থাকলে বাসা ভাড়া পাওয়াও মুশকিল। স্টুটগার্টের উদাহরণ যদি দিই, হোস্টেলে রুমের ভাড়া (এক রুমে একজনই থাকে) মাসে সর্বোচ্চ ৩৫০ ইউরো হবে। অন্যদিকে, এক রুমের একটা বাসা নিতে আপনার ৭৫০ ইউরোর মতো গুনতে হবে। জার্মানির কিছু কিছু এলাকায় বাসা ভাড়া অনেক সস্তা। কিন্তু আমার মতে স্টুডেন্টদের অন্তত কালচারাল ইন্টিগ্রেশনের জন্য হলেও হোস্টেলে থাকা উচিত। তাছাড়া হোস্টেলগুলো এমন সব লোকেশনে বানানো যেখান থেকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খুব সহজে পাওয়া যায়।

জার্মানি ও বাদবাকি ইউরোপের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অসম্ভব রকমের ভালো। যদিও জার্মানদের অভিযোগ আছে, ট্রেন সবসময় ২-৩ মিনিট লেট করে আসে। এদের যখন বলি, আমাদের দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বেশির ভাগ যানবাহন বেসরকারি মালিকানাধীন, সরকারি যানবাহন খুব কম। এরা চোখ কপালে তুলে বলে, এ আবার কেমন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম? পশ্চিম ইউরোপের যেখানেই যান টিকেটিং সিস্টেম হোক আর পাবলিক ট্রান্সপোর্টের, কোয়ালিটি ঘুরেফিরে একই রকম। এ কারণে এদেশে ট্যাক্সিতে চড়া বেশ ব্যয়বহুল। ট্রেনে যদি কোনো জায়গায় যেতে আপনার ৩ ইউরো লাগে, ট্যাক্সিতে লাগবে ৫০-১০০।

জার্মানরা গাড়ির জন্য বিখ্যাত এবং আমার পরিচিত যত জার্মান আছে সবাই গাড়ি চালাতে জানে। এদের কাছে এটা বেসিক লাইফ স্কিল। কিন্তু খুব দূরপাল্লার যাতায়াত না হলে এরা সচরাচর নিজের গাড়ি বের করবে না। এদের কথা হচ্ছে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সবই বলতে গেলে বিদ্যুতে চলে (বাসও), তাই তেল পোড়ে না, যেহেতু তেল পোড়াতে হচ্ছে না, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পরিবেশবান্ধব, এজন্য তারা খুব দরকার না পড়লে নিজের গাড়ি বের করার মানে দেখে না। এ কারণে হয়তো জার্মানিতে উবার তেমন জনপ্রিয় হয়নি। জায়গায় জায়গায় যদি সস্তা বাস-ট্রাম-ট্রেন থাকে এবং আরামে চলাফেরা করা যায়, কে এত পয়সা খরচ করে গাড়িতে চড়বে? তার ওপর বাসে-ট্রেনে ফ্রি ওয়াই-ফাই থাকে।

যে বিষয় দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। সিম কার্ড। জার্মানিতে বড় অপারেটর তিনটি। টেলিকম (যারা জার্মানির বাইরে টি-মোবাইল নামে ব্যবসা করে), ভোডাফোন, ও২। এর বাইরে কিছু সস্তা প্রোভাইডার আছে যারা কিনা এই বড় অপারেটরদের থেকে নেটওয়ার্ক ভাড়া নিয়ে সার্ভিস দেয়। বড় অপারেটরদের প্ল্যানের খরচ বেশি, এরা অনেক বেশি ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস দেয়, যেগুলো সস্তা প্রোভাইডাররা সস্তায় দিতে পারে না। যেমন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোয় গেলে লোকাল রেটে কথা বলতে পারা বা লোকাল রেটে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারা। গরমের ছুটিতে যখন ইউরোপে ঘোরাফেরা করবেন তখন এ জিনিস খুব কাজে লাগে। এখানে আসার পর সবার প্ল্যান দেখবেন, ইন্টারনেট ভলিউম, মান্থলি ফি সব মিলিয়ে যেটা জুতসই মনে হবে নিয়ে নেবেন।

জেনে রাখা ভালো, আপনার জার্মান ভিসা দিয়ে আপনি ইইউ ও শেনজেনভুক্ত সব দেশে যেতে পারবেন। বাড়তি ভিসা লাগবে না। বড়জোর ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞেস করতে পারে, ঘুরতে আসছেন নাকি অন্য কাজে। আসার পর আপনাকে একটা চলতি হিসেবের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। যদি জার্মান না জানেন, আপনার জন্য তিনটি অপশন আছে। ডয়েচে ব্যাংক, কমার্জব্যাংক, স্পার্কাসে। এদের ইংরেজিতে সার্ভিস আছে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় দেখে নিতে হবে, কারো কোনো ইয়ারলি বা মান্থলি ফি আছে কিনা।

জার্মানিতে বসবাস করা সবার হেলথ ইন্স্যুরেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। আপনি হেলথ ইন্স্যুরেন্স এখানে এসে করতে পারবেন কিংবা দেশে। যখন ব্লক অ্যাকাউন্ট খুলবেন, তখন প্রোভাইডার আপনাকে হেলথ ইন্স্যুরেন্সের প্যাকেজ অফার করবে। ওটা নিয়ে নিজে ঝামেলা কম পাবেন। এখানে বয়সের একটা ব্যাপার আছে। আপনার বয়স যদি ৩০-এর নিচে হয়, আপনি পাবলিক হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিতে পারবেন। খরচ কম। স্টুডেন্টদের জন্য মাসে ১১৩ ইউরোর মতো। কিন্তু বয়স বেশি হলে আপনাকে প্রাইভেট  ইন্স্যুরেন্স নিতে হবে। সেখানে  ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি যেভাবে ফি স্ট্রাকচার দেয় সেভাবে আপনার টাকা যাবে। যেমন কিছু প্রাইভেট  ইন্স্যুরেন্স আছে যারা মাসে মাত্র ৩০ ইউরো চার্জ করে, কিন্তু ডাক্তারের কাছে গেলে পুরো ফি আপনার নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। এরপর ওদের ইনভয়েস দিলে ওরা সে টাকা ওদের লিমিট অনুযায়ী আপনাকে ফেরত দেবে। উন্নত দেশে ডাক্তার দেখানোর খরচ অনেক। সামান্য ভিজিটের ফি দেশী টাকায় ৩০-৪০ হাজারের মতো।  ইন্স্যুরেন্স কভার না দিলে দেখা যাবে সামান্য সর্দি-জ্বর আপনাকে ফতুর করে দিয়েছে। (এখানে ফার্মেসিতে গেলেই ওষুধ দেয় না। প্রেসক্রিপশন লাগবে। বাকি বুঝে নিন।)

এবার আসি খাবারদাবার এবং অন্যান্য ব্যাপারে। এরা খাবারে তেমন মসলা দেয় না। দিলেও আমাদের মতো দেয় না। মসলা আপনি ইন্ডিয়ান বা টার্কিশ দোকানে পাবেন। বড় শহরে থাকলে বাংলাদেশী দোকানও পাবেন। কিন্তু রেস্টুরেন্টে গেলে মসলার জন্য আপনার একমাত্র ভরসা হচ্ছে টার্কিশ রেস্টুরেন্ট বা ইম্বিসগুলো কিংবা কাবাবের দোকানগুলো।

ইউরোপিয়ান কালচার খুব ডিসটিঙ্কট। আপনি যদি হলিউডের মুভি দেখে এদের ও আমেরিকান কালচার এক কাতারে ফেলতে যান, ভুল করবেন। এদের কোনো মিল নেই। ইউরোপিয়ানরা মোটাদাগে ফোকাসড, যথেষ্ট লজিক্যাল, ইনডিভিজুয়ালিস্টিক এবং ওপেন মাইন্ডেড। আপনি যদি কোনো বিষয়ে কথা বলতে চান এরা বাগড়া দেবে না, খুব মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনবে এবং আপনার লজিক্যাল রিজনিং যদি ঠিক মনে হয় মেনে নেবে। এরা মানুষের পার্সোনাল স্পেসকে বেশ সম্মান করে এবং আশা করে, যারা এখানে আসবে তারাও একই কাজ করবে।

কালচার কম্পেয়ার করা আমার পছন্দ নয়। একেক কালচার একেক রকম। এদের মাঝে প্যারালাল টানার কিছু নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা এদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। ডয়েচে ভেলের ইউটিউব চ্যানেলে মিট দ্য জার্মানস নামে একটি মিনি সিরিজ আছে। ওটা ভালো করে দেখে নেবেন।

আপনার স্টুডেন্ট পারমিট দিয়ে বছরে ১২০ দিন ফুলটাইম এবং ২৪০ দিন হাফটাইম কাজ করতে পারবেন। আপনি যদি কোনো কোর্সের টিউটর, সায়েন্টিফিক বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন, তাহলে সেটা এ হিসেবে ধরা হয় না। বাইরে কাজ করতে গেলে ধরবে এবং বাইরে কাজ করতে গেলে জার্মান জানা অনেকাংশে বাধ্যতামূলক। যারা আইটি কোম্পানিতে পার্ট টাইম করবেন তাদের হয়তো এত লাগবে না। কিন্তু বাকিদের অনেক জায়গায় জার্মান না জানলে কাজেই নেবে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এখানে সব অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ জার্মান। যে অফিসেই যান, যদি ইংরেজি জানা লোক থাকে সেটা আপনার কপাল, আর থাকলেও এরা ইংরেজিতে আপনাকে সার্ভিস দিতে বাধ্য না। বড় শহরে ইংরেজি বলে থাকা যায়। ছোট শহরে জার্মান না জানলে মুদি দোকানেও যেতে পারবেন না। তাই আসার আগে মোটামুটি কাজ চালানোর মতো জার্মান শিখে আসা ভালো। না হলে আমার মতো এখানে এসে ধাক্কা খেয়ে শিখতে হবে।

 

শাওন আশরাফ: জার্মান প্রবাসী