একজন মানুষ কেন নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায়? জন্ম মুহূর্ত থেকে দিনের পর দিন একটু একটু করে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা পারিবারিক ও সামাজিক আচার, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আবহাওয়া ও অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে শক্তপোক্তভাবে লালিত হওয়া সুঠাম দেহ আর মনকে কেন একজন মানুষ খুব আপন আর প্রিয় মৃত্তিকা থেকে সমূলে উপড়ে নিয়ে শিকড় ছড়ায় ভিন্ন দেশে, ভিন্ন আবহে, ভিন্ন বাতাসে? কিছু প্রশ্নের জবাব একটি মাত্র উত্তরে দেয়া যায় না। শত আঙ্গিকে শত প্রসঙ্গের অবতারণায় মিলেমিশে তৈরি হয় অনেকগুলো উত্তররেখা। আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে বসবাস করছি, আমরা যদি সেই পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, কেন এসেছিলাম আর কেন রয়ে গেলাম বিদেশের মাটিতে—তাহলে নানা রকমের কথা বলা যাবে এর উত্তরে। তবু যদি আমরা আজকের এ লেখায় স্বল্প পরিসরে ব্রিটেনে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশী অভিবাসীর জীবনের গল্প লক্ষ করি, তাহলে হয়তো কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে, কিছুটা আঁচ করা যাবে এ প্রশ্নের জবাবে কী কী কথা আসতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসে দুই ধরনের মানুষ। প্রথম ধরনটি হচ্ছে সিলেটি বাঙালি। আর দ্বিতীয় ধরনটি হচ্ছে নন-সিলেটি বাঙালি, অর্থাৎ সিলেটের বাইরে বাংলাদেশের আর সব অঞ্চলের মানুষ।

যুক্তরাজ্যে অভিবাসী সম্প্রদায়ের ভেতর অন্যতম বৃহত্তম সংখ্যায় আছে ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের অবস্থান। ইংল্যান্ডে বসবাসরত মোট প্রবাসী বাংলাদেশীর ভেতর ৯৫ ভাগই সিলেটি বাঙালি, যারা বংশপরম্পরায় সেই ৭০-এর দশক থেকে ইংল্যান্ডে বসবাস করে আসছে। সিলেটি পরিবারের ভেতর পরস্পরকে টেনে তোলার প্রবণতার বিষয়টি লক্ষণীয়। তারা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেশে অবস্থান করা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের বিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসার ব্যাপারে খুব আগ্রহী। অধিকাংশ ব্রিটিশ সিলেটি পরিবারের ছেলেমেয়েরা ব্রিটেনে লেখাপড়া করে ব্রিটেনে চাকরি অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও বিয়ের সময় তাদের বেছে নিতে হয় বাংলাদেশের বর অথবা কনেকে।

অনেক সময় ছেলে ও মেয়েদের জোর করে দেশে নিয়ে গিয়ে বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্রপাত্রীর সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। তারপর বিয়ের কাবিননামা ব্যবহার করে পাসপোর্টে ব্রিটিশ ভিসা লাগিয়ে তাদের ইংল্যান্ডে নিয়ে আসা হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে চাপিয়ে দেয়া এসব বিয়ের কিছু শেষ পর্যন্ত টিকে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবাহ নামক বন্ধনগুলো আজীবন টিকে থাকে না। ইংল্যান্ডে অভিবাসী নতুন জেনারেশনের ভেতর বিবাহবিচ্ছেদের মাত্রা অত্যন্ত বেশি।

ইংল্যান্ডের নতুন ঘরবাড়িগুলো সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে তৈরি হয়ে থাকে। গোটা ইংল্যান্ডে মোটামুটি একই ধরনের ঘরবাড়ি দেখা যায়। ফ্ল্যাট ছাড়া বাড়িগুলো তৈরি হয় তিনটি ধারায়। টেরাস, সেমি ডিটাচড ও ডিটাচড হাউজ। অনেকগুলো বাড়ি একটির সীমানা দেয়াল থেকেই আরেকটি বাড়ি, এমন করে ৩০-৪০টির মতো বাড়ি এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, এদের বলা হয় টেরাস হাউজ।

আবার গায়ে গায়ে লাগিয়ে দুটি করে বাড়ি তৈরি করা হয়, এদের বলা হয় সেমি ডিটাচড হাউজ। এবং বাংলাদেশের মতো যে বাড়িগুলোর চারপাশের খোলা জায়গা থাকে তাকে বলা হয় ডিটাচড হাউজ। বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা থেকে সহজেই অনুমেয়, দামের দিক থেকে ডিটাচড হাউজের মূল্য বেশি।

সিলেট ছাড়াও যুক্তরাজ্যে আছে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার মানুষ। এর মধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর উল্লেখযোগ্য। নন-সিলেটিদের ভেতর বেশির ভাগ মানুষ ইংল্যান্ডে আসে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশ থেকে ইউকের ভিসার আবেদন করে কোনো একটা কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে একটা কোনো সাবজেক্টে লেখাপড়া করার আগ্রহ প্রকাশ করে। ইংল্যান্ডে স্টুডেন্ট ভিসায় আগত ইন্টারন্যাশনাল ছাত্রছাত্রীরা টার্ম টাইমে কাজ করার অনুমতি পায় সপ্তাহে শুধু ২০ ঘণ্টা আর কলেজ বন্ধের সময় ফুলটাইম কাজ করা যায়। যদিও স্টুডেন্ট ভিসায় আসা ৯০ ভাগ মানুষ ইংল্যান্ডে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির সন্ধানে নেমে পড়ে।

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মানুষগুলো চেষ্টা করে যত দ্রুত সম্ভব ইউকে আসার খরচের টাকা তুলে ফেলতে এবং মাসে মাসে দেশে কিছু পরিমাণ অর্থ পাঠাতে। এমনকি বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও একবার ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখার পর নিজের ভেতরকার ক্যারিয়ারের উচ্চাশাকে মন থেকে মুছে ফেলেন একরকম। ছোটখাটো একটা কাজ আর বিলাতের বাতাসে ফুরফুরে মেজাজে ভেসে বেড়ানোতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে আরম্ভ করেন তারা। তাই কলেজে নিয়মিত না যাওয়া কিংবা পরীক্ষায় আশানুরূপ সাফল্য লাভে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক সময় স্টুডেন্ট ভিসায় আসা মানুষগুলোর ভিসা রিনিউ হয় না। এরপর এই স্টুডেন্ট ভিসার মানুষগুলো অবৈধভাবে থেকে যান ইংল্যান্ডে। আয় রোজগারের মাধ্যম হিসেবে কাজ খোঁজেন ক্যাশ ইন হ্যান্ড, যেখানে পারিশ্রমিক হিসেবে মজুরি ক্যাশ পেমেন্ট করে মালিক পক্ষ, যাতে সরকারকে ট্যাক্স আর ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স পে করতে হয় না। এবং স্বাভাবিকভাবে ইউকে সরকার এসব কর্মীর আয়-রোজগার সম্পর্কে অবগত থাকে না। ক্যাশ ইন হ্যান্ড কাজের জন্য এই মানুষগুলো কাজ খোঁজেন নেপালি, শ্রীলংকান ও বাংলাদেশী গ্রোসারি শপে, পিত্জা কিংবা কাবাবের দোকানে ডেলিভারি ম্যান, রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, বাড়িতে সহকর্মীর কাজ, যারা ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ জানেন তারা খুচরো জোগালি কিংবা বাড়ি বদলের সময় চুক্তিভিত্তিক সাহায্যকারী হিসেবে কাজ খুঁজে নেন। লন্ডন শহরে অধিকাংশ পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় রান্না করা খাবারের চাহিদা আছে, অনেকে বাড়িতে রান্না করে বাড়ি বাড়ি কিংবা অফিস এলাকায় প্লাস্টিকের বক্সে খাবার ফেরি করে বিক্রি করেন। ব্রিটিশ পুলিশ ও হোম অফিস অবৈধ কর্মীদের ধরার জন্য প্রায়ই আচমকা হানা দেয় ফাস্ট ফুড শপ আর রেস্টুরেন্টগুলোয়। কখনো কয়েকজনকে উপস্থিত ধরে ফেললে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় থানায়, কাগজপত্র তল্লাশি করে একসময় ধরেবেঁধে তুলে দেয়া হয় বাংলাদেশে যাওয়ার ফিরতি প্লেনে। শেষ হয় তাদের বিলেতে স্থায়ী হওয়ার বাসনা।

বাংলাদেশ থেকে অনেকে ভিজিট ভিসায় বেড়াতে আসেন ব্রিটেনে। হয়তো তাদের আত্মীয়, বন্ধু-পরিজনকে দেখতে আসেন, কিংবা আসেন শুধুই ব্রিটেনের সৌন্দর্য অবলোকন করতে। টুরিস্টদের জন্য গোটা ব্রিটেনে রয়েছে আকর্ষণীয় অনেক ঐতিহাসিক ও আধুনিক দর্শনীয় স্থান। কেউ কেউ আসেন স্পাউস ভিসায়। কেউ কেউ আসেন চিকিৎসার জন্য। অনেকে আসেন হাইস্কিল মাইগ্রেশনে কিংবা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে।

অভিবাসী বাংলাদেশীদের ভেতর অনেকেই যুক্তরাজ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। তারা ব্রিটিশ অর্থনীতিতে রাখছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা এবং বাংলাদেশী কমিউনিটিতে তৈরি করেছেন সম্মানজনক পরিচিতি। যুক্তরাজ্যের সারেতে বসবাস করেন প্রফেসর ওসামা খান। বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ পাস করে ইংল্যান্ডে লেখাপড়া করতে আসেন ২০০০ সালে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ করেছেন। বর্তমানে তিনি সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। পাশাপাশি তিনি আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গভর্নর হয়ে কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। ছুটির দিনে তিনি নিজের বাড়িতে বসে কমিউনিটির মানুষকে ক্যারিয়ার তৈরির ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসতে আগ্রহী মানুষদের উদ্দেশে প্রফেসর ওসামা খান বলেন, কেউ যদি ব্রিটেনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশে আসতে চান তাহলে ছাত্র বয়সে আসা উত্তম। দেশ থেকে আসার আগে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে ভালো করে জেনে আসতে হবে। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাস করতে পারলে ইংল্যান্ডে চাকরির সমস্যা হয় না। আর শুরুতেই একাডেমিক দিকটা শক্ত করে গড়ে নিতে পারলে ভবিষ্যতে সাফল্যের শাখা-প্রশাখা অনেক দূর বিস্তৃত হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির কদর করে এখানকার ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা। তাই কেউ যদি মনস্থির করে থাকেন ব্রিটেনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন, তাহলে মধ্যবয়স হওয়ার অপেক্ষা না করে তরুণ বয়সেই পরিপূর্ণভাবে চিন্তা ও চেষ্টা করলে ভালো হবে।

ব্ল্যাক মাইনরিটি কমিউনিটির একাংশ হিসেবে ব্রিটেনে অভিবাসী বাঙালিরা অনেক ধরনের তিক্ত বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। গত বছরের পরিসংখ্যান মতে ব্রিটেনে সাদা পুরুষের তুলনায় কালো পুরুষের মানসিক ব্যাধির ঘটনা ঘটেছে চার গুণ বেশি। আবার সাউথ এশিয়ান মহিলাদের ভেতর আত্মহত্যার ঘটনা অনেক বেশি ঘটেছে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, মানসিক অসুস্থতা স্বীকার না করার প্রবণতার কারণ মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপারটা নিয়ে এশিয়ান পরিবারগুলোতে খোলা আলোচনার প্রচলন না থাকা, নিজের বর্তমান ও অতীত এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটা নড়বড়ে অবস্থানে দোদুল্যমান থাকা ইত্যাদি একাধিক কারণে ব্ল্যাক মাইনরিটি কমিউনিটি ব্রিটেনে অনেকটা পিছিয়ে আছে। যদিও নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের চাকরি স্তরে বাংলাদেশীরা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারলেও ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যানেজমেন্ট এবং নীতিনির্ধারণকারী পদগুলোয় বাংলাদেশসহ নন-ব্রিটিশ মানুষের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার বোঝা যায়। যুক্তরাজ্যে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৪টি। বিশবিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলর আছেন ৫৫০ জন। এদের ভেতর মাত্র ১৬ জন হচ্ছেন নন-হোয়াইট। শিক্ষাক্ষেত্রের মতোই অন্যান্য জায়গায়ও ক্ষমতার উঁচু চেয়ারে সূক্ষ্মভাবে দলীয়করণ চলে, আর তাই সমান শিক্ষা এবং সমান কাজের অভিজ্ঞতা থাকার পরও কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি একজন সাদা মানুষের কপালেই জোটে এবং সেটি হয় কোনো একজন সাদা পুরুষ। ব্রিটেনের মতো তথাকথিত স্বচ্ছ গণতন্ত্রের দেশেও বর্ণবাদের মতোই লিঙ্গবাদ গোপন কলকাঠি নাড়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে। ঊর্ধ্বস্থিত অবস্থানের মশাল হস্তান্তরিত হয় একজন সাদা পুরুষের হাত থেকে আরেকজন সাদা পুরুষেরই হাতে। পুরো ব্যবস্থাটি অনেকটা স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের মতো, যে দেয়ালের ওপাশটা দেখা যায় কিন্তু মাইনরিটি কমিউনিটির মানুষের পক্ষে কাচ ভেঙে ওপাশে গিয়ে কিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না কখনো।

অভিবাসী বাংলাদেশীদের একটা বৃহৎ অংশ জড়িত আছে কারি ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে। যুক্তরাজ্যের প্রায় সব রেস্টুরেন্ট এক নামে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচিত হলেও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বাংলাদেশী অভিবাসীরা অনেক এগিয়ে রয়েছেন। শত শত অভিবাসীর জীবন ও জীবিকা আবর্তিত হয় এ রেস্টুরেন্টগুলোকে কেন্দ্র করে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ছাড়াও বাংলাদেশীরা যুক্ত আছেন আইন ব্যবসার সঙ্গে, যা অবধারিতভাবে বহুল চর্চিত স্টুডেন্ট ভিসায় আগত বাংলাদেশী কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে।

এছাড়া অ্যাকাউন্ট্যান্সি এবং বাড়ি কিনে ভাড়া দেয়ার বাণিজ্যেও সফল হয়েছেন অনেক অভিবাসী বাঙালি। লন্ডনে অ্যাকাউন্ট্যান্সি বাণিজ্যে সফল মানুষ হিসেবে অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাহবুব মুর্শেদ একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি সিলেটের মানুষ। ১৯৮৭ সালে ব্রিটেনে আসেন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। বর্তমানে ইস্ট লন্ডনে অবস্থিত মাহবুব অ্যান্ড কো-অ্যাকান্ট্যান্টসটি বাঙালি কমিউনিটিতে এবং লন্ডনের বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম।

ব্রিটেনের নাগরিকত্ব অনেকের কাছেই একটা সোনার হরিণ। এ সোনার হরিণকে কালো পাসপোর্টের পাতায় বন্দি করে হাতের মুঠোয় ধরতে গিয়ে অনেক সময় অনেক বেআইনি কাজ করছেন মানুষ। কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ নামে একটি অবৈধ বিবাহ ব্যবস্থা প্রচলিত আছে ব্রিটেনে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ স্বল্পকালীন ভিসায় ব্রিটেনে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার বৈধ অনুমতি পাওয়ার জন্য টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশ নাগরিককে বিয়ে করে থাকেন। হোম অফিসে নিজেদের এ মিথ্যা বিয়েকে সত্যি প্রমাণ করতে তাদের এক বাড়িতে থাকতে হয় বেশ কয়েকটি বছর। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, অন্তরঙ্গ ছবি প্রদর্শন এবং একই ঠিকানা ব্যবহারের মতো কতিপয় প্রমাণ দেখতে হয় আদালতের সামনে। যদিও বাস্তবে তারা পরস্পরের কাছে গিভ অ্যান্ড টেক বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ দুটি পক্ষ মাত্র। ভিসার কাজ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজের স্বামী-স্ত্রীরা যে যে যার যার আলাদা পথে চলে যায়। তবে এমন ঘটনাও দেখা গিয়েছে, অনেক সময় কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করে কয়েকটি বছর একসঙ্গে থাকার পর তাদের ভেতর বোঝাপড়ায় মিল হয়েছে এবং তারা সত্যিকার স্বামী-স্ত্রীর মতো আজীবন একসঙ্গে রয়ে গিয়েছেন।

বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে লন্ডনের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এক বছরের ডিপ্লোমা করতে এসেছিলেন শরিফুল হাসান (ছদ্মনাম)। ভিসার শর্ত অনুযায়ী লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর দেশে ফিরে যাবেন তিনি। কিন্তু ইউকেতে এসে পরিচিতজনের পরামর্শ অনুযায়ী শরিফুল লেখাপড়া বাদ দিয়ে ফুলটাইম কাজ করতে আরম্ভ করেন।

দিনের বেলা একটা গ্রোসারি শপে আর রাতে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করে কিছু পাউন্ড জমাতেও আরম্ভ করেন কয়েক মাসের মধ্যে। দেশে শরিফুলের পরিবারের সবাই ছেলের সাফল্যে দারুণ খুশি। মাসে মাসে হাতে পাওয়া পাউন্ডের লোভে শরিফুল লেখাপড়ার পাট সম্পূর্ণই চুকিয়ে দেন দ্রুত। ফলাফল হিসেবে বছর শেষে শরিফুল ব্রিটেনে থাকার অনুমতি হারান। হোম অফিস থেকে শরিফুলকে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়। শরিফুল হোম অফিসের আদেশ অমান্য করে শহর বদল করে অন্য শহরে গিয়ে আরেকটি রেস্টুরেন্টে কাজ আরম্ভ করেন। পুলিশ আর সিকিউরিটির লোক দেখলে ভয়ে লুকিয়ে থাকেন। বর্তমানে শরিফুলের মনে একটাই আশা, ইংল্যান্ডে ১৪ বছর অবৈধ থাকতে পারলে হিউমেন রাইটসের ব্যাকগ্রাউন্ডে তাকে এখানে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়া হতে পারে। তরুণ বয়সে দেশ থেকে আসা শরিফুল ধীরে ধীরে যুবক হয়েছেন, এখন বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছেন একটাই আশা বুকে নিয়ে, একদিন তিনি ব্রিটেনে বৈধভাবে থাকার অনুমতি লাভ করবেন। তারপর তিনি দেশে যাবেন, বাবা, মা, ভাই, বোন আর সবার সঙ্গে দেখা হবে অনেক বছর পর। শরিফুল একটা বিয়ে করে সংসার করতে পারছেন না, কারণ তিনি ব্রিটেনে অবৈধভাবে আছেন, তিনি দেশে যেতে পারছেন না। যুক্তরাজ্যের নিষ্ঠুর মাটিতে বাংলাদেশের শরিফুলের মতো অগণিত মানুষের জীবনের সুখভরা রং, রূপ, শখ, আহ্লাদ, স্বপ্ন ক্রমে মুছে ফ্যাকাশে হয়, বিবর্ণ হয়, একসময় টুপ করে ঝরে পড়ে শীতের আগে আগে মৃদু বাতাসের আলতো ছোঁয়ায় বৃন্তচ্যুত অসংখ্য সিকামোর হলদে পাতার মতো। ব্রিটেনের ইতিহাস ভুল করেও লিখে রাখে না কোথাও শরিফুলদের ব্যথার কথা।

রহিম শাহ (ছদ্মনাম) স্টুডেন্ট ভিসায় ইউকে এসেছিলেন দশ বছর আগে। তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী রাবেয়াও (ছদ্মনাম) আসেন রহিম শাহের সঙ্গে। শুরু থেকেই স্বামী-স্ত্রীর চমৎকার সম্পর্ক কমিউনিটির সবাইকে মুগ্ধ করত। কিন্তু ঘুণপোকা খেয়ে যাওয়ার মতো ভেতর থেকে কাটা পড়তে থাকে সম্পর্কের বাঁধন। অনলাইনে রহিম শাহের প্রেম হয়েছে বাংলাদেশে থাকা অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে।

কিন্তু রহিম শাহ রাবেয়াকে কিচ্ছু টের পেতে দেয় না। কারণ, রাবেয়া তখন একটা কোর্সে লেখাপড়া করে স্টুডেন্ট ভিসায় থাকছে আর রহিম শাহ ডিপেন্ডেন্ট ভিসায় স্ট্যাটাস বদলে নিয়ে ফুলটাইম কাজ করছে।

এমন অবস্থায় রাবেয়ার সঙ্গে ডিভোর্স হলে রহিম শাহকে ইউকে থেকে চলে যেতে হবে। লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে রহিম শাহ দীর্ঘ আট বছর দুটি সম্পর্ক একসঙ্গে টেনে চলে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। স্ত্রীকে ভালোবাসার অভিনয়ে ভুলিয়ে রেখে যুক্তরাজ্যে নিজের পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি পারমিশন না পাওয়া পর্যন্ত নিপাট ভালো স্বামীর মুখোশ পরে থাকে। সোনার হরিণ ব্রিটিশ পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রেমিকার কথা, যাকে সে বিয়ে করে ইউকেতে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখিয়েছে এতদিন। আর রাবেয়ার বয়স চল্লিশ পার হয়েছে। নিঃসন্তান রাবেয়া সাজানো সংসার ফেলে একটা এক কামরার ঘরে একা জীবন শুরু করেছে আপাতত। মধ্যবয়সে এই নতুন ধারার জীবন কি তার জন্য নতুন একটা অভিবাসী জীবনের শুরু নাকি শেষ? চোখের জলে ভেসে ভেসে ভাবতেই থাকে রাবেয়া। ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসের লম্বা সুতোর এক পাশ ধরে রাবেয়া এখন অপেক্ষা করে আছে, একদিন সোনার হরিণ তার ঘরেও প্রবেশ করবে লেটার বক্সের ফুটো দিয়ে। দেশে রাবেয়ার বাবা-মা কেউ জানে না তাদের মেয়েটা এখন বিদেশ-বিভুঁইয়ে কেমন আছে। জানে না মেয়েটা কেমন একলা একা পড়ে আছে ব্রিটেনের শীতল জমিনে দলহারা একাকী একটা ব্যথিত বলাকার মতো। যার হাত ধরে রাবেয়া

একদিন ব্রিটেনে এসেছিল সোনার হরিণের সন্ধানে, সেই প্রিয়তম স্বামীটি এখন সোনার হরিণ হাতে করে ছুটে চলেছে নতুন প্রেমিকার আকর্ষণে। অভিবাসী বাংলাদেশীদের কারো কারো কাছে ব্রিটিশ পাসপোর্ট সংসার, স্ত্রী, প্রেম, মায়া, মমতার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় বলে অনুভূত হয়।

যদিও ব্রিটেনের অভিবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের কিছু কাহিনী শোনা যায় কিন্তু সে পার্সেন্টেজ তুলনামূলক অনেক কম। বরং বলা যায় এখানে পারিবারিক বন্ধন বেশ দৃঢ়। বাইরে কাজের পর প্রায় পুরোটা সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে কাটিয়ে থাকে। বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষদের ভেতর একাত্মতা প্রশংসনীয়। এখানে অধিকাংশ বাংলাদেশীরা সবাই পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। একেকটি ছুটির দিনে একেকটি পরিবার হোস্ট হয়ে আতিথেয়তার ভার গ্রহণ করে। দূর-দূরান্ত থেকে ৩-৪ ঘণ্টা ড্রাইভ করে বন্ধুরা আসে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। অনেক অনুষ্ঠানে উপহারের বদলে একটা করে খাবারের পদ রান্না করে আনার প্রচলন রয়েছে। এ অনুষ্ঠানকে বলা হয়, ওয়ান ডিস পার্টি। সবাই একটা আইটেম রান্না করার ফলে একজনের ওপর অনেক রান্নার চাপ পড়ে না। আর সবাই রিল্যাক্সড মুডে দিনটা আনন্দে কাটাতে পারে। ব্রিটেনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ইসলামিক শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীর জন্য আছে মন্দির, গুরুর দুয়ারা। যদিও এখানে শব্দ করে আজান দেয়া কিংবা মন্দিরে ঘণ্টা বাজানোর অনুমতি নেই। ব্রিটেনে জন্ম নেয়া বাংলাদেশী বাচ্চাদের নিজের ভাষা, সংস্কৃতি শেখানোর জন্য এলাকাভিত্তিক একাডেমি, সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র রয়েছে অনেক জায়গাতেই। লন্ডন থেকে প্রচারিত বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ছোটদের জন্য এবং বড়দের জন্য নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। বাংলা টিভিগুলোয় নিয়মিত প্রচারিত হয় আইনবিষয়ক পরামর্শের অনুষ্ঠান, জীবন ও জীবিকার জন্য সহায়ক অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের সাম্প্রতিক তথ্যাদি নিয়ে সংবাদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় এবং বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। অভিবাসী বাংলাদেশীদের ভেতর অসংখ্য গুণী শিল্পী, লেখক, অভিনেতা, নাট্যপরিচালক বসবাস করছেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়। কয়েকজন নবীন লেখক নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছেন লেখক বন্ধু নামে একটি লেখালেখি গ্রুপ। ইউকের লেখকেরা এক সঙ্গে হয়ে লেখালেখির নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিজেদের সন্তানদের কাছে বাংলা ভাষা এবং নিজের দেশের সংস্কৃতির পরিচয় মেলে ধরতে বদ্ধপরিকর।

ব্রিটেনের রাজনীতিতে বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষজন অংশগ্রহণ করে আসছে অনেক আগে থেকে। ২০১৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, এ দেশে ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশী বসবাস করছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বাস করেন বৃহত্তর লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায়। তবে যেখানেই থাকুন না কেন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা রাজনৈতিকভাবে খুবই সক্রিয়। আবার ভোটের সময় নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক কর্মীরা ভোটের জন্য #৩৯;ভিলেজ পলিটিক্স্#৩৯;-এর কায়দায় পারিবারিক যোগাযোগকে অসাধু উপায়ে ব্যবহারের অভিযোগ শোনা যায় প্রায়ই। নিজের পরিচিত এবং আত্মীয়তার দাবিতে ইচ্ছা না থাকলেও মুখচেনা মানুষকে ভোট দিতে হয় সাধারণ ভোটারকে। প্রথম মুসলমান বাঙালি মানযিলা পলা উদ্দিন ব্রিটেনের পার্লামেন্টের লর্ডস হওয়ার পর থেকে আরো অনেক বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিবিদ নিজেকে যুক্ত করেছেন ব্রিটেনের রাজনীতির সঙ্গে। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক তিনজন বাঙালি এমপির সাফল্য প্রমাণ করে ব্রিটেনের রাজনীতিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবস্থান করেছেন।

পরিশিষ্ট কথা: ইংল্যান্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষের গৌরব আর অর্জনের কথা বলতে গেলে আরো অনেক কথা বলা যাবে। তবু একটা পর্যায়ে এসে থামতে হয়। তাই লেখাটিকে সমাপ্তির দিকে আগাতে হবে। লেখা শেষ করার আগে আমার নিজের কিছু কথা বলি পাঠকের কাছে। এটি গত বছর শীৎকালের এক সন্ধ্যা। বিকাল ৪টা বাজতে না বাজতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে বাইরে। ইংল্যান্ডে সামারে দিন থাকে অনেক বড়, রাত ১০টা পর্যন্ত ঝলমল করে সূর্যের আলো। আবার শীৎকালে বিকাল সাড়ে ৩টা কিংবা ৪টার মধ্যে রাতের অন্ধকার ঢেকে দেয় চারপাশ। সেই দীর্ঘ শীতের শুরুর সন্ধ্যায় রাস্তার দুই পাশে শরীর জমিয়ে মাইনাস ৩-এর শীতলতা ধারণ করে চোখে টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে তাকিয়ে আছে ইলেকট্রিক ল্যাম্পপোস্টগুলো। একটা ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে আরেকটির দূরত্ব কম করেও ২০-২২ হাত। তবু নিস্তরঙ্গ জনশূন্যতায় ল্যাম্পপোস্টগুলোর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। অনেকটা যেমন অভিবাসীরা দেশের জন্য স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লে, পুরনো দিনের ছবির অ্যালবাম খুলে বসেন নিরালায়। আমি যে রাস্তার কথা বলছি তার নাম মেকেঞ্জি ক্লোজ। এ এলাকায় সব রাস্তার নামের শেষে ক্লোজ আছে, কারণ প্রতিটি রাস্তার শেষে গাড়ি বের হওয়ার পথ নেই, অর্থাৎ রাস্তা বন্ধ। এ রাস্তাগুলোর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অসাধ্য সাধনের চেষ্টার গল্প। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ থেকে আসার পর অনেক বছর আমি ও আমার স্বামীর বিদেশের মাটিতে নিজের পায়ের তলার মাটিটুকু শক্ত করার সেই প্রাণান্তকর পরিশ্রমের কাহিনী। ছোট দুটি মেয়েকে নিয়ে কাজের সুবিধার্থে আমরা দুজন তখন দিন আর রাত আলাদা শিফটে কাজ করেছি। একজন বাড়ি ফিরলে আরেকজন কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি। মাঝখানের কিছুক্ষণ খুব দ্রুত জরুরি কথাবার্তা আদান-প্রদান করে নেয়া। কাজের ফাঁকে লেখাপড়া করেছি। তিন বছরের অ্যাকাউন্টেন্সি কোর্স শেষ করেছি পাঁচ বছরে। কখনো আশা, কখনো নিরাশা, কখনো হাল ছেড়ে দেয়ার পাড়ে পৌঁছে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। মনকে শক্ত করেছি, নিজেকে বলেছি, এ দেশ আমার পূর্বপুরুষের নয়, তাই এখানে আমাকে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে পরিশ্রমে, সাধনায়, অক্লেশ যাতনায়।

ইংল্যান্ডের মানুষ খুব নিয়ম আর রুটিন মেনে চলে। গত ১৬ বছর আমি ইংল্যান্ডে থাকলেও রুটিনের রুলটানা তীক্ষ তারের ধার আমাকে বাগাতে পারেনি মোটেই। ভবিষ্যতেও পারবে বলে মনে হয় না। তাই অবেলায় উবে যাওয়া সূর্যের আলোর অভাবের ভেতরেও সেদিন আমি একটুখানি স্মৃতি রোমন্থন করতে বেরিয়েছিলাম মোটা ওভারকোট আর কানটুপি জড়িয়ে। কারণ সেদিন ছিল ছুটির দিন আর সারাদিন ঘরের ভেতর বসে থেকে থেকে কেমন প্রাণ ছটফট করছিল। সব সময় টের পাই আমার ভেতরে আছে উদাস, অলস, আনন্দপ্রিয় আর আবেগতাড়িত একটি বাঙালি মন। সে ২০০৬ সালের আগে থেকে জন্মাবধি আমি ও আমার অস্তিত্ব লালিত হয়েছে বাংলাদেশের আবহে। নিয়ম করেই অনিয়মের আনন্দযজ্ঞে ধ্যান করতে ভালোবাসি। তবে কপালে দুর্গতি থাকলে ঠেকানোর সাধ্য নেই কারো। সেই কথাটিকে কপালের রাজতিলক করে বর্তমানে বসবাস করছি ইংলিশদের দেশে। যারা ভারতবর্ষকে প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছে, শোষণ করেছে, আর লুটপাট করেছে। তবু নিজের জীবনকে ঢেলে সাজিয়েছি রুক্ষ্ম কর্কশ শাসকের দেশের পাথুরে মাটিতে, প্রাণভরে শুষে নিচ্ছি তাদেরই আলো আর বাতাস, নিজের শিকড়ের পৌষ-বৈশাখ আর ফেব্রুয়ারির রক্ত ঢালা সংস্কৃতিতে আমূল অনুপস্থিত থেকে উপভোগ করছি ব্রিটিশ সংস্কৃতির উন্মাদনাকে। ইংল্যান্ডের মাটিতে বসবাস করতে গিয়ে এত বছরে সাক্ষী হয়েছি অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা, আশাব্যঞ্জক কিংবা নিদারুণ হতাশার গল্পের। আমার দেখা, জানা, শোনা কিছু অভিবাসী বাঙালির সাফল্য আর না-সাফল্যের কথা উল্লেখ করেছি এ লেখায়। কিছু চরিত্রের নাম বদলে নিয়েছি ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা আইনের সঙ্গে সংগতি বাজার রাখার উদ্দেশ্যে।

কিছু পাওয়া আর কিছু ছাড় দিয়ে সময় কাটানোর নামই জীবন। কমলালেবুর মতো গোলাকার এ পৃথিবীর একপাশ থেকে অন্যপাশ দেখা যায় না এক চোখে। তবু মানুষ জয় করেছে পৃথিবীর মাটি আর মাথার ওপর আকাশের কিছু অংশ। জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ ছুটে চলেছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, শহর থেকে বন্দরে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে, মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে, মাটি থেকে পানিতে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে পৃথিবীর সমস্তটাতেই সব মানুষের সমান অধিকার থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ির পাশের সীমানায় বেড়া তুলে দেয়ার মতো করে দেশ থেকে দেশ ভাগাভাগি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা অভিবাসী জনগণকে কোনো ব্রিটিশ বংশোভূত নাগরিক হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, নিজের দেশ ফেলে তুমি আমাদের দেশে স্থায়ী হয়েছো কেন বাপু? সাদা মানুষের এমন প্রশ্নের বিপরীতে অনেক উত্তর চলে আসে ঠোঁটের ডগায়। কিন্তু কোন উত্তরটি সঠিক, সেটি নিয়ে একটুখানি ভাবতে হয় মুখ খোলার আগে। সে যে শুরুতেই বলেছিলাম, কিছু প্রশ্নের জবাব একটিমাত্র উত্তরে হয় না। কিছু প্রশ্নের জবাব হয় একাধিক উত্তরের অজস্র কথামালা।

একজন মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে আরেকটি দেশে দীর্ঘদিন বসবাস করে, সে দেশে তারা সংসার সাজায়, বাচ্চা জন্মায়, সন্তানের লালনপালন করে, দিনের পর দিন নিজেকে একটু একটু করে অভ্যস্ত করে নেয় সেই দেশের আলো, বায়ু, উত্তাপ, সংস্কৃতি, খাদ্য, জল, আচার আর অনাচারের সঙ্গে। একসময় সেই ধীরে ধীরে রপ্ত করা অভ্যাসগুলো গ্রন্থিত হয়ে যায় মানুষটার অস্থিতে, মজ্জায়, রক্তে, মগজে, নির্বিচারে সর্বত্র, সবখানে। মানুষটা তখন আর শুধুই তার জন্মস্থানের মানুষ থাকে না। মানুষটা তখন ভালোবাসে, সম্মান করে, কৃতজ্ঞতা জানায় দীর্ঘদিন ধরে তৃষ্ণায় পান করা জলের মিষ্টত্বের কাছে, বুক ভরে টেনে নেয়া বিশুদ্ধ বাতাসের কাছে কিংবা লকলকে চারাগাছের মতো বেড়ে ওঠা নিজের সন্তানদের প্রতি জন্মস্থানের আন্তরিক শুশ্রূষার পরম আশ্রয়ের কাছে। আর তাই অভিবাসী প্রথম নারী/পুরুষটির শৈশব-কৈশোরের মধুর স্মৃতিমাখা জন্মভূমিটি গেঁথে থাকে মনের মণিকোঠায়। আর অভ্যাস এবং অভ্যস্ততার কারণে অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে পরবর্তী সময়ে স্বদেশ বলে গ্রহণ করা দ্বিতীয় দেশটিকে। দুটি দেশই তখন অভিবাসী মানুষটির কাছে নিজের দুটি চোখের মতো সমান প্রিয় বলে বিবেচিত হয়। ১৬ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বাস করা একজন বাংলাদেশী অভিবাসী হিসেবে নিজেকে আমার কাছে মনে হয় একটি বৃক্ষের মতো, যার শেকড় প্রোথিত আছে এক মহাদেশে আর যার শাখা-প্রশাখা পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে আছে আরেক মহাদেশে। মাথার ওপর কিন্তু একটাই বিস্তৃত আকাশ এ দেশ কিংবা সে দেশে! দুই মহাদেশের দুটি ছোট্ট দেশের নাগরিক আমি। দুটিকেই আমার নিজের দেশ বলে মনে হয়। তাই নিজেকে আমি কখনো দ্বিখণ্ডিত করি না। অখণ্ডিত আমি দুদিক থেকে সমান আর্দ্রতায় সিক্ত, কৃতজ্ঞ এবং পরিপূর্ণ শ্লাঘায় আরতি নিবেদন করি, এ মানব জীবনে সীমাহীন প্রাপ্তির কাছে।

 

লুনা রাহনুমা, সুইন্ডন, যুক্তরাজ্য