ভারতীয় উপমহাদেশ বহু আগে ছেড়ে এলেও ব্রিটিশদের খাবারের ঐতিহ্যে ইন্ডিয়ান কারি জায়গা করে নিয়েছে। সমগ্র যুক্তরাজ্যে কারি বেশ জনপ্রিয়। ১৮১০ সালে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের মেফেয়ারে প্রথম কারি হাউজের যাত্রা, নাম হিন্দুস্তানি কফি হাউজ। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রায় প্রতেকটি শহরে কারি হাউজ গড়ে উঠেছে। লন্ডনের বাংলাদেশী অধ্যুষিত ব্রিক লেন তকমা পেয়েছে কারি রাজধানী হিসেবে। যুক্তরাজ্যের মানুষ কারি এতটাই পছন্দ করে যে এটিকে একটি গৃহীত জাতীয় খাবার বলা হয় ব্রিটেনে। ফিশ অ্যান্ড চিপসের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের খাবার চিকেন টিক্কা মাসালা এখন যুক্তরাজ্যের স্বীকৃত জাতীয় খাবার। চমৎকার স্বাদ আর বর্ণিল খাবারের বৈচিত্র্যে ইন্ডিয়ান কারি সত্তরের দশক থেকে ব্রিটিশদের রসনাবিলাসে পছন্দের খাবারের তালিকায় ১ নম্বর জায়গা ধরে রাখে।
১৯৩০ সালের পর থেকে কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী নাবিক ব্রিটেনে এসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সে সময় অল্পসংখ্যক ইন্ডিয়ান কারি রেস্টুরেন্ট ছিল, অন্য কোথাও কাজের সুযোগ না মেলায় সে সময় তারা এ রেস্টুরেন্টগুলোয় কাজ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ব্রিটিশ ক্যাফে, ফ্রাইড চিকেন, ফিস অ্যান্ড চিপস শপগুলো ক্রয় করে সেখানে ইন্ডিয়ান কারি হাউজ নামে কারি রেস্টুরেন্টগুলোর যাত্রা করে বাংলাদেশীদের হাত ধরে। সে থেকে যাত্রা হয়ে সময়ের সঙ্গে এর সংখ্যা কেবল বেড়েছে।
১৯৭০ থেকে আশির দশক ছিল ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের সোনালি যুগ। সে সময় কারি রেস্টুরেন্ট ছিল প্রায় তিন হাজার। ১৯৯০ সালে যে সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১১ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১২ হাজারো পৌঁছায়। নামে ভারতীয় কারি হিসেবে পরিচিত হলেও ব্রিটিশদের কাছে সমগ্র যুক্তরাজ্যে মূলত এ শিল্পের প্রসার হয়েছে বাংলাদেশী কারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। সর্বমোট ১২ হাজার কারি হাউজ রয়েছে ব্রিটেনে, যার প্রায় সিংহভাগই বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন। ভারতীয় ও পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের মালিকানায়ও রয়েছে বেশকিছু কারি রেস্টুরেন্ট। যেখানে প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ব্রিটিশ অর্থনীতিতে কারিশিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। এক সময়ের বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ডের শিল্পে কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব পড়েছে জোরালোভাবে। কভিড-১৯-এর কারণে ৫০০-এর বেশি কারি রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক রেস্টুরেন্ট রয়ে গেছে শুধু টেকওয়ে। এর মধ্যে ভিন্দালু ভিসা চালু ঘোষণা হলেও দেশ থেকে দক্ষ শেফ আনা যাচ্ছে না অন্যান্য জটিলতা থাকায়। বিশেষ করে ইমিগ্রেশন পার হতে হলে ইংরেজি জানা আবশ্যিক। যারা শেফের কাজ করেন তাদের সাধারণত ইংরেজির দক্ষতা ভালো না। ফলে তাদের ওয়ার্ক পারমিট দেয়া সত্ত্বেও ব্রিটেনে আনা যাচ্ছে না। এ নিয়ে কারি শিল্পের মালিকরাও বেশ হতাশ।
কারি শিল্প আর ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটি যেন একই শিকড়ে গাঁথা। কারি শিল্প যেন ব্রিটেনে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের এক স্বতন্ত্র পরিচয়। ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির পথচলার শুরু থেকে যে শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বৃহৎ কমিউনিটি। বর্ণ বৈষম্যসহ নানা কারণে কমিউনিটির শুরুর সময়ে এখানে বাংলাদেশীদের জন্য চাকরির তেমন সুযোগ ছিল না। ফলে জীবিকার খোঁজে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা কারি ব্যবসাকে বেঁচে নেয়, সময়ের পরিক্রমায় যেটি ব্রিটেনে একটি বৃহৎ শিল্পে রূপ নেয়, যার রূপকার ও সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবিদার বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে দক্ষ শেফ সংকট, জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যান্য সংস্কৃতির খাবারের সঙ্গে তুমুল প্রতিযোগিতা, সময়ের সঙ্গে নতুনত্ব আনতে না পারার ব্যর্থতা, পূর্বপুরুষদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মের অনীহাসহ নানা জটিলতায় বর্তমানে কারি শিল্প অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে করোনা মহামারীর সময়ে মানুষ যখন গৃহবন্দি ছিল, সেই সময়ে সরাসরি রেস্টুরেন্টে এসে খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। সবাই ঘর থেকে অর্ডার করে খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সুযোগটা বেশ ভালোভাবে নিয়েছে অন্য সংস্কৃতির খাবারের ব্যবসায়ী প্রতিযোগীরা। করোনাকাল যেন ব্রিটেনের কারি শিল্পের জন্য কফিনে শেষ পেরেক হয়ে আবির্ভাব ঘটেছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশিয় খাবারের শেফদের জন্য ভিসা সহজীকরণসহ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রয়াত বাংলাদেশী উদ্যোক্তা এনাম আলীর প্রচেষ্টায় এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কারি কলেজ, দক্ষিণ এশিয়া নাগরিকদের পাশাপাশি কারি শেফ হিসেবে দক্ষতা অর্জন করে কাজে যোগ দিচ্ছেন রোমানিয়াসহ ইউরোপীয় অনেক দেশের শেফ। তবু যেন সংকট কাটছে না কোনো কিছুতেই। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বন্ধ হচ্ছে কারি হাউজ।
কারি শিল্পে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকলেও কর্মী সংকট আর আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবসায় টিকে থাকা বর্তমানে বেশ দুষ্কর হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়ে আসা, জ্বালানি পণ্যের মূল্য ক্রয়সীমার মাঝে নিয়ে আসাসহ কারি শিল্পে বিদ্যমান সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে আরো বেশি পরিমাণে সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা মনে করেন, মহামারী চলাকালীন মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বাড়িতে বসে খাবারের প্রবণতা বেড়ে গেছে। অনলাইন ফুড ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আগের চেয়ে। একদা লন্ডনের ব্রিকলেন হয়ে উঠেছিল কারি শিল্পের ক্যাপিটাল, যা বাংলা টাউন হিসেবেই পরিচিত। তবে পাঁচ বছরে এখানে ৫০টিরও বেশি কারি রেস্টুরেন্ট থেকে বন্ধ হয়ে বর্তমানে মাত্র ২০টি কারি হাউজ টিকে আছে। যারা এখনো টিকে আছেন তারাও প্রতিনিয়তই ধুঁকছেন ব্যবসায়িক মন্দায়।
বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বর্তমানে কর্মী সংকট বেশি, যে কারণে কাস্টমারদের সার্ভিস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খাবারের মাঝে বৈচিত্র্য নিয়ে আসা, নতুনত্ব আর সঙ্গে আরো বেশি পরিমাণে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারকে পরিবেশন করতে পারলে, স্বাস্থ্যকর খাবার অপশন, প্রচলিত খাবারগুলো থেকে নতুন রেসিপি উদ্ভাবন করার মাধ্যমে হয়তো এ শিল্পে আবার পুনর্জীবন দেয়া সম্ভব। ব্রিটিশ বাংলাদেশী নতুন প্রজন্ম চাইলে নতুনত্ব এসে এ ব্যবসাকে গতিশীল করতে পারে। তবে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় ভালো চাকরির সুযোগ রেখে কেউই যেন পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী না। ফলে ইন্ডিয়ান কারি নামে পরিচিত হলেও যে শিল্পের আসল রূপকার বাংলাদেশীদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, আজ তা বিলীন হওয়ার হুমকির মুখে। আধুনিকায়নের মাধ্যমে পরিবর্তিত রূপে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনই। না হয় কারি শিল্পের বাংলাদেশী ঐতিহ্য কেবল ইতিহাসের অংশ হিসেবে পরিণত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নাঈম হাসান: গণমাধ্যমকর্মী যুক্তরাজ্য






