বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে স্লোভেনিয়া এখনো সে অর্থে পরিচিত কোনো দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এমনকি আমাদের দেশের অনেক মানুষ স্লোভেনিয়া ও স্লোভাকিয়া এ দুটি দেশকে অনেক সময় এক করে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে স্লোভেনিয়া ও স্লোভাকিয়া ভিন্ন দুই রাষ্ট্র। ইউরোপের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া কিংবা গ্রিসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশীর বসবাস থাকলেও স্লোভেনিয়ায় সে অর্থে বাংলাদেশীদের খুব একটা পদচারণা দেখা যায় না। সব মিলিয়ে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংখ্যা একেবারে হাতে গোনা। এখনো এ সংখ্যা একশাতে পৌঁছেনি।

রাজধানী লুবলিয়ানায় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশী বসবাস করেন। স্লোভেনিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেশির ভাগ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। অনেকে আবার ওল্টের মতো বিভিন্ন ধরনের কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া অল্প কিছুসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন যারা শিক্ষার্থী হিসেবে মধ্য ইউরোপের এ দেশে বসবাস করছেন। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন কিংবা পর্তুগালের সঙ্গে তুলনা করলে স্লোভেনিয়া এখনো অভিবাসীদের বিষয়ে বেশ রক্ষণশীল। স্লোভেনিয়ায় বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে বেশির ভাগ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, কসোভো ও মেসিডোনিয়া এ চার দেশের অধিবাসী। যুগোস্লাভিয়া শাসনামলে স্লোভেনিয়ার অর্থনীতি ছিল শিল্প ও কারখানানির্ভর। তাই বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, কসোভো, ক্রোয়েশিয়া ও মেসিডোনিয়া থেকে অনেকে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করার জন্য স্লোভেনিয়ায় পাড়ি জমাতেন। এছাড়া যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের সময় সার্ব মিলিশিয়া বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও কসোভো থেকে অসংখ্য মানুষ নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে স্লোভেনিয়াকে বেছে নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার পরিবর্তে মধ্য ইউরোপের এ দেশে স্থায়ী হয়ে যান।

আজকের দিনেও স্লোভেনিয়ার অর্থনীতি অনেকাংশে অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর। বিশেষ করে দেশটির বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন সাইটে অথবা বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় যেসব অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন তাদের বেশির ভাগ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, কসোভো ও মেসিডোনিয়ার নাগরিক। এছাড়া স্লোভেনিয়ার অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে যেসব বেকারি কিংবা কাবাবের দোকান রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ পরিচালিত হয় আলবেনিয়ানদের দ্বারা। আলবেনিয়ার বাইরে কসোভো ও মেসিডোনিয়ার একটি বড় অংশের মানুষের ভাষা আলবেনিয়ান। তারা নিজেদের আলবেনিয়ান হিসেবে পরিচয় দিতে অধিক স্বাছন্দ্যবোধ করেন। স্লোভেনিয়ায় যেসব আলবেনিয়ান বসবাস করেন তাদের সিংহভাগ কসোভো কিংবা মেসিডোনিয়ার বাসিন্দা।

যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি কিংবা অস্ট্রিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের শক্তিশালী কমিউনিটি রয়েছে। এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশ শক্তিশালী। স্লোভেনিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের মাঝে বিভিন্ন কারণে এখনো শক্তিশালী কোনো কমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া ইউরোপের এসব দেশের মতো স্লোভেনিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীরাও তেমন একটা অবস্থাসম্পন্ন নন। এমনকি স্লোভেনিয়ায় বর্তমানে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক তেমন একটা ভালো অবস্থানে নেই। ঈদ, দুর্গাপূজা, বাংলা নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা একত্র হয়ে বিভিন্ন সামাজিক উৎসবের আয়োজন করেন। স্লোভেনিয়ায় এ ধরনের সামাজিক উৎসবের আয়োজন সেভাবে চোখে পড়ে না।

একটি কারণে স্লোভেনিয়া বাংলাদেশীদের কাছে পছন্দের গন্তব্য হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য অনেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম খরচে স্লোভেনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা যায়। স্লোভেনিয়ায় চারটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ইউনিভার্সিটি অব লুবলিয়ানা, ইউনিভার্সিটি অব মারিবোর, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা এবং ইউনিভার্সিটি অব প্রিমরস্কা। ইউনিভার্সিটি অব লুবলিয়ানা এবং ইউনিভার্সিটি অব মারিবোর আন্তর্জাতিক যেকোনো সূচকে সারা পৃথিবীর প্রথম ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে স্থান পেয়েছে। স্লোভেনিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো লেভেলে পড়াশোনা করতে হলে এক বছরে দুই হাজার আটশ ইউরো থেকে চার হাজার ইউরোর মতো টিউশন ফির প্রয়োজন। যদিও স্লোভেনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ স্লোভিন ভাষায় কথা বলে, তার পরও দেশটিতে স্লোভিনের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে ইংরেজি ভাষার চর্চা হয়। মাঝবয়সী থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের প্রায় সবাই ইংরেজিতে অত্যন্ত দক্ষ। এ কারণে দেশটিতে ভাষাগত কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় না। এছাড়া দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাচেলর, মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি যেকোনো লেভেলে ইংরেজি ভাষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্টাডি প্রোগ্রাম পাওয়া যায়। এছাড়া স্লোভেনিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বনি বা সাবসিডাইজস মিল’ এবং ‘সাবসিডাইজস বাস সার্ভিস’ নামে দুটি বিশেষ পরিষেবা প্রদান করা হয়। এ দুই পরিষেবার আওতায় একজন শিক্ষার্থী অনেকটা সাশ্রয়ী মূল্যে নির্দিষ্ট কিছু রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনতে পারেন এবং গণপরিবহন ব্যবহারের সুবিধা উপভোগ করতে পারেন। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় স্লোভেনিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম। তবে বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস ও বর্তমান সময়ের ইউক্রেন বনাম রাশিয়া যুদ্ধ দেশ দুটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এ কারণে বর্তমানে স্লোভেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট টাইম চাকরির সুবিধা অনেকটা সংকুচিত হয়ে এসেছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে বিশ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারেন না। স্লোভেনিয়ায় এ ধরনের কোনো আইন নেই। একজন শিক্ষার্থী চাইলে প্রতিদিন ফুলটাইম কাজ করতে পারেন। ‘এম জব সার্ভিস’ এবং ‘ই-স্টুডেন্টস্কি সার্ভিস’ নামে দুটি অর্গানাইজেশন রয়েছে, যারা শিক্ষার্থীদের পার্টটাইম চাকরির ব্যাপারে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে। এ দুটি অর্গানাইজেশন স্লোভেনিয়ার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্বারা স্বীকৃত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী হিসেবে স্লোভেনিয়ায় পা রেখেছেন।

আগেই উল্লেখ করেছি, স্লোভেনিয়া এখনো ইমিগ্র্যান্ট বান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে মানুষ স্লোভেনিয়ায় আসার জন্য খুব একটা আগ্রহ দেখান না। কেননা আমাদের দেশ থেকে যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান, তাদের অনেকে নির্দিষ্ট সময়ের পর ওই দেশে স্থায়ী হতে চান। ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগাল ইউরোপের এ চারটি দেশ বর্তমান সময়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের। গুরুতর কোনো অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে প্রমাণিত না হলে এসব দেশ সহজে কোনো নাগরিককে ডিপোর্ট করে না। ইতালি ও ফ্রান্সে প্রবেশের পর অনিয়মিত অভিবাসীদের অনেকে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন করেন। কোনো কারণে কারো অ্যাসাইলামের আবেদন গৃহীত না হলে পরবর্তী সময়ে বিকল্প কোনো উপায়ে শর্তসাপেক্ষে তিনি বৈধতাপ্রাপ্তির আবেদন করতে পারেন। স্পেনে একটানা তিন বছর বসবাসের পাশাপাশি এবং প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ৪০ ঘণ্টা কাজের এক বছরের বৈধ কর্মসংস্থান চুক্তির প্রমাণ জমা দিতে পারলে স্পেনে যেকোনো অনিয়মিত অভিবাসী বৈধ হওয়ার আবেদন করতে পারেন। আর পর্তুগাল এ মুহূর্তে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে অভিবাসনবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত। একটানা পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাস করার পর যে কেউ পর্তুগালে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক সহজে পর্তুগালে টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিটের আবেদন করা যায়। স্লোভেনিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য তেমন কোনো সুবিধা নেই। আইওএম কিংবা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তত্পরতা স্লোভেনিয়ায় খুব একটা চোখে পড়ে না। কাগজে-কলমে কেউ যদি একটানা পাঁচ বছর স্লোভেনিয়ায় বসবাস করেন তাহলে এ দেশের পার্মানেন্ট রেসিডেন্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দুই বছরকে এক বছর ধরা হয়। একটানা দশ বছর যদি কেউ স্লোভেনিয়ায় বৈধভাবে বসবাস করেন তাহলে তিনি দেশটির নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে স্লোভেনিয়ার স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি দক্ষতা থাকতে হয়। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। স্লোভেনিয়ায় এমন অনেক বিদেশী নাগরিক রয়েছেন যারা দশ বছরের বেশি সময় ধরে বৈধভাবে এ দেশে বসবাস করছেন, এ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও তাদের দক্ষতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও তারা এখনো স্লোভেনিয়ার নাগরিক হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে তাদের অনেকের আবেদন ঝুলে আছে।

স্লোভেনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু স্লোভেনিয়া নয়; সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, কসোভো ও মন্টেনিগ্রো অর্থাৎ একসময় যুগোস্লাভিয়ার অধীনে ছিল এমন সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে মজবুত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ দূতাবাসকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে হাঙ্গেরির বর্তমান সরকারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ফলে প্রত্যেক বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৩০ জন শিক্ষার্থী হাঙ্গেরির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাইপেনডিয়াম হাঙ্গেরিকাম নামক শিক্ষাবৃত্তির অধীনে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার স্লোভেনিয়ার সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করতে পারে যাতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও স্লোভেনিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল ফ্রি স্কলারশিপে স্লোভেনিয়ায় পড়াশোনা করতে পারেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক্সচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রাম কিংবা সংযুক্ত গবেষণা প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের একসময়কার ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মিলান প্যাগোন ছিলেন একজন স্লোভেনিয়ান। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে স্লোভেনিয়া সরকারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না থাকায় আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা যখন স্লোভেনিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তখন তাদের আয় থেকে ২২ শতাংশ ফ্ল্যাট ট্যাক্স ও ১২ শতাংশ সোশ্যাল প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলিয়ে ৩৪ শতাংশের মতো ট্যাক্স কেটে নেয়া হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী যদি ১০০ ইউরো আয় করেন, তবে ৩৪ ইউরো তার আয় থেকে ট্যাক্স হিসেবে কেটে নেয়া হয় এবং সবশেষে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬৬ ইউরো জমা হয়। তবে ভারত, শ্রীলংকা, আজারবাইজানসহ এমন অনেক দেশ আছে যেসব দেশের সরকারের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার সরকারের চুক্তি রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীকেও ট্যাক্স দিতে হয়। তবে আমাদের মতো তাদের কাঁধের ওপর এতটা ট্যাক্সের বোঝা নেই। বাংলাদেশ সরকারের এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে স্লোভেনিয়ার কোনো দূতাবাস নেই, এ কারণে ভিসা সংগ্রহ করতে আমাদের সবাইকে দিল্লি যেতে হয়। তাছাড়া স্লোভেনিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময় থেকে শুরু করে টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিটের অ্যাপ্লিকেশনের সময় আমাদের বেশকিছু জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশে স্লোভেনিয়ার একটি স্থায়ী কনস্যুলেট প্রয়োজন, যাতে দিল্লিতে না গিয়ে সরাসরি আমরা ঢাকা থেকে স্লোভেনিয়ার ভিসার জন্য আবেদন করতে পারি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময় থেকে শুরু করে টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিটের অ্যাপ্লিকেশন জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত আমরা যে ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হই, সেগুলো নিরসনে উভয় দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। স্লোভেনিয়া চাইলে বাংলাদেশ থেকে কনস্ট্রাকশন কিংবা কৃষি খাত অথবা বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজের জন্য শ্রমিক নিতে পারে। মাছ, মাংস, বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল ও শাকসবজি এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে স্লোভেনিয়া নতুন বাজার হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে স্লোভেনিয়া মধু সংগ্রহ করে। স্লোভেনিয়ার বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশে উন্নত প্রজাতির মৌমাছি সরবরাহের পাশাপাশি মধু উৎপাদনের জন্য প্রশিক্ষণ ও মৌচাষীদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে স্লোভেনিয়া অংশীদার হতে পারে। স্লোভেনিয়ায় অসংখ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা আমাদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। কপার স্লোভেনিয়ার একমাত্র বন্দরনগরী। বাংলাদেশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতাানির ক্ষেত্রে সরাসরি কপারের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য স্লোভেনিয়া হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও স্লোভেনিয়া এ দুই দেশের সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার ওপর আগামী দিনে বাংলাদেশের সঙ্গে স্লোভেনিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি নির্ভর করছে। স্লোভেনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলে দুই দেশ বিভিন্নভাবে লাভবান হবে। একই সঙ্গে নিকট ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ শিক্ষার্থী কিংবা অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে স্লোভেনিয়ায় আসার সুযোগ পাবে।

 

রাকিব হাসান রাফি: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।