যুক্তরাজ্যের গিল্ডফোর্ডের ইউনিভার্সিটি অব সারের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ওসামা খান। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী ডিন, ভাইস প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা জীবনে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রভাষক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ওসামা খান ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিয়েল এস্টেট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসে এমফিল করেন। গবেষণা করেছেন রিয়েল এস্টেট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ে। ২৪ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে করপোরেট ফাইন্যান্স, গাণিতিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করে আসছেন এ শিক্ষাবিদ। শিক্ষার্থীদের করপোরেট ফাইন্যান্স বিষয়ে পড়াতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন তিনি। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা এ শিক্ষাবিদ কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় গঠিত বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাজ্যের সারেতে স্ত্রী লেখক আমিনা তাবাসসুম এবং দুই সন্তান নিয়ে বাস করেন তিনি। যুক্তরাজ্যে তার জার্নি, বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ওসামা খান। শুনেছেন সিরাজুম মুনিরা

 

আপনি এখন ইউনিভার্সিটি অব সারের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। একজন বাংলাদেশী হিসেবে ইংল্যান্ডে আপনার এ যাত্রা কেমন ছিল। আপনার জার্নিটা শুনতে চাই।

আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে ব্রিটেনের একটা গবেষণামূলক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, একাডেমিক হতে পেরেছি। আমার এই একাডেমিক জার্নিটা খানিকটা আন-ইউজুয়াল ছিল বলেই আমি বলতে চাই। আমি কমনওয়েলথ স্কলারশিপে ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে এসেছিলাম মাত্র এক বছরের এমফিল করার জন্য। কখনো ভাবিনি এক বছরের বেশি এ দেশে থাকা হবে। আজ বাইশ বছর হয়ে গেল। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটেনে আমার ২২ বছর পূর্ণ হলো। আমি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছাই এক বছরের জন্য। তারপর পিএইচডি করার স্কলারশিপ পাই। রিসার্চ শুরু করি। প্রায় চার বছর পোস্টগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ ও স্টাডি করেছি ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে। এর মধ্যে বিয়ে করেছি, ছেলে হয়েছে। থাকা-খাওয়া সবকিছুর কথা চিন্তা করে চাকরির সন্ধানে বেরিয়ে গেলাম।

ইউনিভার্সিটি অব সারেতে ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লেকচারার হিসাবে জয়েন করি। পরবর্তী সময়ে সিনিয়র লেকচারার ও আরো পরে ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস ইকোনমিস ল-এর ডিরেক্টর লার্নিং অ্যান্ড টিচিং হতে পারি। ক্যারিয়ার ভালোই এগিয়েছে পুরোটা সময়। শিক্ষা, শিক্ষার উন্নয়ন, ছাত্রদের উন্নয়ন, ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদের অভিজ্ঞতায় উন্নয়ন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পর ছাত্রদের কীভাবে ভালো পেশায় ঢোকানো যায়, কারিকুলাম ডেপেলপমেন্ট—এগুলো নিয়ে প্রচুর কাজ করেছি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

সারে ইউনিভার্সিটির চায়না ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার পেছনেও আমার ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে সলেন্ট ইউনিভার্সিটি নামে ক্রিয়েটিভ আর্ট ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই। এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে অ্যাসোসিয়েট ডিনস অপারেশনস হিসেবে সবচেয়ে বড় ফ্যাকাল্টিতে কাজ করি। পরে ডাইরেক্ট অব লার্নিং অ্যান্ড টিচিং হই ২০১৫ সালে। তখন থেকেই মূলত আমি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাজ করা শুরু করি। তার আগে পর্যন্ত আমি সবসময় অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের লেকচারার, সিনিয়র লেকচারার, প্রফেসর হিসেবে বিজনেস স্কুলে কাজ করেছি। ২০১৫ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করি। সেখানে প্রচুর কাজ শিখি। লাইব্রেরি ম্যানেজ করা, স্টুডেন্ট এক্সপেরিয়েন্স ম্যানেজ করা—বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগ পাই সলেন্ট ইউনিভার্সিটিতে। তারপর সেন্টার অব এক্সিলেন্স লার্নিং অ্যান্ড টিচিং প্রতিষ্ঠান করি নিজের হাতে। আমার ক্যারিয়ারে আদৌ এ রকম আর সুযোগ আসবে কিনা সন্দেহ। ২০১৮ সালে প্রথম সলেন্ট ইউনিভার্সিটিতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদে পদোন্নতি পাই। আমি যতদূর রিসার্চ করে দেখেছি, ব্রিটেনের এক হাজার বছরের ইতিহাসে আমিই প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ইমিগ্র্যান্ট, যে একজন এক্সিকিউটিভ বোর্ড প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদে উঠতে পেরেছি। এজন্য আমি আল্লাহর মেহেরবানি কামনা করি। আমার শিক্ষক, শিক্ষিকা, বাবা-মা স্ত্রী, ছেলেমেয়ে শুভাকাঙ্ক্ষী সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের অবদান ছাড়া আমার পক্ষে এই পদে আসা সম্ভব হতো না। আমি গর্বিত। বাংলাদেশের মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। সব দেশের মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। আমি ইনক্লুসিভ মানুষ। আমার মনে হয় এটা আমার দায়িত্ব, অন্য মানুষকে সাহায্য করা। তারপর সলেন্ট ইউনিভার্সিটি ছেড়ে সারে ইউনিভার্সিটিতে এসে জয়েন করি। এখানে আমি প্রায় তিন বছর ধরে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ করছি। এটি একটি গবেষণামূলক বিশ্ববিদ্যালয়। আমি খুবই গর্বিত সারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারি। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডলে।

ইংল্যান্ডে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা অনেকদিন ধরেই যাচ্ছেন। ওখানকার একাডেমিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কীভাবে দেখা হয়?

বাংলাদেশীরা ব্রিটেনে অনেক বছর ধরেই আসছে। ব্রিটেনের যেসব ডায়াস্পোরা অন্যান্য দেশ থেকে আসছে কয়েক শতাব্দী ধরে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ কয়েক শতাব্দী ধরে এখানে পাড়ি জমিয়েছে।

বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় নাম ব্যবসার খাতিরে। বাংলাদেশীরা এ দেশকে কারি খাওয়া শিখিয়েছে। যত ধরনের ভারতীয় কারি রেস্টুরেন্ট ব্রিটেনে আছে, তার নব্বই ভাগ বাংলাদেশীদের মালিকানায় বা বাবুর্চিয়ানায় চলছে। ফলে বাংলাদেশীদের একটা বড় অবদান ব্রিটেনের কালচারের ভেতরে রয়েছে। যদি আমার বাইশ বছরের শিক্ষাজীবনের কথা চিন্তা করি, খানিকটা দুঃখ নিয়েই বলব, বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে না। যে বাংলাদেশী পরিবারগুলো ব্রিটেনে আছে, তাদের মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে না; যে সংখ্যক শ্বেতাঙ্গ, ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের সন্তানরা আসছে। এটি দুঃখজনক। আমি বাংলাদেশী একজন একাডেমিক হয়ে ব্রিটেনে কাজ করছি। যখন চিন্তা করি এখানে বড় হওয়া বাংলাদেশী ছেলেমেয়েগুলো অন্যদের সমানুপাতে পড়াশোনা করতে আসছে না, তখন বেশ দুঃখ হয়।

এটা নিয়ে কাজ করারও চেষ্টা করছি। যেহেতু আমাদের বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা মূলত ব্যবসায়ী। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা অনেক। ফলে অনেক ছোট থাকতেই বাবা-মায়ের ব্যবসায় ঢুকে পড়ে। অবশ্য ভেতরে অনেক ধরনের প্রেশারও এসে থাকে। তাছাড়া অনেক ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকে।

বাংলাদেশকে যে ব্রিটেনের সব বিশ্ববিদ্যালয় চেনে, বিষয়টা তা না। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যারা অ্যাকটিভভাবে বাংলাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের রিক্রুটও করে না। ২০০৯, ১০, ১১ সালে তিন বছর ধরে আমি সারের সিনিয়র লেকচারার হিসেবে বাংলাদেশের মার্কেটটা বলার চেষ্টা করেছি। যাতে বাংলাদেশ থেকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আমরা আনতে পারি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাকে ব্রেইনড্রেইন বলা হলেও এটা একটা বিশাল অবদান। বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা ব্রিটেনে এসে লেখাপড়া করে কিছু মানুষ ফেরত গেলেও দেশের উন্নতি হবে। এই বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রী যারা ব্রিটেনে পড়তে আসেন, তাদের সম্পর্কে একাডেমিক মহলে উঁচু ধারণা রয়েছে। বিভিন্ন সাবজেক্টে প্রফেসররা বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের অনেক চালাক-চতুর বুদ্ধিমান এবং কর্মঠ হিসেবে চেনে। আমি এর জন্য গর্বিত বোধ করি। আমি বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকেই বিবিএ করেছি। ওই ডিগ্রি নিয়েই কিন্তু কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করতে আসতে পেরেছি।

বাংলাদেশী শিক্ষার্থী যারা ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করে সেখানেই বসবাস করেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কেমন?

ব্রিটেনে আমরা যারা লেখাপড়া করতে এসেছি এবং থেকে গিয়েছি, তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্রে সফলতা দেখতে পেয়েছি। শিক্ষক হোক বা আর্টিস্ট, ডাক্তার হোক বা ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরিজীবী, আইনজীবী, ব্যাংকার বা ব্যবসায়ী যে প্রফেশনেই গেছেন, বাংলাদেশীরা ভালো করেছেন। তবে যারা এখানে আসে শুধু থেকে যাওয়ার জন্য, তারা অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এখন নিচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০১০-এর মধ্যে এই দেশে ভিসা কলেজের আবির্ভাব ঘটেছিল। এটি হলো একটা ডেরিগেটরি টার্ম। এর মানে কিছু ব্যবসায়ী ডেভেলপিং দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভুল তথ্য দিয়ে এখানে এনেছে। তাদের স্পন্সরশিপ দিয়েছিল; তখন এ ধরনের দু নম্বরি বিজনেস ছিল। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী সে সময় নামকাওয়াস্তে বাজে বাজে প্রতিষ্ঠানে এসেছে। হয়তো টিউশন ফি সক্ষমতার মধ্যে ছিল। তারা এ দেশে থাকার উদ্দেশ্যে এসেছে; দেখছে কলেজে পড়াশোনা হচ্ছে না, ভালো ফ্যাসিলিটি নেই, শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই, কারিকুলাম খারাপ এবং তারাও পড়াতে ইচ্ছুক না। তারা টাকাটা নিয়ে কোনো রকমে একটা সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিতে ইচ্ছুক। এই ছাত্রছাত্রীদের জীবন এ দেশে কঠিন হয়ে গেছে। তারা কোনোভাবে দশ বছর থেকে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সেই হয়ে যাওয়ার পরেও কিন্তু তাদের জীবন সহজ হয়নি। তারা কায়িক শ্রমের পেশা বেছে নিয়েছে। তাতে মনুষ্যত্বের ক্ষতি হয়নি। তাদের সম্মান জানাই। তবে আমি মনে করি প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে ব্রিটেনে অনেক কষ্টে জীবন যাপন করতেও দেখেছি। যারা বুঝতে পেরেছে, তারা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বিভিন্ন পেশায় ব্যাপক উন্নতি করেছে। একটা ছেলেকে চিনি, এ দেশে বিশাল স্যাটেলাইট কোম্পানিতে কাজ করে। এছাড়া অনেক প্রফেসর, নার্স, রিসার্চার, ডাক্তার, কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট রয়েছেন, সাহিত্যিক রয়েছেন, তারা সবাই ভালো করছেন। যারা এখানে আসছেন, তারা ভালো মতো দেখেশুনে আসবেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী লেখাপড়া করতে আসছেন। আসবেন নিজেকে উন্নত করার জন্য।

যেসব বাংলাদেশী পরিবারের সন্তান ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন, সেখানেই বড় হয়ে উঠছেন তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আপনার কাছে শুনতে চাই। বাংলা ভাষা বা বাংলাদেশকে তারা কতটা অনুভব করেন? আদৌ করেন কিনা?

প্রশ্নটা অনেক কঠিন। আমার নিজের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এখানেই। ছেলের বয়স ১৮। এ বছর সে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে ভর্তি হলো। এখনো ক্লাস শুরু হয়নি। এক সপ্তাহ পরে ক্লাস শুরু হবে। মেয়ে ষোলো বছর বয়সে এ দেশের কলেজে পড়ছে। তিনটা সাবজেক্টে এ লেভেল দেয়ার পর ইনশা আল্লাহ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবে।

আমার মনে হয় তাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি অনেক টান আছে। আমি সেটা টের পাই। তারা হয়তো বাংলাদেশের কালচার, সংস্কৃতি, কৃষ্টি সেভাবে ধরে রাখতে পারেনি। তারা হয়তো দুটো রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীত গেয়ে উঠতে পারছে না। হয়তো সুন্দর কবিতা বলতে পারে না। হয়তো তাদের বাংলাটা অনেক দুর্বল। হয়তো ইংরেজির টানে বাংলা বলে। আমার ছেলেমেয়েরা যখন বাংলাদেশে যায় তাদের কাজিনরা বা খালা-খালু, চাচা-চাচিরা তাদের নিয়ে মজা করে—কেমন লর্ড ক্লাইভের মতো বাংলা বলছে! ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বা ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলছে। তার পরও যারা বাংলা বলতে পারে না, তাদের মধ্যেও বাংলাদেশী আইডেন্টিটির শক্ত দিক দেখা যায়। আমি এখানে অনেক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মানুষকে চিনি, যারা আমার চেয়ে বয়সে সিনিয়র। এ দেশে জন্ম হয়েছে, বড় হয়েছে, তাদের মধ্যে কিন্তু বাংলাদেশ এখনো রয়ে গেছে। তারা এখনো মনে করে তারা বাংলাদেশী। এ দেশের ২২ বছরের ক্যারিয়ারে আমি আজ পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশীকে দেখিনি, সে সফল হোক আর না হোক; সে বাংলাদেশকে  নিজের মধ্যে উপলব্ধি করে না। এটা একটা বড় পাওনার বিষয়। বাঙালি জাতি হিসেবে আমার মনে হয় এ দেশের মানুষের মধ্যে সেই বর্ণ, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। এখানে পহেলা বৈশাখ হয়, স্বাধীনতা দিবস হয়, শহীদ মিনার আছে যেখানে একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করি। অনেকে হয়তো মাতৃভাষাটা ঠিকমতো বলে উঠতে পারছে না। কিন্তু তারা গর্ববোধ করে।

আমার ছেলেমেয়ের মতো যারা প্রথম প্রজন্ম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশী, যাদের এখনো বাংলাদেশে নানা-নানি, দাদা-দাদি বা আত্মীয়স্বজন রয়েছে; বছর বছর বা বছরান্তে বা দু বছরে একবার করে যাওয়া পড়ে, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। তারা বাংলাদেশের জন্য কিছু করার চেষ্টাও করে। আমার ছেলেমেয়েকে আমি অনেকবার দেখেছি বাংলাদেশের ছবি আঁকতে তাদের স্কুলে, বাংলাদেশের পতাকা আঁকতে, মানচিত্র আঁকতে। বাংলাদেশের খাবারকে বন্ধুবান্ধবদের মাঝে পরিচিত করাতে। সেজন্য আমি বলব বাংলাদেশের প্রতি তাদের টান আছে।

একটা বিষয় আমাকে কষ্ট দেয়। আমি বাংলাদেশ ছেড়ে এ দেশে থাকার কারণে অনেক সময় আমার বাংলাদেশী বন্ধুবান্ধব ও স্বজনেরাই আমাকে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হিসেবে দেখে। আমরা যারা এই দেশে থাকি তারা হয়তো এ দেশে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেনের মতো থাকছি। কেন বাংলাদেশে থাকলাম না, যেখানে বুক দাপিয়ে ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেনের মতো থাকতে পারতাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটা সত্য। আমি দেশে গেলে এটা আমাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া হয়। তুমি দেশ ছেড়ে চলে গেছো। এমন একটা ভাব, যেন আমি মীর জাফরের মতো কিছু করেছি! কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে, আমি বাংলাদেশী হিসেবেই এখানে কাজ করি। বাংলাদেশের পরিচয় দিয়েই আমি এখানে শিক্ষকতা করি। আমার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের সঙ্গে অনেক দেশের ছাত্রছাত্রীরা পরিচিত হচ্ছে। ফলে আমরা যারা প্রবাস বেছে নিয়েছি, তাদের নেতিবাচক চোখে না দেখে বরং দেশের এম্বাসেডর হিসেবে বা প্রতিনিধি হিসেবে দেখা উচিত।