ইউরোপে অভিবাসী
বাংলাদেশীদের নিয়ে
এক দশক
ধরে কাজ
করছে অল
ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ
অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা)।
সংগঠনটির নেতৃত্ব
দিচ্ছেন ফ্রান্সে
বসবাসরত বাংলাদেশী
অভিবাসীদের প্রিয়মুখ
কাজী
এনায়েত উল্লাহ। যিনি
ইউরোপে বাংলাদেশের
একজন শীর্ষ
ব্যবসায়ী, সফল
উদ্যোক্তা ও
সংগঠন। যিনি
কাজ করছেন
ইউরোপসহ বিভিন্ন
দেশে থাকা
বাংলাদেশী অভিবাসীদের
নিয়ে। বাংলাদেশের
শ্রমবাজার, প্রবাসীদের
বিনিয়োগ, ডলার
সংকট, ব্যক্তিজীবনসহ
নানা বিষয়ে
তার অভিজ্ঞতা
শেয়ার করেছেন
বণিক বার্তার
সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি
নিয়েছেন আবু তাহের
অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন
আপনি। ইউরোপের ২৯টি দেশের
বাংলাদেশী অভিবাসীদের সম্মিলিত সংগঠন
এটি। আয়েবা
বাংলাদেশী অভিবাসীদের এক ছাতার
নিচে নিয়ে
আসতে মোটা
দাগে কী
ধরনের কাজ
করছে এখন?
এ বছরে
আয়েবার ১০
বছর পূর্তি
হলো। ১০
বছর আগে
গ্রিসে আমরা
উদ্যোগটি নিয়েছিলাম।
মূলত আমাদের
লক্ষ্য ছিল
আমাদের মধ্যে
একটা নেটওয়ার্কিং
তৈরি করা।
ইউরোপে আমাদের
যেসব দক্ষতা
আছে, সেগুলো
একত্র করে
প্রবাসে যারা
বাস করেন
তাদের স্বার্থে
কাজ করা।
সেটাই করছি
দীর্ঘ ১০
বছর ধরে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের
সঙ্গে আয়েবার
বর্তমানে খুবই
নিবিড় সম্পর্ক।
এটা আমরা
খুব স্বতঃস্ফূর্ততার
সঙ্গে কাজে
লাগাচ্ছি। ইউরোপের
বেশকিছু উল্লেখযোগ্য
দেশে ফ্রান্স,
ইতালি, স্পেন,
পর্তুগাল এসব
দেশে আমাদের
অবৈধ বাংলাদেশী
রয়েছে। তাদের
বৈধ করতে
আমরা কাজ
করছি। অভিবাসীদের
সমস্যা, সংকট
এমনকি সমাধানের
লক্ষ্যে কাজ
করছে আয়েবা।
ইউরোপে পেশাজীবী, ব্যবসায়ীরা এখন
সংশ্লিষ্ট দেশে
বিনিয়োগ করে
খ্যাতি পেয়েছে। আপনিও তাদের
একজন। বিশেষ
করে ফ্রান্সের বুকে বাংলাদেশীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন?
দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইউরোপে বাংলাদেশী অভিবাসীরা/প্রবাসীরা আগ্রহী কিনা, দেশে
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের
সংকট দেখেন
কিনা আপনি?
এটা খুবই
হতাশার বিষয়।
আমরা মুখে
অনেক কথা
বলি, কিন্তু
বাস্তবতার ভিত্তিতে
কথা বলি
না। বাস্তবতার
মধ্যে থেকেই
এর একটা
সমাধান খুঁজে
বের করা
সম্ভব। আমরা
বলি, বাংলাদেশ
সরকার যেন
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার
মাধ্যমে ফরেন
ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট
বা এফডিআর
আনতে কাজ
করছে, সেটা
বিদেশী বা
প্রবাসী হোক।
সেজন্য বাংলাদেশ
সরকার কিছু
উদ্যোগও নিয়েছে।
কিছু মানুষ
এর সুযোগ-সুবিধা
পাচ্ছে আর
কিছু মানুষ
এতে সম্পৃক্তও
আছে। কিন্তু
আমার মনে
হয়, বিনিয়োগের
যে লক্ষ্যমাত্রা
ছিল, তার
মিনিমাম জায়গায়ও
বাংলাদেশ পৌঁছাতে
পারেনি। বিদেশ
থেকে যারা
বিনিয়োগ করে
তাদের একটাই
উদ্দেশ্য মুনাফা
অর্জন করা
বা কিছু
সুযোগ-সুবিধা
ভোগ করা।
সুযোগ-সুবিধা
না থাকলে
তারাও থাকবে
না। আমাদের
দেশে এক্সপার্টদের
হাতে যে
ক্যাপাসিটি আছে,
তাদের হাতে
যে সঞ্চয়
আছে, যে
ফাইন্যান্স আছে
সেটা ওই
বিদেশী এফডিআইয়ের
থেকে অনেক
বেশি। আমি
মনে করি
সেটি শত
বিলিয়ন ডলার
কোনো ব্যাপারই
না।
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে বিশেষ
করে ইউরোপ,
ওয়েস্টার্ন ইউরোপ
বা আমেরিকায়
যারা বাস
করে তাদের
প্রচুর ক্যাপাসিটি
রয়েছে। কিন্তু
তারা সেসব
নিয়ে দেশে
আসতে চায়
না। কারণ
তারা মনে
করে, এখানে
এই যে
এত ফান্ড
আমরা তৈরি
করেছি, সেটা
সব বিক্রি
করে আমি
যদি দেশে
ফিরে যাই
বা শিল্প-কারখানায়
বিনিয়োগ করি
তাহলে দেখা
যাবে, দেশের
বিদ্যমান ব্যবস্থায়
মূলধনটা নষ্ট
হয়ে যাবে।
তখন আবার
হয়তো শূন্য
হয়ে বিদেশেই
ফিরে আসতে
হবে। সেজন্য
কেউ আর
কোনো সাহস
করে না।
এটা কেন
হয়। কারণ
যে পরিবেশটার
কথা বলা
হয়, বাংলাদেশ
গিয়ে সেটা
আর খুঁজে
পাওয়া যায়
না। বলার
জিনিস একটা
আর প্রকৃতভাবে
সেখানে গিয়ে
দেখা আরেকটা।
বিষয়টা এমন
না যে
সরকার সব
ধরনের সুযোগ
দিচ্ছে, তার
পরও আমরা
যাচ্ছি না।
আদতে প্রবাসীরা
মোটেও সেখানে
যাবেন না,
যতদিন না
প্রবাসীরা সেখানে
সুযোগ-সুবিধা
পাবেন বা
তাদের বলার
জায়গা আছে
বলে উপলব্ধি
করবেন।
আরেকটা বিষয়
খেয়াল রাখতে
হবে, যারা
শিক্ষিত প্রবাসী,
যারা মেইনস্ট্রিমে
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
পালন করছেন
তাদের যে
পরিচিতি, যে
সততা-দেশপ্রেম,
তারা যখন
দেখেন যে
দেশের ব্যাংক
থেকে লোন
নিয়ে সেটি
পরিশোধ না
করে লুটপাট
করে দেশের
বাইরে চলে
যাচ্ছে, তাদের
দেখে প্রবাসীরা
এখন মনে
করে দেশে
বিনিয়োগ করে
কোনো লাভ
নেই। তারা
মনে করে
দেশটা এখন
লুটপাটের দেশ
হয়ে গিয়েছে।
ওখানে তো
আমাদের জন্য
কিছু নেই।
ফলে দেশে
এসব প্রবাসীর
যে সম্পদ
রয়েছে সেগুলোও
বিক্রি করে
তারা এখন
বিদেশে নিয়ে
যাচ্ছে। অর্থাৎ
উত্তরাধিকার সূত্রে
বাবা-মায়ের
কাছ থেকে
যে সম্পদ
পায়, সেটাও
তারা বিক্রি
করে বিদেশে
নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতি
তাদের ভালোবাসা
থাকতে পারে
কিন্তু আস্থা
নেই, এটা
একটা বড়
সমস্যা। তাছাড়া
আমরা এখন
কিছু মানুষকে
চিনি যারা
বাংলাদেশের নানান
সুযোগ-সুবিধা
ভোগ করছে
কিন্তু সেগুলো
বাংলাদেশের স্বার্থে
কোনো রকম
ভূমিকা পালন
করে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডলারের সংকট
চলছে। সরকার
থেকে বারবার বলা হচ্ছে,
প্রবাসীরা যেন
দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের
পাঠানো অর্থের ওপর প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে। রেডিমেড পোশাকের বাজারও ইউরোপে বড় আকারে
ঢুকছে। ইউরোপে রেডিমেড পোশাকের বাজার আরো
প্রসারিত হওয়ার
সম্ভাবনা আছে
কি?
করোনাভাইরাসের পরে
অনেক কিছুই
বদলে গিয়েছে।
অনেক কিছুই
এখন মডিফায়েড।
অনেক দেশের
অর্থনীতি ধ্বংস
হয়েছে, অনেক
অর্থনৈতিক কার্যকলাপ
ব্যাহত হয়েছে।
নতুন নতুন
অনেক উদ্যোগ
আসছে। সেজন্য
অনেকেই জাতীয়
স্বার্থ থেকে
নিজেদের গুটিয়ে
নিয়েছে। শুধু
নিজস্ব স্বার্থে
কাজ করছে।
বর্তমানে ইউক্রেন
যুদ্ধের মতো
ঘটনা বিভিন্ন
দেশে বড়
প্রভাব ফেলেছে।
আমাদের মতো
উন্নয়নশীল দেশগুলো
এখন ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে। বর্তমানে
আরেকটি বড়
সংকট হচ্ছে
জ্বালানি সংকট।
আরেকটি ব্যাপার
হলো বাংলাদেশে
যারা টাকা
পাঠায়, তারা
কিন্তু বিদেশে
যারা কম
আয় করে।
যারা বেশি
আয় করেন,
তারা কিন্তু
সংশ্লিষ্ট দেশেই
বিনিয়োগ করে,
ছেলেমেয়েও নিয়ে
এসেছে এখানে।
তারা আর
দেশে ফিরতে
চায় না।
তাদের তেমন
মায়া-মমতাও
থাকে না।
আমাদের রিজার্ভ
এখন সীমিত।
ব্যালান্স অব
পেমেন্ট নিয়ে
যদি আমরা
কথা বলি,
তাহলে হয়তো
আমরা দেখব
ব্যয়ের পরিমাণ
এত বেশি,
যেখানে আয়টা
খুবই সীমিত।
অর্থাৎ রেমিট্যান্স
ছাড়া বড়
কোনো আয়
নেই। সেটা
একমুখী আয়।
এ বিষয়ে
উন্নতি করার
ক্ষেত্রে মূল
কাজ হতে
পারে প্রবাসীদের
সম্পৃক্ত করা।
দেশপ্রেমিক প্রবাসীদের
সম্পৃক্ত করলেই
এ পরিস্থিতি
উন্নতি হবে।
সেজন্য উদ্যোগ
নিতে হবে
বেসরকারি পর্যায়ে,
সরকার যেটাকে
উৎসাহ দেবে।
একমাত্র অর্থনৈতিক
মুক্তির মাধ্যমেই
সম্ভব আমাদের
জাতীয় মুক্তি।
কিন্তু সেটা
শুধু বলার
মধ্যে রাখলেই
হবে না,
অভ্যস্ততার মধ্যে
ঢোকাতে হবে।
বাংলাদেশের এফবিসিসিআইয়ের
সঙ্গে একটা
প্রটোকল সাইন
হয়েছে। ইউরোপে
একটা বিপ্লব
করতে চাই,
নতুন রক্ত
নিয়ে, পুরনো
রক্ত তো
অনেক হয়েছে।
বাংলাদেশ নিয়ে
তাদের ধারণাটা
অনেক বেশি
শক্তিশালী না।
এটা মজবুত
করতে চাই
আমরা।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে। যেমন রোমানিয়া। প্রবণতা দেখা
যাচ্ছে, একটা
দেশে যাওয়ার পরে ইতালি
বা জার্মানিতে অভিবাসনের চেষ্টা করছে। কিন্তু তারাও অবৈধ
হয়েছে। অনিশ্চিত এমন অভিবাসন থামাতে আয়েবা
কী ধরনের
কাজ করছে,
এ যাত্রা থামাতে আয়েবার উদ্যোগ কী?
ঠিক এভাবেই
আসলে বিষয়গুলো
ঘটছে। যারা
হোটেল, রেস্টুরেন্ট
বা টুরিজমে
কাজ করতেন
তারা আর
কাজ করতে
আগ্রহী না।
তারা রাত
দিন কাজ
করা পরিশ্রম
করতে আগ্রহী
না। তারা
দিনে শুধু
কাজ করেই
আয় করতে
পারে বলে
মনে করে।
গ্লোবালি এসব
ডিল করছে।
তারা ওখানে
গিয়ে সাপোর্টার
তৈরি করে।
অনেক দেশ
অনেক সময়
অভিবাসী আহ্বান
করে। পরে
যখন দেখা
যায় যে
তারা ওই
দেশে গিয়ে
সেখান থেকে
অন্য দেশে
চলে যাচ্ছে,
তখন ওই
সব দেশ
হতাশ হয়।
বিষয়টা মূলত
এভাবে হচ্ছে।
তারা দেখছে
যে ওখানে
যারা এসেছিল
তারা অন্য
কোথাও চলে
যাচ্ছে। ইউরোপের
সব দেশেই
এমন হবে।
তবে যদি
স্কিলড লোক
অনেক আসে,
তাহলে অল্প
কিছু এ
ধরনের লোক
আনা সম্ভব
হবে।
নিরাপদ অভিবাসন ও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার কথা
আমরা প্রায়ই শুনছি। তার
কারণ হিসেবে অনেকে মনে
করেন সঠিক
গাইডলাইন নেই,
অনিশ্চিত জীবনের কারণেই তারা
এভাবে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আপনার
মন্তব্য কী?
বারবার তো
বলা হচ্ছে
সবাই দক্ষ
হোক। তার
পরও শ্রমবাজারে
অবৈধভাবে ঢোকার
চেষ্টা করছে
অনেকেই। যারা
এভাবে শ্রমবাজারে
প্রবেশ করছে
তাদের বেশির
ভাগই অশিক্ষিত।
তাদের গড়ে
তুলতে হবে।
তাদের কর্মদক্ষভাবে
গড়ে তুলতে
হবে। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের
দালালের খপ্পর
থেকে বাঁচাতে
পারবেন না,
যদি কেউ
সিদ্ধান্ত নিয়ে
ফেলে সব
সম্পদ নষ্ট
করে, মৃত্যুঝুঁকি
নিয়েও সেখানে
সে যাবে।
বন্ধ করার
একমাত্র উপায়
বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ
করা। দেশের
উন্নয়নে সেখানে
প্রবাসীদের সম্পৃক্ত
করা।
ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সংগঠকের পাশাপাশি আপনার
আরেকটি পরিচয়
রয়েছে, সেটি
হলো আপনি
একজন লেখক।
গত কয়েক
বছরে আপনি
বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন। প্রবাস নিয়ে নিজের
ব্যক্তি অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, আরো বড়
পরিসরে কিছু
লিখবেন কিনা?
আমি এই
সময়ের সাক্ষী।
আমি যে
জীবনটা পার
করলাম, যারা
পরে আসবেন,
তারা যেন
বোঝেন যে
তাদের জীবন
কীভাবে পরিচালনা
করা উচিত,
বাস্তবতার ভিত্তিতে
কিছু ফিকশন
তৈরি করে
ভবিষ্যতের জন্য
রেখে যেতে
চাই। কার্যকরভাবে
একটা মানুষও
যদি লেখা
পড়ে উৎসাহিত
হয়, জীবনকে
সংগঠিত করে
ও ভবিষ্যতের
স্বপ্ন পূরণের
দিকে এগোয়
তাহলেই আমার
লেখা সার্থক
হবে।
আপনার মূল্যবান সময় বণিক
বার্তার পাঠকদের দেয়ার জন্য
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমিও আমার অভিজ্ঞতা, প্রবাসীদের নিয়ে পরিকল্পনা বণিক বার্তার কাছে শেয়ার করতে পেরে আনন্দিত বোধ করছি। বণিক বার্তার সব পাঠক-দর্শককে আমার এবং আমাদের বৃহৎ সংগঠন আয়েবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাচ্ছি।






