স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর নাম জানা থাকলেও আদপে দেশগুলো কী রকম সে বিষয়ে আমার ধারণা একেবারেই ছিল না। সুতরাং নরওয়ে দেশের কথা শুনলেই আমার কল্পনায় আসত ভাইকিং সিরিজে দেখা পরাবাস্তব এক দেশের ছবি। যেখানে সমুদ্রে ছুটে বেড়ায় জলদস্যুর নৌকা, আকাশে খেলা করে অদ্ভুত সবুজ মেরুজ্যোতি, যেখানকার পাহাড়ে-জঙ্গলে হুটহাট দেখা মেলে নরস মিথলজির দেবতাদের বা পাহাড়ি দানব ট্রোলের।

সেই রূপকথার দেশেরই স্বর্গের মতো সুন্দর একটা ছোট্ট শহরে যে একদিন পোটলাপুটলি বেঁধে যখন রওনা দিলাম, এমনকি তখন অব্দি আমার সে দেশ নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা ছিল না। বোদো নামের উত্তরের এক শহরে গিয়ে আবাস গাড়লাম আমি। আবাসের উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষা। অবশ্য মনে মনে এ সুযোগে ইউরোপ ভ্রমণের একটা চোরা ইচ্ছেও ছিল। সে যাই হোক, যাওয়ার আগে থেকে সেখানকার তৎকালীন কিছু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছুটা আলাপ সূত্রে যে টুকু বুঝেছিলাম, তখন পর্যন্ত সে শহরে গোটা ১০-১২ জনের মতো বাঙালি থাকে। তাও তাদের মধ্যে সবাই যে নিজেরাই শিক্ষার্থী তা নয়, কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের সহধর্মিণী হিসেবেও এসেছেন সেখানে। সংখ্যাটা খুব কম শোনালেও এমন প্রত্যন্ত এক শহরে, যার নিজের জনসংখ্যাই ধরেবেঁধে ৫০ হাজারের মতো হবে, সেখানে আমরা নতুন শিক্ষার্থীরাসহ প্রায় জনা বিশেক বাঙালি আসলে অনেক। আর সত্যি বলতে কি, আমার এক আমেরিকাপ্রবাসী কাকুর পরামর্শ ছিল দেশের বাইরে দেশী মানুষদের থেকে এক শ হাত দূরে থাকবে। সেটা মেনেই শুরুর দিকটায় আমি নিজ দেশের মানুষকে কিছুটা এড়িয়েই চলেছি। তবে নরওয়েতে তিন বছর কাটিয়ে আসার পর সেসব বাঙালিদের মাঝেই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কিছু বন্ধুদের খুঁজে পেয়েছি আমি।

নিশিথ সূর্য দর্শন: নরওয়ে দেশটার নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সবার আগে যে কথাটা মাথায় আসে সেটা হচ্ছে নিশিথ সূর্যের দেশ।  তবে সত্যি বলতে এ নিশিথ সূর্য ব্যাপারটার সঙ্গে সে দেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আসলে নিশিথ সূর্য বা ইংরেজিতে মিডনাইট সান বলতে প্রকৃতির এক অদ্ভুত বিস্ময়কে বোঝায়। নরওয়ে দেশের কিছু কিছু জায়গায় গ্রীষ্মকালের বেশকিছু দিন সূর্য একেবারেই ডোবে না। গোধূলী বেলার কমলা সূর্যটা দিগন্ত কোনো রকম ছুঁয়ে দিয়ে আবার সেখান থেকেই ওঠা  শুরু করে। একাধারে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয় দেখার এমন বিরল সৌভাগ্য পৃথিবীর খুব কম স্থানের মানুষেরই হয়ে থাকে। এমনকি নরওয়ের সব অঞ্চল থেকেও এটি দেখা যায় না। শুধু সুমেরু বৃত্তের ভেতরকার শহরগুলোতেই এ অভূতপূর্ব জিনিসের দেখা মেলে। ভাগ্যক্রমে আমার ইউনিভার্সিটি ছিল নরওয়ের একেবারের উত্তরের এক শহর, বোদোয়। এ শহরখানা সুমেরুবৃত্তের ভেতরে পড়ায় এখানে মেরুজ্যোতি যেমন

হরহামেশাই দেখা যায়, তেমনি মিডনাইটসান দেখার জন্যও আদর্শ একটি জায়গা এটি। সেখানে মে মাসের শেষ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়টা ২৪ ঘণ্টাই দিন থাকে।

এ দিন-রাতের পরিবৃত্তির সময়টা ভালো মতো দেখার জন্য স্থানীয় মানুষের পরামর্শে আমরা কয়েকজন বাঙালি বন্ধু মিলে চলে গিয়েছিলাম বোদো শহরের সব থেকে উঁচু পাহাড় কেসারভারডেনের চূড়ায়। সূর্যাস্তের সময়টা হিসাব করে মোটামুটি তার ঘণ্টা দেড়েক আগে রওনা দিয়েছিলাম আমরা। বেশ ধীরে-সুস্থে হেঁটে গিয়ে উপরে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই সূর্য ডোবার সময় হয়ে গিয়েছিল।  কেসারভারডেনের ওপর থেকে সমুদ্রের দৃশ্য বেশ মনোহর। সেখান থেকে সমুদ্রে বহুদূরের সব পাহাড়,  এমনকি লোফোতেন আইল্যান্ড পর্যন্ত (নরওয়ের অন্যতম সুন্দর জায়গা বলে পরিচিত) দেখা যায়। তো আমরা পথক্লান্তি ভুলে এ মনোরম সব দৃশ্য দেখতে আর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এরই মাঝে প্রায় ডুবি ডুবি ভাব করা সূর্যটাকে দেখলাম। থাক আজ আর যাব না ভেবে আবার সূর্যোদয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ডোবা আর ওঠার মাঝে আন্দাজ ৫/৭ মিনিটের মতো ব্যবধান ছিল। সেবার মনে ছিল না, কিন্তু ভেবেছিলাম পরে কোনো সময় গিয়ে পুরো ব্যাপারটা টাইম ল্যাপ্স ভিডিও করব, কিন্তু আফসোস! সেটা আর আলসেমিতে হয়ে ওঠেনি।    

লক্ষ্য করে দেখেছি, বোদোয় এ দীর্ঘ সময় দিন থাকার মাসগুলোয় মন বেশ ফুরফুরে থাকত। কর্মশক্তিও যেন বেড়ে যেত সে সময়। নরওয়েজিয়ানরা ভীষণ কর্মঠ শক্তপোক্ত জাত। তাদের সঙ্গে তুলনায় যাব না। তবে ওই আলোমাখা গ্রীষ্মের দিনগুলোয় আমরা আদুরে-আলসে বাঙালিরাও সকাল বেলার ক্লাস, বিকালের পার্ট টাইম চাকরি সামলেও গভীর রাত পর্যন্ত (সময়ের হিসেবে আরকি। সূযযি মামা তো আড় বিদায় নিচ্ছিল না) ঘুরে বেড়িয়েছি, সমুদ্র পাড়ে বসে থেকেছি, একসঙ্গে রান্নাবান্না, বারবিকিউ, গল্প, আড্ডা কোনো কিছুতে ক্লান্তি বোধ হয়নি। এবশ্য এর কিছু সমস্যাও ছিল। যেমন এত আলো থাকার কারণে অনেকেরই ঠিকঠাক ঘুম হতো না। গ্রীষ্মে তাই সকলেই দেখতাম বেশ ভারী ভারী পর্দা ঝুলত জানালায়। আবার সে দেশে ঘরে ঘরে হিটার আছে ঠিকই, কিন্তু ফ্যান জিনিসটা ঠিক সহজলভ্য নয়। তাই হুটহাট তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বেশ ভোগান্তিই পোহাতে হয় ছাত্রদের। তবে এসব খুঁটিনাটি দিক বাদ দিলে নরওয়েতে গ্রীষ্মকালের মতো এমন চমৎকার কিছু আর হয় না।

আঁধারের দিনগুলো : মিডনাইট সান যদি আলোর রোশনাই হয় তবে ঠিক তার বিপরীত হবে নরওয়ের শীতকালটা, যেটা ডার্ক পিরিয়ড বলেও পরিচিত। সে দেশে গ্রীষ্মকালে সূর্য যে ওভারটাইমটা করে সেটা সে পুষিয়ে নেয় শীতকালে গিয়ে। তখন প্রায় মাসখানেক সে পুরোদমে ছুটিতে থাকে। এর পরও দিন হয় অল্পস্বল্প করে। মানে বেশ কিছুদিন আমাদের দেশে ভোর হওয়ার আগে পুব আকাশটা যেমন ফর্সা হয় ওঠে, তেমনটুকু হয়েই আবার রাত হয়ে যায়। যেন মিছিমিছি একটা লোভ দেখাল সকাল হবে বলে।

সে দেশে যাওয়ার আগেই বোদো শহরের এমন অদ্ভুত দিনরাতের ব্যাপারটা জেনে গেছিলাম বটে। তবে সেটা মনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তার হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি শেখানে থাকতে গিয়ে। কেমন একটা বিষাদগ্রস্ত মন খারাপের সময় সেটা। পড়াশোনা, কাজ কোনো কিছুতেই মন দিতে কষ্ট হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ক্লাসে যাওয়াটা মোটেও সুখকর ছিল না । কিছুদিন যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরে আমি দিনের আলো দেখি না। একফালি সোনালি আলোর দিন দেখার জন্য মনটা আকুপাকু করত। ব্যাপারটা যে কেবল আমার বেলায়ই ঘটছিল তা নয়, ওখানকার এ সময়টায় নাকি কমবেশি সবার সঙ্গেই এমনটা হয়ে থাকে। বিশেষ করে নতুন যারা সেখানে যায় তাদের নাকি অন্ধকার সময়টায় মানিয়ে নিতে বেশ সমস্যা হয়। ছাত্রছাত্রীদের  ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময়টায় একটা কৃত্রিম দিনের আবহ তৈরির জন্য ক্যাম্পাসে বড় বড় বাতি লাগিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া তাদের যাতে একাকিত্ব কম বোধ হয় সেজন্য ছাত্রছাত্রীদের বেশি বেশি করে বিভিন্ন একটিভিটিতে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দেয়া হচ্ছিল। প্রথম বছরটা ক্রিসমাস উপলক্ষে ইউনিভার্সিটির হাউজিং কমিটির অর্থায়নে পার্টির আয়োজন করা হয়েছিলো বলে মনে আছে।

এছাড়া কারো কোনো রকম মানসিক অসুবিধা বোধ হলে তাদের সঙ্গে কথা বলা বা কাউন্সেলিং করার ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছিল ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকেই।

আমি একটু মুখচোরা স্বভাবের হওয়ায় প্রথম বছরের অন্ধকারের সময়টায় খুব বেশি বন্ধু-বান্ধব ছিল না আমার। তার ওপরে আমার হাউজিংয়ের বেশির ভাগ বাসিন্দা ছিল এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট। ফলে প্রথম সেমিস্টার শেষ হতে না হতেই সব যার যার দেশে ফিরে গিয়েছিল। তাই সেবারটা বেশ কষ্টেসৃষ্টে পার করতে হয়েছিল আমাকে। মাঝে কিছুদিন অসলো শহরে আমার পিসতুতো ভাইয়ের বাসা থেকেও ঘুরে এসেছিলাম। সেখানেও শীতের সময় দিনের অংশ অনেক কম হলেও সূর্য একেবারে লাপাত্তা হয়ে যায় না। এত দিন পর অসলো শহরে গিয়ে দাদার বাসার জানালা দিয়ে যখন প্রথম দিনের আলোর দেখা পেয়েছিলাম তখন খুশিতে রীতিমতো লম্ফঝম্প শুরু করে দিয়েছিলাম আমি।

যা হোক পরের বছর আর একই ভুল করিনি। আর ততদিনে বাঙালি বন্ধু-বান্ধব হয়ে গিয়েছিল কয়জন। আগের বাসা পাল্টে ততদিনে তাদের এলাকায় আস্তানা গেড়েছি। একসঙ্গে গল্প-আড্ডা-গানে পরের বারের রাতটা আর হাজার বছরের দীর্ঘ মনে হয়নি।

 

অনন্যা দাশ : লেখক