জন্মের পর থেকে ঢাকা শহরে প্রথমে দাদাবাড়ি এবং পরে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকা আমি কখনো জানতাম না একই বাসায় নানারকম পরিবার একেক ঘরে কীভাবে ভাড়া থাকে, কীভাবে বাথরুম অথবা কিচেন শেয়ার করে। কখনো বাসায় কেউ সাবলেট ছিল না বলে ওই অভিজ্ঞতাটুকুও ছিল না। তবে দেশ থেকেই লন্ডনে আরো বছর দুয়েক আগে পড়তে আসা বান্ধবীর কথা শুনে এ ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সেই বান্ধবী থাকার কারণেই কপালগুণে আমি লন্ডন পৌঁছানোর আগেই আমার জন্য সে যে বাসায় থাকে, সেখানে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে রাখতে পেরেছিল। কপালগুণে বলছি কারণ বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই এমন কেউ এখানে পরিচিত থাকে না যে কিনা আগে থেকে তার জন্য একটি থাকার জায়গা ঠিক করে রাখবে। পরিচিত থাকলেও আরেকজনের জন্য অগ্রিম ভাড়া, ডিপোজিট, সব দিয়ে বসে থাকার মতো সুযোগ বা সাহস সবার হয় না। ফলে শুনেছি এখানে আসার পরও অনেককে আগে হোটেলে উঠে তারপর ঘর খুঁজতে। সে যে কী এক অনিশ্চয়তা, সঙ্গে করে আনা হিসাব করা টাকা অযথা খরচ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা, সেটা যে এর মধ্য দিয়ে না গিয়েছে সে বুঝবে না।

শুধু তা-ই নয়। লন্ডনের মতো আধুনিক শহরে এসে শুনলাম অন্য দেশ থেকে আসা একা মেয়েকে নাকি অনেক বাড়িওয়ালাই ঘর ভাড়া দিতে চান না। তারা নাকি নতুন একটা জায়গা হুট করে আসা একা একটা মেয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে চান না; বিশেষ করে যেহেতু একই বাড়িতে নানারকম মানুষের বসবাস থাকে। শুনে খুব অবাক হলেও আসলে বলার কিছু ছিল না। আমাদের বাড়িওয়ালাও একই অজুহাত দেখিয়ে আমাকে ঘর দিতে চাননি। বান্ধবী আর তার বর নিজেদের ঘাড়ে দায়িত্ব নিয়ে আমার থাকার ব্যবস্থা না করলে হয়তো আমারও এসে পথে পথে ঘুরতে হতো।

লন্ডনে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি তা মুখে মুখে কম-বেশি সবাই জানেন। আমিও জানতাম, শুনতাম। কিন্তু সেটা যে আসলে কতটা বেশি তা টের পেলাম লন্ডনে পা দেয়ার পরদিন থেকে। ইস্ট লন্ডন মোটামুটি এশিয়ানদের এলাকা। বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানিরা ইস্ট লন্ডনের বিভিন্ন এলাকা এমনভাবে দখল করে রেখেছে যে রাস্তায় জাত ব্রিটিশ লোকজনই এখানে চোখে পড়ে কম। যারা জানেন না তাদের জন্য এখানে একটি তথ্য দিয়ে রাখি, লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল একটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে ট্রেন স্টেশন থেকে বের হতে গেলেই দেখবেন ইংরেজির পাশাপাশি স্পষ্ট বাংলায় সাইনবোর্ডে স্টেশনের নাম লেখা ‘হোয়াইটচ্যাপেল স্টেশনে স্বাগতম’। বের হলে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে অসংখ্য দোকানে পোশাক, গয়না, জুতা-স্যান্ডেল, শাকসবজি বিক্রি হতে দেখবেন। মনে হবে আপনি যেন ফার্মগেটের ফুটপাত মার্কেটে দাঁড়িয়ে আছেন। আবার স্টেশন থেকে এক স্টপেজ পর আছে ইস্ট লন্ডন মসজিদ, যেখানে রোজ তিন ওয়াক্ত মাইকে আজান দেয়া হয়।

এ ইস্ট লন্ডনের এক এলাকায় ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া করে আমি থাকি, যে ঘরকে এখানকার ভাষায় ‘বক্স রুম’ বলা হয়। জানালাবিহীন এ ঘরের যা ভাড়া সেই ভাড়ায় ঢাকা শহরের মগবাজার-ইস্কাটনের মতো এলাকায় ১২০০-১৫০০ স্কয়ার ফিটের আস্ত অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকা যায়। সেন্ট্রাল লন্ডনে ঘর ভাড়ার কথা আর না-ই বলি!

যুক্তরাজ্যে গণপরিবহন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক বড় একটা জায়গা দখল করে আছে। এখানে ট্রাফিক আইনের এত কড়াকড়ি, বিশেষ করে লন্ডনে পার্কিং স্পেসের যন্ত্রণায় আমি দেখলাম যাদের গাড়ি আছে তারাও সুবিধা পেলে গাড়ি ফেলে রেখে বাস বা ট্রেনে চলাফেরা করেন। লন্ডনে গণপরিবহনের সুবিধা দেখে আমি যারপরনাই মুগ্ধ। বিশেষ কোনো ইস্যু না থাকলে নির্দিষ্ট সময়মতো বাস-ট্রেন আসে। বিভিন্ন অ্যাপে বাস-ট্রেন আসার আগেই সময়সূচি দেখা যায়। কোনো রুটে ট্রেন বা বাস লেট হলে সেটাও অ্যাপে দেখিয়ে দেয়। বাসে নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের বেশি দাঁড়ানোরও অনুমতি নেই। বিনা ভাড়ায় কেউ উঠতে পারবে না, কোনো গ্যানজামও করতে পারবে না। সবই ভালো। কিন্তু বিশ্বাস করেন, ১.৬৫ পাউন্ড বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২০০ টাকার নিচে কোনো ভাড়া নেই। নিয়মিত কাজ ছাড়া তেমন একটা বের না হলেও মাসে যাতায়াতের পেছনে আমার ৮০ পাউন্ডের মতো খরচ হবেই। ভাগ্যিস তাও এখন আর বাসা থেকে দেড় ঘণ্টা দূরে তিন ট্রেন আর এক বাস পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাস করতে যেতে হয় না। ভার্সিটিতে যখন ক্লাস করতে হতো তখন তো মাসে ১৫০ পাউন্ড শুধু যাতায়াত ভাড়ায়ই চলে যেত।

এরপর আসি খাওয়ার খরচের বিষয়ে। জিনিসপত্রের দাম এখন সবখানেই বেশি, এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই। কিন্তু কভিড মহামারীর আগে জিনিসপত্রের দাম যা ছিল, মহামারীর সময় লকডাউনের পর তা বাড়তে শুরু করে। লন্ডনে ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকা স্কুলশিক্ষক সামিনা শারমিন বলছিলেন, ২০১৯ সালেও ৩০টি ডিম কিনেছেন দেড় পাউন্ড করে। তারপর একে একে লকডাউন, ব্রেক্সিট আর সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি মিলে সেই ৩০টি ডিমের দাম হয়েছে প্রায় ৪ পাউন্ড, অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। আমি নিজেই গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে প্রায় দু’তিন সপ্তাহ পরপর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপাতির দাম বাড়তে দেখছি। যার আয় অনেক তার ব্যয় বাড়লেও খুব একটা গায়ে লাগে না। কিন্তু আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট, যাদের কিনা থাকা-খাওয়া-যাওয়া-আসাসহ টিউশন ফিও জোগাড় করতে হয় নিজের আয় থেকে, তাদের জন্য এক এক পেনি মূল্যবৃদ্ধিও অনেক কষ্টের।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমন এক জিনিস, যা মানুষের বাস্তব জীবনের অংশবিশেষকে ফুটিয়ে তোলে। এখানে মানুষ মূলত সেসব বিষয়ই শেয়ার করে যা তার জন্য আনন্দের, ভালোলাগার। যেমন বিশেষ কোনো দিন বিশেষভাবে কাটানো, কোথাও বেড়াতে বা খেতে যাওয়া, কোনো অর্জন ইত্যাদি। কিন্তু তার মানে তো এই না যে সেই মানুষটির জীবনে আর কিছু নেই!

প্রবাসী জীবনের প্রথম দিককার অনেকগুলো বছর খুব ব্যস্ততার এবং কথাটা মোটামুটি সবার জন্যই খাটে। বিশেষ করে যারা স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন, তারা এবং তাদের পার্টনাররা এখানে এসে যে কত ধরনের অড জব করেন, লিগ্যাল পেমেন্টের পাশাপাশি খরচ চালানোর আশায় ক্যাশ-ইন-হ্যান্ড মানে বেআইনি অতিরিক্ত ঘণ্টা কাজ করেন মিনিমাম ওয়েজের চেয়ে অনেক কম বেতনে, কতটা পরিশ্রম করেন সেটা এ মানুষগুলোকে সামনে থেকে না দেখলে কেউ বুঝবে না। আমরা এর মাঝেও চেষ্টা করি খরচ থেকে কিছু পাউন্ড সরিয়ে সপ্তাহে ছয়-সাত দিনের ব্যস্ত কাজের শিডিউল থেকে কয়েক মাসে এক সঙ্গে দু-একদিন ছুটি ম্যানেজ করে হুট করে কোথাও একটু ঘুরে আসতে, একটু ভালো সময় কাটাতে। কিন্তু যেই ভালো সময়গুলোকে ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক মাধ্যমে একটু শেয়ার করলাম, অমনি সেই চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আশপাশের মানুষগুলো বলবে, ‘খালি তো দেখি ঘুরেই বেড়াও। কাজ করো কখন?’ ‘ভালোই টাকা কামাও মনে হচ্ছে? সেই ট্যুর দিচ্ছো দুদিন পর পর?’... হ্যাঁ বাংলাদেশের তুলনায় ঘণ্টাপ্রতি অনেক বেশিই টাকা কামাই। কিন্তু খরচটাও যে বাংলাদেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তার সঙ্গে দায়িত্বও। বাসার কাজ, বাইরের কাজ, পড়াশোনা, খরচাপাতি—সবকিছু নিয়ে মাসের প্রতিটা দিন যখন মাথা খারাপ করব, তার মাঝে একদিন যদি আমরা একটু ছুটি নেই সেটাই কি আমাদের বাকি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে? তাহলে কি আপনাদের মনের শান্তির জন্য আমরা ইউনিফর্ম পরে যখন ফ্যাক্টরি, কেয়ার হোম, রেস্টুরেন্ট, দোকানে দৌড়ঝাঁপ করে ঘামতে ঘামতে কাজ করি, ৭-৮-৯-১০ ঘণ্টা দাঁড়ানো থেকে বসার সুযোগ পাই না, সেই ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেব? না। আমাদের দৈনন্দিন কষ্ট আর পরিশ্রম যেমন বাস্তব, তেমনি বাস্তব আমাদের আনন্দের ছোট মুহূর্তগুলোও। কষ্ট করে আয়-রোজগার করে কোনোমতে নিজের খরচ চালিয়ে এ মানুষগুলো যখন দেশে প্রিয়জনের জন্য টাকা পাঠায়, সেই টাকা দেশের রেমিট্যান্সেই অংক যোগ করে।

হয়তো বলতে পারেন এত কষ্ট হওয়ার পরও কেন আছি দেশের বাইরে? কারণ এ দেশে কষ্ট যেমন বেশি, তেমনিই বেশি সুবিধা। গণপরিবহনে চলাচল যে এতটা স্মুথ হতে পারে, লন্ডনে না এলে বুঝতাম না। বাসে-ট্রেনে দাঁড়িয়ে থাকলেও ধাক্কাধাক্কি নেই। সবখানে নিয়ম, আর সেই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা মানুষ, তা সে যে দেশ থেকেই আসুক না কেন। আবার পেশা যেটাই হোক না কেন, কাউকে কেউ ছোট করে দেখছে না। একজন ডাক্তার আর একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী সবার কাছ থেকে সমান সম্মান আর আচরণ পাচ্ছে। কারণ সবাই জানে, এদের একজনকে ছাড়াও এ সমাজ অচল।

মেয়ে হিসেবে সব কথার শেষ কথা—আমি যখন লেট নাইট শিফটে কাজ শেষ করে বাস-ট্রেনে চড়ে রাত দেড়টায় একা হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরি, আমার ভয় বা অস্বস্তি লাগে না। নিজের পোশাক নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে না। মাথা উঁচু করে সেই গভীর রাতেও ঘরে ফিরতে পারি। আমি মেয়ে বলে কোনো ‘ক্ষতি’ হওয়ার ভয়ে বা কারো কথা শুনতে হবে ভেবে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকতে হয় না। এ সামাজিক নিরাপত্তার অনুভূতিটা একজন নারীকে যতটা ক্ষমতাশালী ও আত্মবিশ্বাসী করে, তা অন্য কিছু করতে পারে না। একজন প্রবাসী নারী হিসেবে আমি এ নিরাপত্তা ভালোবাসি, তাই শত কষ্টের পরও ভালোবাসি এ লন্ডন প্রবাস।

 

তানজীমা এলহাম বৃষ্টি: লন্ডন প্রবাসী