এ বছরের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে, পশ্চিম ইউরোপের অন্যতম দেশ ইতালি যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। রাজধানী রোমেই কেটেছে ছুটির বেশির ভাগ সময়। ঐতিহাসিক রোমান স্থাপনায় পরিপূর্ণ, ইতিহাস সমৃদ্ধ রোম শহরের সৌন্দর্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনোযোগ ছিল বাংলাদেশী অভিবাসীদের দিকেও। রোমের এখানে-সেখানে নানা পেশায় জড়িত বাংলাদেশী অভিবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তাদের কাছ থেকে পেশাগত সেবা নিয়েছি এবং সেই সঙ্গে জেনেছি ইতালিতে তাদের জীবনযাত্রার কথা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতালিতে অভিবাসনকারীদের মধ্যে অন্যতম একটি অবস্থানে আছে বাংলাদেশীরা। ইউরোপে শুধু কাজের উদ্দেশ্যে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীদের কাছে নানা কারণে পছন্দের শীর্ষে থাকা দেশ ইতালি। গত কয়েক দশকে ইতালিতে অভিবাসনকারী বাংলাদেশীদের সংখ্যা বিভিন্ন জায়গার হিসাবে বিভিন্ন রকম হলেও সেখানকার বাংলাদেশীদের বিশ্বাস ইতালিতে বর্তমানে বা ২০২২ সালের আগস্ট নাগাদ ২০০,০০০ থেকে ২৫০,০০০ বাংলাদেশী অবস্থান করছে।

ইতালি প্রবেশের সুযোগ

ইতালিতে একজন বাংলাদেশীর পক্ষে প্রবেশ হতে পারে বিভিন্ন উপায়ে। তবে এর মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে লটারি পদ্ধতি, স্পন্সরশিপ, পারিবারিক ভিসা।

বেশকিছু বছর পর ইতালি সরকার তাদের শ্রমঘাটতি পূরণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের ৩১টি দেশ থেকে প্রায় ৭০,০০০ শ্রমিক নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। এ বছরের শুরুর দিকে এ ঘোষণা হয় এবং বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ। আগেও এভাবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়েছে ইতালি সরকার। সরকারি ঘোষণার পর বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে যেসব আবেদনপত্র জমা পড়ে তার থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিতরা ইতালিতে প্রবেশ করতে পারে।

দ্বিতীয় জনপ্রিয় উপায়ে ইতালি থেকে পাওয়া স্পন্সরশিপ পাওয়া। বিশেষ কোন খাতে কাজের নিশ্চয়তা/চাকরি নিয়ে ইতালি যেতে পারে একজন বাংলাদেশী। এ প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন রোমের পাইকারি দ্রব্যের আমদানি-রফতানি ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম মৃধা। তিনি একদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে বাংলাদেশী ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। তিনি বলেন, ‘ইতালি সরকার ২০২২ সালের আগেও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক বা লোক নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ রকম ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবার ই সুযোগটি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য স্পন্সর করেছেন তিনি। এ বছরও তার স্পন্সরশিপে ইতালিতে আসছে দু-তিনজন। এ যাবত তার স্পন্সরে ইতালিতে এসেছেন মোট ১০ জন বাংলাদেশী। বাংলাদেশের কাউকে স্পন্সর করার বিষয়টা বেশ ঝামেলাপূর্ণ হলেও তিনি বরাবর এতে আগ্রহ বোধ করেন এবং সব ঝামেলা মাথায় নিয়েও একজন বাংলাদেশীকে সহায়তা করার জন্য তিনি প্রস্তুত। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠাকে একা উপভোগ না করে সেটার অংশীদার করতে চান ইতালিতে আসতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীদেরও।’

ইতালিতে অভিবাসন যাদের কাছে একটি স্বপ্ন, তারা যদি উপরোক্ত বৈধ উপায়ে ইতালিতে আসতে না পারে তাহলে বেছে নেয় অবৈধ পথ। এভাবে ইতালি আসার ক্ষেত্রে খুব বড় একটি উপায় হচ্ছে জলপথে, সড়কপথে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে আসা। ইতালির কাছাকাছি ইউরোপের কোনো একটি দেশে ঢুকে যাওয়ার পর, সেসব দেশ থেকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সড়কপথে ইতালি প্রবেশের ঝুঁকি নিয়ে থাকেন বাংলাদেশীরা। প্রয়োজনে ইতালিতে প্রবেশের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন তারা। বাংলাদেশীদের এ রকম ঝুঁকি নেয়ার পেছনে কারণ অনেক। যেমন, ইতালিতে বাংলাদেশীদের আছে কাজের সুযোগ, বসবাসের সুযোগ, অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দেশে থাকা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুযোগ, স্বল্প সময়ের ভেতরেই কাজের ও বসবাসের বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার সুযোগ এবং স্ত্রী-সন্তানদের নিজের কাছে নিয়ে আসার সুযোগ ইত্যাদি।

কাজ ও অভিবাসন সুবিধা

অর্থাৎ সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় থাকা দেশ ইতালি বর্তমানে নানা কারণে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য একটি আদর্শ স্থানে পরিণত হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছিলাম রোমের ভিক্টোরিয়া সেন্ট্রালের বিশিষ্ট অলংকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে। তিনি ইতালিতে অভিবাসনকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রথম জেনারেশনের অন্তর্ভুক্ত একজন। দীর্ঘ ৩৩ বছর বসবাস করছেন ইতালিতে। রাজ্জাক সাহেব জানান, ‘ইতালিতে বর্তমানে নানা খাতে শ্রমিক প্রয়োজন আর সেই কারণে অভাবনীয় রকম শিথিল পরিস্থিতি এবং কাজকর্মের সুযোগ দেখা যাচ্ছে দেশজুড়েই। যারা একবার ইতালিতে ঢুকে পড়ছে তাদের কাজের কোনো অভাব নেই। ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশীরাও খুব সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে নতুন আসা বাংলাদেশীদের কাজ, বুদ্ধি-পরামর্শ ইত্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন। প্রাথমিকভাবে কাউকে হয়তো পাঁচ-ছয় মাস কিছুটা কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়, তবে এর বেশি নয়। ইতালিতে আসা বাংলাদেশীরা শুরু থেকেই আয় করতে পারে। ইতালিতে নতুন একজন বাংলাদেশী খুব সহজেই মাসে নিদেনপক্ষে ১০০০ ইউরো আয় করতে পারে। একটু চেষ্টা করলে ১৫০০-২০০০ ইউরো আয় করাও তেমন একটা কঠিন নয়। ইতালিতে প্রবেশের কতদিন পর সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার এবং কাজের বৈধতা পাওয়া যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। সরকারিভাবে ঘোষণার মাধ্যমে একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষকে বৈধতা দেয়ার নিয়ম চালু আছে দেশটিতে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশীরা প্রথমবার বৈধতা পায় ১৯৮৬ সালে। এর আগে আসা সব বাংলাদেশীই সেসময় একসঙ্গে কাজের ও থাকার বৈধতা পায়। ইতালি সরকার সেই একই পদ্ধতিতে কয়েক বছর পরপর দেশটিতে বসবাসকারী অবৈধদের বৈধতা দিয়ে থাকে।’

রাজ্জাক সাহেবের কথার সঙ্গে মিল পেয়েছি আমার অভিজ্ঞতারও। ২০০৫ সালে প্রথমবার যখন ইতালি যাই তখন দেখেছি অবৈধ বাংলাদেশীরা বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে ভীষণ অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তাদের দেখেছি ফুটপাথে চাদর বিছিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করতে এবং পুলিশের ভয়ে তটস্থ থাকতে। সে সময় প্রশাসনের চোখে সেটা ছিল অপরাধ। অবৈধ হিসেবে বাংলাদেশীদের ভয় ছিল যেকোনো সময় গ্রেফতার হওয়ার। এবার দেখলাম বাংলাদেশী অভিবাসনকারীদের এখন আর তেমন একটা পেরেশানিতে থাকতে হয় না। এমনকি চাদর বিছিয়ে ব্যবসাও করতে হয় না তাদের। ট্যুরিস্ট এলাকাগুলোতে কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে থেকে ঠাণ্ডা পানি, স্কার্ফ ইত্যাদি বিক্রি করছে, আশপাশেই আছে দায়িত্বরত পুলিশ ও আর্মি। তবে পুলিশ, আর্মি তথা প্রশাসন বেশ সহনশীল সেসব ব্যবসায়ীর জন্য। খেয়াল করে দেখলে মনে হবে যারা এ রকম ব্যবসা করছে, তারাও লিগ্যাল ব্যবসাই করছে।

ইতালিতে বসবাসকারী নারীদের জীবন

ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে একটি বড় গোষ্ঠী হচ্ছে নারীরা। তারা মূলত স্বামীর সূত্রে ইতালিতে এসেছেন এবং বসবাস করছেন স্বামী-সন্তান নিয়ে। কথা বলছিলাম রোমের টর বেল্লা মনাকা এলাকার কয়েকজন গৃহবধূর সঙ্গে। তাহমিনা আক্তার রিনা, আরিফা নিগার আরা ও জেসমিন আক্তার; ওনারা তিনজনই ১২ বছর বা তার বেশি সময় ইতালিতে বসবাস করছেন। তারা আমাকে বলছিলেন, ‘ইতালিতে ওনাদের জীবনযাপন খুব সুন্দর ও সাবলীল। ওনারা যেখানে বসবাস করছেন সেই এলাকায় ২০-২৫টি বাংলাদেশী পরিবারের বাস। সবার মধ্যেই অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা প্রায়ই নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেসব অনুষ্ঠান হয় পারিবারিক সম্মেলন কেন্দ্র এবং সেসব অনুষ্ঠানে ১০০-১৫০ জন মানুষের লোকসমাগম হয়। সামাজিক এ বন্ধন তাদের প্রবাস জীবনকে আরো সহজ করে তোলে। ইতালির নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, বিশুদ্ধ খাবার, জীবনের নিরাপত্তা, শহরের পরিবেশ, ইতালিয়ানদের নম্র-ভদ্র আচার-ব্যবহার, উন্নত জীবনযাপন এসবই তারা উপভোগ করেন। একটা সময় ছিল বাংলাদেশী পোশাক পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন অনলাইন কিছু প্রতিষ্ঠানের বদৌলতে অনেকেই বাড়িতে বসে পেয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশী পোশাক। অনেকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও বাড়িতে বসে এ ব্যবসা করেন।’

ইতালির প্রবাস জীবনে এতসব ভালো দিক থাকার পরও ইতালিতে বসবাসকারী নারীদের মধ্যে একটি হাহাকারের সুর ছিল। ইতালি ভ্রমণকালীন তাদের সেই সুরে শুনেছি তাদের জীবনের অপূর্ণতা। যেসব নারী স্বনির্ভর হতে চান, নিজের দায়িত্ব নিতে চান, স্বামীর সঙ্গে সংসারের নানা কাজের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে চান তারা যোগ্যতা কিংবা ইচ্ছা থাকলেও তা করতে পারছেন না। নিত্যদিনের নানা কাজে ও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে গেলে প্রয়োজন ড্রাইভিং জানা ও অর্থ উপার্জন করা। এ দুটোই ইতালিতে বসবাসকারী নারীদের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। ড্রাইভিং শিখতে গেলে প্রয়োজন ইতালিয়ান ভাষার প্রতিটা স্তরের দক্ষতা। আবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম করতে গেলেও প্রয়োজন ভাষাগত দক্ষতা। যার ফলে তারা পিছিয়ে আছেন ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে। আত্মনির্ভরশীল কিংবা স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন অনেকটা স্বপ্নই রয়ে যায় ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশী নারীদের জন্য।

পুরো ইতালিতেই বাংলাদেশী নারীদের কাজের সুযোগ কম। বিশেষ করে রাজধানী রোমে এ সুযোগের হার অনেকটা শূন্যের কাছাকাছি। হাতে গোনা যে কয়জন বাংলাদেশী নারী রোমে কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হচ্ছেন মনোয়ারা বেগম বেবি। তিনি ২০০৩ সাল থেকে ইতালির রোমে বসবাস করছেন। ইতালিতে যাওয়ার পর পরই ব্যবসা শুরু করেন। সংসার ও ছোট বাচ্চা সামলিয়ে, শুধু কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল নিয়ে ব্যবসা শুরু করে বর্তমানে তিনি একাধিক রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপের মালিক। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্য কোনো উন্নত দেশে একজন বাংলাদেশী নারীকে উদ্যোক্তা হতে গেলে যতটা পরিশ্রম করতে হয় তার চেয়ে অনেকটা বেশি পরিশ্রম করতে হয় ইতালিতে। এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে ভাষাগত সমস্যা ও পারিবারিক বাধা। ইতালিতে কোনো কিছু করতে গেলে প্রথমত সেখানকার ভাষা শিখতে হবে। যদিওবা কোনোমতে কেউ এ ভাষা রপ্ত করতে পারে, তখন আবার মুখোমুখি হতে হয় পারিবারিক বাধার। ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশী পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজের ব্যবসায় সহধর্মিণীর সহায়তা নেন। তবে স্ত্রীকে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের অনুমতি দিতে চান না। যারা এসব বাধা অতিক্রম করতে পারেন, তাদের সংখ্যা খুবই সামান্য। হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের যেসব কাজে ইতালিয়ান ভাষার দক্ষতার প্রয়োজন নেই সেসব জায়গায় তারা কাজ করছেন। ইতালির বিভিন্ন শহরের ফ্যাক্টরিগুলোতে বাংলাদেশী নারীদের কাজের হার তুলনামূলক বেশি। রোমে কোনো ফ্যাক্টরি না থাকায় সে রকম সুযোগও নেই। যার ফলে রাজধানী রোমের জীবন যতই উন্নত হোক, বাংলাদেশী নারীরা এখানে সবচেয়ে পিছিয়ে আছেন।’

ভাষা ও শিক্ষা

ইতালির ভাষা ইতালিয়ান, যা কিনা লেখা হয় ল্যাটিন হরফে। দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল পর্যায়ে দ্বিতীয় একটি ভাষা শেখার সুযোগ আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ইতালিয়ানরা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বেছে নেয় স্প্যানিশ ভাষা। দেশটিতে ইংরেজি ভাষার প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম ইতালির স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান রতনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘ইতালিয়ানদের মধ্যে যারা ট্যুরিজম, হোটেল ম্যানেজমেন্ট বা এ-জাতীয় কাজ করতে আগ্রহী তারা ইংরেজি ভাষা শেখার বিষয়ে আগ্রহী হন। দেশটিতে যেসব কাজে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার আছে সেসব কাজেই শুধু ইংরেজি ভাষা সীমাবদ্ধ। বাকি সব কাজে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে।’ তিনি নিজে বাংলাদেশের উচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন হওয়ায় তার মুখেও শুনেছি ভাষাসংক্রান্ত আক্ষেপ। তিনি আক্ষেপ করেই বলেন, ‘২০ বছর যাবত ইংরেজি ভাষার কোনো ব্যবহার না থাকায় ইংরেজি অনেকটা ভুলেই গিয়েছি।’

ড্রাইভিং শেখা, পরীক্ষা দেয়ার নিয়ম এবং ড্রাইভিং পরীক্ষায় ব্যবহূত ভাষা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সফল নারী উদ্যোক্তা বেবি বলেন, ‘সাত-আট বছর আগেও ইতালিতে ড্রাইভিং শিখে পরীক্ষা দেয়ার জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা যেত। কিন্তু এখন ড্রাইভিং শিখতে গেলে ইতালিয়ান ভাষার দক্ষতা বাধ্যতামূলক। যার ফলে, প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশী নারী এবং ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশী পুরুষ ইতালিতে ড্রাইভিং পরীক্ষায় বসতে পারেন না বা ড্রাইভিং করতে পারেন না।’ তার মতে, ইতালি সরকারের উচিত ইতালিয়ান ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা এবং অভিবাসীদের ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের সুযোগ দেয়া।

ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের সন্তানরা সরকারি খরচে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। ইতালির শিক্ষা পদ্ধতি কিছুটা জটিল ধরনের এবং প্রাথমিক পর্যায়ের বাচ্চাদের প্রচুর পরিমাণ হোমওয়ার্ক করতে হয়। কিন্তু ভাষাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশী বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের হোমওয়ার্ক করার বিষয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে সক্ষম হন না। বাধ্য হয়েই হয় তাদের অন্য কারো সহায়তা নিতে হয় কিংবা শুধু স্কুলের পাঠদানের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের অধিকাংশের সন্তানরাই ইতালির উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত তেমন একটা পৌঁছায় না। কেননা, সে পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই তারা ইতালির নাগরিকত্ব পেয়ে যায় এবং পাড়ি জমায় অন্য কোনো দেশে।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশ থেকে ইতালিতে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বাংলাদেশীদের সংখ্যা অত্যন্ত কম হলেও একেবারে শূন্য নয়। তবে সেখানেও সমস্যা হচ্ছে ভাষা। ইতালিতে বসবাস করা বাংলাদেশীদের মধ্যে পেশাদার ডিগ্রিধারীরাও এ সমস্যার মুখোমুখি। রোমের এ রকম একজন বাংলাদেশী হলেন রেজওয়ানা হাকিম মৌ। তিনি একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিন বছর যাবত বসবাস করছেন রোমে। তার স্বামী কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর একজন গ্র্যাজুয়েট। এ দম্পতি ইতালিতে তাদের পেশাদার ডিগ্রি ব্যবহার করতে পারছেন না শুধু ভাষার অদক্ষতার জন্য। তারা ইংরেজিতে যথেষ্ট দক্ষ কিন্তু ইতালিতে ইংরেজির কোনো ব্যবহার নেই। ডাক্তার রেজওয়ানার স্বামী রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছেন আর তিনি চেষ্টা করছেন আরো উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আর সেটা হচ্ছে ভাষা। তিনি যে বিষয়ের ওপর পড়তে চান, সেগুলো পড়তে হবে ইতালিয়ান ভাষায়। অপরদিকে ইংরেজিতে পড়তে চাইলে সীমিত যেসব সুযোগ মেলে সেসব বিষয়ে তিনি পড়তে চান না। এ কারণে একজন ডাক্তার হয়েও গত তিন বছরে তিনি যেন আটকে আছেন একটি গণ্ডির ভেতরে।’

ধর্মচর্চা ও রাজনৈতিক সচেতনতা

ইতালির প্রধান ধর্ম হচ্ছে রোমান ক্যাথলিক। দেশটিতে মুসলিম ধর্মাবলম্বী বলতে আছে কেবল অভিবাসীরা। বাংলাদেশ থেকে যারা ইতালিতে অভিবাসন করেছেন, তাদের মধ্যে প্রায় সবাই মুসলিম। মুসলিম অভিবাসীরা রাজধানী শহর রোমে ধর্ম পালন করতে পারেন। এমনকি সরকারি সহায়তায় সেখানে তৈরি হয়েছে রোম সেন্ট্রাল মসজিদ। এর বাইরেও রোমে বেশকিছু মসজিদ আছে। তবে রোমের বাইরে মসজিদ খুব একটা নেই। যার ফলে ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে, মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অসুবিধার মধ্যে পড়েন সেখানকার অভিবাসীরা। বিষয়টা নিয়ে কথা হচ্ছিল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিবাসীর সঙ্গে। তিনি আরো জানান, ‘ইতালিতে সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা বা আরবি পড়া, কোরআন পড়তে শেখা ইত্যাদি বাড়ি পর্যন্তই সীমিত। যেসব বাংলাদেশী ধর্মপ্রাণ তারা শুরু থেকেই এমন কোনো একটি দেশে চলে যেতে আগ্রহী থাকেন, যেখানে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা করা সম্ভব, সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেয়া সম্ভব, জুমার নামাজ আদায় করা সম্ভব। আর সেসব বিচারে তাদের পছন্দের তালিকায় থাকা দেশ ইংল্যান্ড।’

ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা খুব বেশি। তবে তারা স্থানীয় বা ইতালিয়ান কোনো রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত হন না। তারা বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমর্থক কিংবা সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ ঘটান। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী রতন জানান, ‘স্থানীয় রাজনীতি করতে চাইলে নাগরিকত্ব থাকতে হয় কিংবা পাসপোর্ট পেতে হয়। যখন রাজনীতি করার মতো সময় আসে বা হাতে পাসপোর্ট আসে তখন বাংলাদেশীরা ইতালি ত্যাগ করে অন্য দেশে পাড়ি জমান। যার ফলে বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে ইতালিয়ান রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছে বলে তেমন একটা শোনা যায় না।’

বাংলাদেশীদের ইতালি ত্যাগ করার কারণ

বিগত বছরগুলোতে বহুসংখ্যক বাংলাদেশী পরিবার ইতালি ছেড়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তারা মূলত ইতালিয়ান পাসপোর্ট পাওয়ার পর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো একটি ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে সপরিবার বসবাস করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ড ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। ইংল্যান্ডের অধিবাসী হিসেবে বিষয়টা আমার অজানা নয়। ইতালি থেকে ইংল্যান্ডে আসা পরিবারগুলোর মুখে বরাবর যা শুনেছি সেই একই কথা শুনলাম এবার ইতালিতে গিয়ে। সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশীরাও মনে করেন ইতালি থেকে বিপুলসংখ্যক পরিবার ইংল্যান্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার পেছনের কারণ হচ্ছে সন্তানের ভবিষ্যৎ, ভাষা ও ধর্ম। তারা চান তাদের সন্তানরা ইংরেজি শেখার সুযোগ পাবে এবং পৃথিবীর যেকোনো ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে নিজেদের কর্মজীবন পছন্দ করার সুযোগ পাবে। তারা বিশ্বাস করে, ইতালিতে এখনো বাংলাদেশীদের সন্তানদের জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি। ইতালি সরকার ও স্থানীয়রা বাংলাদেশীদের শ্রমিক হিসেবে বা ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু বাংলাদেশীরা চান না তাদের সন্তানদের জীবনও তাদের মতো হোক। এমনকি তারা বিশ্বাস করে, তাদের সন্তানরা ইতালিতে যতই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুক পেশাগত জীবনে তারা বৈষম্যের শিকার হবে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডে বাংলাদেশীদের অভিবাসনের ইতিহাস বহু পুরনো হওয়ায় এখানে বাংলাদেশীরা বৈষম্যের শিকার হন না, সন্তানদের ইসলামী দীক্ষায় দীক্ষিত করা সহজ এবং সন্তানদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ আছে।

তবে ইতালিতে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া কিছু বাংলাদেশী এবং ইতালি থেকে ইংল্যান্ডে চলে আসা বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, যেসব পরিবার ইতালিতে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আশানুরূপ সুদৃঢ় করতে পারেনি, বহু বছর থাকার পরও ইতালিতে বসবাসের ক্ষেত্রে যাদের যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি, যারা ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকার মতো দেশগুলোতে বসবাসের স্বপ্ন লালন করেছেন বহু বছর ধরে, ইতালিতে যারা কোনো স্থায়ী সম্পদের মালিক হতে পারেননি তারাই পাড়ি জমিয়েছেন অন্যান্য দেশে। ইতালির পাসপোর্ট পাওয়ার পর ইতালি ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপন প্রসঙ্গে রাজ্জাক সাহেব বলেন, ‘যেসব পরিবার ইতালি ছেড়ে ইংল্যান্ড গিয়েছে তারা সামাজিকভাবে ইতালির চেয়েও ভালো আছে সে রকম কিছু নয়। আর্থিক দিক দিয়েও তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি তারা। তবে এর পরও ইংল্যান্ড ছেড়ে পুনরায় ইতালি ফিরে আসছে না শুধু সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগের জন্য।’

বাংলাদেশ ছাড়ার পর শুরু থেকেই ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন এ রকম ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে ইতালি থেকে যেসব পরিবার ইংল্যান্ডে এসেছে তারা মূলত সরকারি আর্থিক সুবিধা বা সোশ্যাল সিকিউরিটি ভোগ করার উদ্দেশ্যে এসেছে। এ বিষয়ে তিনি জানান, ‘ইতালির জীবন ইংল্যান্ডের জীবনের চেয়ে সহজ এবং আরাম-আয়েশের।‘ ব্যক্তিগত কারণে তিনি প্রায়ই ইংল্যান্ডে আসেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি ইংল্যান্ডে চলে যাওয়া ইতালিয়ান বাংলাদেশী এবং ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের জীবনের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন।

দক্ষতা অর্জন, নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাস

কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত অনুকূল দেশ হিসেবে ইতালিকে বেছে নেয়ার কারণ বলতে গিয়ে রতন সাহেব বলেন, ‘ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে প্রবেশ সহজ, দক্ষতার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই, কাজ পাওয়া বেশ সহজসাধ্য। এমনকি কিছুদিনের মধ্যে কাজের ও থাকার বৈধতাও পাওয়া যায় সহজেই।’ দক্ষতা অর্জন বিষয়ে বলছিলেন রাজ্জাক সাহেব। তিনি জানান, ‘শুরুর দিকে কাজের দক্ষতা না থাকলেও চলে। এমনকি ইদানীংকালে কেউ অবৈধভাবে ইতালিতে ঢুকে পড়লেও ঢোকার পর পরই অ্যাসাইলাম হিসেবে থাকা ও কাজের অনুমতি পেয়ে যাচ্ছেন খুব সহজেই। পাঁচ-ছয় মাস এটা-সেটা করে কাটিয়ে, এর মধ্যে ভাষাটা কিছুটা রপ্ত করতে পারলেই কাজকর্ম নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই। কাজের বৈধতা পাওয়ার পর যারা স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান তাদের সেই ব্যবসা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো কোর্স করতে হয়। সফলভাবে মাস ছয়েকের সেই কোর্সটি শেষ করার পর অর্জিত দক্ষতা দিয়ে শুরু করা যায় ব্যবসা-বাণিজ্য।’

বৈধতা পাওয়ার পর থেকে ইতালিতে টানা ১০ বছর সময়কাল থাকার পর একজন বাংলাদেশী নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। নাগরিকত্ব প্রদানের আগে একজন আবেদনকারীর সব কাজকর্মের এবং ইতালিতে বসবাসের সব রেকর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। যখন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো খারাপ কাজের রেকর্ড পাওয়া যায় না, তখন তাকে নাগরিকত্ব ও ইতালিয়ান পাসপোর্ট দেয়া হয়। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর একজন বাংলাদেশীকে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায় না খুব একটা। স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই মনে করেন নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ইতালি থেকে ৯৭% বাংলাদেশী চলে যান অন্যান্য দেশে।

ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের মধ্যে যারা আছেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন ছিল, তারা কী কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যবসায়ী নাসিরুদ্দিন ঢালি বলেন, ‘এখন থেকে ১০ বছর আগে ইতালির পাসপোর্ট পেয়েছি। কিন্তু এ দেশ ছাড়তে পারিনি। ২৯ বছর যাবত এখানে বসবাস করি। এখন এটাই আমার দেশ। তাছাড়া রোমের ট্যুরিস্ট এলাকায় আমার মিনি মার্কেট আর ফাস্ট ফুডের ব্যবসায় যা উপার্জন করি তা পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভব না’ এ প্রসঙ্গে রতন সাহেব বলেন, ‘তিনি এবং তার পরিবার শুরু থেকেই ইতালিতে স্থায়ী বসবাসে আগ্রহী ছিলেন। সেই হিসেবেই গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা। তিনি এবং তার স্ত্রী অন্য কোনো দেশে যেতে আগ্রহী নন। তবে তাদের সন্তানরা ইতালি থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অন্য কোনো দেশে যেতে চাইলে তারা বাধা দেবেন না।’

পরিশেষ

আশির দশকে ইতালিতে বাংলাদেশীদের প্রবেশ ঘটে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সেখানে বাংলাদেশীদের অভিবাসন কখনই কমেনি। ইতালিতে একাধিকবার ভ্রমণ, ইতালিতে বাংলাদেশীদের জীবন ও নানা পেশায় তাদের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ, বসবাসকারী বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথোপকথন ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অভিবাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে নিজের জীবন, নিজের পেশা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন ইতালিতে বসবাসকারী/অভিবাসনকারী বাংলাদেশীরা। কিন্তু প্রশ্ন যখন সন্তানের ভবিষ্যতের তখন তারা ছাড়তে রাজি আছেন পরিচিত দেশ, কাজ ও অভ্যস্ত পরিবেশ। ইতালিতে বাংলাদেশী অভিবাসনকারীদের এখনো প্রথম জেনারেশন চলছে। সেই হিসেবে এটা হয়তো বলার সময় আসেনি যে ইতালিতে জন্মগ্রহণকারী ও বেড়ে ওঠা শিশুরা বড় হয়ে কাজের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবে। বসবাসকারীরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি নন বলে এটা প্রমাণেরও কোনো সুযোগ হয়নি। ব্রেক্সিট হওয়ার পর ইংল্যান্ডে ইতালিয়ান বাংলাদেশীদের অভিবাসন কমে গেলেও বেড়েছে আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন প্রভৃতি দেশে। তবে বাংলাদেশীরা যতদিন ইতালিতে থাকেন, ততদিন তাদের জীবন সেখানে সুন্দর ও সাবলীল। এ সাবলীল ও সুন্দর জীবনকে তারা অস্থায়ী হিসেবেই ধরে নেন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার পরই পাড়ি জমান অন্য কোনো দেশে।

 

তাসনুভা সোমা: লেখক ও কলামিস্ট