‘যে
দেশের
মাটিতে
মিশে
আছে
বেহুলা
লখিন্দর
আমি সে
দেশের
লোক
চোখে
খোদাইকৃত
ভালোবাসার
ভিসা,
হে ইমিগ্রেশন
বিভাগ
কী খোঁজ
মেশিন
রিডেবল
পাসপোর্টের
বুকে!’১
শিমুল গাছের
বীজের মতো
যেন অভিবাসী
মানুষ। শিমুলের
ফল ফেটে
গেলে তার
বীজ যেমন
বাতাসে ভেসে
ভেসে মৃত্তিকায়
পতিত হয়ে
একসময় চারাগাছ
জন্মায় নতুন
ভূমিতে, ঠিক
তেমন শিমুল
বীজের মতোই
অভিবাসী মানুষ
বাস্তবতার নিরিখে
নিজেকে ছড়িয়ে
দেয়ার জন্য
আকুল হয়,
সে আকুলতার
মর্মে থাকে
অভিবাসন। মানে
মানুষ অভিবাসী
হয় জীবিকা,
আয়, উন্নততর
জীবন তথা
প্রতিষ্ঠার মোহে।
কিছু মানুষ
আছে যারা
নিজেকে ছড়িয়ে
দেয়ার জন্য
না হলেও,
নিজেকে ছাড়িয়ে
যাওয়ার জন্য
অভিবাসী হয়।
এই ছাড়িয়ে
যাওয়ার মূলে
থাকে নিজের
সক্ষমতার পরখ
ও বিস্তারের
প্রণোদনা।
নিজের সক্ষমতা
বিস্তারের তেমনই
এক প্রণোদিত
সময়ে নেদারল্যান্ডসের
আমস্টারডাম থেকে
পাওয়া আমন্ত্রণে
সস্ত্রীক একটা
ফেলোশিপ প্রোগ্রামে
যোগ দেয়াই
ছিল আসল
উদ্দেশ্য। তারপর
ব্রাসেলস, প্যারিস,
মিলানো, ভেনিস,
ফ্লোরেন্স, রোম
হয়ে ফিরতি
পরিকল্পনার মাঝপথে
মিলানোয় যাত্রাবিরতি
দিতে গিয়ে
পড়ে গেল
ফুলস্টপ! মিলানোয়
পা রেখেই
প্রথম যে
ইতালিয়ান শব্দটি
জেনেছিলাম, তা
হলো ‘চিনকোয়ান্তাছেই’।
আগন্তুক হিসেবে
আপাতত একটা
আশ্রয়ে পৌঁছাতে
সে বাড়ির
সড়ক নম্বর
ছিল এটি।
ইতালিয়ান সংখ্যাবাচক
শব্দ। যার
বাংলা করলে
দাঁড়ায় ৫৬।
পিয়েরো দেল্লা
ফ্রান্সেসকা সড়কের
৫৬ নম্বর
বাড়ি। বাংলাদেশ
নামের পুবের
১ লাখ
৫৬ হাজার
বর্গমাইলের দেশ
ছেড়ে পশ্চিমের
তথা ইউরোপের
দেশ ইতালির
মিলানো মহানগরের
কোনো এক
৫৬ নম্বর
বাড়িতে প্রথম
আশ্রয় পাওয়া।
অভিবাসী হিসেবে
এই প্রথম
যেন আমার
৫৬ হাজার
ধমনির রক্তের
অন্তর্গত স্রোতস্বিনীর
বহমানতা ভিন্নমাত্রায়
টের পাওয়া!
তখন বর্ণিল
আকাশে মিলানো
শহর আর
ছেড়ে আসা
দেশগাঁয়ের চিন্তনের
পাশাপাশি জায়গা
করে নিতে
কায়িক শ্রমে
জিতে যাওয়া
প্রান্তীয় মনন।
মিলানোয় আমার
অভিবাসী দিনগুলো
শুরু হয়েছিল
একজন ইতালীয়
চিত্রশিল্পী ও
গণিতবিদ, ইতালীয়
রেনেসাঁর সবচেয়ে
প্রতীকী ব্যক্তিত্বদের
মধ্যে যিনি
ছিলেন মানবতাবাদী-চিত্রশিল্পীদের
দ্বিতীয় প্রজন্মের
একজন, শিল্প
এবং গণিতের
মাস্টার, দ্য
ভিঞ্চির মতোই
চিত্তাকর্ষক এবং
রহস্যময় শিল্পী
পিয়েরো দেল্লা
ফ্রান্সেসকা, তার
নামের সড়কে
ও সে
সড়কের অন্য
প্রান্তে আরেক
ফ্রান্সেসকো, মানে
যিনি ইতালীয়
মার্ক্সবাদী, সাংবাদিক,
ভাষাবিদ, লেখক
ও রাজনীতিবিদ,
সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস
ও ভাষাতত্ত্ব
দার্শনিক, ইতালির
কমিউনিস্ট পার্টির
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
আন্তোনিও ফ্রান্সেসকো
গ্রামশিদর নামাঙ্কিত
পিয়াচ্ছা গ্রামশিতে।
সেসব মানিয়ে
নেয়ার কঠিন
অধ্যবসায়ের বহু
সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাতের
সময়ের সাক্ষী
এই পিয়াচ্ছা
গ্রামশি ।
ভাষিক, কায়িক
ও শীতের
দুর্যোগপূর্ণ সময়ের
মোকাবেলা করে
তখন মিলানোয়
এক অভিবাসী
দম্পতির দৈনন্দিন
ক্লেশের প্রতিবেদন
লেখা হচ্ছে।
ছিন্নমূল অসহায়ত্বের
অনুপ্রবেশ যেন
আটকানো যাচ্ছে
না! অন্যদিকে
সামাজিক ভব্যতা,
নাগরিক কোলাহল,
আত্মনৈঃশব্দের, নির্জনতার
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
থাকা উদ্বাস্তুর
কঠিন বাস্তবভূমিতে
মাত্র দুই
কামরার একটা
ঘরের মধ্যে
পনেরোজন নানা
বয়সী নারী-পুরুষ-শিশুর
সঙ্গে দুটো
সপ্তাহ কেটে
যাওয়ার পর
আবিষ্কার করতে
আর বেগ
পেতে হয়নি,
এটা এক
অজানা অনভিপ্রেত
উদ্বাস্তু জীবনস্রোতে
ভেসে চলেছি!
‘গ্রামের
মানুষ আমি,
কেন যে
এভাবে নষ্ট
হওয়ার জন্য
এখানে
এলাম,
আমি
ডুবেছিলাম
ধান-কাউনের
গন্ধে
গ্রামের
মানুষ
আমি,
আমার
মুখে
ছিল
কাঁচা
দুধের
ঘ্রাণ
শরীরে
পদ্ম
ফুলের
সৌরভ,
আমার
চোখে
ছিল
এক
আকাশ
তারা
বুক ভরা
স্বর্ণচাঁপার
বন;
আমি কেন
নষ্ট
হতে
এখানে
এলাম।’২
মিলানোয় আমাদের
প্রথম সাবলেটের
চারতলার জানালাবিহীন
ঘরে দুই
দরজা। যার
ফাঁক গলে
দিনের আলো
যেখানে কিঞ্চিত
আসে, সেখানে
বিবর্ণ গেরস্থালির
ইমেজ দানা
বাঁধে আর
হাঁড়িপাতিল চামচের
শব্দ ম্লান
হাসির মতো
শুরুতেই মিলিয়ে
যায়। ঢাকার
পাট চুকিয়ে
অভিবাসনে সব
জলাঞ্জলি দিয়ে
আপাতত এই
গৃহবাসী। গুহাবাসীও
বলা যেতে
পারে এই
দশাকে! এখানেই
বিছানায় বাড়তি
চাদর বিছিয়ে
রেহালের মতো
ছোট্ট তাঁতে
ভক্তির চুমু
দিয়ে টানা
গাঁথা, পোড়েন
দেয়া শুরু।
শুরুটা ছিল
খানিকটা কর্কশ।
শিল্প-সংস্কৃতি
কারবারে মধ্যবিত্ত
বাঙালি সুগন্ধি
বিশেষত্ব, অহম
নিয়ে চলে,
চলার নয়
তবুও। এখানে
অভিবাসে বোনাফাইট
তাঁতি জীবন।
ঘাম রক্তের
নোনা স্বাদ
গন্ধে লিপ্ত
হওয়া কারো
বাসনায়।
সাতদিনের নোটিসে
আমার ফেলোশিপ
প্রোগ্রামে যোগ
দিতে গিয়ে
দেশে কাউকেই
সেভাবে বলেকয়ে
আসা হয়নি।
ফলে একটা
কমন অনুযোগ,
‘ভাই
এইভাবে পলাইলেন?’
সেই থেকে
এক পলাতক
বাঙাল তাঁতি
আমি। পলায়নেরও
একটা গতি
থাকা চাই।
সে গতির
নামই বোধ
হয় জীবন।
সদর-অন্দরের
জীবন। যে
জীবন কখনো
জীবিতকে এ
অভিবাসে নরম
বিছানায় পাশবালিশ
দিয়ে শুইয়ে
রাখে না।
আছাড় মারে,
আঘাত করে।
আর কতটা
আঘাত সওয়ার
ক্ষমতা বেড়েছে
তা প্রত্যহ
পরখ করে
দেখে। সত্যি,
সেখানে দয়া
ধর্ম চর্মচক্ষে
দৃষ্টিগোচর হওয়ার
নয়।
মনে হতে
থাকল গোত্রহীন
এক উদ্বাস্তু
আমি। বুঝতে
বাকি রইল
না, এই
অজানা-অচেনা
দেশে অস্তিত্ব
রক্ষা করতে
হলে আবেগ-অনুভূতি
জিইয়ে রেখে
লড়াই করা
যাবে না।
অথচ নিজের
সঙ্গে এটা
ছিল অবশ্যম্ভাবী,
অবর্ণনীয়। ফলে
নানাবিধ ঝুঁকির
মধ্যে নিজেকে
সমর্পণ করতেই
হলো অবলীলায়।
সাড়ে তিন
এয়োরোয় মিলানো
শহরের একটি
ম্যাপ বা
পথমানচিত্র কিনে
রাস্তায় নেমে
এলাম। জীবন
বাস্তবতার কঠিনতর
প্রশিক্ষণে পায়ে
হেঁটে, বসে,
ট্রামে, পাতালরেলে,
সাইকেলে শুরু
হলো ছুটে
বেড়ানো। পথ
হারিয়ে গিয়েছি
উপর্যুপরি। বলা
ভালো, পথ
চিনেছি। ঘরে
ফেরার নতুন
রাস্তা বাতলে
নিয়েছি। পইপই
করে রাস্তাঘাটের
নিশানা মগজে
গেঁথেছি।
‘প্রবাসে,
দৈবের
বশে,
জীব-তারা
যদি
খসে
এ দেহ-আকাশ
হতে,
নাহি
খেদ
তাহে।’৩
প্রতিদিন নিত্যনতুন
সড়কে পথ
ভাঙতে ভাঙতেই
শহরের ‘কম্যুনে’
ইনফরমেশন সেন্টার
আমার দিকবিদিক
ঘুরে বেড়ানোর
আয়োজনে তথ্য
সরবরাহ করতে
থাকল, তাদের
প্রকাশিত নানা
প্রচার পুস্তিকার
মাধ্যমে। আমিও
মহাসমারোহে নিজের
শিল্পকর্মকাণ্ডের কিছু
মুদ্রিত স্মারক
প্রকাশনা নিয়ে
বেরিয়ে যেতাম।
শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলো
প্রায়ই নির্দিষ্ট
থাকত কেবল
আমন্ত্রিতদের জন্য।
সেখানে আমার
মতো অভাজনকে
কে-ই
বা নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণ
জানাবে? কখনো
সখনো ফাঁক
তালে ঢুকেও
গিয়েছি প্রদর্শন
কক্ষে। তবে
শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত
এমন সমাগমের
মধ্যে খর্বকায়,
তামাটে গায়ের
সুরত রং-বর্ণ
মিলে সহসাই
শনাক্ত হতে
হতো। তাতে
নিরীহ জিজ্ঞাসাবাদেরও
মুখোমুখি হওয়া।
ভাষা প্রতিবন্ধকতার
মাশুল দিতে
গিয়ে ইংরেজি
বয়ানে বরং
বাড়তি মনোযোগ
পাওয়া যেত!
বিপত্তি তেমন
না হলেও
একটা হীনম্মন্যতায়
আক্রান্ত হওয়া
ছিল অবধারিত।
আবার নিজের
পরিচয় উন্মুক্ত
করে সমীহও
পাওয়া যেত
কখনো। অসংখ্য
গ্যালারি বা
প্রদর্শনশালায় নিয়মিত
যাতায়াতে পরবর্তীকালে
ই-মেইলে
আমন্ত্রণ পেতে
থাকায় প্রদর্শনীর
তথ্য পেতে
সহজ হলো।
আরো সুগম
হলো যাতায়াত।
শিল্পী পরিচয়ে
আমাদের বসবাস
করতে চাওয়া
মিলানো শহরে
কেমন ছিল
স্বদেশীদের পেশা?
অসংখ্য মানুষ
তখন ক্লানদেস্তিনি
বা অবৈধ
বিদেশী নাগরিক।
পৃথিবীর প্রায়
দেশেরই নাগরিক
এ তালিকায়।
বাংলাদেশী অধিকাংশেরই
তখন মূল
কাজ ফুল
বিক্রি, খোলা
বাজারে রসুন,
সবজি বেচা,
মোটা দাগে
বার-রেস্টুরেন্ট
কর্মী, কিছু
দোকানপাটের মালিক
কর্মী, খুব
কম ফ্যাক্টরি
শ্রমিক। মিলানোয়
রোজগারের এই
ছিল তখন
চেনা চৌহদ্দি।
এমতাবস্থায় আর্ট
বা হাতের
কাজ করে
জীবিকার সম্ভাবনার
লক্ষ্য থাকলেও
বাস্তবে তা
ছিল সুদূরপরাহত।
সে সময়
একেবারে শুরুর
একদিনের রোজগার
ছিল ‘ছুতারের’
কাজের! বিস্তারিত
বললে তা
পরিষ্কার হতে
পারে। আমরা
যে চিনকোয়াস্তাছেই
বাড়ির আশ্রিত
সে পরিবারের
দাদা-বৌদির
চতুর্দশী কন্যার
সম্বোধনে আমার
স্ত্রী তার
পিসি ও
সে সূত্রে
আমি তার
পিসা। তো
তার স্কুলের
সহপাঠীর সিঙ্গেল
মা, যিনি
লাতিন, তার
ঘরের কিছু
নতুন আসবাব
স্থলাভিষিক্ত করতে
হবে পুরনোগুলো
হটিয়ে। আমরা
গেলাম সে
কাজে। ভরসা
কারুশিল্প বিভাগে
পড়াশোনার সময়
কাঠের কাজের
হাতিয়ার ব্যবহার।
মোটামুটি গলদঘর্ম
হয়ে ক্রাফটটি
আন্দাজ কাজে
লাগিয়ে সে
যাত্রা শ্রমসম্মানীসমেত
ঘরে ফিরেছিলাম।
ধারণা করেছিলাম,
পেয়ে গেলাম
আমার কারিগরি
বিদ্যার সামর্থ্যের
সার্টিফিকেট। শুধু
তাই নয়,
এ জাতীয়
কাজ করে
খেটে খাওয়ার
উদ্দেশ্য পরিষ্কার
দেখা যাচ্ছিল
মনে করেছিলাম!
তবে সেসব
যে পরবর্তী
সময়ে অসাড়
প্রমাণিত হয়েছিল
তা বলাই
বাহুল্য। তবে
শ্রম বেঁচে
যে বেশ
উতরে যাওয়া
যায় সে
শিক্ষায় ভর
করে তখন
আমাদের পথচলা
শুরু। বুঝতে
শেখা, জীবনের
নিষ্ঠুরতম বাস্তবতা
হলো নিজে
বাঁচা! যেখানে
রোমান্টিক ভাবালুতার
জায়গা নেই
কোনো। তাই
‘বারের
দায়তো বারিস্তা’
বা ‘পানীয়
সরবরাহ সহযোগী’
থেকে বিক্রয়কর্মী,
রাজমিস্ত্রির জোগালি
থেকে সমুদ্রতটে
ট্যাটু করা,
বিজ্ঞাপন প্রচারপত্র
বিলি থেকে
সকাল-সন্ধ্যার
ফ্রি প্রেস
বা খবরের
কাগজ বিলি
করার কাজে
নিয়োগ থাকাই
হয়েছিল বিধেয়।
সেসব কাজে
সফলতা বলতে
ততটুকুই, আমার
পুরনো অনুভূতি
ও আমিত্বের
যে ঠাট
তার যথেষ্টই
স্খলন হয়েছিল।
মিলানোর মতো
বড় শহরে
নিজেকে ছোট
থেকে বড়
করতে গিয়ে
যেন ক্রমে
ছোট হওয়ারই
তামিল হচ্ছিল।
এসবই স্পষ্টত
বৈরী পরিস্থিতি!
তথাপি অবৈরী
দুনিয়ার খোঁজ
পেতেই যেন
মরিয়া তখন।
অন্যদিকে অননুমোদিত
অভিবাসী হিসেবে
বৈধ বাসিন্দা
না হওয়ায়
একের পর
এক ঘর
পাল্টানো চলছে।
ভিয়া পিয়েরো
দেল্লা ফ্রান্সেসকা
চিনকোয়াস্তাছেই থেকে
নিজেদের সাবলেট
ঘর ভিয়া
নিকোলা ফাব্রিজি
দোদিচি, ভিয়া
পালাচ্ছো পালাচ্ছি
চিনকোয়ে, সেখান
থেকে ভিয়া
কার্লো মার্কস
ছেইদিচি, ভিয়া
ভাল ত্রমপিয়া
উনো, ভিয়া
কারোলিনা ইনভেরনিছিও
চিনকোয়ে, ভিয়া
করছো ছেমপিওনে
অত্তানতাঅত্তো, সর্বশেষ
ভিয়া দেলফিকো
দুয়ে বাড়িতে
থিতু হয়েছিলাম।
সম্পাদকের সঙ্গে
আমি দায়বদ্ধ
মিলানোর তখনকার
বাঙালি কমিউনিটি
নিয়ে কিছু
উল্লেখ রাখার।
তবে সে
উল্লেখে উল্লেখযোগ্য
ইতিবাচক কথা
থাকলে বেশ
হতো হয়তো।
আর তা
না হলে?
সত্যি বলতে
সংগঠিত বাঙালি
কমিউনিটি বলতে
যা বোঝায়,
তেমন কিছু
তখন মিলানোয়
ছিল কি?
না, আমার
নজর কাড়েনি!
দুই হাজারের
পরের পুরো
দশক ও
পরের দশকের
সিংহভাগ জুড়ে
দেখা, জানা
বহুধাবিভক্ত খণ্ডিত
আঞ্চলিক সমিতিগুলোর
খেয়োখেয়ি ছিল
বিস্তর। উল্লেখিত
সময়ের মধ্যে
বাংলা স্কুল,
বাংলা সংস্কৃতিচর্চার
কোনো প্রতিষ্ঠান
পরিচালিত হতে
দেখিনি। এ
নিয়ে তথাকথিত
কমিউনিটি ব্যক্তিত্বদের
কোনো হেলদোলও
ছিল বলে
প্রত্যক্ষ করিনি।
বাংলাদেশ সমিতি
তখন পদ
কোন্দলে পর্যুদস্ত।
মিলানোয় বসবাসকারী
বাংলাদেশীদের মধ্যে
একটি জেলার
বেশির ভাগ
অধিবাসী থাকায়
এই সমিতি
পরিচালনায় সে
এলাকাভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার
সূত্রে জবরদখল
হচ্ছিল। ফলে,
কার্যত মুখ
থুবড়ে পড়েছিল
সমিতি কার্যক্রম।
নানা উন্নয়ন
ও কল্যাণ
সমিতির নামে
বিশেষ করে
অননুমোদিত অভিবাসী
নিয়ে তাদের
ছিল নানা
ব্যবসা। এসব
অভিবাসীপ্রত্যাশীর কাছে
ঘর, বিছানা
ভাড়া দেয়া
(মুরগি পালা
বলে বহুল
কথিত), স্বল্প
মাইনের কর্মী
হিসেবে ব্যবসায়
নিয়োগ, তাদের
অর্জিত গচ্ছিত
অর্থ পেয়ে
নিজেরা তা
পুঁজি হিসেবে
ব্যবহার করে
ব্যবসায়ী বনে
যাওয়া, এমনকি
অবৈধ পথে
তাদের আত্মীয়-স্বজনকে
ইতালি নিয়ে
আসার আশ্বাসে
অর্থ তছরুপসহ
নানাবিধ যথেচ্ছাচার
দৃষ্ট ছিল।
এসব নানা
অন্যায্যতার মধ্যেও
ছিল যেমন
মায়া কাড়া
মানুষজন, তেমনই
শুভার্থীদের আনাগোনা।
এ কথা
বলতেই হয়,
একটা লম্বা
সময় ধরে
কোনো আলাদা
শ্রেণী নয়,
অভিবাসীপ্রত্যাশী বাংলাদেশের
মানুষ হিসেবেই
নানাবিধ আনন্দ
উচ্ছ্বাস, ভালো
লাগা, সহমর্মিতা,
সহযোগিতার এমন
নিঃস্বার্থ আয়োজন
বিভুঁইয়ে আমাদের
সময়কে খানিক
হলেও বৈচিত্র্যপূর্ণ
করেছিল। তাদের
প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আত্মপরিচয়ের সংকটে
ভোগা বাংলাদেশীদের
তখন নানা
সাংগঠনিক পরিচয়ে
নেতা হওয়ার
হিড়িক। উদাহরণস্বরূপ
কয়েক বছরের
মধ্যে ঢাকা
সমিতি, বৃহত্তর
ঢাকা সমিতি,
ঢাকা উত্তর
সমিতি, ঢাকা
দক্ষিণ সমিতি,
ঢাকা জেলা
সমিতি এমন
নামের সংগঠনের
ছড়াছড়ি। একই
নামের সংগঠনের
একাধিক কমিটিও
আছে। আছে
স্বাধীনতার কম
বয়সী মুক্তিযোদ্ধাও!
তারাই বাংলাদেশ
কনস্যুলেটের নানা
আয়োজনে বাহারি
সাজে হাজির
হয়ে হম্বিতম্বি
করতে পিছপা
হয় না।
দলাদলি, বিবাদ,
ঝগড়াও আছে
এসব ঘিরে।
এলাকাভিত্তিক তথা
ইউনিয়নবাসীরও সংগঠন
আছে। এসব
কার কী
কাজে লাগে
সে এক
ব্যাপক অনুসন্ধানের
বিষয়। এমন
একটি কমিউনিটির
অংশ হয়ে
শিল্পচর্চা করার
নিয়ত করে
কত রকম
ঝক্কি পোহাতে
হয়েছে তা
বছরের পর
বছর টের
পেয়েছিলাম। নিজসদৃশ
স্বদেশীরা শহরজুড়ে
ফুল বিক্রি
করে। যা
কার্যত অর্থ
সাহায্য চাওয়া
ছাড়া কিছুই
নয়। ফলত
সে শহরের
কোনো গ্যালারির
দরজায় আমাকেও
ফুলবিক্রেতা ঠাহর
করা তাদের
জন্য ছিল
স্বাভাবিক!
গ্যালারির দরজায়
দরজায় ঘুরে
তখন পর্যন্ত
নিজের শিল্পকাজের
জন্য কোনো
গতি করতে
না পারলেও
নিজের শিল্পব্যুত্পত্তির
প্রতি আস্থা
দৃঢ় হয়েছিল।
এমন প্রতীতি
জন্মেছিল, এ
শহরে আমার
শিল্পকাজের যথাযথ
মূল্যায়ন না
হওয়ার কোনো
কারণ নেই।
উত্তর ইতালির এ জনপদে তথা মিলানোয় অতীতে কোনো বাঙালি শিল্পীর বিচরণ ছিল কিনা তা জানতে গিয়ে বোধগম্য হলো আমরাই প্রথম। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে অভিজ্ঞতা আহরণের কোনো সুযোগ ছিল না। তাই ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা অর্জন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প রইল না।
এভাবেই নানা
যাতনা, যন্ত্রণা
সয়ে সম্ভাব্যতা
খুঁজে ফেরার
অসফল তালিকা
দীর্ঘতর হয়।
বলা বাহুল্য,
এসব তালিকায়
যথাযথ প্রাপ্তির
হদিস তখন
অব্দি নেহাৎ
হ্রস্বই! তথাপি
খোঁজাখুঁজিতে তো
আর বিরতি
দিলে চলে
না। তেমনি
বিরতিহীন খোঁজাখুঁজির
একপর্যায়ে পেয়ে
যাই কাঙ্ক্ষিত
গ্যালারি ও
কিউরেটরের নাগাল।
ততদিনে বছর
পাঁচ অতিক্রান্ত।
সেই থেকে
এই কিউরেটর
ও গ্যালারির
সঙ্গে কাজ
করে যাচ্ছি।
এই পেয়ে
যাওয়ার পেছনেও
আছে গল্প।
সেটা আপাতত
মুলতবি থাক
ভবিষ্যতের জন্য।
তবে বলে
রাখি, শিল্প
ব্যবস্থাপক গ্যাব্রিয়েলা,
শিল্প শিক্ষক
মার্গারিতা কাভাল্লো,
শিল্প ইতিহাসবিদ
ড. আন্না
বালদি, কিউরেটর
মারিনা জর্দানো,
মিউজিয়াম পরিচালক
ও কিউরেটর
এনেছো ফিয়ামেত্তা
আমার উদ্বাস্তু
জীবন ও
মনে সুবাতাস
আনয়নে ব্যাপক
ভূমিকা রেখেছিলেন,
রাখছেন এ
কথা অনস্বীকার্য।
Ciao tutti amici belli. চাও
তুত্তি আমিচি
বেল্লি। Sono contento per voi. সোনো
কন্তেনতো পের
বোই।
সেই থেকে
মিলানোর সঙ্গে
আমার সম্পর্ক
নতুন বাস্তবতায়,
নয়া জমানায়
নয়া যাপনের।
নয়া কিসিমের
জানা-বোঝা-পড়া।
অতীতের পাল্টা
আধিপত্য খুঁজতে
সচেষ্ট হওয়া।
জীবনানন্দ যেমন
বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে
নেই কোনো
বিশুদ্ধ চাকুরী’।
আমারও নেই।
এখানে শুদ্ধতার
প্রশ্নটি ঘরগেরস্থালির।
সে অর্থে,
চাকরি নয়
গেরস্থালি করি।
বয়ন গেরস্থালি।
মনে হয়
সারা জীবনটাই
বুনে বুনে
তৈরি। মাঝে
মাঝে উল
বোনার কাঁটা
থেকে ঘর
পড়ে যেমন
খুলে যায়
তেমনই জীবনের
খিড়কি কপাট
খুলে খুলে
পড়তে চায়
যেন এই
অভিবাসে। কিন্তু
ওই বোনার
নকশা আমার
কাছে হররোজ
অভিনব মনে
হয়। বিস্ময়ে
তাই উঁকি
মেরে আলগোছে
নকশা দেখে
নকশা সাজাই।
কত নকশা,
কত রঙ
লটকে আছে
জীবন গাছের
ডালে ডালে!
‘শব্দ
সাজান
কবি,
যাকে
কবিতা
বলি,
আমি নকশাই
করি,
যাকে
ছবি
আঁকা
বলি।’৪
আমি বয়নবাদী।
সামান্য কত
বয়ন উপাসনা
আমাকে টোকা
দিয়ে যায়।
তাকে ক্ষুদ্রে-বিশালতায়
ধরতে কী
কাঙালপনা আমার
আজ! গাঁয়ে
বসে লাগাতার
বুনতে চাইলেও
শহর কখনো
সেজন্য ছুটি
মওকুফ করেনি।
ক্যাজুয়াল বা
ঐচ্ছিক ছুটিও
বরাদ্দ পাইনি।
ফলে চারপাশের
যাপন যত
দেখি যাপিত
হওয়ার একঘেয়েমি
আরো বেশি
ধ্বংস করে।
তবু বয়ন
ভাবনায় বোধ
হয়তো আমাকে
শান্ত রাখে।
প্রথম পোড়েন
দেয়ার অপেক্ষা
প্রেমিকার জন্য
প্রতীক্ষার চেয়েও
রোমাঞ্চকর! এমন
তারুণ্যের রোমাঞ্চ
তৈরি করতে
পারার জন্য
বয়নের কাছে
আমি কৃতজ্ঞ।
বয়নকে রেডি
ফুড ভাবিনি
কোনোদিন, প্রার্থনা
করেছি তা
যেন আমাকে
নিংড়ে নিয়ে
গড়ে ওঠে।
আমি বুনি।
বুনতে আমার
ভালো লাগে।
বুনলে আমি
ভালো থাকি।
এ আমার
প্রাণের দায়।
ব্যক্তিগত দেনা
চুকাতে চাইলে
মিলানোর কাছে
আরো দেনাই
বাড়বে শুধু।
ইউরোপের অন্যতম
চাকচিক্যের এই
মহানগরে কত
মন খারাপ,
হাসি, বেদনা,
দুঃখ-কষ্টের
স্মৃতি হাড়ে-পাঁজড়ায়
মিশে আছে!
পিতৃত্বের দুদুটো
গেড়োর সাক্ষী
হয়েছে মিলানো।
পিতৃদেবসহ চেনা
কত কী
হারিয়েছি এই
মিলানো অভিবাসী
হয়ে। গত
অনেকগুলো বছরে
সকাল-সন্ধ্যা
মিলানো আমার
চৈতন্যজুড়ে আধিপত্য
করতে চেয়েছে।
আমি লড়েছি-হেরেছি-জিতেছি।
তাই মিলানো
তি অদিয়ো
এ তি
আমো ঘৃণায়
মিলানোকে অভিসম্পাত
দিয়ে ভালোবেসে
স্বাচ্ছন্দ্যে তাকে
জড়িয়ে বাস
করি।
‘উড়ছে
শরীরে
জড়ানো
বসন,
হাওয়ায়
হাওয়ায়
তাঁতের
খটখট
ধ্বনি।
যুদ্ধক্ষত
মহামারী
ঢেকে
দেয়
এমন
বসন
আছে,
কিন্তু
সে
কেবল
নবী
ও
শিল্পীর
গায়ে।’৫
ফসলের আদিম
শরীর থেকে
বুনো আমোদের
গন্ধ ছড়ানো
আরণ্যক গ্রাম
বুকে নিয়ে
এ শহরে
একদা পিঠ
ঠেকিয়েছিলাম। বুকের
উষ্ণতায় এ
পার্থিব অর্জন
সৃষ্টির উচ্ছ্বাস
হয়েছে। সে
জগেকই অভিজ্ঞতা
অভীপ্সার ভাষায়
রূপায়ণ করতে
চেয়েছি। হয়তো
এমনি করে
সারা জীবন
ধরে নিজের
শৈশবকে সৃজনী
ভাষায় ভিন্ন
পরিসরে পুনর্নির্মাণ
করে যাওয়া।
প্রজ্ঞায়িত অনুষঙ্গে
তন্তুর ভেতর
কথারা হয়
দেশমাতার কথা।
সে দেশ,
যা লোকায়ত
তাত্পর্যে লিপ্ত।
এ লিপ্ততায়
সমঝোতা করতে
হয়, রফা
করতে হয়
এক দ্বান্দ্বিক
সম্পর্কের অন্তর্নিহিত
প্রস্তাবনার সঙ্গে।
যে দ্বন্দ্বে
বস্তুর চেনা
গড়নে অভিজ্ঞতার
মিশেলে বদল
ঘটে কিন্তু
স্বভাবচ্যুত হয়
না। প্রকল্পটি
জারি থাকে
সংকল্পের দ্বৈতাদ্বৈতকে
সঠিক মাত্রায়
বাঁধার আয়াসে।
এখানে কোনো
গুরুনির্দেশ বা
বিধিবিধান খাটে
না, বরং
বোধ ও
প্রাণের ফজিলতে
শিল্পায়াত নাজিল
হয়।
মিলানোয় এসে
‘নতুন
তকমা মুফতে
পাইলাম’, অভিবাসী।
এ যে
আসলে এক
উদ্বাস্তু পরিস্থিতি
সেটা সহসাই
টের পেয়ে
গিয়েছিলাম। একজন
অভিবাসী উদ্বাস্তু
জীবনের অভিজ্ঞতা
এক এক
করে আমার
চেতনার মর্মমূলে
আঘাত করতে
থাকল। এও
নীরবে দেখছিলাম,
অনুভব করছিলাম।
বলা ভালো,
ভেসে যাচ্ছিলাম
এক অচেনা
উদ্বাস্তু স্রোতে।
অতীত কীর্তিনাশার
এ যেন
মৈষাল পর্ব।
স্রোতের চোরা
টানে ভাঙনের
মুখোমুখি হতে
সময় লাগল
না। কিন্তু
এ আসন্ন
অবশ্যম্ভাবী কীর্তিনাশা
ভাঙনের শব্দ
শুনতে শুনতে
রক্ষা বাঁধের
তালাশ করে
মরা কেবল।
এসবই জীবনের
ষোলোআনা দাম
চুকিয়ে কেনা।
যার প্রতি
আনার অভিঘাতের
মুখোমুখি দাঁড়িয়েও
ছিল তাঁতচিত্রের
পলাতক আত্মাটিকে
জাগিয়ে তোলার
চেষ্টা। সময়
যদি নির্মম
নির্দয় হয়,
তাহলে তার
কাছে নতি
স্বীকারেও রাজ্যের
অবিশ্বাস! জীবন
বাবুর কথা
ধার করে
বলি—‘আঁধার
দেখেছি, কিন্তু
আছে আরো
বড় অন্ধকার।’
এমনি প্রায়ান্ধকার
পরিস্থিতির মধ্যে
মিলানোয় বয়ন
হয়ে উঠল
আমার উদ্বাস্তু
জীবনের দিনলিপি।
অভিবাসী জীবনে
বসে আলগা
হয়ে যাওয়া
সুতার বাঁধন
জোড়া দেয়া।
হাড়ে-পাঁজরায়
অতীতমুখী ক্ষরণ
তখন।
মিলানো নামের
বৈচিত্র্যময় প্রাণস্পন্দনের
এ শহর
খুবই জীবনমুখী।
তারুণ্য যেন
এখানে খোয়াবার
নয়। ছেড়ে
যায় না
বুঝি। বহুজাতি
অভিবাসী আবহ
আরেকটি ভিন্ন
মাত্রা। কত
রকমের সম্পর্ক,
আত্মীয়সম অনেকেই
কিংবা ঢের
বেশি! আরবান
শিক্ষা জগতে
শিক্ষা নেয়া
আরেকবার সম্পর্কের
বয়ন, তার
বয়নও তাত্পর্যপূর্ণ।
এখানে আত্মপ্রহার
আছে, আছে
আত্মউন্মোচনের উসকানি।
যেখানে বিপন্নতার
মাঝে ঘুরে
দাঁড়াবার সাহস
জোগায়। আমার
স্মৃতির তন্তুজগতের
সঙ্গে, বয়নের
সঙ্গে এ
সমাজের ভাব
সম্পদ, দায়িত্ববোধ,
সংস্কৃতিবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য
মানবিক ঐক্যের
যে স্বরূপ
চিহ্নিত করে
তা আমার
‘দুধভাষায়’
অনূদিত হয়।
সাধন সমন্বয়
হয় বোনাবুনির
সামর্থ্যে। আর
এভাবেই অন্য
ধরনের ইতিহাস
সাধনা, ব্যর্থতা,
সংগতি, অর্জন,
উেপ্রক্ষা তথা
অভিজ্ঞতার কথা
শিল্পকর্মে ধরা
থাকে।
এখানেই পিতৃত্বের
গরিমায় গৌরবান্বিত
হয়েছি। সত্যিকারের
সংসার হয়েছে।
হোক তা
বৈরাগ্যের সংসার।
সব মিলিয়ে
মিলানো তার
ভাষা, বর্ণ,
সংবেদে গৃহীবাউল
জীবনের স্বাদ
নিয়ে এল।
যেখানে এসব
অনুষঙ্গে মরমিয়া
গুহ্যসাধনার হালহকিকত
চিত্রলেখ্য হয়।
সিসিলির জিবেল্লিনায়
আমার আর্টিস্ট
রেসিডেন্সিকে একটা
অনন্য ঘটনা
হিসেবেই দেখি।
অনেকদিন আগে
আমার জন্মের
বছর ও
মাসে জিবেল্লিনাসহ
আশপাশের আরো
চারটি জনপদ
এক প্রলয়ংকরী
ভূমিকম্পে ধ্বংস
হয়ে গিয়েছিল।
পরে সেখান
থেকে ২০
কিলোমিটার দূরে
৪০ বছর
ধরে নতুন
জিবেল্লিনা নামে
আরেকটি শহর
গড়ে তোলা
হয়। যার
প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি
হিসেবে এই
আধুনিক স্থাপত্য
ও শিল্পকর্ম
গড়ে তুলেছেন
তিনি লুদভিকো
কোররাও। সবাই
বলেন, ছেনাতোরে
কোররাও। তার
আমন্ত্রণে ‘মোজেও
অরেস্তিয়াদি দ্য
জিবেল্লিনা’য়
আর্টিস্ট রেসিডেন্স
হিসেবে আমন্ত্রিত
হই। উল্লেখ্য,
এ মিউজিয়ামের
প্রতিষ্ঠাতা ও
পরিচালক তখন
তিনি। তিন
সপ্তাহের আর্টিস্ট
রেসিডেন্সির পর
তিন মাসব্যাপী
আমার একক
প্রদর্শনীর সঙ্গে
আরো ছয়জন
ফাইবার আর্টিস্টের
শিল্পকর্মও প্রদর্শিত
হয়েছিল একই
প্রদর্শনী শিরোনামে।
যার শিরোনাম
ছিল ‘লা
ছেই স্তাজিয়নে
দ্য চন্দন’
বা ‘চন্দনের
ছয় ঋতু’।
দক্ষিণ ইতালির
প্রকৃতি সাগর
আর মানুষের
সঙ্গে সেই
ছিল প্রথম
প্রত্যক্ষ করা।
অনেক বন্ধু
সম্পর্ক তৈরি
হয়ে যায়
সে যাত্রায়,
যা এখনো
বিদ্যমান। সেই
জিবেল্লিনাকে আমি
বলি প্রবাসে
আমার গ্রামের
বাড়ি। সত্যি
তাই, সেখানটায়
আমি বারবার
ফিরে যেতে
চাই!
নাম হিসেবে
মিলান জানি
আমরা যে
শহরকে, তাকে
স্থানীয় ইতালিয়ানরা
অভিহিত করেন
‘মিলানো’
বলে। মিল
থেকে মিলানো!
অন্ত্যমিল! আমার
অভিবাসী জীবনেও
নানা মিল-অমিলের
গোঁজামিলেও কোনো
এক অন্ত্যমিলের
নাম হয়ে
আছে দমিলানোদ।
তাতে যেমন
অসংখ্য মিলমিশ
আছে আবার
অমিলও কম
নেই! তবুও
সব মিলিয়ে
আমার জীবনের
অংক ও
অংক মিলানো
এক জনপদ
‘মিলানো’
থাকে স্মৃতিসত্তা
জুড়ে।
এই স্মৃতি
আলেখ্য পারতপক্ষে
একটা লম্বা-চওড়া
সময় ও
নানা ভূগোল
ছেঁকে বলার
চেষ্টা, দেখা
ও দেখানোর
চেষ্টা। তাতে
ব্যক্তিগত ‘আমি’
পদটি হয়তো
বেশি সরবেই
হাজির নাজির
থেকেছে। খুব
বিতকিচ্ছিরি ঠেকলেও
এই ‘আমি’-কে
পরিহার করতে
পারারও অবকাশ
নেই। কেননা
এই ‘আমি’
যে আমরাই।
আমি প্রমিত
বাংলা কওয়া
শুদ্ধ বাঙালি
না। আমি
বাঙাল। সাকিন
নগরদাইর বিলের
পাড়, যা
প্যাঁক-কাদা-জল
আর জংলা-ঝোপের
ঘেরানের এক
বাঙাল তালুক।
দ্যাশ পূর্ব
বাংলা হয়,
যারে বাংলাদেশ
কয়।
এখানেই ‘মিলান
আমি তোমাকে
ভালোবাসি আবার
ঘৃণাও করি’
বিরচন হইল
সমাপন।
উদ্ধৃতি সূত্র
১. আমিনুল
ইসলাম
২. মহাদেব
সাহা
৩. বঙ্গভূমির
প্রতি, মাইকেল
মধুসূদন দত্ত
৪. শিল্পী
রশিদ চৌধুরী
৫. কবি
ও তিমি,
সেলিম আল
দীন
শফিকুল কবীর চন্দন: ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশী শিল্পী






