ঘডির কাঁটায় তখন সকাল সাড়ে ৯টা ছুঁই ছুঁই। রংপুরের মাহিগঞ্জ বাজারে, সোনালী ব্যাংকের সামনে স্বপন স্টোর। মুদিখানা দোকান। দোকানের মালিক স্বপন রায় চায়ের কাপ পরিষ্কার করছেন। দুটো কাপ। একটা তার জন্য, অন্যটা পেয়ারা স্যারের জন্য। আলহাজ মীর আনিসুল হক পেয়ারা একজন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা। এলাকার মানুষের কাছে তিনি স্যার হিসেবেই পরিচিত। স্বপন রায় চায়ের ব্যবসা করেন না। কিন্তু পেয়ারা স্যারের সঙ্গে দিনে দুবার চা পান করেন। সকাল সাড়ে ৯টা ও বিকাল সাড়ে ৪টা। ইলেকট্রিক পাত্রে ততক্ষণে পানি প্রায় পরিপূর্ণ উষ্ণ। জানতে চাইলাম, পেয়ারা স্যার কখন আসবেন। বললেন, মিনিট দুয়েকের মধ্যে। বললেন, তিনি খুব সময় মেপে চলেন। ঘড়ির কাঁটায় চলে তার জীবন। খুব ছন্দময় তার জীবন। কোনো ছন্দপতন নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো ছন্দপতন নেই। প্রতিদিন আমার দোকানে এক কাপ চা পান করে পাড়ি জমান শহরে। জজ কোর্টের সামনে অধিকার চেম্বারে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আড্ডা দেন। বাসায় ফিরে ইবাদত ও আহার সেরে বিশ্রাম নেন। তবে দিবাঘুমের কোনো অভ্যাস নেই তার। বই পড়েন। পত্রিকার পাতা উল্টান। বিকালে আবার ইবাদত শেষে আমার দোকানে। আবার এককাপ লাল চা। এটা তার প্রায় ১০ বছরের সূচি। খুব ব্যতিক্রম না হলে এতে কোনো পরিবর্তন আসে না।
ততক্ষণে ঘড়িতে সাড়ে ৯টা। রিকশা থেকে নামলেন পেয়ারা স্যার। চেহারায় আলো ঝলমল করছে। গায়ের রঙ টকটকে সাদা। চোখে চশমা, পায়ে জুতো। পাঞ্জাবির ওপর হালকা সোয়েটার পরা। সে পোশাক চকচক করছে। এ বয়সেও সবকিছু ঠিক আছে। শুধু স্মৃতিটা আর আগের মতো নেই। ভালো মনে থাকে না। কখনো কখনো রেগেও জান। আমাকে চিনিয়ে দিলেন স্বপন দাদা। দোকানে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলতে শুরু করলেন তাঁর জীবনের গল্প। বায়ান্নর গল্প। একাত্তরের গল্প।
আলহাজ মীর আনিসুল হক পেয়ারার জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালে তার বয়স ছিল ১৬ বছর। ১৯৪৯ সালে পড়তেন রংপুর জিলা স্কুলে। ভাষা আন্দোলনের জন্য বহিষ্কৃত হন। রংপুর আদর্শ স্কুল থেকে শেষ করেন মাধ্যমিক। ১৯৫২ সালে ছিলেন কারমাইকেল কলেজের ছাত্র। সে সময় চারদিক ছিল থমথমে। স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রদের বের করে এনে মিছিল করতেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন শাহ মো. আব্দুর রাজ্জাক ও মোহাম্মদ আফজাল হোসেন। রংপুরে ভাষা আন্দোলনে আরো অনেকে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কিছু নাম তিনি বলার চেষ্টা করছিলেন। সিদ্দিক হোসেন, ডা. রোকেয়া আলমগীর, বিনয় সেন, মজিবর রহমান মতি, ডা. শোভান খান, ডা. দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক, মকবুল হোসেন, আফান উল্লাহ, ডা. কবির খান বখতিয়ারি, অ্যাডভোকেট গাজী রহমান, কামরান শাহ আবদুল আউয়াল, অধ্যাপক রেজা শাহ তৌফিকুর রহমান, অ্যাডভোকেট আবদুস সালামসহ নাম না জানা আরো অনেকেই সে সময় আমাদের ভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন।
রংপুরে ভাষা আন্দোলন সূচিত হয় ১৯৪৮ সালের মার্চে। ধর্মঘট, সভা, সমাবেশ, মিছিল, পোস্টারিংয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় আন্দোলন। কারমাইকেল কলেজ হয়ে ওঠে এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, সূতিকাগার। ১৯৪৮ সালের মার্চে শুরু করে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুরো সময়ে রংপুরে চলে আন্দোলন। কারমাইকেল কলেজের তত্কালীন অধ্যক্ষ ছিলেন শাহাব উদ্দিন। তিনি ছিলেন উর্দুভাষী। তিনি সার্বক্ষণিক পাইপ টানতেন। রংপুরে ভাষা আন্দোলনের মূল বিরোধিতাকারী ছিলেন শাহাব উদ্দিন। তিনি ছাত্রদের মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে দিতেন না। কোথাও কোনো দেয়াল লিখন কিংবা পোস্টার দেখামাত্র তুলে ফেলার নির্দেশ দিতেন। ১৯৫২ সালে মীর আনিসুল হক পেয়ারাসহ আরো কয়েকজন মিলে রংপুর টাউন হলের পাশে কাদামাটি দিয়ে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ওটা ছিল দক্ষিণমুখী। পরবর্তী সময়ে ওখানে স্থায়ী একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। কথাগুলো বলতে বলতে পেয়ারা স্যার খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। বললেন, আমার সহযোদ্ধারা কেউ আর সক্রিয় নেই। কেবল আমি ছাড়া। কেউ অসুস্থ, আর কেউ গ্রামে চলে গেছে। শুধু আমি এখনো নিজে সামান্য চলতে পারি। আনিসুল হক পেয়ারা একসময় তুখোড় স্কাউট ছিলেন। প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পাওয়া স্কাউট। আফান উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। বর্তমানে সাহিত্য সংগঠন করেন। রাজনীতি করেন। রসিকতাও করতে পারেন এখনো। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, বাড়ি কোথায়? সাতক্ষীরা শুনেই মজা করে বললেন, সাতক্ষীরা থেকে একক্ষীরায়? মাঝখানে ছয়ক্ষীরা নেই? আনিসুল হক পেয়ার এখনো শিশুর মতো সরল। ছোট্ট শিশু অক্ষরের সঙ্গে খেললেন কিছুক্ষণ। খাবার দিলেন। বললেন, আপু নাচো তো। আর তিনি গাইলেন, নাচ ময়ূরী নাচ রে। আনিসুল হক পেয়ারার পাঁচ সন্তান। চার মেয়ে শিক্ষকতা করেন। ছেলেটা ব্যবসায়ী। সরকার ভাতা দেয়। তাতেই তার বেশ চলে। গায়ের জামাটা জন্মদিনে মেয়ে উপহার দিয়েছে।
১৯৫২ সালে আনিসুল হক পেয়ারার নামে গ্রেফতারি পারোয়ানা জারি হয়। সে সময় তিনি পালিয়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধও তার কাছে এক অসামান্য গৌরবগাথা। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ তার ঠিক পথেই চলছে। কথার এক পর্যায়ে সাংবাদিক ইকবাল ভাই ও হাশেম ভাই তাকে মাহিগঞ্জ প্রেস ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ডেকে নিয়ে গেলেন। পেয়ারা স্যার আজো একাই চলতে পারেন। তবে চলার গতি ধীর। উঠেই দেখলেন, রাস্তার মাঝে কিছু ময়লা পড়ে আছে। আনিসুল হক পেয়ারা নিজ হাতে সেই ময়লা পরিষ্কার করলেন। বৃদ্ধ মানুষ। কিন্তু দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, পরিবেশের প্রতি তিনি এখনো দায়িত্বশীল, যত্নশীল। এটাই আনিসুল হক পেয়ারা। এরাই আমাদের ভাষা সৈনিক। এরাই আমাদের মুক্তিযোদ্ধা। যারা আমাদের জন্য ভাষা এনেছেন, স্বাধীনতা এনেছেন। তারা এখনো তাদের দায়িত্বের জায়গায় খুবই স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন।
চলতে চলতে ভাষা সৈনিক আনিসুল হক পেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলাম, তরুণদের কাছে কী চাওয়ার আছে আপনার? বললেন, বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নাও তোমরা। আরো। আরো অনেকটা পথ। এসব ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধাদের দেখানো পথে বাংলাদেশ এগোবে। বাংলা ভাষা এগোবে। শুদ্ধ হবে বাংলা ভাষার পথচলা।
লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর






