ভাষা আন্দোলনে বাগেরহাটের অবদানও কম ছিল না। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে বাগেরহাটের ঐতিহ্য অনুসরণ করে এবারো তারা আরো সংঘবদ্ধ হয়ে নেমে আসে রাস্তায়। তারপর তা হাজারো জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তা শাসকদের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে মিছিল নামে এবং পুলিশের গুলিতে নিহত হন জব্বার, রফিক, সালাম, বরকত প্রমুখ। আহত হন অনেকে। এ ঘটনায় যে ১৭ জন আহত হওয়ার সন্ধান পাওয়া যায়, তার মধ্যে একজন ছিলেন বাগেরহাটের মানুষ। নাম আনোয়ারুল ইসলাম।
২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলিবর্ষণ এবং তাতে ছাত্র-জনতার আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল দেশের ইতিহাসে একটা মাইলফলক। এ দুঃখজনক ঘটনার সংবাদ সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য স্থানের মতো বাগেরহাটের ছাত্রসমাজও এর প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালের এ আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দেন, তাদের কয়েকজন তখনো ছাত্র। কিছু নতুন উদ্যমী ছাত্রনেতাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। তারাই দ্বিতীয় পর্যায়ের এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। এতদিন যেসব ছাত্র উদাসীন বা দোদুল্যচিত্ত ছিল, তারাও এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই (১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে) ভাষার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বাগেরহাটে ছাত্রদের উদ্যোগে একটা কমিটি গঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। এর আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছিলেন যথাক্রমে পিসি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র এএসএম জহুরুল হক ও শেখ আশরাফ হোসেন। কেউ কেউ আবার ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে গঠিত এ কমিটির নাম ছিল ‘কমিটি অব অ্যাকশন’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর উপদেষ্টা ছিলেন পিসি কলেজের তত্কালীন অধ্যাপক মীর মোশারফ আলী ও নারায়ণ চন্দ্র সমদ্দার। সদস্য ছিলেন মনসুর আলী, নূর মোহাম্মদ, আব্দুল খালেক, মারুফুর রহমান, আশরাফ আলী প্রমুখ। অধ্যাপক কালিদাস মুখার্জী, জিতেন্দ্র লাল, জহুরুল হকও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ঢাকায় গুলি চালানোর প্রতিক্রিয়ায় ২২ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মঘট পালিত হয়। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, ছাত্রদের ডাকে শহরের অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ থাকে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয় মিছিল। পিসি কলেজ থেকে যে মিছিল বের হয়, তার নেতৃত্ব দেন মনসুর আহমদ, জহুরুল হক মুনসুর আলী (সাতক্ষীরা) প্রমুখ। এসব মিছিল সারা শহর প্রদক্ষিণ করে জড় হয় কলেজ প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত রাজমোহন ট্যাংকের পাড়ে। ওইদিনের এ স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে যেসব ছাত্রনেতা বক্তৃতা করেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মনসুর আহমদ, জহুরুল হক, মুনসুর আলী (পরে মন্ত্রী) প্রমুখ। ঢাকার এ হত্যাকাণ্ডের প্রভাব ছিল বহুবিস্তৃত। শুধু মফস্বলের জেলা বা মহকুমা শহরই নয়, তা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক অবস্থান, শ্রেণী নির্বিশেষে কীভাবে তা সাধারণ মানুষকে আন্দোলিত করে, বাগেরহাট মহকুমার অন্তর্গত মোড়েলগঞ্জের একটা ঘটনা তার প্রমাণ। এখানকার কৃষকরা ঢাকার গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ধর্মঘট করেন। এটা ছিল একটা ব্যতিক্রমী সংবাদ। তখন মোড়েলগঞ্জ ছিল একটা দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা। সেখানে তখন সরকারি উদ্যোগে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির অধীনে ‘টেস্ট রিলিফ’-এর মাধ্যমে সামান্য মজুরিতে দরিদ্রদের জন্য মাটি কাটার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে অংশ নেয়া লোকেরা ছিল স্থানীয় হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ এবং তাতে ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে তারা মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দেন এবং ধর্মঘট পালন করেন, যেটা ছিল একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। এ মাটি কাটার কাজ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কিউকিউএম জহুর (কাসেদ আলী)। বিষয়টি পাঠকের উপলব্ধির জন্য তার রিপোর্টটির অংশবিশেষ নিচে উদ্ধৃত হলো:
পরদিন (২২ ফেব্রুয়ারি— লেখক) অথবা দু-একদিন পর আট মাইল দূরে এক গণ্ডগ্রামে টেস্ট রিলিফের কাজ তদারক করতে গেলাম। কাজকর্মে কেউ নেই। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, মহাদুর্ভিক্ষ পীড়িত অশিক্ষিত কাঙালরা বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহীদদের মর্মবেদনায় হরতাল পালন করছেন। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পরও জানতে পারলাম না, কে বা কারা এ হরতালের ডাক দিয়েছেন। রেডিও মারফত খবরটা গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়বে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু অজপাড়াগাঁয়ে ছয় কি আট আনা পয়সা পাওয়া রিলিফের খাল কাটা, কোদাল মারা, কোনোমতে দিন গুজরানকারী ক্ষেতমজুর, গরিব কৃষক ঢাকার শহীদানের জন্য হরতাল পালন করবেন, তাতে খুব বিস্মিত হলাম। অচেতনমনে কিছুটা চেতনা সঞ্চারিত হলো। মনটাও ক্ষুব্ধ হলো।
ঢাকায় গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটে ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এখানেও এ উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালানো হতে থাকে। এ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়ে ছাত্রদের উদ্যোগে শহরে পোস্টারিং করা হয়। এ পোস্টারিংয়ের কাজে যারা অংশ নেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বাগেরহাট স্কুলের তত্কালীন ছাত্র সোহরাব হোসেন (পরে এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক)। এগুলোই ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাগেরহাটের মাটিতে প্রথম প্রকাশ্য সরকারবিরোধী দেয়ালপত্র। এ সময় এ আন্দোলনের খরচ নির্বাহের জন্য জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়। ছাত্রদের উদ্যোগে কৌটায় করে চাঁদা তোলা হতে থাকে। জনগণও তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিতে এগিয়ে আসে। বলা হয়, এ চাঁদা তোলার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন কাড়াপাড়া নিবাসী আব্দুল আজিজ (১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত)। এ সাড়া ছিল সত্যিই অভূতপূর্ব। মফস্বল শহরে ভাষা আন্দোলন যে এত দ্রুত এত ব্যাপক সাড়া সৃষ্টিতে সমর্থ হবে, তা কল্পনাই করা যায়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রদের দ্বারা সূচিত হলেও এবং তাদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকলেও তা দ্রুত বৃহৎ পরিধিতে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। এর প্রভাব এত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার কারণ তাত্পর্যপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবিতে শুরু হলেও তার শিকড় ছিল অনেক গভীরে। সে সময়কার আর্থসামাজিক অবস্থাই ছিল এ আন্দোলনের ব্যাপকতা অর্জনের প্রধান ভিত্তি। জনগণ একে তাদের ওপর মুসলিম লীগ সরকারের নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখতে থাকে। তাই ভাষার দাবি নিয়ে ছাত্রদের দ্বারা শুরু হলেও দ্রুত সাধারণ জনগণ তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ভাষা আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সব দল-মতের মানুষের একত্র হওয়া। এমন কোনো রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পেশাজীবী গোষ্ঠী ছিল না, যারা এ আন্দোলনের মহাতীর্থে এসে মিলিত হয়নি। যুবলীগ, গণআজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, আওয়ামী মুসলিম লীগ, জাতীয় কংগ্রেস, তপসিলি সম্প্রদায়, গণতন্ত্রী পার্টি, নেজামে ইসলামী, খেলাফতে রব্বানী পার্টি প্রভৃতি দল ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। বাগেরহাটেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এর মধ্যে যুবলীগের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এর যে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়, তার একজন ছিলেন বাগেরহাটের শেখ আব্দুল আজিজ। ১৯৫০ সালের শেষের দিকে বাগেরহাটে এর শাখা স্থাপিত হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক। এ দলের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনরত ছাত্রদের প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতে থাকেন।
২৩ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট সফল করার ব্যাপারে ছাত্ররা ছিল সংকল্পবদ্ধ। আগেই বলেছি, বাগেরহাটে তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। একটি কলেজ এবং মাত্র দু-তিনটি স্কুলই ছিল ভরসা। তাতে ছাত্রও খুব বেশি ছিল না। তাছাড়া নানাবিধ কারণে ওই সময় সব ছাত্রকে মিছিলে নামানোও ছিল একটা কঠিন ব্যাপার। অনেক ছাত্র ছিল দোদুল্যচিত্ত, যারা তখন এসব আন্দোলন, মিছিল-মিটিং এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট থাকত। এ কারণে ২৩ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট সফল করার জন্য এখানকার ছাত্রনেতারা বাইরে থেকে ছাত্র আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ সময় বাগেরহাট মহকুমায় দুটি বড় স্কুল ছিল— বাহিরদিয়ার রাংদিয়া স্কুল ও গোয়ালমাঠ স্কুল। এ দুই স্কুলে তখন ছাত্রসংখ্যাও ছিল প্রচুর। এ দুই স্কুল থেকে ছাত্র আনার জন্য পাঠানো হয় সোহরাব হোসেন ও যুবলীগের আব্দুল খালেককে। গোয়ালমাঠ স্কুলে যান সোহরাব হোসেন। তিনি তখন ছিলেন বাগেরহাট স্কুলের ছাত্র। রেললাইনের পাশে অবস্থিত সাহেব আলী নামে এক আত্মীয়র বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছিলেন। তিনি ছাত্রনেতাদের কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে গোয়ালমাঠ স্কুলে যান এবং ছাত্রদের দেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে, বুঝিয়ে তাদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। এখনকার মতো তখন বাস যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। ঘটনার দিন তারা শহরে আসে দু-তিন মাইল পথ হেঁটে। একে একটা অসাধারণ ঘটনাই বলতে হবে। এতে সোহরাব হোসেনকে সহায়তা করেন কাজী মশিউর রহমান (পরে এনএসআইয়ের ডিজি)। যুবলীগ নেতা খালেককে পাঠানো হয় রাংদিয়ায়। তিনি ছাত্র নিয়ে আসেন ট্রেনে করে। এতে শহরে ওইদিনই ধর্মঘটে অংশ নেয়া ছাত্রের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এটা ছিল একটা প্রায় বিরল ঘটনা। কারণ বাইরে থেকে ছাত্র এনে আর কোথাও ধর্মঘট করার কথা শোনা যায় না। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, এর উদ্যোক্তারা এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কতখানি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, বাধাবিঘ্ন অতিক্রমে ছিলেন কতখানি নিঃশঙ্কচিত্ত।
২৩ তারিখের ধর্মঘট বাগেরহাটে সফলভাবে পালিত হয়। বিশাল মিছিল নিয়ে ছাত্ররা সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। এতে প্রধান ভূমিকা পালন করে পিসি কলেজের ছাত্ররা। ওইদিন কলেজ থেকে ছাত্রদের মিছিল নিয়ে বেরোনোর সময় এমন একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে, যা আজো ইতিহাস হয়ে আছে। ওই সময় পিসি কলেজ ছাত্র মংসদের সম্পাদক ছিলেন এজেডএম দেলোয়ার হোসেন (পরে খুলনার লব্ধ-প্রতিষ্ঠ আইনজীবী, ল’ কলেজের অধ্যক্ষ)। ভিপি ছিলেন অনন্ত কুমার বিশ্বাস (চিতলমারী)। সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সৈয়দ রওনক আলী (হারু মিয়া), ইব্রাহিম হোসেন লাল প্রমুখ। ছাত্রদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তারা বড় ভূমিকা পালন করেন। ওইদিন (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ধর্মঘট সফল করার উদ্দেশ্যে ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে মিছিল নিয়ে বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে এ ঘটনা ঘটে। তখন এ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ মণিকান্ত গাঙ্গুলী। শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কালিদাস মুখার্জী, মীর মোশারফ আলী, নারায়ণ চন্দ্র সমদ্দার, জিতেন্দ্রলাল বিষ্ণু, নুরুল হক, এ রাজ্জাক, ইসমাইল হোসেন প্রমুখ। শিক্ষকদের প্রায় সবাই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে। তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ উদ্দেশ্যে ছাত্রদের সহায়তা করে আসছিলেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জিএল বিষ্ণু, মীর মোশারফ আলী। আরো একজন প্রত্যক্ষ উৎসাহদাতা ছিলেন ‘কেএম’ বলে খ্যাত বাংলা বিভাগের বিখ্যাত অধ্যাপক কালিদাস মুখার্জী। তবে অধ্যক্ষ মণিকান্ত গাঙ্গুুলীর অবস্থান ছিল ঠিক এর বিপরীত। তিনি ছিলেন ধর্মঘটের বিপক্ষে। এটা ছিল তার নীতিবোধপ্রসূত বিশ্বাস। তিনি অবশ্য বাংলা ভাষার বিপক্ষে ছিলেন না। তবে তিনি সম্ভবত চাননি পড়াশোনা রেখে ছাত্ররা প্রত্যক্ষভাবে সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হোক। এতে ধর্মঘটমুখী ছাদ্রদের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা এ ধর্মঘট সফল করে তোলার প্রস্তুতি নেয় এবং ক্লাস বর্জন করে মিছিল নিয়ে বেরোনোর উদ্দেশ্যে বিষ্ণুপদ বিল্ডিংয়ের সামনের প্রাঙ্গণ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মূর্তির পাদদেশে জড় হয়। তখন ছাত্র সংসদের নেতারা ছাড়াও সদ্য পাস করা ছাত্রদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মনসুর আহমদ, আব্দুল খালেক, জহুরুল হক, আশরাফ হোসেন প্রমুখ। ওইদিন অন্যান্য শিক্ষক ছাত্রদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্লাস নেয়া থেকে বিরত থাকলেও অধ্যক্ষ মণিকান্ত গাঙ্গুলী নিজেই ক্লাস নেয়ার জন্য অফিস পিয়ন পঞ্চাননকে ডেকে হাজিরা খাতা আনিয়ে অবরোধ সৃষ্টিকারী ছাত্রদের অতিক্রম করে মূর্তির সামনে গেট দিয়ে কলেজ অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় সচেষ্ট হন। মণিকান্ত গাঙ্গুলী ছিলেন অত্যন্ত রাশভারি মেজাজের মানুষ। পাণ্ডিত্যে, ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তার অনমনীয় ব্যক্তিত্বের সামনে অন্য সময় অন্য কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, কারো মাথা তোলারই সাহস ছিল না। তবে সেদিন এর ব্যতিক্রম ঘটে যায়। অবরোধ সৃষ্টি করে বসে থাকা ছাত্ররা তার পথ আটকে দেয়। তিনি অনমনীয়, ক্লাসে যাবেনই। ছাত্ররা যেতে দেবে না। শুরু হয়ে যায় বিশৃঙ্খলা। মণিকান্ত গাঙ্গুলী তখন অবরোধ সৃষ্টিকারী ছাত্রনেতাদের নাম ধরে ডেকে ডেকে তীব্র ভর্ত্সনা করতে থাকেন। তবে ছাত্ররা তাতে বিচলিত না হয়ে নিজেদের সংকল্পে অটল থাকে। বচসার এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে মণিকান্ত গাঙ্গুলী অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে যান। তখন তাকে ধরাধরি করে অধ্যক্ষের কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা ছিল ওই সময়কার একটা বহুল আলোচিত ঘটনা; প্রবীণ সংশ্লিষ্টরা এখনো যা স্মরণ করে আপ্লুত হন। পরে ছাত্ররা গেটে একটা কালো ফিতা বেঁধে দিয়ে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে যায়। আগেই বলেছি, এদিনের এ ধর্মঘট সফল করায় ছাত্ররা ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সব ছাত্র মিলে ওইদিন মিছিল করে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। তখন মাইক এলেও তার প্রচলন ছিল খুবই কম। মাইকের বিকল্প ছিল টিনের চোঙা। তা নিয়ে ছাত্রনেতারা আগে এবং পেছনে পতাকা-ফেস্টুন হাতে ছাত্রদের দীর্ঘ মিছিল। সবার মুখে এক দাবি, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’
ওইদিন সন্ধ্যায় বাগেরহাট শহরের এসি ল’ টাউন হলে এক সভার আয়োজন করা হয়। আগে থেকেই এ সভার বিষয়ে প্রচারকার্য চালানো হয়। সমাবেশে অভূতপূর্ব জনসমাবেশ ঘটে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অডিটোরিয়াম ভরে যায়। প্রত্যাশার চেয়ে জনতার উপস্থিতি অত্যধিক হওয়ায় সভা পার্শ্ববর্তী মাঠে (বর্তমানে স্বাধীনতা উদ্যান) স্থানান্তর করতে হয়। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতারা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। এতে বক্তৃতা করেন মনসুর আহমদ, আশরাফ হোসেন, মারুফুল হক, আমজাদ আলী গোরাই, সৈয়দ রওনক আলী হারু মিয়া, জহুরুল হক, আব্দুল খালেক, নজিবুর রহমান, ইজাবুল হক, আব্দুস সাত্তার খান প্রমুখ। এ সমাবেশে পরবর্তীতে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ শেখ আব্দুল আজিজ ও মোস্তাগাওছল হকও বক্তৃতা করেন বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।
কেন্দ্র থেকে নির্দেশ আসার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর যুগ্ম আহ্বায়ক হন ছাত্রনেতা মনসুর আহমদ ও আব্দুল খালেক। সদস্য করা হয় মুনসুর আলী (সাতক্ষীরা, পরে মন্ত্রী), মারুফুল হক প্রমুখকে। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে আন্দোলনে বিশেষ গতি আসে। ছাত্রদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, এভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারলে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে অসুবিধা হবে না।
আর এ আন্দোলনে দেশের সমগ্র ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ। তখন বাগেরহাটের ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে মহকুমার বিভিন্ন স্কুলে আন্দোলন পৌঁছে দেয়া এবং সেখানে মিছিল-মিটিং করানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছাত্রনেতারা নিজেরা গ্রামাঞ্চলে যেতে থাকেন বা তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে থাকেন। এতে আন্দোলন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সর্বস্তরের জনগণ এ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। মোড়েলগঞ্জ, মোল্লারহাট, মুলঘর, চিতলমারী, দৈবজ্ঞহাটি, চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর, কান্দাপাড়া, যাত্রাপুর, ফয়লা, গিলাতালা প্রভৃতি স্থানে বড় বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব জনসভায় বাগেরহাটের ছাত্রনেতারা বক্তৃতা করেন। সেসব জনসভায় ঢাকায় আহত ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য চাঁদা তোলা হয়। এক সভায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আহতদের জন্য সাহায্যের আবেদন জানানো হয় এবং তাত্ক্ষণিকভাবে সভাস্থল থেকে ১০৫ টাকা সংগৃহীত হয়। পরে এসব টাকা ঢাকায় পাঠানো হয়। এভাবে গ্রামের স্কুলে স্কুলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল হতে থাকে। ছাত্ররা কালো ব্যাজ ধারণ করতে থাকে। সর্বত্র স্লোগান ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
এ আন্দোলনে শুধু ছাত্ররাই নয়, এখানকার সর্বস্তরের জনতাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যে কথা আগেই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে কয়েকজন ব্যক্তির কথা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। যেমন আমজাদ আলী গোরাই, হাবিবুর রহমান ও আব্দুল গনি সরদার। তখন আমজাদ আলী গোরাই ছিলেন সদ্য রাজনীতিতে যোগ দেয়া একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। আগে থেকেই তিনি এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটা চাকরিও করতেন। ভাষা আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠলে তিনি স্বেচ্ছায় ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যান। এক্ষেত্রে আরেকজন ভাষা সৈনিকের নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি হলেন শহীদ হাবিবুর রহমান। তার বাড়ি ছিল বাগেরহাট জেলার সদর থানার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামে। তার কর্মজীবনের সূচনা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে সিভিল সাপ্লাই বোর্ডের অফিসার ও আনসার অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ঝিনাইদহ শহরে বসবাস করছিলেন। ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। ওই সময় তিনি আজাদ পত্রিকার সংবাদদাতা ছিলেন। এ পত্রিকায় ভাষা আন্দোলনের খবর পাঠানোর সূত্রে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বেশ অনেক দিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার জন্য তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসরদের হাতে নিহত হন। এক্ষেত্রে বাগেরহাটের খারদার নিবাসী আব্দুল গণি সরদারের নামও স্মরণে রাখতে হবে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনিও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে যে তিনজন ব্যক্তিকে বাগেরহাটে ভাষা সৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে থাকে, তিনি তাদের একজন।
২৩ ও ২৪ তারিখের মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যদিয়ে এ বিষয়ে সক্রিয়তা থেমে যায়নি। এর পরও তা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কাজী নূরুল ইসলাম খুলনায় আসেন। তিনি ছিলেন খুলনার মুজগুন্নীর কাজী বাড়ির সন্তান। তার আগমনে খুলনার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নতুন গতি পায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি খুলনার গান্ধী পার্কে এক বড় সভা হয়, যার প্রধান বক্তা ছিলেন নুরুল ইসলাম। তিনি এ সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি তার নিজের দেখা ঢাকায় গুলিবর্ষণের মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেন। ১৯৫২ সালের ৮ মার্চ প্রকাশিত কলকাতার সত্যযুগ পত্রিকায় এ সভার বিস্তৃত বিবরণ ছাপা হয়। এ আন্দোলনে গতি আনার জন্য ২ মার্চ তিনি বাগেরহাটে আসেন। পিসি কলেজ ছাত্র সংসদের উদ্যোগে কলেজ মাঠে এক সভা হয়। এ সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন নূরুল ইসলাম। এ সভার বিষয়ে আগেই প্রচার চালানো হয়েছিল। এ কারণে ছাত্র-অছাত্র মিলে বহু মানুষ এ সভায় ভিড় জমায়। উদ্দেশ্য ঢাকা প্রত্যাগত সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি নুরুল ইসলামের বক্তৃতা শোনা। খুলনার মতো তিনি বাগেরহাটেও সমবেত ছাত্র-জনতার সামনে ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায় ব্যাখ্যা করেন এবং ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণের করুণ ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরেন। ঢাকা থেকে প্রেরিত হয়ে কাজী আজহার আলীও ফকিরহাট ও বাগেরহাটের এ আন্দোলন তত্পরতায় অংশ নিচ্ছিলেন। তাদের চেষ্টায় খুলনার মতো বাগেরহাটের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হতে থাকে। (পুনর্মুদ্রণ)
লেখক: অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ






