পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যে ব্লাড ক্যান্সারের রোগী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হলেন লিয়াকত আলী খান। শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে লাহোরে এক জনসভায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন লিয়াকত আলী খান। গভর্নর জেনারেল পদ খালি হলে সেই খালি পদে নিয়োগ পেলেন পূর্ব বাংলার তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। কিছুদিন পর খাজা নাজিমুদ্দিন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনকে যারা এ পদে বসিয়েছিলেন তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল খাজা নাজিমুদ্দিনের মাধ্যমে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৮ সালে ১৫ মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির মূল কথা ছিল— পূর্ব বাংলার অফিস-আদালত, শিক্ষা কারিকুলামসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু করা হবে। নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভুলে গেলেন তার স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চলছিল। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় এলেন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। মুসলিম লীগের উদ্যোগে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। এই জনসভায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো ঘোষণা করলেন— উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী দ্রোহী ছাত্রসমাজ বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়। সর্বত্র একই উচ্চারণ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। সারা ঢাকা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। দেয়াল লিখন পোস্টার লাগানো শুরু হলো। এরই মধ্যে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা বার লাইব্রেরিতে রাজনৈতিক নেতাদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান। এ সভায় মওলানা ভাসানীকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ কমিটিতে সদস্য হলেন আবুল হাসিম, আতাউর রহমান খান, অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, খয়বাত হোসেন, মীর্জা গোলাম হাফিজ, শওকত আলী, মো. তোহা, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন ও গাজী উল হক। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। ১৯৪৮ সালের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নিন্দা জানিয়ে সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রদান করেন মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য নেতা। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি যৌথভাবে কাজ করে যাওয়ার ঘোষণা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি দুই কমিটি যৌথভাবে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হতে থাকে। দুপুরে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা শুরু হয়। সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির নেতারা বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের একটি অংশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এ সময় আব্দুল মতিন বক্তব্য দিতে গিয়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতার কাছে জানতে চান ১৪৪ ধারা ভঙ্গে তাদের মতামত উপস্থিত অধিকাংশ ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মত প্রকাশ করেন। এ সময় আমতলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই গগনভেদি স্লোগানে ছাত্র-জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে দশজন-দশজন করে ভাগ হয়ে মিছিল এগোতে থাকে। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলতে থাকে। বিকালবেলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে পুলিশের গুলিতে বরকত, সালাম, জব্বার শহীদ হন। এ ঘটনায় ঢাকার মানুষ প্রতিবাদ করে। ২১ ফেব্রুয়ারির আগে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মৌলভীবাজারের কয়েকজন ছাত্র ও একজন ছাত্রী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এরা হলেন— মোহাম্মদ ইলিয়াস, এসএম আলী, রওশন আরা বাচ্চু, এম সাইফুর রহমান, মোহাম্মদ ইলিয়াস, এরা তত্কালীন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমান, শহিদুল্লাহ কায়সার, মোহাম্মদ সুলতান এরা একসঙ্গে মিলে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন। এসএম আলী কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের নেতা হিসেবে ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। মেয়েদের মধ্যে রওশন আরা বাচ্চু মৌলভীবাজার জেলার একমাত্র প্রতিনিধি। তিনি ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলনে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির প্রতিটি গোপন বৈঠকে উপস্থিত থেকে আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণে অবদান রেখেছিলেন। ২১ তারিখে পুলিশের লাঠিচার্জে তিনিও আহত হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এই ভাষাসৈনিক ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের গোটা ইতিহাস ৮৪ বছর বয়সে এখনো অনর্গল বলে যান। মৌলভীবাজার জেলার আরো একজন বিখ্যাত নাগরিক এম সাইফুর রহমান। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এসএম হলে আবাসিক ছাত্র ছিলেন। এসএম হলের বেশির ভাগ ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এ কারণে পুলিশ নজরদারি ছিল এসএম হলের দিকে। এ সময় পুলিশ ইপিআর অতর্কিতে হলে তল্লাশি চালানোর সময় হলের অন্য ছাত্রদের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। প্রায় দুই মাস কারাবরণ করে জামিনে মুক্তি পান। এ তথ্যের বাইরে ঢাকায় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে মৌলভীবাজার জেলার নাগরিকদের অংশগ্রহণের তেমন তথ্য জানা যায় না।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি করে ছাত্র হত্যা ঘটনাবলি তত্কালীন জেলার মহকুমার আকাশ বাণী কলকাতার সংবাদে পৌঁছে যায়। এ সময় দৈনিক পত্রিকা ঢাকার বাইরে একদিন পর পৌঁছাত। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মৌলভীবাজার মহকুমা সদর ও কুলাউড়া উপজেলায় ঢাকায় গুলির খবর পৌঁছলে স্থানীয় বিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল-সমাবেশ করেন। তখনো মৌলভীবাজার মহকুমায় কোনো কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়নি। যার ফলে এখানকার ভাষা আন্দোলন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কাশীনাথ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময় মৌলভীবাজারের ছাত্রদের মধ্যে কেউ সিলেট ও অন্যান্য জায়গায় লেখাপড়া করতেন। তারাও মৌলভাবাজার এসে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ সময় মৌলভীবাজার সদরে মুসলিম ক্ষমতার দাপট ছিল সীমাহীন। এ অবস্থার মধ্যে কয়েকজন সাহস করে শোভাযাত্রা বের করলে এতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করেন। এতে নেতৃত্ব দেন সাজ্জাদুর রহমান পুতুল, সৈয়দ আহমদ মাহমুদ, মাহমুদ আল চৌধুরী, কুতুবউদ্দিন, মকসুদবখত, আব্দুল বারী, মো. জাকর, সমসের মিয়া। এসব ছাত্র তরুণরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ২৫ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার শিশুপার্কে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য মৌলভীবাজার মহকুমা বারের প্রখ্যাত উকিল আব্দুল আজিজ। সভায় ব্যাপকসংখ্যক ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে সভার উদ্যোক্তরা বক্তব্য রাখেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি এ সভায় গৃহীত প্রস্তাবাবলি ছিল নিম্নরূপ—

১. ঢাকার রাষ্ট্রভাষা দিবসে ছাত্রদের ওপর ফ্যাসিস্ট নূরুল আমিন সরকারের পুলিশ ও মিলিটারি গুলি চালনা করে নিরীহ ছাত্রদের হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার জন্য এই সভা সংকল্প করছে।

২. যে উদ্দেশ্যে ঢাকায় নিরীহ ছাত্র ও জনসাধারণ শহীদ হয়েছেন, তা সফল করার নিমিত্ত ছাত্র ও জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য এ সভা সংকল্প করছে।

৩. এ সভা খুনি নূরুল আমিন সরকার ও নাজিমুদ্দিন সরকারের ওপর গভীর অনাস্থা প্রকাশ করে তাদের পদত্যাগ দাবি করছে। 

৪. ঢাকার এই অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের পরও যেসব এমএলএ এখনো আইন পরিষদের সদস্যপদ আঁকড়ে ধরে আছেন, এ সভা তাদের পদত্যাগ দাবি করছে। মুসলিম লীগ ও পরিষদ পদত্যাগকারীদের মোবারক জানাচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেসব সংবাদপত্র মুসলিম লীগ সরকারের মিথ্যা বিবৃতি প্রকাশ করে ভাষা আন্দোলন নিয়ে মিথ্যা ও বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করেছে, এসব গণবিরোধী সংবাদপত্র বর্জনের দাবি জানায়।

এ সভার পর ছাত্র-তরুণরা মহকুমার বিভিন্ন স্থানে আরো কয়েকটি সভা ও মিছিল করে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তত্কালীন সময়ে মৌলভীবাজারের দুজন বিশিষ্ট লোকসাহিত্যিক মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন ও চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ সিলেটের আল-ইসলাহসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন।

মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে সবচেয়ে রাজনীতিসচেতন এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল কুলাউড়া। ১৯৪৭ পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন কুলাউড়া ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। কুলাউড়ার গণমানুষের নেতা ছিলেন সৈয়দ আকমল হোসেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিক ও পঞ্চাশের প্রথম দিকে কুলাউড়ার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া তত্কালীন কুলাউড়া রাজনীতিতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম ছিল বিজন বিহারী পুরকায়স্থ, আব্দুস ছালাম, সৈয়দ ছয়ফুল হোসেন। এদের প্রত্যেকের মধ্যে ছিল দুর্বার বিল্পবী প্রবণতা আর ছিল শ্রেণী সংগ্রামের উন্নত মানের নৈতিকতা। এদের মধ্যে প্রাণপুরুষ ছিলেন সৈয়দ আকমল হোসেন। ঢাকায় গুলিতে ছাত্র নিহতের ঘটনার খবর আসে কুলাউড়ায়। তাত্ক্ষণিকভাবে সৈয়দ আকমল হোসেন কুলাউড়ার সব বিদ্যালয়ে খবর পাঠান পরদিন ধর্মঘট পালনের জন্য। কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে পরদিন রেল ধর্মঘট ব্যবস্থা করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি কুলাউড়ায় রেল ধর্মঘট পালিত হয়। কুলাউড়া ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় রেল ধর্মঘট পালনের খবর জানা যায়নি। ওইদিন কুলাউড়া নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, পৃথিমপাশা, আলী আমজাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। আলী আমজাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা রবিরবাজার ঘুরে বিদ্যালয়ের সম্মুখে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে এতে সভাপতিত্ব করেন নবম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল মালিক। সভায় বক্তব্য রাখেন নৃপেন্দ্র দেব, দেলওয়ার হোসেন, তজ্জমুল আলী চৌধুরী, মহিউদ্দিন। এ সভা চলাকালে গণতন্ত্রী পার্টির নেতা সৈয়দ ছয়কুল হোসেন সমর্থন জানান। কুলাউড়া শহরে প্রতিবাদী মিছিল বের হয়। কুলাউড়ার ভাষা আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিজন বিহারী পুরকায়স্থ, আব্দুস সালাম, সৈয়দ ছয়কুল হোসেন, হোসেন আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ বশির আলী, তাহের আলম, আব্দুল মতি, আবু তাহের মাস্টার শিক্ষকতায় পেশায় জড়িত থাকায় গোপনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। মৌলভীবাজার জেলার শমসের নগরে প্রতিবাদ সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মফিজ আলী, সৈয়দ মতিউর রহমান। তাছাড়া শমসের নগরের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন সবরউদ্দিন, এমএ গফুর, মেরাজ মিয়া, মোশারফ আলী, ভাষানি নামের দর্জি, গোলাম মোস্তফা, হীরেন্দ্র চৌধুরী। শমসের নগরের মফিজ আলী ও রাজনগরের তারা মিয়া সিলেট শহরের ভাষা আন্দোলনে অন্যতম সংগঠক ছিলেন। মফিজ আলী ও সৈয়দ মতিউর রহমান সিলেটের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা পীর হাবিবুর রহমান, সুনামগঞ্জের মাহমুদ আলী সিলেট থেকে প্রকাশ করতেন নওবেলাল পত্রিকা। এ পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনতা সমর্থন তৈরি করে। কমলগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজার আদমপুরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে মিছিল করে। তত্কালীন মৌলভীবাজার মহকুমার প্রতিটি থানায় বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় কী ঘটেছিল তার বিবরণ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি থানার ছাত্র-জনতা স্থানীয়ভাবে ভাষা আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। মহকুমা সদর থেকে সবচেয়ে দূরের থানা বড়লেখা। মহকুমা ও জেলার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। বড়লেখায় ঢাকার ছাত্র নিহত হওয়ার খবর পৌঁছার পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা সভা-সমাবেশ-মিছিল করে নূরুল আমিন সরকারের পুলিশ ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদ জানায়। বড়লেখায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবিএ ওয়াহিদ ও মদারিছ আলী। শ্রীমঙ্গল থানায় ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে মুসলিম লীগের প্রচণ্ড দাপটের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোয় যোগাযোগ করে শ্রীমঙ্গল ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করেন তত্কালীন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত সূর্যমনি দেব। সূর্যমনি দেব ভাষা আন্দোলনে সপক্ষে একটি জনসভার সিদ্ধান্ত নিয়ে তত্কালীন শ্রীমঙ্গলের মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা মো. ইসরাইলকে বুঝিয়ে সভায় সভাপতিত্ব করতে রাজি করান। সভা আয়োজনে সহযোগিতা করেন ক্ষিরোদ দেব চৌধুরী। এ সভাটি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পাশের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগ নেতা মো. ইসরাইলের সভাপতিত্বে এ সভায় বিদ্যালয়ের ছাত্ররা বক্তব্য রাখেন। মূল আলোচক ছিলেন সূর্যমনি দেব। কমলগঞ্জের মুন্সীবাজারে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু থেকে মাতৃভাষার পক্ষে জ্ঞানগর্ভ বেশকিছু প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে স্থানীয় আলেম সমাজকে নিয়ে মুন্সিবাজারে একটি প্রতিবাদ সভা করেন। এছাড়া মহকুমার মফস্বল এলাকায় সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনে মৌলভীবাজার মহকুমাবাসীর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখক: লোকগবেষক