ভাষা আন্দোলনে ফরিদপুরের ইতিহাস ও ভাষা সংগ্রামীদের অবদানের কথা আলোচনা করা খুবই কষ্টকর। কারণ উপযুক্ত ও সঠিক তথ্য পাওয়া এখন মুশকিল। যা পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই পরে লেখা স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রভৃতি। এসব লেখায় লেখকরা নানাভাবে তাদের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। একজনের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যজনের দেয়া তথ্যের বিভ্রান্তি থাকে। স্থানীয়ভাবে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের দেয়া তথ্যও সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়েছে। কারণ নিজেদের বক্তব্যের প্রামাণ্যতা যাচাইয়ের সময়ে তারা অজ্ঞাতেই তাদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন। ফলে ভাষা আন্দোলনে স্থানীয় ইতিহাসে বিভ্রান্তির তথ্য এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনের মুখ্য নেতৃত্বে ছাত্ররাই ছিলেন। ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া সব বিক্ষোভের অগ্রভাগে ছাত্রই থাকতেন। সাধারণ জনতা পরে মিছিলে-মিটিংয়ে যোগ দিত। শেখ মুজিবের ছত্রচ্ছায়ায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ব্যানারে জাতীয় রাজনৈতিক তত্পরতা ছাত্ররাই চালাতেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ফরিদপুর জেলা শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের মাধ্যমে ইমামউদ্দিন আহমাদ ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার নেতৃত্বে শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, পরে ১৯৬৯ ও ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্বও তিনি পালন করেন। নিখিলবঙ্গ ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা সদর মহকুমার ছাত্র রাজনীতিতে যারা নেতৃত্ব দিতেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন আবদুল হামিদ চৌধুরী (কৃষ্ণপুর), কাজী রোকন উদ্দিন আহমদ (কাউলিবেড়া, ভাংগা), মোশাররফ হোসেন চৌধুরী (ফুলসূতী), ড. গোলাম মওলা ও খন্দকার আবদুল হামিদ (মাদারীপুর মহকুমা), শেখ মুজিবুর রহমান ও মোল্লা জালাল উদ্দিন (গোপালগঞ্জ)।
তখন মফস্বলের মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাষা আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এ কথা সত্য, কিন্তু এর উপযুক্ত বিবরণ পাওয়া মুশকিল। ঢাকার মতো মফস্বলের আন্দোলন পত্রপত্রিকায় প্রকাশে স্থান পায়নি। তবুও বিভিন্ন সংবাদপত্রে ভাষা আন্দোলনের যে সংবাদ ছড়িয়ে রয়েছে, তা একেবারে কম নয়। গ্রামেগঞ্জে এখনো অনেকে বেঁচে আছেন, যারা স্মৃতিচারণ করতে পারেন। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর, চাঁদপুর, ফেনী, কুমিল্লায় ঢাকার মতো বিক্ষোভের সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। ঢাকার বাইরে অনেক স্থানে ছাত্র ছাড়াও সাধারণ মানুষ ভাষা আন্দোলনের বিক্ষোভে মিছিলে মিটিংয়ে অংশ নিয়েছে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইলে ভাষা বিতর্কের শুরু হলে ফরিদপুরের জনগণ আন্দোলনের প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে মূলত ছাত্ররাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত মুসলিম ছাত্রলীগ ও সংগ্রাম পরিষদের জেলা কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হন আসাম রেফারেন্ডামে যোগদানকারী রাজেন্দ্র কলেজের আইএ প্রথম বর্ষের ছাত্র মহিউদ্দিন আহমদ। পরবর্তীতে বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন নিয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন আহ্বায়ক মনোনীত হন। এছাড়া ছাত্র আন্দোলনে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ফরিদপুরে যেসব ছাত্রনেতা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন লিয়াকত হোসেন, ইমামউদ্দিন আহমাদ, মুনওয়ার হোসেন, শেখ মহিউদ্দিন (মোহন মাস্টার), এমএ লতিফ, মোল্লা জালাল, এজাহারুল হক সূর্য মিয়া, খন্দকার আবুল হাশেম, বাবলু চৌধুরী, মাহবুব আলী, আবদুল হালিম, আবদুল বারী, অহিদুল হক রাজা মিয়া, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবুল খায়ের চৌধুরী, খলিলুর রহমান ঠাকুর, রওশন জামাল খান, আবদুস শুকুর শুকপাক, আনিসুর রহমান, ফজলুর রহমান সিদ্দিকী, রেজাউল করিম রাশেদ, সিরাজ সরদার, ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী, মো. আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী প্রমুখ।
বাংলা পৃথিবীর এমন একটি ভাষা, যার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম। আমরা সেই রাষ্ট্রের অধিবাসী। পৃথিবীর সব দেশের মতো আমাদের ছাত্রসমাজ আন্দোলনে বিশ্বাসী। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনে সদা সোচ্চার। এ উপমহাদেশের বিপ্লবে-বিবর্তনে ছাত্রসমাজের অবদান-আত্মাহুতি উল্লেখযোগ্য। ভারতবর্ষের ছাত্র আন্দোলনে ফরিদপুরের ছাত্র-যুবকদের ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা, এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের আমতলায় যে সভা হয়েছিল, সেখানে বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচজন মেডিকেল ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। তারা হচ্ছেন ডা. মোহাম্মদ জাহেদ, ননীগোপাল সাহা, ডা. সফিকুর রহমান রেজা, ডা. গোলাম মওলা ও ডা. আবদুস সালাম চৌধুরী। ভাষা আন্দোলনের এ সময়টায় ঢাকায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ পত্রিকা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। সৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল গফুর। তিনি ছিলেন তত্কালীন পাংশা থানার খানগঞ্জ ইউনিয়নের দাদপুর নিবাসী হাজি হাবিল উদ্দিন মুন্সীর পুত্র।
২১ ফেব্রুয়ারি রাতে হোস্টেল ব্যারাকে মেডিকেল কলেজের ভিপি ডা. গোলাম মওলার কক্ষে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক বৈঠক বসেছিল পরের দিনের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। সে সময় সর্বদলীয় রাষ্ট্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন গোলাম মাহবুব। ২২ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির যে খসড়া তৈরি করা হয়, গোলাম মাহবুব তাতে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাকে বাদ দিয়ে ডা. গোলাম মওলাকে (শরীয়তপুর) রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। এ বৈঠকে ডা. মোহাম্মদ জাহেদ ও ডা. ননীগোপাল সাহা উপস্থিত ছিলেন। এ তিনজনই ফরিদপুরের গৌরব সন্তান।
গোলাম মওলা ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর শরীয়তপুরের নড়িয়া থানার পোড়াগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪১-এ জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি, ১৯৪৩-এ বিএসসি, ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ববিদ্যায় এমএসসি ও ১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভিপি ছিলেন। দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গোলাম মওলা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাকালে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় প্রত্যক্ষ অংশ নেন এবং নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ১৯৫৬ সালে উপনির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদ্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালেই ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ডা. গোলাম মওলাকে ১৯৯৪ সালে ভাষা সৈনিক ও রাজবন্দি পরিষদ থেকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভাষা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০১০ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়। ভাষা আন্দোলনের এ মহান নেতা ১৯৬৭ সালের ২৯ মে মৃত্যুবরণ করেন।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, স্বাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সে সময় অন্যান্য ছাত্রীর মধ্যে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন সুফিয়া আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ছাত্রীজীবন ছিল ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিচারপতি ও আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহীমের কন্যা।
বৃহত্তর ফরিদপুরের গৌরব সন্তান অধ্যাপক আবদুল গফুর ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র অধ্যক্ষ আবুল কাশেমের দ্বিতীয়জন হিসেবে কাজ করেছেন। সৈনিক পত্রিকার সহসম্পাদক, পরবর্তীতে সম্পাদকের দায়িত্ব পালনসহ মিল্লাত, আজাদ, ডেইলি পিপল, দেশসহ দৈনিক পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা পরিচালক ও ইনকিলাবের সূচনা ১৯৮৬ থেকে ফিচার এডিটরের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাযান্নর ভাষা আন্দোলনে শুরু ১০৪৮ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় তাকে ২০০৮ সালে রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’-এ সম্মানিত করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছেন যারা, তাদের মধ্যে ফরিদপুরের আরেক কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট একেএম সামসুল বারী মিয়া মোহন। বরকত যখন নিচ পেটে বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় ছটফট করছিলেন, তখন নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও বরকতকে মেডিকেল কলেজের ইমারজেন্সি বিভাগে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন নিজ কাঁধে বহন করে। ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র ১৯৪৮ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের প্রথম বর্ষ বিএ ক্লাসের ছাত্র থাকাবস্থায় বাংলা ভাষায় প্রচলন ও সেবা করার লক্ষ্যে ‘সাহিত্যের পথে’ ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ফরিদপুরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে চকবাজার মসজিদ পর্যন্ত মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় ড. কাজী মোতাহার হোসেন, কবি জসীমউদ্দীন ও আব্বাস উদ্দিনকে ফরিদপুর এনে গানের জলসা করে বাংলা ভাষার প্রতি সবাইকে আকৃষ্টি করতেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সর্বপ্রথম ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ডাকা হলে এ আন্দোলনের ঢেউ বয়ে যায় ফরিদপুরের ওপর দিয়ে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা সকালে শহরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল শেষে থানার সামনে পিকেটিং করলে পুলিশ বর্বরোচিতভাবে ছাত্রদের ওপর লাটিচার্জ করে। জেলখানার সামনেও ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ হয়। আহত অবস্থায় মহিউদ্দিন আহমেদ, মাহবুব আলী, আবদুল হালিম, আবদুল বারী ও ইমামউদ্দিন আহমেদসহ আরো কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। মারাত্মকভাবে আহত হন ওহেদুল হক ও সূর্য মিয়া। ছাত্র-জনতার চাপের মুখে পুলিশ একদিন একরাত পর থানা হাজত থেকে গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতাদের ছাড়তে বাধ্য হয়। এর পরই ফরিদপুরের ছাত্র-জনতা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যোগাযোগ চালানো হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রাজেন্দ্র কলেজে বিএ ক্লাসের ছাত্র সৈয়দ মাহবুব আলী। তখন ছাত্ররা টিনের কৌটা হাতে চাঁদা তুলে সংগঠনের খরচ জোগাতেন। ফরিদপুরের স্থানীয় নেতারা ঢাকার সঙ্গে লোক মারফত নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালনসহ জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুতপূর্ণ এলাকা সফর করে সমাবেশ ও বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতেন।
১৯৫২ সালের প্রথম দিকে আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে সরকার ছাত্রনেতাদের ওপর হুলিয়া, নির্যাতন ও গ্রেফতারের হুমকি চালাতে থাকে। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে ফরিদপুর জেলা কারাগারে বন্দি হয়ে আসেন শেষ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু) ও মহিউদ্দিন আহমেদ (আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, মরহুম)। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার ছাত্রসমাজ একুশে ফেব্রুয়ারির প্রস্তাবিত হরতালের জন্য যেভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল, তা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার অনশনরত শেখ মুজিবকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বিনা বিচারে আটক রেখেও নিশ্চিত হতে পারেনি। এজন্য দেখা যায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে অনশনরত শেখ মুজিবকে ঢাকা কারাগার থেকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা ও ফরিদপুর জেলখানা থেকে গোপনে প্রেরিত চিঠির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করতেন। শেখ মুজিবুর রহমানও ফরিদপুরের গৌরব পুরুষ। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল শেখ লুত্ফর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুন।
শহীদের স্মৃতিকে ধরে রাখার নিমিত্তে রাজধানী ঢাকায় শহীদ মিনার নির্মাণের খবর ফরিদপুরে পৌঁছামাত্র ২৩ ফেব্রুয়ারি শহরের অম্বিকা ময়দানে তরুণ শিল্পী আব্দুস শুকুর শুকপাক স্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে মাটি দিয়ে একটি চারকোনা বেদি তৈরি করেন। কিন্তু মুসলিম লীগের পেটুয়া বাহিনী ওই রাতেই ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত ‘বেদি’ ভেঙে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে বলে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী আলীপুর নিবাসী ননী মোল্লা জানান। সেই সময় শহীদ মিনার সম্পর্কে ফরিদপুরে কারো কোনো ধারণা ছিল না। আবদুস শুকুর শুকপাকের পরিকল্পনায় ইট-সিমেন্ট দিয়ে পরবর্তীকালে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৫ সালে রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি ছিলেন বর্তমান আমেরিকা প্রবাসী মাজেদুর রহমান। তিনি এক রাতের মধ্যে কলেজ প্রাঙ্গণে একটি সুন্দর শহীদ মিনার তৈরি করে সে সময় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এ শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়েছিল কলেজে প্রবেশের ডান দিকে। সে জায়গায় এখন একটি বড় শহীদ মিনার নির্মাণ হয়েছে। তবে ওই শহীদ মিনার সৃষ্টির স্মৃতি অনেকেরই মনে রয়েছে। তখনকার প্রেক্ষাপটে শহীদ মিনার করা খুবই দুঃসাধ্য ছিল। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অম্বিকা ময়দানে ভাষা শহীদদের স্মরণে মিনারটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলহাজ ফিরোজার রহমান নিজ উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে ভগ্নপ্রায় শহীদ মিনারটি সংস্কার করে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
লেখক: সম্পাদক, সাহিত্য পত্রিকা ‘উঠোন’






