খুলনায় একুশের আন্দোলন হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এখানে ভাষা আন্দোলন তীব্রতর করার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে তমদ্দুন মজলিস। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান সংগঠক ছিলেন বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম। দৈনিক সৈনিক পত্রিকার খুলনা কার্যালয়ে (শহীদ হাদিস পার্কের পাশে) তমদ্দুন মজলিসের খুলনা শাখার সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। সিনিয়র আইনজীবী এসএম আমজাদ হোসেন (আইয়ুব সরকারের শিক্ষামন্ত্রী) ও অ্যাডভোকেট মোল্লা মোমিন উদ্দিন আহমেদ (এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী) যথাক্রমে তমদ্দুন মসলিস খুলনার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথমে যারা জোরালো ভূমিকা রাখেন, তমদ্দুন উদ্দিন মজলিস ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনে তমদ্দুন উদ্দিন মজলিস বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন। এ ধর্মঘটে সরকার দমননীতির আশ্রয় নেয়। ধর্মঘটের আগেই তত্কালীন দৌলতপুর কলেজে (বর্তমান বিএল কলেজ) বসে ছাত্র ফেডারেশন ও মুসলিম ছাত্রলীগের সংগঠকরা মিছিল সমাবেশ করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। সেই সঙ্গে তারা একটি ইশতেহারও ছাপেন। এ ইশতেহারে খুলনার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা খান-এ-সবুরের (পরে যোগাযোগমন্ত্রী) নাম ছাপা হয়। ছাত্রসমাজ ১১ মার্চের ধর্মঘটের ব্যাপারে খান-এ-সবুরের শরণাপন্ন হয়। খান-এ-সবুর তাদের আন্দোলনে সমর্থন দিলেও পরে ইশতেহার থেকে তার নাম প্রত্যাহার করেন। এখানকার ভাষা আন্দোলনে নয়াসাংস্কৃতিক সংসদ নামে একটি সংগঠন তত্পর হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে এটি স্থাপিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তত্কালীন ন্যাপ নেতা, ’৭০-এর আওয়ামী লীগের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির মেম্বার (এমএনএ) এমএ গফুর (মরহুম)। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে খুলনায় যে কর্মতত্পরতা দানা বেঁধে ওঠে, তার প্রেরণা সৃষ্টিতে উপরোক্ত সংগঠনটির ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। নয়াসাংস্কৃতিক সংসদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তোফাজ্জেল হোসেন, মালিক আতাহার, এমএ বারী (’৭৩-এ সংসদ সদস্য), সালাহউদ্দিন আহমেদ, ন্যাপ নেতা আবুল কালাম সামসুদ্দিন সুনু, সমীর আহমেদ, অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক দেশের ডাক সম্পাদক লুত্ফর রহমান জাহাঙ্গীর (মরহুম) প্রমুখ। তারাই পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিম উদ্দীন পল্টন ময়দানে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এ উক্তির প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। খুলনায় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের কোনো সংগঠন ছিল না। তত্কালীন ন্যাপ নেতা এমএ গফুরের নেতৃত্বে নয়াসাংস্কৃতিক সংসদ খুলনায় ধর্মঘট সফল করার উদ্যোগ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের সমর্থনে খুলনা শহরে পোস্টারিং করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনা জিলা স্কুল ছাড়া বিকে ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন, মডেল স্কুল ও সেন্ট জোসেফ স্কুলে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। জিলা স্কুল সরকারি বলে এখানে ধর্মঘট পালিত হয়নি।
ঢাকায় ছাত্র মিছিলে গুলির খবরে খুলনায় ছাত্রসমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কালবিলম্ব না করে প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এমএ গফুর, আবুল কালাম সামসুদ্দিন সুনু মিয়া, মিজানুর রহিম, তোফাজ্জেল হোসেন, মালিক আতাহার, এমএ বারী প্রমুখের নেতৃত্বে খুলনার ছাত্র-জনতা। ভাষা আন্দোলনে খুলনার সংগ্রামী ছাত্র-জনতার সঙ্গে এসে যোগ দেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস ও এসএমএ জলিল। ফলে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি শহরে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খুলনার উল্লিখিত ভাষা সৈনিকরা একত্র হয়ে আলোচনায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয়, ২৩ ফেব্রুয়ারি আবারো খুলনার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও তত্কালীন গান্ধী পার্কে (আজকের শহীদ হাদিস পার্ক) জনসভার। জনসভার খরচের জন্য নেতারা রাস্তায় চাঁদা আদায়ে বের হন। খুলনার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে এ তহবিলে অর্থ দান করেন। মফঃস্বল শহরে ভাষা আন্দোলন যে এত দ্রুত ব্যাপক সাড়া সৃষ্টিতে সমর্থ হবে, তা কল্পনাই করা যায়নি। ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। এদিন ভাষার দাবিতে দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। মিছিলে সাধারণ মানুষ ও রিকশাচালকরা যোগ দেয়। ওইদিন বিকালে তত্কালীন গান্ধী পার্কে এমএ গফুরের সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এমএ বারী, তোফাজ্জেল হোসেন প্রমুখ বক্তৃতা করেন। ছাত্র-যুবসমাজের এ আন্দোলনের পেছনে তত্কালীন স্থানীয় রাজনীতিকদের আশীর্বাদ ছিল প্রত্যক্ষ। জনসভায় বক্তৃতা না করলেও সভার সামনের সারিতে উপবিষ্ট ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিক এএইচ দেলদার আহম্মেদ (সাবেক খাদ্যমন্ত্রী) ও ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট আবদুল জব্বার (’৭১-এ শহীদ)। ওইদিন ঢাকা থেকে মুখে মুখে সংবাদ প্রচারিত হয় প্রতিটি শহরে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার জন্য। ২৪ ফেব্রুয়ারি আহসান আহম্মেদ রোডের আজাদ গ্রন্থাগারে বসে ভাষা সৈনিকদের এক সভায় এমএ গফুরকে আহ্বায়ক করে খুলনায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন— এমএ বারী (’৭৩-এ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য), আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস (পরে ন্যাপ নেতা), আবুল কালাম সামসুদ্দিন সুনু মিয়া (মরহুম), আলতাফ হোসেন খান, খন্দকার আবদুল হাফিজ, জাহিদুল হক, মিজানুর রহিম, এসএম জলিল, এম নূরুল ইসলাম (বর্তমান সংসদ সদস্য), তোফাজ্জেল হোসেন ও খন্দকার এনামুর রহমান। আহসান আহম্মেদ রোডে আজাদ গ্রন্থাগার খুলনা ভাষা সংগ্রাম পরিষদের অঘোষিত দপ্তর হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এ পরিষদের নেতারা এখানকার স্কুল-কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সারা দেশের মতো খুলনায়ও ধর্মঘট পালিত হয়। ওইদিন বিকালে খন্দকার আবদুল আজিজের সভাপতিত্বে তত্কালীন গান্ধী পার্কে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
তমদ্দুন মজলিস খুলনা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম আমজাদ হোসেন ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে এমপিএ নির্বাচিত হন। আইয়ুব সরকারের আমলে ১৯৬৫-৬৯ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৬ সালে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৫-২০০২ পর্যন্ত বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য। রাজনীতিতে সক্রিয় নন। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী চিন্তচেতনায় উদ্বুদ্ধ। তার জীবনের প্রত্যাশা ছিল মন্ত্রী ও সফল আইনজীবী হওয়া। তিনি দাবি করেন, তার সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
মোমিন উদ্দিন আহম্মেদ শুরুতেই ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পাকিস্তান আমলে খুলনা মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ ও ’৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খন্দকার মোশতাক শাসনামলে তিনি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। পরে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সর্বদলীয় আইনজীবী পরিষদের নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এম নূরুল ইসলাম ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনে খুলনার স্কুল-কলেজে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা-পূর্বকালে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপে যোগ দেন। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী তিনি ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিন জেলা ন্যাপের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। (পুনর্মুদ্রণ)
লেখকদ্বয় গবেষক






