ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির জীবনে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এ আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্তা নির্মাণের প্রথম ও সফল পদক্ষেপ। বাঙালি সেদিন নির্ভুল নিষ্ঠায় এ আন্দোলন সফল করেছিল বলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন দেশের। পাকিস্তানি শাসকরা প্রথম থেকেই বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলার ওপর আঘাত হানে। তারা সাম্রাজ্যবাদী ম্যাকিয়াভেলির দর্শন অনুসরণ করে। ম্যাকিয়াভেলির দর্শন ছিল, কোনো দেশকে দীর্ঘদিন পদানত করে রাখতে হলে প্রথমেই ধ্বংস করতে হবে সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নব্য দালাল পাকিস্তান বাঙালিকে পদানত করার প্রধান কৌশল হিসেবে এ পথ বেছে নিয়েছিল।
ঢাকা বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হলেও বাংলাদেশের কোনো আন্দোলনই ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভাষা আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সময়ের ব্যবধানে আন্দোলনের ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনের সঙ্গে নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারী আন্দোলনের দারুণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এরশাদবিরোধী আন্দোলন প্রথম ঢাকায় ছাত্রসমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে আন্দোলনের উত্তাপ সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনে কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না। ভাষা আন্দোলনও কোনো একক নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ। যে সময় ভারতীয় উপমহাদেশে ভাঙনের সুর বেজে উঠেছে কাকতালীয়ভাবে, সেই সালেই কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠা। সময়ের সাহসী সন্তানেরা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজকে ঘিরে ভাষা আন্দোলনের মতো চেতনাদীপ্ত আন্দোলন সংঘটিত করে। এর কারণ হিসেবে অনুমান করা যায়, মাতৃভাষার গুরুত্বের প্রশ্নটি তখনো দেশের আমজনতার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। মাতৃভাষা মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্ব বহন করে, তা একমাত্র শিক্ষিত ও সচেতন মহলই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ভাষা পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা সবার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। বাতাস ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি মাতৃভাষা ছাড়া মানুষ জীবন্মৃত। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অনায়াসলব্ধ মূল্যবান জিনিসকে তারা গুরুত্ব দিতে চায় না। আমরা বায়ু সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। এটা অনায়াসলব্ধ। তাই এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য যদি পৃথিবী থেকে বাতাস উধাও হয়ে যেত, তাহলে মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেত। মাতৃভাষা মানুষের জীবনে অক্সিজেনের মতো। মানুষ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে প্রিয় মাতৃভূমিকে ছেড়ে বিদেশে যায়। সে সবকিছু দেশে ফেলে যায়। নিয়ে যায় ধমনিতে বহমান রক্ত আর মায়ের মমতা জড়ানো মাতৃভাষা। মানুষের চেতনার সূতিকাগার, তার বিপ্লবী চেতনার শানিত প্রকাশ একমাত্র মুখের ভাষায়ই মণ্ডিত হয়ে ওঠে। বলা হয়, শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব আর বিপ্লবেই মুক্তি। বিষয়টি আমরা ১৭৫৭ সালে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন হয়। লর্ড ক্লাইভ যুদ্ধ জয় করে ফিরে গিয়ে ব্রিটেনের রানীর কাছে লিখেছেন, ফিরে আসার সময় পথের দুই ধারে যে মানুষের সমাগম দেখলাম, তারা যদি এক টুকরো করে ঢিল ছুড়ত, তাহলেও আমাদের সৈন্য বাহিনী ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু এ দেশের মানুষ সেদিন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। কারণ তারা শিক্ষার অভাবে সচেতন ছিল না। ছিল না দেশপ্রেম। তাই ভাষা আন্দোলনে সারা দেশে ছাত্রসমাজই প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছে। তারা খাপখোলা তরবারির মতো ধারালো ভূমিকা পালন করেছেন শিক্ষাপ্রাপ্ত চেতনার কল্যাণে। সে কারণে বলা হয়ে থাকে, ভাষা আন্দোলনে জাগরিত আদর্শ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের প্রারম্ভিক সূত্রপাত।
এরই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনে কুষ্টিয়ার অবদান স্মরণযোগ্য। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত কুষ্টিয়ার প্রাগ্রসর ছাত্রসমাজ কুষ্টিয়া সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে ভাষা আন্দোলনের অমর অধ্যায়ের সূচনা করে। যারা সেদিন মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য কুষ্টিয়ায় আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে ভাষা সৈনিক মিজানুর রহমান মজনু অন্যতম। ভাষার মাসে তার সঙ্গে কথা হয় তার বাসায়। সেদিনের সেই তেজোদীপ্ত তরুণ আজ বয়সের ভারে ক্লান্ত। দূর অতীতের কথা স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেছেন বা বলার চেষ্টা করেছেন অত্যন্ত আন্তরিকতায়। এ আন্দোলনে কুষ্টিয়া মুসলিম হাইস্কুলের অবদান স্বীকার করতেই হয়। কুষ্টিয়ার সার্ধশত বয়সী এ প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে অনেক সংগ্রামী ও মেধাবী নেতৃত্বের। এখানে স্মরণ করা দরকার, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি আজকের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জন্ম হয়েছিল। মূলত ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাই সেদিনের আন্দোলন সফল করে তোলেন।
ভাষা সৈনিক মিজানুর রহমান মজনু আরো বলেন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের তত্কালীন মেধাবী ছাত্র আব্দুস ছাত্তারের অবদান ভোলার নয়। কারণ তিনি ছিলেন আমাদের বড় ভাইতুল্য। তার আন্তরিকতার কারণেই কুষ্টিয়ার ভাষা আন্দোলন সফলতার দিকে এগিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে আরো যারা সম্পৃক্ত ছিলেন— আব্দুর রউফ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, নূর-এ-আলম জিকু, নূরুজ্জামান, গিয়াস উদ্দিন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন প্রমুখ।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একদিন মাতৃভাষা রক্ষার জন্য যারা জীবনবাজি রেখেছিলেন, আজ বাংলা ভাষার দৈন্য দেখে তারা আহত, সঙ্গে ক্ষুব্ধ। ভাষা সৈনিক মজনু বলেন, একদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান দিয়েছিলাম। যদি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকি, তাহলে হয়তো স্লোগান দিতে হবে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই।
অন্তিম ইচ্ছা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হোক— এ প্রত্যাশা। যদি দেখে যেতে পারি, তবে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। অনেক কষ্টে পাওয়া মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা দরকার। ভাষার এ দৈন্য দেখে কবি আবুল হাসান লিখলেন, আমার মাতৃভাষা আমার মায়ের মতোই অসহায়। আমরা বাংলা ভাষাকে অসহায় অবস্থায় দেখতে চাই না। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করবে, ঐতিহাসিক সত্যের অস্তিত্ব জানান দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ভাষার মাসে এটাই হোক সর্বস্তরের বাঙলিসত্তার জাগ্রত উপলব্ধি।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, খোকসা সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া






