‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বাংলা ১৩৫৮-এর ৮ ফাল্গুন আমাদের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এক অমর ও ঐতিহাসির দিন। আজ থেকে ৬৬ বছর আগে ওইদিনে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকার রাজপথে ও মেডিকেল চত্বরে পুলিশের গুলিতে অকাতরে প্রাণ দেন চিরভাস্বর, চির-উজ্জ্বল, চির-অমর সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর ও আরো অনেকে। আজ তাদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে ও আত্মদানের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি এবং সেই মহান ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়েই পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরিশেষে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা লাভ করেছি আমাদের স্বাধীনতা— আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
সেই মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর অবদান কোনো অংশে কম নয়। আজ প্রায় ৬৬ বছর পর রাজশাহীর সেই ভাষা আন্দোলনের কথা বলতে গিয়ে আমার অনেকের কথা মনে পড়ে, যারা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আবার অনেকেই কর্মজীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপৃত রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে হয়তো কালে-ভদ্রে দেখা হয় অথবা হয়ই না। আমি ১৯৫২ সালে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজের ছাত্র ও পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন তরুণ অধ্যাপক ও ছাত্রদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কথা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত যে, তমদ্দুন মজলিসই ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তান করে। এ তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে অধ্যাপক আবুল কাশেমের সম্পাদনায় ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম একটি পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, না উর্দু’ নামে ঢাকার বলিয়াদী প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এর লেখক ছিলেন তিনজন। অধ্যাপক মরহুম কাজী মোতাহার হোসেন, দৈনিক ইত্তেহাদ সম্পাদক মরহুম আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাশেম। এতে প্রমাণ করা হয় যে, বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়ার সম্পূর্ণ উপযুক্ত। এ পুস্তিকাটির মুখবন্ধে প্রদত্ত তমদ্দুন মজলিসের গৃহীত প্রস্তাবাবলির মধ্যে নিম্নোক্ত সবিশেষ উল্লেখযোগ্য: ১. বাংলা ভাষাই হবে— ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা ও গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসারদের ভাষা; ২. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি— বাংলা ও উর্দু।
মজলিসকর্মীরা পুস্তিকাটির প্রচার ও বিক্রির যথেষ্ট চেষ্টা করেন, কিন্তু তখন জনসাধারণের মধ্যে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মজলিসকর্মীদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে এ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা সম্পর্কে কয়েকটি আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। তত্কালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান উর্দু হরফে বাংলা লেখার পক্ষে ওকালতি করেন, আর সেই সঙ্গে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তনে সৃষ্টি হয় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। গড়ে ওঠে মজলিসকর্মীদের এক বৈঠকে অধ্যাপক নূরুল ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথম ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে সংগ্রাম পরিষদ হয় সম্প্রসারিত ও আন্দোলন চলতে থাকে। পরিশেষে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম অফিস-আদালতের ভাষা, সর্বোপরি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশব্যাপী ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং বহুস্থানে ধর্মঘট পালিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় আসেন তত্কালীন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ঢাকায় রেসকোর্সের বিরাট জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা, আর সেই সঙ্গে রেসকোর্সের কোনো কোনো প্রান্ত থেকে ‘না, না’ শব্দে প্রতিবাদ ওঠে। উল্লিখিত তথ্য পাওয়া যায় তত্কালীন জনপ্রিয় ও নির্ভীক পত্রিকা এবং ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী ও বলিষ্ঠ হাতিয়ার সাপ্তাহিক সৈনিকের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩, ১৪শ সংখ্যা থেকে।
১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় আমি মফস্বলে বর্তমানে নওগাঁ জেলার বদলগাছী হাই স্কুলের একজন ছাত্র ছিলাম। প্রত্যক্ষভাবে তমদ্দুন মজলিস বা ভাষা আন্দোলনে তখন জড়িত ছিলাম না। তাই এ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে শুনেছি যে, ১৯৪৮-এর আন্দোলনের ঢেউ কিছুটা রাজশাহীতেও লেগেছিল। বিশেষ করে রাজশাহীর বামপন্থী জননেতা আতাউর রহমান, তত্কালীন রাজশাহী কলেজের ছাত্র একরামুল হক (পরে অধ্যাপক ও বর্তমানে ব্যবসায়ী), আবুল কাশেম চৌধুরী (বর্তমানে অধ্যাপক) এ আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তারা এজন্য কারাবরণও করেন। তবে এ আন্দোলনে নাকি ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয় এবং তারা দুই ভাগ হয়ে যায়। ফলে আন্দোলন তেমন ব্যাপকতা লাভ করেনি।
পরবর্তীতে আসে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক মহান ভাষা আন্দোলন। আমি আগেই বলেছি, আমি তখন আজশাহী কলেজের ছাত্র। এ আন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। মনে পড়ে, ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানের এক জনসভায় পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। আর সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র তার তীব্র প্রতিবাদ ওঠে। ২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা। ৩০ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় সভা ও সংগ্রাম পরিষদ গঠন। আর এর আহ্বায়ক মনোনীত হন কাজী গোলাম মাহবুব (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট)। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি আহূত হয় তত্কালীন সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ঘর্মঘট। রাজশাহীতেও আমরা সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমি তখন রাজশাহী কলেজের নিউ মুসলিম হোস্টেলে ‘এ’ ব্লকে ছিলাম। ৩০ জানুয়ারি কী করা যায় ভাবছিলাম। এমন সময় সকালে হোস্টেলের বাইরে থেকে রাজশাহী কলেজের ছাত্র আমার সহপাঠী আবুল কালাম চৌধুরী (পরে রাজশাহী জজ কোর্টের বিশিষ্ট অ্যাডভোকেট আজ আর আমাদের মাঝে নেই) আমাদের ব্লকে আসেন এবং আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সঙ্গে নেতৃস্থানীয় ছাত্র হাবিবুর রহমান (বর্তমানে ঢাকায় চাকরিরত), রইছ উদ্দিন আহমদ, রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের ছাত্র এ. গাফফার (রাজশাহীতে ডাক্তারি করতেন, এখন বিদেশে), ওয়াহিদুল হক (দুলু) (বর্তমানে বিদেশে) আমরা ‘এ’ ব্লকের এক প্রান্তে বসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে ও বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট ও মিছিলের সিদ্ধান্ত নিই এবং সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু কিরি। টিনের চোঙা দিয়ে ধর্মঘট ও মিছিলের কথা ঘোষণা করে দেয়া হয়। কলেজ হোস্টেল থেকে মিছিল শুরু হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস ও ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ উপলক্ষে কাগজের ছাপানো ছোট ছোট পাকিস্তানি পতাকা তৈরি করে ওই পতাকায় লেখা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। আর ওই লিখিত পতাকা বড় কাগজে লাগিয়ে দিয়ে তার নিচে ছাত্রছাত্রীদের দস্তখত নিয়ে দুই আনা, চার আনা, আট আনা করে চাঁদা তোলা হয়। এ ব্যাপারে তত্কালীন যুবনেতা মোসাদ্দারুল হক (এখন ঢাকায় ব্যবসা করেন) আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেন। তিনি স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে সব স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। ওইদিন জালিম শাহীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দিবেত ছাত্রছাত্রীদের মিছিল ও মিছিল শেষে ভুবন মোহন পার্কে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। আমার যতটুকু মনে পড়ে, এতে অন্যদের মধ্যে বক্তৃত করেন রাজশাহী কলেজের নেতৃস্থানীয় ছাত্র আনোয়ারুল আজিম (পরে তিনি গোপালপুর চিনিকলের প্রশাসক থাকাকালীন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিহত ও শহীদ হন। তার স্মরণে আজ গোপালপুর রেল স্টেশনের নাম আজিমনগর হয়েছে), মেডিকেল স্কুলের ছাত্রী মোহসেনা বেগম (ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত), মমতাজ উদ্দীন আহমদ (বর্তমানে অধ্যাপক ও খ্যাতিমান নাট্যকার), মোসবাহুল হক বাচ্চু (বর্তমানে ডাক্তার ও প্রাক্তন এমপি), ইয়াসীন আলী (পরে অ্যাডভোকেট, বোধ হয় বেঁচে নেই) এভাবে আন্দোলন ক্রমে ক্রমে ব্যাপকতা লাভ করেতে থাকে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় তমদ্দুন মাজলিস থেকে আমি ভাষা আন্দোলন জোরদার কারার নির্দেশ পাই। সে মোতাবেক পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস রাজশাহী জেলা শাখার উদ্যোগে আমি রাজশাহী ভুবন মোহন পার্কে বাংলা পাকিস্তানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে এবং সেই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এক বিরাট জনসভা আহ্বান করি। এ উপলক্ষে মজলিসের পক্ষ থেকে হাজার হাজার প্রচারপত্র বিলি করে হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজশাহীতে এটিই প্রথম জনসভা। এ ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করার সৌভাগ্য আমারই হয়েছিল। এতে অন্যদের মধ্যে তত্কালীন স্থানীয় বিশিষ্ট জননেতা মরহুম ক্যাপেটন শামছুল হক (প্রাক্তন এমপিএ) ও মোসাদ্দারুল হক বক্তৃতা করেন। এ সভায় সিদ্ধান্তবলিসহ একটি প্রতিবেদন পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক লোক সেবক’-এ প্রকাশিত হয়। দেশের অন্যান্য কাগজেও খবর বের হয়েছিল।
এরপর রাজশাহীতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এতে মরহুম মাদার বখশ (অ্যাডভোকেট ও এমএলএ), ক্যাপ্টেন শামছুল হক (মরহুম), মজিবর রহমান (ঢাকায় চাকরিরত), নূরুল ইসলাম (লাল মিয়া, ব্যবসায়ী), বামপন্থী জননেতা আতাউর রহমান (মরহুম), গোলাম আরিফ টিপু (অ্যাডভোকেট), ডা. মেসবাহুল হক বাচ্চু, সাঈদ উদ্দিন আহমদ (ব্যবসায়ী), মহসীন প্রামাণিক (অ্যাডভোকেট), ইয়াসীন আলী (মরহুম), আবদুল গাফফার (ডাক্তার), প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়ী, (প্রাক্তন মন্ত্রী, বেঁচে নেই), আমি ও আরো অনেকে জড়িত ছিলাম। এতদিন পর সবার নাম আমার স্মরণে নেই, এজন্য আমি দুঃখিত। নওগাঁ এসে আমি স্থানীয় ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দেখা করি এবং নওগাঁ মাদ্রাসা ময়দানে এক ছাত্র জনসভার আয়োজন করা হয়। আমার যতটুকু মনে পড়ে, বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রাক্তন ছাত্রনেতা আবুল খায়ের (বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী পাট ব্যবসায়ী) ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন। আমিই সভার প্রধান বক্তা ছিলাম। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট ও প্রতিবাদ দিবস সফল করার আহ্বান জানানো হয়। এখানে আমার একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। সভা শেষে হঠাৎ করে মাঠে আমার আব্বার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তিনিও সভায় উপস্থিত ছিলেন। আমি জানতাম না। দেখা হওয়ায় আমাকে বললেন, কাজটা ভালো, তবে সাধারণ ঘরের ছেলে, একটু সাবধানে চলবে। যা হোক, আমি তারপর আবার রাজশাহী ফিরে যাই। গিয়ে শুনি যে, নাটোরে ভালো কাজ হচ্ছে না। ফলে আমাকে রাজশাহী ছেড়ে নাটোর-নওগাঁর পথে বের হতে হয়। নাটোরে এসে একটা ছাত্রকর্মী সমাবেশ করি। তাদের আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে পুনরায় সভা করার জন্য নওগাঁর পথে রওনা হই। এরই মধ্যে শান্তাহারে এসেই খবর পেলাম, কজন নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে আমাকে আত্মগোপন করে আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আমি সে মোতাবেক নওগাঁর মফস্বলে চলে আসি এবং আন্দোলনের কাজ করতে থাকি। ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালিত হয়। কিন্তু ওই তারিখে ধিকৃত মুসলিম লীগ সরকারের নির্মম বুলেটে ঢাকায় প্রাণ দেন মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর ও জানা-অজানা আরো অনেকে। ফলে সারা দেশে দাউ দাউ করে আন্দোলন জ্বলে ওঠে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় হরতাল। অনুষ্ঠিত হয় গায়েবি জানাজা ও প্রতিবাদ সভা আর মিছিল। জানাজায় যোগদান করেন তত্কালীন অ্যাডভোকেট জেনারেল মরহুম শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। কিন্তু জালেমশাহী চুপ থাকার কথা নয়। তারা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ সারা প্রদেশের বহু নেতা ও কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করে এবং অত্যাচার চালায়। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের যারা বাইরে ছিলেন, তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, ৫ মার্চ শহীদ দিবস পালন করা হবে। এরই মধ্যে সারা প্রদেশে স্কুল-কলেজ এমনকি কোথাও কোথাও ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্রে ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। কিন্তু আকস্মিকভাবে সংগ্রাম পরিষদের কজন নেতা ৬ মার্চ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এরপর স্কুল-কলেজ, হাটবাজার সবই খুলে যায়। আমরাও আবার কলেজে ফিরে যাই। এরই মধ্যে নেতারা অনেকে জেল থেকে ছাড়া পান। কিছুদিন পর ২৭ এপ্রিল ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য ঢাকায় একটি প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা সম্মেলন আহূত হয়। এতে আতাউর রহমান খান (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হন। একইভাবে ১ জুলাই মাদার বখশ (মরহুম) গংয়ের আহ্বানে রাজশাহীতে জেলা রাষ্ট্রভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি গৃহীত হয়। আন্দোলন ধীর পদক্ষেপে চলতে থাকে। এ সম্মেলনসংক্রান্ত একটি ছাপানো পোস্ট কার্ড আমার কাছে এখনো রয়েছে।
রাজশাহীতে রাষ্ট্রভাষা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পাশাপাশি চলে। এ দুটি আন্দোলনেই আমি সক্রিয়ভাবে জড়িত। এরই মধ্যে ১৯৫৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৫টায় কলেজ হোস্টেলের ‘এ’ ব্লক থেকে প্রথমে আমাকে এবং পরে গাজিমুদ্দিন ও ওয়াহিদুল হক দুলু এবং অন্য স্থান থেকে আবুল কালাম চৌধুরী (অ্যাডভোকেট, বেঁচে নেই), আব্দুর রহমান (ঢাকায় চাকরিরত), মেসবাহুল হক বাচ্চু (ডাক্তার ও সাবেক এমপি), আব্দুল মান্নান (অ্যাডভোকেট), সামছুদ্দিন আহমদ (অব. সরকারি চাকরিজীবী), মহসীন প্রামাণিক (অ্যডভোকেট), মমতাজ উদ্দিন আহমদ (অধ্যাপক ও প্রখ্যাত নাট্যকার), মহিউদ্দিন আহমদ (সাংবাদিক), আব্দুল গাফফার (ডাক্তার, বিদেশে), আরো কজনসহ মোট ১৫ জনকে— সবার নাম এ মুহূর্তে আমার মনে নেই— পুলিশ গ্রেফতার করে এবং রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে নিক্ষেপ করে। মনে পড়ে, ওই সময় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র রাজশাহী জেলে ছিলেন। জেলের ভেতরে কয়েদিরা রাজবন্দি হিসেবে আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করত।
যা হোক, অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির দিন জেল গেটে আমাদের যে অভ্যর্থনা ও পরে যে গণসংবর্ধনা দেয়া হয়, তা আজো স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
এ ঐতিহাসিক বায়ান্নর পথ ধরেই আসে দেশের ১৯৫৪-এর নির্বাচনী গণজাগরণ। ঘটে অত্যাচারী ও ধিকৃত মুসলিম লীগশাহীর শোচনীয় পরাজয়, ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেন হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী।
একুশ আমাদের গর্ব। মায়ের ভাষার জন্য বিশ্বে আর কোনো জাতিকে এত রক্ত দিতে হয়নি। বাঙালি দিয়েছে। প্রামাণ করেছে, তারা শুধু বাঙালি নয়, মানুষও। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে একুশ একটি সংগ্রামী যুগের সূচনা।
লেখক: সাবেক বিচারপতি






