দেশভাগের আগে থেকেই ভাষা আন্দোলনের শুরু। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত ‘ইত্তেহাদুল মুসলেমিন’-এর এক উর্দু সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ‘উর্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হইবে’ বলে দাবি করার পর পরই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। তখন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে-বিপক্ষে একটি তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়। ভাষা সংগ্রামের আদি পর্বের এ তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সময় থেকেই নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জের বিজলী প্রেস থেকে স্ফুলিঙ্গ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। পত্রিকাটি ড. এনামুল হকের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা কেন?’ লেখাটির প্রথম কিস্তি প্রকাশ হয়েছিল এবং পরবর্তী দুই সংখ্যায় তা শেষ হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার পত্রিকাটির ওই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং পরে বিজলী প্রেসটিকেও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের উর্দু অথবা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তাব করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাবের সংশোধনী এনে বাংলাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরোধিতায় তার প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। ঢাকায় সে সংবাদ আসার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকায় সর্বদলীয়ভাবে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলে সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট আহ্বান করে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন। গণপরিষদের তালিকা থেকে বাংলা ভাষাকে বাদ দেয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদে ওইদিন ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শেখ মুজিবুর রহমান, মুহম্মদ তোয়াহা, অলী আহাদসহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়।

১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। বিভিন্ন স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। নারায়ণগঞ্জ শহরের পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল গোদনাইলে অবস্থিত লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল ও ঢাকেশ্বরী কটন মিলেও সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ওইদিন সেখানে ছাত্র ও শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকালে মিলের ভেতরে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দেশব্যাপী পাকিস্তান-উত্তর প্রথম হরতাল।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে এসে ২১ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দান ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলে ছাত্রদের মধ্যে আবার তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে সে সময়ের দিনগুলো ছিল আন্দোলনে উত্তাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে তখন আন্দোলন পরিচালিত হতে থাকে।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এরপর প্রতি বছর ১১ মার্চকে ভাষা দিবস হিসেবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে পালনের সিদ্ধান্ত নিলেও তা তেমন কার্যকরী হতে পারেনি। কিন্তু ১৯৫১ সালে সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে ১১ মার্চ ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দিবস পালনের জন্য ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কেন্দ্র ঘোষিত ১১ মার্চ ধর্মঘট সফল করার জন্য নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। বিকালে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ঢাকার কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তৃতা করেন। পাকিস্তান অবজারভার পরদিন সংবাদে উল্লেখ করে, ‘১১ই মার্চ নারায়ণগঞ্জের ছাত্রছাত্রীরাও পূর্ণ ধর্মঘট পালন ও বিরাট মিছিলসহকারে শহর প্রদক্ষিণ করেন। মিছিলে তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আওয়াজ তোলেন এবং রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউটে এসে একটি সভায় সমবেত হন। সভায় সভাপতিত্ব করেন অলি আহাদ এবং অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন মহম্মদ তোয়াহা, মুজিবুর রহমান, সুলতান আহমদ, শামসুল হুদা ও বজলুর রহমান।’ ১৫ মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকা এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে।

১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫২-এর ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে পুনরায় বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্য রাখলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ৩০ জানুয়ারি সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও ধর্মঘট পালিত হয়।

৪ ফেব্রুয়ারি শুধু ঢাকায় ধর্মঘট আহ্বান করা হলেও এদিন ঢাকার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জেও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় এবং ছাত্ররা মিছিলসহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে এবং পরে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন দৈনিক আজাদ এক সংবাদে উল্লেখ করে, ‘নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালন করেন এবং মিছিলসহকারে সারা শহর প্রদক্ষিণ করেন। মিছিল শেষে ছাত্রছাত্রীরা স্থানীয় রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক সভায় মিলিত হন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন।’

৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট শেষে ওইদিনই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট আহ্বান করে। ২১ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটকে সফল করার জন্য নারায়ণগঞ্জে ভাষা সংগ্রাম কমিটি ও ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। লিফলেট ছাপা হয়, হাতে লিখে কয়েকশ পোস্টার তৈরি করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও মোড়ে মোড়ে লিফলেট বিতরণ করা হয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে পোস্টার লাগানো হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ও খণ্ড খণ্ড মিছিল করে ছাত্ররা। তখন পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্র ও কার্টুনসংবলিত পোস্টারে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ছেয়ে যায়।

১৯৫২ সালের জানুয়ারির শুরুতেই নারায়ণগঞ্জে মফিজ উদ্দিন আহম্মদ ও আজগর হোসেন ভূঁইয়াকে যথাক্রমে আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফলভাবে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট শেষে বিকালে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক সমাবেশের আয়োজন করে। মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম ছিলেন ওই সমাবেশের প্রধান অতিথি। সমাবেশে বক্তৃতা করেন আলমাছ আলী, বজলুর রহমান, মুস্তাফা সারওয়ার প্রমুখ। সভা চলাকালেই আবুল হাসিমের কাছ থেকে নারায়ণগঞ্জবাসী জানতে পারে, ঢাকার ছাত্র মিছিলে গুলি করা হয়েছে এবং কয়েকজন ছাত্র মারা গেছেন। মুহূর্তের মধ্যেই জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মর্গ্যান গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রীদের বিশাল মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন সে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শহর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গুলি চালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস ও ট্যাক্সি চলাচল করলেও গুলিবর্ষণের সংবাদের পর বাস, ট্যাক্সিসহ সব যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়।

ওই রাতেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য তদানীন্তন জিন্নাহ সড়কের (বর্তমান বঙ্গবন্ধু সড়ক) পূর্ব পাকিস্তান লেবার ফেডারেশনের কার্যালয়ে একটি গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় সফি হোসেন খান, ডা. মজিবর রহমান, শামসুজ্জোহা, বজলুর রহমান, মসিউর রহমান, নাজির মোক্তার, বাদশা মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু গোপন সে বৈঠকের খবরটি বৈঠক চলাকালেই ফাঁস হয়ে যায়। সভার শেষ পর্যায়ে মহকুমা প্রশাসক ও পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা মহকুমা প্রশাসককে জানান, শান্তিপূর্ণভাবে তারা আন্দোলন পরিচালনা করবেন, কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না। তাদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়। সেই সভায় ২৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে একটি বড় সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সমাবেশকে সফল করার লক্ষে রাতেই সফি হোসেন খান ও কাজী মজিবর শ্রমিক জমায়েতের জন্য মিল এলাকায় চলে যান। এদিকে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় সংগ্রাম পরিষদ ২২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে হরতাল আহ্বান করে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে।

২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ শহর হয়ে ওঠে মিছিলের নগরী। সকাল থেকেই মিছিল আর মিছিল। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, খুনি নূরুল আমীনের ফাঁসি চাই’, ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই’, ‘এমএইচ কোরেশীর রক্ত চাই’ ইত্যাদি স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত হতে থাকে। এমএইচ কোরেশী তখন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট। তারই নির্দেশে ২১ ফেব্রুয়রি ঢাকায় গুলি চালানো হয়েছিল। জুমার নামাজ শেষে বিভিন্ন মসজিদে গায়েবানা জানাজা ও শহীদদের উদ্দেশে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিকালে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। শহরের নারীরাও সে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।

নারায়ণগঞ্জে ২৩ ফেব্রুয়ারিও পূর্ণ হরতাল পালিত হয় এবং পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী বিকালে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান তোলারাম কলেজের স্থানে চাষাঢ়া মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো ছাত্র-জনতা সমাবেশে জড়ো হয়। গোদনাইল শ্রমিক অঞ্চল থেকে বিভিন্ন মিলের কয়েক হাজার শ্রমিক সমাবেশে যোগ দেন। মমতাজ বেগম ছাত্রী ও শিক্ষকদের একটি বিশাল মহিলা দল নিয়ে সমাবেশে এসে যোগ দেন। সমাবেশের সব বক্তা তীব্রভাবে নূরুল আমীন সরকারের সমালোচনা করে বক্তৃতা করেন। শ্রমিক নেতা ফয়েজ আহাম্মদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন সফি হোসেন খান, নাজির মোক্তার, সোলায়মান, এফ রহমান, খোরশেদ আহমদ, আবদুল কাদের, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, জানে আলম প্রমুখ। পরদিন ‘নারায়ণগঞ্জের বিরাট জনসভায় মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি’ শিরোনামে আজাদ পত্রিকা সংবাদ প্রকাশ করে। আনন্দবাজার পত্রিকা উল্লেখ করে, ‘নারায়ণগঞ্জে ঢাকায় গুলি চালানোর প্রতিবাদে সম্পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। এ হরতালে শহরতলীর ঢাকেশ্বরী ১ নং, ২ নং, চিত্তরঞ্জন, লক্ষ্মীনারায়ণ, আদর্শ কটন মিল ও আদমজী জুট মিল, নারায়ণগঞ্জ কো. প্রভৃতি কারখানার প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক জড়িত হইয়া পড়ে। সমস্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হইয়া পড়ে। অপরাহ্নে শ্রমিক নেতা ফয়েজ আহম্মদের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জে এক সভা হয় এবং উহাতে প্রায় ২০ হাজার লোক হয়।’ করাচি থেকে প্রকাশিত প্রখ্যাত সাংবাদিক জেডএ সুলেরীর ইভিনিং টাইমস পত্রিকায় ‘নূরুল আমীন মাস্ট গো, নারায়ণগঞ্জ মিটিং ডিমান্ড’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়।

২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। শহরে যানবাহন, দোকানপাটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। গোদনাইল শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন মিল-কলকারখানা বন্ধ থাকে। দৈনিক আজাদ ও আনন্দবাজার পত্রিকা এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে। নারায়ণগঞ্জের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ তখন একটি লিফলেট প্রকাশ করে। লিফলেটটি নারায়ণগঞ্জের কোনো প্রেস ছাপাতে রাজি না হওয়ায় সে সময় নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় কর্মরত বাদশা মিয়া ঢাকা থেকে লিফলেট ছাপিয়ে আনেন। মুস্তাফা মনোয়ার তার সহকর্মীদের নিয়ে তখন ভ্যানে চড়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় খালি গলায় বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান গেয়ে বেড়াতেন। তিনি তখন সাইকেলে চড়ে ক্যামেরা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে আন্দোলনের বহু ছবি তোলেন।

তখন ভাষা আন্দোলনের সে উত্তাল সময়টিতে মমতাজ বেগম স্কুলের বাইরে এসে শ্রমিকদেরও এ আন্দোলনে যুক্ত করার জন্য কাজ করতে থাকেন। তিনি আদমজী জুট মিলের তত্কালীন শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম মোল্লার আহ্বানে শ্রমিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন এবং শ্রমিকদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এ আন্দোলন সফল না হলে শুধু ভাষা নয়, আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাবে। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ফলে আদমজী জুট মিল ও গোদনাইলের বিভিন্ন মিলের হাজার হাজার শ্রমিক নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। মমতাজ বেগমের দক্ষতা ও নেতৃত্বে তখন নারায়ণগঞ্জের নারীরা ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারিতে মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে মিছিলের আগে কখনো নারায়ণগঞ্জে নারীদের মিছিল সংঘটিত হয়েছে বলে জানা যায় না। এটি ছিল নারায়ণগঞ্জে প্রথম নারীদের সংগঠিত মিছিল। আর মমতাজ বেগমের এমন সাহসী ভূমিকার কারণে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়লেন। প্রথমে তারা মমতাজ বেগমকে প্রধান শিক্ষয়িত্রীর পদ থেকে অপসারণের জন্য তার বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপের অভিযোগ আনেন।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ২৯ ফেব্রুয়ারি একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এদিন সকালে নারায়ণগঞ্জে মহকুমা প্রশাসকের নির্দেশে মমতাজ বেগমকে কর্মচ্যুত ও গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়। এ সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে মিছিল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণে হাজির হন। স্থানীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে এ সংবাদ পৌঁছলে সফি হোসেন খান গোদনাইলের বিভিন্ন মিলের শ্রমিকদের এ সংবাদ পাঠিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে বিভিন্ন মিলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দলে দলে মিছিল নিয়ে এসে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণ ঘিরে ফেলেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মহকুমা প্রশাসক ঢাকা থেকে ইপিআর পাঠানোর আহ্বান জানান। বিক্ষোভ দমনে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট নারায়ণগঞ্জে আসার সংবাদে ছাত্ররা আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ঢাকার দোহার পুলের পর থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে বড় বড় গাছ কেটে ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড তৈরি করেন। ১৬০টিরও বেশি গাছ ও ইট ফেলে রাস্তা আটকে দেয়া হয়। এদিকে আদালতে মমতাজ বেগমের জামিনের আবেদন করা হলেও মুসলিম লীগ সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে জামিনের অনিশ্চয়তা উপলব্ধি করে আগেই শামসুজ্জোহা ও ডা. মজিবর রহমানকে সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ঢাকা জজ কোর্টে জামিনের ব্যবস্থা করার জন্য পাঠানো হয় এবং সেখানেও তারা জামিন নিতে ব্যর্থ হন। উত্তেজিত জনতার উদ্দেশে আদালত থেকে মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী বেরিয়ে জানান, মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল তছরুপের কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু জামিন না দিয়ে আদালতের ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জবাসী উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। এদিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে গাছ ও ইটের

ব্যারিকেড সরিয়ে বিকালে পাঞ্জাবি সৈন্যরা নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে। মমতাজ বেগমকে গাড়িতে তোলা হলে কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকের প্রতিরোধে গাড়ি আর এগোতে পারে না।

মমতাজ বেগমকে বহনকারী ঢাকাগামী ইপিআর ও পুলিশের গাড়িটি চাষাঢ়া মোড়ে এলে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা গাড়িটি আটকে দেয়। পাগলা থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার জনতা এসে পথে অবস্থান নেয়। পুলিশের সঙ্গে পাঞ্জাবি সৈন্যরা যুক্ত হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর একসঙ্গে হামলা চালায়। পুলিশ-সৈন্যদের সঙ্গে ছাত্র-জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। চাষাঢ়া বাইতুল আমানে সভা বসে। তারা সে সভায়ও হামলা চালায়। শত শত লোক আহত হয়। শিশু-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু লোককে গ্রেফতার করা হয়। রাতে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নারায়ণগঞ্জে এসে গ্রেফতারকৃতদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে নারায়ণগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রাতে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনের নেতাকর্মীদের বাসায় হামলা চালানো হয়। নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করতে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওইদিন প্রায় ১৫০ লোককে গ্রেফতার করা হয়।

১ মার্চ শহরের কালীর বাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে জোবায়েদুল হক নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু হয় এবং আরেক আনসার সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এ ঘটনায় সারা দেশে নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকার এ ঘটনাকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করতে থাকে। নারায়ণগঞ্জ শহরে পুনরায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) সংবাদে উল্লেখ করে, “নারায়ণগঞ্জের মিছিলে ‘যুক্ত বাংলা চাই’, ‘জয়হিন্দ’ ইত্যাদি ধ্বনি শোনা গেছে।” এদিকে নিহত কনস্টেবল জোবায়েদুল হকের ময়নাতদন্তে দেখা যায়, নিহতের গায়ে বিদ্ধ গুলিটি ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের রাইফেল থেকে ব্যবহূত। বিষয়টি জানাজানি হলে সরকার নিহতের পরিবারকে তাত্ক্ষণিকভাবে ১০ হাজার টাকা প্রদান করে। কিন্তু ঘটনাটিকে সরকার বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন ৩ মার্চ রেডিওতে এক ভাষণে নারায়ণগঞ্জে ‘জয়হিন্দ’ ও ‘যুক্ত বাংলা চাই’ স্লোগান হয়েছে বলে প্রচার করেন। এর দুদিন পর করাচি থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নূরুল আমীনের বেতার ভাষণের তীব্র সমালোচনা করে সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রদান করেন।

৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল মাঠে আনসারদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক এএইচএমএস দোহা ভাষা আন্দোলনকে হিন্দুদের কারসাজি ও ভারত সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ বলে উল্লেখ করেন। তিনি ২৯ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩৭ জন হিন্দু যুবক। আশ্চর্যের বিষয়, এরা সবাই অল্প দিন আগে কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসে। গ্রেফতারের সময় এরা সবাই মুসলমানি লেবাস পরিহিত ছিল। আরো লক্ষ করার বিষয়, এ সময় ভারত থেকে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার হিন্দু পূর্ববঙ্গে প্রবেশ করতে থাকে।’ নারায়ণগঞ্জে ৭ মার্চ পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ও কারফিউ বলবৎ থাকে। এ কারফিউর মধ্যেও পুলিশ এলাকার বহু লোককে গ্রেফতার করে।

বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ‘১৯৫২ সালে ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন এমন সময় খুব উত্তপ্ত হয়েছিল, যখন ঢাকা শহরে আন্দোলনে ভাটা পড়েছিল। বস্তুতপক্ষে নারায়ণগঞ্জ এ সময় ছিল ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকা।’ নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ ছিল ভাষা আন্দোলনের এক শক্ত ঘাঁটি। ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত সেখানে প্রতিদিন বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে, প্রায়ই ধর্মঘট হয়েছে। পুলিশও অনেককে গ্রেফতার করেছে।’১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহের নগরী। ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ আন্দোলন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশে বিস্তৃত হওয়ার কারণেই তা সহজে সফলতা পেয়েছে। ভাষা আন্দোলন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত হলেও নারায়ণগঞ্জে এ আন্দোলনের চরিত্রটি ছিল সারা দেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নারী ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ভাষা আন্দোলনে যেমন ভিন্ন এক চরিত্র ও মাত্রা তৈরি করেছে, তেমনি আন্দোলনকে করেছে বেগবান, যে চেহারাটি দেশের কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। নারায়ণগঞ্জ শহরের পার্শ্ববর্তী আদমজী ও গোদনাইল শ্রমিক অঞ্চল হওয়ায় এবং এ অঞ্চলের মিল-কারখানাগুলোর শ্রমিকদের মধ্যে আগে থেকেই কমিউনিস্টদের শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠায় এ আন্দোলনে শ্রমিকদের অংশগ্রহণও সহজতর হয়েছে। আর এ কারণেই এখানে ভাষা আন্দোলন যেমন বেগবান হয়ে উঠতে পেরেছে; আবার নারায়ণগঞ্জ ঢাকার নিকটাঞ্চল হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনকেও দ্রুত প্রভাবিত করতে পেরেছে।

 

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী