বাংলা ভাষা আন্দোলনে কুমিল্লার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ভাষা আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চে। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অগ্রাহ্যকৃত প্রস্তাব এবং ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতা পূর্ব বাংলার জনগণকে চরম বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এ থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কাল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব। ভাষা আন্দোলনের বীজ পর্যায়ে দেশভাগের প্রাক্কালে কংগ্রেস ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হবে বলে দাবি করে। সে সময় মুসলিম সমাজ রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেয়। উর্দু ভাবী পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে এই অঞ্চলের জনগণ সাধারণভাবে ধরে নিয়েছিল। তখন উর্দু শিক্ষার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ সম্পর্কে কবি-সাংবাদিক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহর স্মৃতিচারণ :
গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মে বাংলার দাবি কম ছিল না। কিন্তু হিন্দুদের থেকে পৃথক করার গরজে সে কথা অনেকে ভুলেই গিয়েছিল। যতটুকু মনে পড়ে হিন্দু ভাইরাও সেদিন যেন এটা মেনে নিয়েই উর্দু শিখবার চেষ্টা করতে থাকেন।
কুমিল্লা জিলা স্কুলের মৌলবি দলিলুর রহমানের ‘হাযারী জবান’ ও আলী আহমদ রচিত ‘বাংলার সাহায্যে উর্দু শিক্ষা’ হটকেকের মতো বিক্রি হয়েছিল।
১৯৪৮-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব অগ্রাহ্য হওয়ার পর পরই পূর্ববঙ্গজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ২৫ ফেব্রুয়ারির ‘পরদিনই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের মুসলিম ছাত্রলীগ, ফরোয়ার্ড ব্লকের ফরোয়ার্ড ব্লক ছাত্র ব্যুরো, আরএসপির দুই ছাত্র সংগঠন ছাত্র কংগ্রেস ও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে সভা করেন। সভাটি ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নায়েব আলী চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১ নম্বর গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তৃতা করেন মুসলিম লীগের পক্ষে ফরিদউদ্দিন, আনোয়ারুল হক চৌধুরী, আরএসপির ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষে নরেশ চক্রবর্তী, ছাত্র কংগ্রেসের পক্ষে সুভাষ কর, ছাত্র ব্যুরোর পক্ষে মোস্তাফিজুর রহমান, অজিত রায়, ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধীরেন দত্ত এবং সৈয়দ নূরুল ইসলাম ফরিদ। ভিক্টোরিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত ওই সভার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, শহরের স্কুলগুলোয় ছাত্রদের মধ্যে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা হবে। সে অনুযায়ী স্কুলগুলোয় গিয়ে বাংলা ভাষা দাবির যৌক্তিকতা ছাত্রদের বোঝানো হয়।
কুমিল্লায় ১ মার্চ ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট করে। ছাত্ররা ক্লাস থেকে বের হয়ে শোভাযাত্রায় যোগদান করে। শোভাযাত্রাকারীরা ‘আজাদ পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ’, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি কর’, ‘প্রধানমন্ত্রী বরবাদ’ প্রভৃতি ধ্বনি করে। শোভাযাত্রাকারীরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ভবনের সম্মুখে ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শোভাযাত্রা টাউন হলে গিয়ে শেষ হয়; সেখানে এক বিরাট সভা হয়; বিভিন্ন বক্তা বাংলা ভাষার সমর্থনে বক্তৃতা করেন। একজন ছাত্র উর্দুর পক্ষে কিছু বলার চেষ্টা করলে সবাই চিত্কার করে তাকে থামিয়ে দেয়। মুসলমান ছাত্ররা শোভাযাত্রায় প্রধানত অংশগ্রহণ করেছিল। স্থানীয় উকিল ও মোক্তার বারের প্রায় সবাই বাংলা ভাষার সমর্থক। এ জনসভায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।
পাকিস্তন গণপরিষদে ব্যবহার্য ভাষা থেকে বাংলাকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে সদ্য গঠিত সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। সে ধর্মঘট সাফল্যজনকভাবে কুমিল্লায় পালিত হয়। ১১ মার্চ টাউন হলের পূর্ব মাঠে বদরুল হুদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তৃতা করেন ফয়েজউল্লাহ, অবিনাশ সাহা, জিয়াউল হক, রুহুল আমিন কায়সার, এবিএম মূসা, শাহ আবদুল ওয়াদুদ, আমীরুল ইসলাম মজুমদার প্রমুখ। এখানে ছাত্র ফেডারেশনের চিত্ত বসুর বক্তৃতা করার কথা ছিল কিন্তু আন্দোলনের কৌশল হিসেবে তিনি বক্তৃতা করেননি। কারণ বাংলা ভাষার পক্ষের সব তত্পরতাকে মুসলিম লীগ তখন ভারতীয় কর্মকাণ্ড বলে প্রচার করত। সভা শেষে শহরে মিছিল বের করা হয়।
১১ মার্চ ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে ১৫ এমনকি ১৬ মার্চ পর্যন্ত সাধারণ ধর্মঘট ও ছাত্র ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। কুমিল্লার ছাত্ররা বিপুল উদ্দীপনার সঙ্গে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৮ সালে কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে উপর্যুক্ত ব্যক্তি ছাড়াও ভূমিকা রাখেন চিত্ত বসু, ফয়েজউল্লাাহ, মোস্তাফিজুর রহমান। কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলনে বামপন্থী রাজনৈতিক দল, ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ এবং তমদ্দুন মজলিস সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে; এর মুখ্য ভূমিকায় ছিল ছাত্রসমাজ। তখন মুসলিম লীগ ছিল প্রভাবশালী। মুসলিম লীগ ভাষা আন্দোলনে কেন্দ্রীয় রাজনীতির অনুকূলে কাজ করত। এর প্রবণতা আঞ্চলিক পর্যায়েও অনুরূপ ছিল। তবে লক্ষ করা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে তারা ভাষা আন্দোলনের মতো ন্যায্য আন্দোলনে তাদের সমর্থনও ছিল উল্লেখযোগ্য। মুসলিম লীগের সেই সময়কার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ফয়েজউল্লাহর স্মৃতিচারণ প্রণিধানযোগ্য:
আমাদের কার্যকলাপে মুসলিম লীগরা আসত না; না আসারই কথা। কেননা কেন্দ্রীয় রাজনীতি তাদের প্রভাবিত করত। তবে আমাদের কাজকর্মে বাধা দিত না— আবার সমর্থনও যে করত তা নয়। মুসলিম লীগের বক্তব্য ছিল এ রকম যে, বাংলা হিন্দুর ভাষা, এটাকে নিয়ে হইচই করা ঠিক নয়। এটা ভারতের উসকানি। আমরা পাকিস্তানি না বাঙালি— যেহেতু আমরা পাকিস্তানি অতএব আমাদের ভাষা হবে উর্দু। মানুষ এত সচেতন ছিল না, তাই তারা প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হয়েছে এবং বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছে ক্ষেত্রবিশেষে। এসব পরিস্থিতি আমাদের সামাল দিতে হতো।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল জনদাবি। তা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ এটিকে ভালো চোখে দেখেনি। কারণ এবিএম মূসার মতে, সে সময় মুসলিম লীগ কর্মীরা আমাদের কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করত। কিন্তু আমাদের প্রবল আন্দোলনের মুখে তারা সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু সেই যে দোদুল্যমানতা, আদেশ ও অনুপ্রেরণার দ্বন্দ্ব— এর উদাহরণ পাওয়া যায় বদরুল হুদা চৌধুরীর স্মৃতিচারণে:
বিরোধিতা যা হয়েছে তা সামান্য। তখন আবাদ নুরুদ্দিন মাহমুদ সাহেবরা আমাদের বাধা দিয়েছেন কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে আবাদ সাহেবও পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার পক্ষে বক্তৃতা করেছেন। দলিলুর রহমান নামে একজন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কথা বলেছে— আমাদের একটি মিটিং ভেঙে দেবার চেষ্টা করেছে। আমার ওপর ঢিল ছুড়েছে— বাম চোখে এখনো এর দাগ আছে।
১৯৪৮-এর ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উর্দুর পক্ষপাত পূর্ববঙ্গবাসীর মনে তিক্ততার সৃষ্টি করে। এতে আন্দোলনটি অধিকতর গতিশীল হয়ে ওঠে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববঙ্গ সরকার ও মুসলিম লীগ রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে জনমত সৃষ্টির প্রয়াস চালায়। কুমিল্লায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের গভর্নর লিয়াকত আলী খান কুমিল্লায় আগমন করেন। এ সময় কুমিল্লা জেলা মুসলিম ছাত্রলীগ লিয়াকত আলী খানের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করে। স্মারকলিপিতে পাকিস্তানের সর্বত্র শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্ব-স্ব প্রদেশের ভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় যে, মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যম হলে শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য যথার্থভাবে বাস্তবায়িত হবে। শিক্ষার সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার যে যৌক্তিতা এখানে তুলে ধরা হয়েছে, আসলে এর মধ্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিই এক নিবিড় ও গভীর সমর্থন লক্ষ করা যায়, যা রাষ্ট্রভাষা বাংলার ভিত্তিমূলকে আরো শক্ত করে তোলে এবং তা তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৮-এ নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রচলনের পক্ষে যুক্তি দেন। তা ১৯৪৯ সালে দানা বেঁধে ওঠে। আরবি হরফে বাংলা লিখন প্রক্রিয়ার বিরোধিতার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারে উদ্যোগে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় আরবি হরফে বাংলা শিক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল— এ সম্পর্কে ফয়েজউল্লাহ বলেন:
আরবি হরফে বাংলা শিক্ষা প্রক্রিয়ায় হোচ্ছা মিয়া মাদ্রাসায় (বর্তমানে স্কুল) তত্কালীন সুপারিন্টেন্ডেন্ট আখতারুজ্জামানের পরিচালনায় নৈশ বিদ্যালয় খোলা হয়। পাড়ার লোকেরা এখানে আসত। কিন্তু তেমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। এই প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা করা হয়। ফলে এ উদ্যোগ সফল হতে পারেনি— আপনা আপনি ঝিমিয়ে পড়ে।
এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার সর্বত্র প্রতিবাদ হয়। এটি যে বাংলা ও বাংালির সমাজ ও সংস্কৃতির বুনিয়াদ নষ্ট করার হীন চক্রান্ত তা বুঝতে কারো কষ্ট হয়নি। ১৯৪৯-এর ২৩ ডিসেম্বর কুমিল্লা টাউন হল প্রাঙ্গণে ত্রিপুরা জেলা তমদ্দুন মজলিসের সভাপতি সফিউল হকের সভাপতিত্বে বাংলা ভাষায় উর্দু হরফ প্রবর্তনের পরিকল্পনার প্রতিবাদে জনসভা হয়। মজলিসের রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান শাখার সম্পাদক মফিজুর রহমান, বদরুল হুদা চৌধুরী প্রমুখ বক্তৃতা করেন। উর্দু হরফ প্রবর্তনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল ছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলতেই থাকে।
১৯৫০-এর শেষ দিকে গঠিত হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন ডিএসএফ। এ সংগঠনটি ভাষা আন্দোলনকে সবার সম্মুখে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে চেষ্টা করছিল। ১৯৪৯-১৯৫১ সালের মার্চ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো কর্মতত্পরতা পরিলক্ষিত না হলেও পঞ্চাশের শেষ প্রান্তে ডিএসএফ মুখর হতে থাকে। এ সম্পর্কে মোহাম্মদ উল্লাহর মুখ থেকে শুনি:
ধীরে ধীর ’৫০ সাল থেকেই কলেজের চার দেয়াল ভেঙে ডিএসএফের উদ্যোগে আমরা ভাষার দাবিকে মাঠে-ময়দানে নিয়ে আসতে শুরু করি। ভাষা নিয়ে সরকারি মহলে যেমন ষড়যন্ত্র, তেমনি ছাত্রসমাজও ছিল বিভ্রান্ত, আর রাজনীতিবিদরা ছিল নিষ্ক্রিয়। জনগণ ছিল নিশ্চুপ। আমরা শহরের রিখশা শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিকদের নিয়েও কাজ শুরু করেছিলাম।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে সর্বদলীয় ভিত্তিতে ছাত্র সংগঠন ডিএসএফ যে প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করেছিল, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরপর ১৯৫১-এর ২৭ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ প্রতিষ্ঠাও পূর্ব বাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রে বড় ঘটনা। যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলন নতুন মাত্রা অর্জন করে। কুমিল্লায় পূর্বাপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুবলীগ সমানতালে কাজ করতে থাকে।
পূর্ব বাংলায় তখন চলছিল শিক্ষক আন্দোলন। শিক্ষকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ধর্মঘট করতে থাকেন। ১৯৫১ সালের ১৬ মার্চ কুমিল্লায় পূর্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সেদিন তিনি যে বক্তৃতা করেন, তা ছিল যুগান্তকারী। তিনি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার পরিবর্তে উর্দু প্রবর্তনের চেষ্টার তীব্র নিন্দা করে এর বিরুদ্ধে প্রতিটি বাঙালিকে প্রতিবাদ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন: ‘বাংলা ভাষা অবহেলিত হইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহ করিব’। তার এই তেজস্বী বক্তব্য পূর্ববঙ্গবাসীকে সাহস জোগায়; মনোবল দৃঢ় করে।
২. ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তৃতার পর কুমিল্লায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কুমিল্লায় ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের স্থানীয় শাখার উদ্যোগে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে এবং শোভাযাত্রা বের করে নানা ধরনের বিক্ষোভাত্মক ধ্বনিসহ প্রধান প্রধান রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। ওইদিনই বিকালে টাউন হল প্রাঙ্গণে ছাত্র ও জনসাধারণের এক মিলিত জনসভা হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ আমীর হোসেন। সভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের ও রাষ্ট্রভাষা সমস্যা সমাধানের আগে জনমত গ্রহণের দাবি জানিয়ে এবং আরবি হরফে বাংলা শিক্ষার উদ্ভট পরিকল্পনার নিন্দা করে কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট কুমিল্লায় সফলভাবে পালিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত পর্যায়ের সূচনা এভাবেই শুরু। তখন রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। ’৫২ সালের জানুয়ারি থেকে যুবলীগ দেয়াল লিখন, রাস্তার চৌমাথায়-তেমাথায় পথসভা করতে শুরু করে। বন্দি মুক্তি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদানের দাবিও সামনে আনে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল পতাকা দিবস। তা কুমিল্লায় উদযাপিত হয়।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে সার্থক করে তোলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। এসব তত্পরতার প্রাণকেন্দ্র ছিল আরএসপি ও যুবলীগের কার্যালয়। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর বাসভবনের পাশে ভুবন চন্দের মিষ্টির ডেরার পেছনে (বর্তমান কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের ডা. মুছলেহউদ্দিন আহমদের বাসার উত্তর দিকেই ছিল একটি টিনের ডেরা— এখানেই ছিল আরএসপি ও যুবলীগের কার্যালয় তথা ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র)। অবশ্য একুশ-উত্তর পর্বে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভাষা আন্দোলনের কার্যালয় নির্ধারণ করা হয়। কান্দিরপাড়ের সমবায় মার্কেটের দোতলায় অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদের বাসাও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি সরকারের ছিল বিরূপ মনোভাব। ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের আড্ডা ছিল ভুবন চন্দের দোকানে। সাদা পোশাকধারীদের আড্ডাও শুরু হলো তার দোকানে। তিনি তাদের চিনতেন এবং কর্মীদের আকারে-ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতেন। এক বিতর্কে উত্তাপ সৃষ্টি হলে তিনি নির্ধারিত গলার আওয়াজ দিয়ে পেছনের অফিসের কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি সংকেত দিতেন। তার মিষ্টির দোকানের মিষ্টির হাঁড়ির নিচে লুক্কায়িত রাখা হতো বিভিন্ন কাগজপত্র।
একুশে ফেব্রুয়ারি কুমিল্লায় শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালিত হয়। সর্বদলীয় কর্মপরিষদের নির্দেশানুসারে একুশে ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা শহরে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। স্কুল-কলেজের ছাত্র ও ছাত্রীরা দলবদ্ধভাবে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। শহরের সব দোকানপাট ও যানবাহন বন্ধ ছিল। ছাত্রদের এক বিরাট শোভাযাত্রা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা হউক’ ধ্বনি করতে করতে সব শহর পরিভ্রমণ করে। নুনাবাদ নামে অবাঙালি বাস্তুত্যাগীদের কলোনির কয়েকটি দোকান খোলা রাখা হয়। ছাত্রদের শোভাযাত্রা কলোনির কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্ররা দোকানদারকে দোকান বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করে। তা নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হওয়ায় কলোনির অবাঙালিরা দলবদ্ধভাবে শোভাযাত্রার ওপর আক্রমণ করে ছাত্রদের মারপিট করে। ফলে কয়েকজন ছাত্র আহত হয়। দুজন ছাত্র হাসপাতালে আছে। এ ঘটনায় শহরে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়। অপরাহ্ন ৫ ঘটিকায় টাউন হলে বিরাট সভায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। ছাত্রনেতারা বক্তৃতা প্রসঙ্গে ছাত্রদের ওপর অহেতুক আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে; তারা আরো বলে যে, পূর্ববঙ্গবাসীর গণতান্ত্রিক দাবি গৃহীত না হলে এবং তাদের আত্মবিকাশের পথ রুদ্ধ হলে এমন একদিন আসবে, সেদিন পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপ গ্রহণ করবে। সভায় অবাঙালি দোকান বয়কট করার দাবি জানিয়ে আরো একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। বক্তারা পূর্ববঙ্গ সরকার ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেয়ার আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। বক্তারা পাকিস্তান সরকারের ফ্যাসিস্ট মনোবৃত্তির তীব্র নিন্দা করেন। নুনাবাদ মোহাজের কলোনির লোকজন কর্তৃক ছাত্রদের আক্রমণ একতরফা বিষয় ছিল না। আসহাবউদ্দীন আহমদের স্মৃতিচারণে তা স্পষ্ট:
‘প্রথমটায় দোকান বন্ধ করার ব্যাপারে বচসা হয়। ছাত্ররা খুব কর্কশভাবে তাদের দোকান বন্ধ করতে বলে। তারাও রূঢ়ভাবে দোকান বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ঋত্ড়স ড়িত্ফং ঃড় নষড়ংি। ছাত্ররা বুঝিয়ে-সুজিয়ে বললে হয়তো দোকান বন্ধ করত। ঘটনা দুর্ঘটনার পথ নিত না। ছাত্ররা খুব ওসঢ়ধঃরবহপব দেখায়, যা তাদের পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক। মারামারির ফলে আহত হয়ে একজন যুবক এবং একজন ছাত্র হাসপাতালে নীত হয়।’
(বাকী অংশসহ পুরো নিবন্ধ পড়ুন বণিক বার্তা অনলাইনে)
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






