ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধিকার সংগ্রামের ভিত্তিমূল। এর সোপান ধরেই ধর্মীয় ভাবাদর্শে গড়ে ওঠা পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। শুধু তা-ই নয়, বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর একুশে ফেব্রুয়ারি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব মুসলিম লীগ সদস্যদের দ্বারা নাকচ হলে পূর্ববঙ্গের সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাবনা শহরেও তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এখানকার ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে জনমত গঠনে সহায়তা করেন মুসলিম লীগের হাশেম-শহীদ গ্রুপের নেতা আমজাদ হোসেন, ছাত্রনেতা নঈমুদ্দিন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাবেরা মুর্শেদ, শাহজাহান মোহাম্মদ, পাবনা জিলা স্কুলের হেড মাওলানা কসিমুদ্দিন আহমদ, এডওয়ার্ড কলেজের আরবি শিক্ষক মাওলানা আবদুল হামিদ প্রমুখ ব্যক্তি। ২৬ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিক যুবলীগ, জনকৃষ্টি পরিষদ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র কংগ্রেস, র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টি ও মুসলিম লীগের উদারপন্থী অংশের নেতারা দেওয়ান লুত্ফর রহমানের বাসভবনে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদসভা ও ২৯ ফেব্রুয়ারি হরতাল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাবনা টাউন হলের সভায় লুত্ফর রহমানকে আহ্বায়ক এবং এএলএম মাহবুবুর রহমান খান ও আমিনুল ইসলাম বাদশাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় পাবনার ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি।’ এরপর হরতাল সফল করতে লিফলেট বিলিসহ চুঙোর মাধ্যমে চালানো হয় ব্যাপক প্রচার। ২৮ ফেব্রুয়ারি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এমদাদ আলীর বাসভবনে ছাত্রনেতাদের ডেকে এক বৈঠক করা হয়। বৈঠকে আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, এমএ হামিদ, দেওয়ান লুত্ফর রহমান, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, আব্দুর রশিদ মাহমুদ, পাবনার এসপি, এসডিও ও কয়েকজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধ সত্ত্বেও ছাত্রনেতা এএলএম মাহবুবুর রহমান ও আমিনুল ইসলাম বাদশাসহ অন্যরা হরতাল পালনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। নিষিদ্ধ করা হয় সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েত। এদিকে মাওলানা আব্দুল্লাহেল কাফী হরতালের বিপক্ষে লিফলেট বিলি করেন এবং তার ভক্তদের হরতাল পালনে নিষেধ করেন।

১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে ও হরতাল পালন করে। সঙ্গে যোগ দেন বিড়ি ও হোসিয়ারি শিল্পের শ্রমিকরা। মিছিলটি পাবনা শহরের মেইন রোড হয়ে ডাকঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ বাধা দেয় এবং লাঠিচার্জ করে। কয়েকজন ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়। অনেকে আহত হয়। পরে আদালত তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দেন। ১ মার্চ ছাত্রনেতা এএলএম মাহবুবুর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গ্র্রেফতার করা হয় পাবনার লুত্ফর রহমান, আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রণতি কুমার রায়সহ অনেককে। তাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র আহ্বানে ৫ মার্চ পাবনা শহরে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বক্তৃতা করেন র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ডাক্তার মণীন্দ্রকুমার মজুমদার, রওশনজান চৌধুরী ও মুসলিম লীগ নেতা ডাক্তার তোফাজ্জল হোসেন।

১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষার তালিকা থেকে বাংলা ভাষা বাদ দেয়া, পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীর নিযুক্তির পরীক্ষায় বাংলা ভাষা বাদ দেয়ার প্রতিবাদে ১১ মার্চ সারা পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘট সফল করার জন্য পাবনার ছাত্র-জনতা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আগের দিন গ্রেফতার করা হয় আমজাদ হোসেন, রওশনজান চৌধুরী, প্রদীপকুমার রায়, মোসলেম উদ্দিন মোক্তারসহ আটজনকে। ১১ মার্চ ছাত্ররা বিশেষ ক্ষমতা অর্ডিন্যান্স অমান্য করে বিক্ষোভ করে। পুলিশ অনেককে গ্রেফতার করে এবং ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায়। ওইদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করা ছাত্ররা এডওয়ার্ড কলেজের সামনে আসে এবং স্লোগান দেয়। এরপর এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলের স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি। পাবনার বিভিন্ন স্থানে ওইদিন ধর্মঘট ও বিক্ষোভ পালিত হয়। ১১ মার্চের হরতাল ও মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ঢাকা থেকে পাবনায় এসেছিলেন আবদুল মতিন (পরবর্তীকালে ভাষা মতিন নামে পরিচিত হন)। ১১ মার্চ পাবনায় অনুষ্ঠিত ধর্মঘট সম্পর্কে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার সংবাদে বলা হয়: ‘রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সাধারণ ধর্মঘটের দিন গতকল্য ছাত্রগণ হরতাল পালন করে এবং বিশেষ ক্ষমতা অর্ডিন্যান্স অমান্য করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই সম্পর্কে গত বুধবার কয়েকস্থানে তল্ল­াশী করা হয় এবং রোসেনজান, আমজাদ হোসেন ও অন্য তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।’ (১৫ মার্চ, ১৯৪৮)

মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী ছাত্র-জনতা তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটে ইতিহাসের মর্মান্তিক ঘটনা। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সারা দেশে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের আগুন। এদিকে পাবনায় ভাষা আন্দোলন সফল করার জন্য এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি আবদুল মোমিন তালুকদারকে আহ্বায়ক ও ছাত্রলীগ নেতা আজিজুল হককে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আরো যেসব ছাত্রনেতা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা হলেন ফজলুল আজিম, আনসার আলী, ফজলে কবির, শওকত আলী, মাহমুদ আলম খান, মো. আলাউদ্দিন, হাসান আলী মোল্লা, শামসুজ্জোহা, জয়নাল আবেদীন খান, আজাহার আলী, আবদুল মতিন লাল মিয়া, আবুল আতা কোরেশী, সৈয়দ রেজা কাদের, আলতাফ হোসেন, রণেশ মৈত্র প্রমুখ। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এমএ হামিদ, এম মনসুর আলী, আব্দুর রব বগা মিয়া, আমজাদ হোসেন, মাহমুদ আলম খান মুকু প্রমুখ নেতা ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল সফল করতে পাবনার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্ররা শোভাযাত্রা করেন। এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা জিলা স্কুল ও জিসি ইনস্টিটিউশনের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে এবং ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করে। বিকালে এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়: ‘২১শে ফেব্রুয়ারী পাবনার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় তিন হাজার ছাত্র ধর্মঘট করিয়া মিছিলসহকারে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে শহরের প্রধান রাস্তাগুলি প্রদক্ষিণ করে। অপরাহ্নে কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা হয়। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এবং উর্দু হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়।’ (১৬ই মার্চ, ১৯৫২)

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রমিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখের শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক খবর পাবনায় পৌঁছলে ছাত্র, শ্রমিক তথা সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফেব্রুয়ারিজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে এবং মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার দাবি জানানো হয়। এ সময় পুলিশ পাবনার ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। অনেককে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। রাজনীতিক মনোরঞ্জন ধর জেলজীবনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন: ‘পাবনা জেলেও দেখলাম, ৪০-৫০ জন ছেলে ভাষা আন্দোলনের কারণে জেলে এসেছে। ওদের দেখে ভালোই লাগল।’

পাবনায় সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের সংবাদ সে সময়ের ঢাকার ‘দৈনিক আজাদ’, ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’সহ নানা পত্রিকায় ছাপা হয়। ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ছাপা হয়: “গতকল্য পূর্ব্বাহ্ন ১১ ঘটিকায় পাবনায় প্রায় তিন হাজার ছাত্র ধর্মঘট করিয়া ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র বন্দীদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি ধ্বনিসহ সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করেন। অপরাহ্নে কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা হয়। সভায় মির্জ্জা শওকত হোসেন সভাপতিত্ব করেন। সভায় বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণের এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষা প্রচলনের অদ্ভুত প্রস্তাব প্রত্যাহারের এবং অবিলম্বে ছাত্রদের মুক্তি দাবী করিয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়।” ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদে’ আরো ছাপা হয়: ‘ঢাকায় জনতার উপর পুলিশের গুলীবর্ষণের নিন্দা করিয়া ও অবিলম্বে এই সম্পর্কে তদন্তের জন্য বেসরকারী প্রতিনিধিদের লইয়া তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানাইয়া গতকল্য এইখানে ছাত্র ও জনসাধারণের সম্মিলিত দুই মাইল দীর্ঘ এক শোভযাত্রা বাহির করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান রাস্তা পরিভ্রমণ করে। শহরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয় এবং মুসলিম লীগ, বণিক সমিতি, ছাত্র ও অন্যান্যদের উদ্যোগে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। গুলীবর্ষণের ফলে নিহতদের পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করিয়া এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানাইয়া সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয়। ইহা ছাড়া আরবী হরফে বাংলা লেখার পরিকল্পনা বাতিলের জন্য সরকারের নিকট দাবী জানানো হয়।’ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পাবনা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সিরাজগঞ্জ, শাহজাদপুর, ফুলবাড়ী, ঈশ্বরদী, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া প্রভৃতি স্থানে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ভাঙ্গুড়ায় ভাষা আন্দোলনের সময় যে সমাবেশ হয়েছিল, সে সম্পর্কে ১৯৫২ সালের ৯ মার্চ ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকায় ছাপা হয়। পাবনার ভাষা আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করেন।

পাবনা জেলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বহুরৈখিক ও বিপরীতধর্মী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আটচল্লিশে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, বায়ান্নতে তাদের অনেকেই ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন। আবার আটচল্লিশে বিরোধিতাকারীদের অনেকেই বায়ান্নতে এসে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। পাবনা জেলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান, ভাষা মতিন, মোহাম্মদ সুলতান প্রমুখ ব্যক্তি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৫১ সালে এডওয়ার্ড কলেজের বার্ষিক মিলাদের অনুষ্ঠানে এসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বক্তব্য রাখেন, যা রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জনমত গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কয়েক দিন আগে মোনাজাতের মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলন করতে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন। আতাউর রহমান গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন ও বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে প্রগতিশীল কর্মীদের চেতনাকে শানিত করেন। মোহাম্মদ সুলতান ও আবদুল মতিন পাবনায় এসে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করে আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। ঢাকায় সংঘটিত ভাষা আন্দোলনেও রয়েছে পাবনার মানুষের অসামান্য অবদান। পাবনার তেজোদীপ্ত সন্তান আবদুল মতিন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অযৌক্তিক বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন। ঢাকায় সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন পাবনার আরেক কৃতী সন্তান ডা. সাঈদ হায়দার।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ভাষা আন্দোলনে পাবনা জেলার মানুষের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। বাংলা ভাষার দাবিতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমেছে, জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছে। এ জেলার ভাষা আন্দোলন প্রবল রূপ ধারণ করেছিল, যার ইতিহাস বিস্তারিতভাবে স্থান পেয়েছে রোদেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে। এ আন্দোলন স্মরণ করায়, পাবনার মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। এ জেলার নীল বিদ্রোহ, প্রজা বিদ্রোহের মতোই ভাষা আন্দোলনও ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। এ আন্দোলনের পথ ধরেই পাবনার সংগ্রামী মানুষ ভুট্টা আন্দোলনসহ সব আন্দোলন সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় রাখে অনন্য অবদান।

 

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়