মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হয়। বিগত সাত বছরে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে আপনারা কতটা ভূমিকা রাখতে পেরেছেন বলে মনে করেন?

আমাদের মূল কাজ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন কোর্সকে অ্যাক্রেডিট করা। আমাদের অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেটে এটা বোঝাবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কোর্স মানসম্মত শিক্ষার সব শর্ত পূরণ করেছে এবং এখানকার শিক্ষার্থীরা মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা পাচ্ছে। এর ফলে অনেক সময় শ্রমবাজারে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয় সেটি ঘটবে না। তবে এটি এমন কোনো প্রক্রিয়া নয় যেটি রাতারাতি হয়ে যাবে। অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের আগে দীর্ঘ প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো আমরা এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছি। অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছি। আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব শর্ত পূরণে কাজ করছে। তাদের একাডেমিক-প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন করছে, মানের উন্নয়ন করছে।

স্বাধীনতার পর অর্ধশতকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমাদের শিক্ষা খাতকে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শিক্ষ খাতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। স্বাধীনতার আগে দেশের শিক্ষার যে অবস্থা ছিল স্বাধীনতার পরও তার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সাক্ষরতার হারসহ কিছু ক্ষেত্রে আমরা উন্নতি করেছি। তবে শিক্ষার মানসহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবস্থা একই আছে। এর একটি কারণ হলো পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি। গত কয়েক দশকে শিক্ষার উন্নয়নে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। সঠিকভাবে এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে আমাদের শিক্ষা খাত ভালো অবস্থানে থাকত। কিন্তু সেটি হয়নি। এ বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে পরিকল্পনার ঘাটতি, রাজনৈতিক কারণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বহুবিধ বিষয় রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নতুনত্বকে গ্রহণের প্রতি শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অনীহাও উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

প্রায় সাত বছর পার হলেও অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এখনো একটিও অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট দিতে পারেনি। এর কারণ কী?

অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে আমি নিয়োগ পাই ২০১৮ সালে। সব সদস্যসহ কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে আরো কিছু সময় চলে যায়। এরপর কাউন্সিলের অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, অ্যাক্রেডিটেশনের নীতিমাল তৈরি এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। এ কাজগুলো সম্পন্ন করার পর আমাদের মনোযোগ দিতে হচ্ছে পর্যবেক্ষক টিম তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মতো বিষয়গুলোয়। যেহেতু বাংলাদেশে এ ধরনের কাউন্সিল নতুন তাই আমাদের সবকিছুই নতুনভাবে প্রস্তুত করতে হয়েছে। আবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তো এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী তাদেরও প্রস্তুত হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা তাদের সহযোগিতা দিচ্ছি। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে আবেদন করেছে এবং তাদের অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এক-দুই মাসের মধ্যেই আমরা এক বা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়কে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট দিতে পারব বলে আশাবাদী।

INT-EDUCATION-DAYMAS_220125_4

ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন পেতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ বিষয়ে আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কি?

বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৭-এর ১০ (ছ) ধারায় আন্তঃরাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনা ও সহায়তার মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স এজেন্সির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এছাড়া এশিয়া প্যাসেফিক কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স, রাশিয়ার ন্যাশনাল সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাক্রেডিটেশন, ইন্দোনেশিয়ার অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর এডুকেশন, কাজাখস্তানের ইনডিপেনডেন্ট এজেন্সি ফর অ্যাক্রেডিটেশন অ্যান্ড রেটিংসহ আরো বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আমরা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোলাবরেশন আরো বাড়বে এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।

অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের ক্ষেত্রে আপনারা কোন কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন?

অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের ১০টি প্রধান শর্ত রয়েছে। এ শর্তগুলোর মধ্যে আবার অনেকগুলো ছোট ছোট শর্ত রয়েছে। এ ১০টি শর্তের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন পদ্ধতি, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা, কারিকুলাম, শিখন-শেখানো-মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও সহযোগিতা কার্যক্রম, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, গবেষণা ও মেধাবৃত্তিক কার্যক্রম, মনিটরিং, মূল্যায়ন ও ধারাবাহিক উন্নয়নের মতো বিষয় রয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বিভাগগুলোকে উপযুক্ত পরিচালনা, দক্ষ নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা, আউটকাম বেজড কারিকুলাম, যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক-কর্মকর্তা, পর্যাপ্ত গবেষণা ও মেধবৃত্তিক কার্যক্রম এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

অ্যাক্রেডিটেশন প্রদানের ক্ষেত্রে আপনারা কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন? সংকট কাটিয়ে উঠতে পরিকল্পনা কী?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমরা অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের বিষয়ে বেশ আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এ আগ্রহ কম। এর একটি কারণ হতে পারে অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধিক শিক্ষার্থী পাবে। ফলে তারা অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যমে এগিয়ে থাকতে চাচ্ছে। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয় নেই ফলে তাদের আগ্রহ কম। তবে শিক্ষার্থীদের অর্জিত ডিগ্রির যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য পাবলিক-প্রাইভেট সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেট প্রয়োজন। বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়টি অনুধাবন করে এরই মধ্যে সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছে। আমরা আশা করছি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বিষয়টি বুঝতে পারবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমরা মনে করছি বিভিন্ন কলেজের আওতাধীন ডিগ্রিগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনার বিষয়টিকে। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশের বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়নরত। এ শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ কলেজগুলো যে অবস্থায় রয়েছে তাতে তাদের অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। আমরা কাজটি কীভাবে করতে পারি সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি।

আপনার মতে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষায় মূল সংকটগুলো কী কী?

আমাদের দেশে একটি বড় সমস্যা হলো ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং না থাকা। কোন বিষয়ে কী পরিমাণ গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন এ বিষয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশে শতাধিক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে, অনেক সরকারি-বেসরকারি কলেজে স্নাতক-স্নতকোত্তর চালু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষার্থী যখন শ্রমবাজারে যাচ্ছে তারা কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না। কারণ আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিষ্ঠা হয়নি। অনেক সময় দেখা যায়, যে বিষয়ে প্রয়োজন নেই সে বিষয়ে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট রয়েছে, কিন্তু যে বিষয়ে প্রয়োজন সে বিষয়ে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট নেই। এ কারণেই দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং না থাকার বিষয়টি উচ্চ শিক্ষা খাতে একটি বড় সংকট তৈরি করছে বলে আমি মনে কির। এছাড়া আরেকটি বড় সংকট হলো প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকট। বিশেষত নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ শিক্ষকের খুবই সংকট রয়েছে। সিনিয়র শিক্ষক নেই বললেই চলে। কোনোমতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এবং তারা কাঙ্ক্ষিত মানের দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না। এছাড়া আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষায় আরেকটি সংকট হলো সময়োপযোগী কারিকুলাম না থাকা। সময়োপযোগী কারিকুলামের অভাবেও অনেক সময় আমাদের শিক্ষার্থীরা চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।

মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনা করে ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং করতে হবে এবং সে অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া উচ্চ শিক্ষায় আউটকাম বেজড কারিকুলাম নিশ্চিত করতে হবে। এরই মধ্যে এ কারিকুলাম তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয় যাতে আউটকাম বেজড কারিকুলাম প্রয়োগ করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষায় আরো কয়েকটি বড় সংকট হলো দক্ষ শিক্ষকের সংকট, বাজেটের সংকট, গবেষণার ঘাটতি ও জবাবদিহিতার অভাব। এ সংকটগুলো দূর করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রক্রিয়াটি এমন হতে হবে যাতে সবচেয়ে মেধাবীরাই শিক্ষক হিসেবে আসে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উচ্চ শিক্ষায় নতুন জ্ঞানের সৃজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর নতুন জ্ঞান সৃজনের একমাত্র উপায় গবেষণা। তাই এ জায়গাটিতে বিশেষ জোর দিতে হবে। আমরা যদি এসব সংকট দূর করতে পারি তাহলে দ্রুতই আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হব।