আমাদের শিক্ষা খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, বিশেষত উচ্চ শিক্ষাকে?

স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর দীর্ঘ একটি সময় পার করেছি আমরা। এ সময়ে আমাদের সমসাময়িক রাষ্ট্র মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কোথায় চলে গেছে আর আমরা এখনো কোথায়? আমাদের কিছু খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এটাকে সামগ্রিক উন্নয়ন বলতে পারি না। বর্তমান ইন্ডাস্ট্রি শ্রমভিত্তিক নয় বুদ্ধিভিত্তিক। আর এ বুদ্ধিভিত্তিক উন্নয়নের জন্য বুদ্ধির উন্মেষ ঘটানো এবং সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। সংস্কৃতিটি আসতে হবে শিক্ষা থেকে। এতে বছরেও আমরা শিক্ষার আশানুরূপ উন্নয়ন করতে পারিনি। মনে রাখতে হবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ফাউন্ডেশন থেকে উচ্চ শিক্ষা আসে। সেজন্য এ দুটি সেক্টর উন্নত হচ্ছে কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরে আমাদের মাত্র ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বেড়েছে। এরপর ৯০-এর পর এসেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই তবে গুণগত মানের দিক থেকে বাড়েনি। গুণগতভাবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারিনি আমরা। শিক্ষার ক্ষেত্রে যদি আমরা এগোতে চাই তাহলে গুণগত মানের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা। এ বিনিয়োগ যদি আমরা না করি তাহলে ভবিষ্যতে জাতির জন্য খারাপ সময় আসবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি নৈতিক, মানবিক শিক্ষিত শ্রেণী তৈরি করতে পারছে না?

বিষয়টি যতটুকু না শিক্ষার সঙ্গে জড়িত তার চেয়ে বেশি আমাদের সমাজের সঙ্গে জড়িত। এই যে মানবিকতার কথা বলছেন এটা পরিবার থেকে, শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকে শেখানো দরকার। সে জিনিসটার চরম অভাব রয়েছে দেশে। গত কয়েক বছরে যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে সেখানে দেখবেন অনেক মা-বাবা সন্তানকে প্রশ্নপত্র কিনে দিচ্ছেন। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। এখান থেকে বোঝা যায় আমাদের সমাজ কতটুকু দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। এখানে দুর্নীতিকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি চ্যানেল করে রাখা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন দুর্নীতিগ্রস্ত হয় তখন প্রতিষ্ঠানের সবাই দুর্নীতি করবেন। যদি রাষ্ট্রের প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত না হন এবং সঠিক বিচার ব্যবস্থা থাকে তাহলে দুর্নীতি কখনো হবে না। এটার আরেকটি কারণ বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়েই উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আপনার কী মত?

শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। এ অভাবের অন্যতম কারণ আর্থসামাজিক কারণে হোক বা অন্য কারণে হোক যোগ্য শিক্ষকদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া। যারাই দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের জন্য ভালো একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন ডিগ্রি শেষ করে তারা আবার ফিরে আসেন। সবাই যে বিদেশে থেকে যেতে চান তা কিন্তু নয়, অনেকে বাধ্য হয়ে থেকে যান। তাদের জন্য যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই অনেকে ফিরে আসবেন। ফিরে এলেই এ ঘাটতি পূরণ হবে।

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের কারিকুলামের একটি সংযোগ থাকতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি কী ধরনের গ্র্যাজুয়েট চায় সেটা আমাদের জানতে হবে এবং সেভাবে কারিকুলাম আপডেট করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষকদের উৎসাহ অনেক কম। কারণ এখানে পরিশ্রম করতে হবে, সময় ব্যয় হবে। এসবের একটি কারণ রয়েছে। আমাদের চারপাশে দেখা যায় পদোন্নতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয় রাজনৈতিক কারণে, গ্রুপিংয়ের কারণে। এগুলো থেকে সরে আসতে হবে। এটিও একটি দুর্নীতি, যা শিক্ষা ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থার যতদিন না উত্তরণ হবে ততদিন আমাদের উন্নয়ন সম্ভব না।

বিশ্বের বিভিন্ন র‍্যাংকিংয়ের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। যেসব প্যারামিটার র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

এ প্যারামিটারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গবেষণা। গবেষণা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি গবেষণা প্রকাশ করার জন্য অনেক বড় বাজেটের দরকার হয়, যা একজন শিক্ষকের জন্য কষ্টসাধ্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য একটি ফান্ড আছে সেখান থেকে পুরো টাকা আমরা দিয়ে দিই। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্যও বরাদ্দ দিই।

বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট প্রফেশনালদের কোনো ইতিবাচক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। উচ্চ শিক্ষার পর কোয়ালিটি জবে এটা একটা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। আপনি কী ভাবছেন এ বিষয়ে?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকটা ইন্ডাস্ট্রির মতো। ইন্ডাস্ট্রিতে একটি টেমপ্লেট থাকে সেখানে কোনো পণ্য দেয়া হলে সেটি কোয়ালিটি অনুযায়ী বের হবে। আমার টেমপ্লেট যদি ভালো না থাকে তাহলে ভালো প্রডাক্ট আসবে না। এজন্য প্রথমেই আমার যোগ্য শিক্ষক দরকার। একই সঙ্গে যোগ্য শিক্ষার্থীও দরকার। সামগ্রিক পরিবেশটি যদি আমাদের থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারবেন। আমাদের শিক্ষার্থীদের আইকিউ মোটেও খারাপ না। কিন্তু তাদের আমরা সুযোগ দিতে পারি না। আমরা যদি শিক্ষা ক্ষেত্রে ভালো বিনিয়োগ করি তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা একদিন ভালো প্রডাক্ট হয়ে বেরিয়ে আসবেন। পার্শ্ববর্তী দেশও এ খাতে অনেক বিনিয়োগ করে এবং কোয়ালিটি বজায় রাখে। আমাদের গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ সেটা পারছে না। এর কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সুযোগ দিতে হবে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি করতে পারবে।