আজ সপ্তমবারের মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির থিম—‘এআই ও শিক্ষা: অটোমেশনের পৃথিবীতে মানুষের কর্তৃত্ব সংরক্ষণ।’ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৮ সালে শান্তি ও উন্নয়নে শিক্ষার অবদান তুলে ধরার লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ২০১৯ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা শুরু হয়।

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) মহাপরিচালক আদ্রেঁ আজুলে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উৎসর্গ করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের প্রতি। তিনি ইউনেস্কোর সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এ ধরনের প্রশিক্ষণে দরকারি অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে তিনি তাগিদ দিয়েছেন। দিবসটিকে এআইকে উৎসর্গ করে ইউনেস্কো শিক্ষা খাতে এ নতুন প্রযুক্তিটির ব্যবহার ও অবস্থানকে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে আসতে চায়। আদ্রেঁ আজুলে বলেছেন, ‘এআই শিক্ষা খাতে অনেক বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে। বিদ্যালয়ে এর ব্যবহার নৈতিক মূলনীতি দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। এআই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি উপকরণ হবে, যা তাদের জন্য আরো কল্যাণ ও স্বাধীনতা নিয়ে আসবে।’

শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশেও কয়েক বছর ধরেই আলোচনা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবে নানা ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকের সংকট, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে এ সংকটগুলো বিদ্যমান থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার মানের অবনমন ঘটেছে। বাংলাদেশে যে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে আছে—সাধারণ শিক্ষা, আলিয়া মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা, কওমি মাদ্রাসা, ক্যাডেট শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যম। এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে শিক্ষায় যখন কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তখন সামগ্রিকভাবে সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না এবং বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের মধ্যে দক্ষতাসহ নানা পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এছাড়া এসব ব্যবস্থার অধীনে আবার নানা উপধারা রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২২ অনুযায়ী শুধু প্রাথমিক শিক্ষায়ই আমাদের ১১ ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। নানা ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ দক্ষ শিক্ষকের অভাব। পর্যাপ্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে মেধাবী শিক্ষকরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হচ্ছেন না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষকদের বেতন তুলনা করে দেখা গেছে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন বিশ্বে অন্যতম নিম্নতর। কম বেতন ভাতার পাশাপশি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব এ সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে। ২০১১ সালের শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও ২০২২ সালের শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলনা করে দেখা গেছে গত ১০ বছরে আমাদের শিক্ষার মান আরো নিম্নগামী হয়েছে। তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর অধিকাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণী অনুযায়ী উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া এ ঘাটতি পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তরেও থেকে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা স্নাতক-কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায় সম্পন্ন করার পরেও তাদের মধ্যে মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতি থাকছে। তারা পর্যাপ্ত কর্মদক্ষ হয়ে উঠছেন না এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।

শিক্ষাবিদরা এ অবস্থার জন্য প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মান খারাপ হওয়া এবং পরিকল্পনাহীন উচ্চ শিক্ষাকে দায়ী করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই রাজনৈতিক বিবেচনায় গড়ে উঠেছে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদারও সামঞ্জস্য নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ মৌলিক গবেষণা হলেও দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ চর্চা খুব কম। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে। আমাদের দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারছে না।

স্বাধীনতার পর গত অর্ধশতকে প্রত্যেক সরকারের পক্ষ থেকেই শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। নানা প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো কিছু বিষয় ব্যতীত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে এ প্রকল্পগুলো খুব একটা প্রভাব রাখতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ বেশিরভাগ প্রকল্পেই অবকাঠামো উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ভবন, কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এর প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিতে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি, উপযুক্ত জনবল তৈরি করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ল্যাবগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিকুলাম নিয়েও একটি বড় সংকট রয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন আমরা শিক্ষা খাতে সুদূরপ্রসারী ও আধুনিক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারিনি। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই কারিকুলাম প্রণয়ন করা হচ্ছে, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে দেশের যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে।

যেকোনো দেশের উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেরও বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হলে শিক্ষা খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাবিদরা জানান, ‌এ খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। সরকারের উচিত বিষয়টি নিশ্চিত করা। এছাড়া শিক্ষায় সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছেন অনেকে। এছাড়া শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাবিদসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান সংকট নিরসন ও সামনের দিনের বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিযোগিতার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণও জরুরি। এআইয়ের যুগে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় এমন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তাই এ যুগে শিক্ষা খাতে আধুনিক ব্যবস্থাপনাও জরুরি হয়ে উঠেছে।