সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের আকাঙ্ক্ষা চিরকালীন। মায়ের গর্ভে সন্তান না এলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই হতাশায় ভুগতে থাকেন। ইনফার্টিলিটির সমস্যা স্ত্রীর পাশাপাশি স্বামীর কারণেও হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা মানবদেহের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দিয়েছে। আজকের দুনিয়ায় ইনফার্টিলিটি সমস্যারও সমাধান আছে। প্রাথমিক বেশ কিছু প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে সমাধান দিতে পারে আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন।

এখনকার সময়ে পড়াশোনা শেষ করে ক্যারিয়ার গুছিয়ে মাতৃত্বের কথা চিন্তা করেন অনেক নারী। ফলে ততদিনে অনেকেরই বয়স ৩০ পেরিয়ে যায়। এ সময় সন্তান ধারণে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা যায়। আধুনিক জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেও বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়।

আইভিএফ পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে একটি কাচের জারের ভেতরে নারীর শরীরের ডিম্বাণু আর পুরুষের শুক্রাণুর মিশ্রণ ঘটানো হয়। আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনকে বলা যায় মানুষের সফল সহায়ক পুনরুৎপাদন পদ্ধতি। কাচের ভেতরে ডিম্বাণু নিষিক্ত করার এ পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক ছাড়াই জন্মদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেকে আইভিএফকে টেস্টটিউব পদ্ধতি নামেও জানেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আইভিএফ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক নিঃসন্তান নারী সন্তান ধারণ করার সুযোগ পান, একইভাবে সারোগেসি বা গর্ভ ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

যেসব নারী ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভুগছেন তাদের মধ্যে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা বেশি দেখা দেয়। শুক্রাণুর অস্বাভাবিকতা, ডিম্বাশয়, ডিম্বনালি বা জরায়ুর সমস্যা, ডিম্বাণু নিঃসরণে অসুবিধা, এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রেও গর্ভধারণে সমস্যা হয়। নিঃসন্তান দম্পতিদের ক্ষেত্রে প্রথমে ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দিয়ে স্ত্রীর ডিম তৈরির চেষ্টা করা হয়। স্বামীর সমস্যা থাকলে তাকে ওষুধ দিয়েও অনেক সময় ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। ওভারিতে সিস্ট, ফেলোপিয়ান টিউবে ব্লক, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পলিসিস্টিক ওভারি থাকলে অনেক সময়ে ল্যাপরোস্কোপি-হিস্টিরিয়োস্কোপি করা হয়। এ পদ্ধতিগুলোতে সন্তান আসার সম্ভাবনা বাড়ে। এগুলোতে কাজ না হলে আইইউআই (ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন—ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে কাছাকাছি আনা হয়) অথবা আইভিএফের পরামর্শ দেয়া হয়।

আইভিএফকে সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির (এআরটি) সর্বাধিক পরিচিত ধরন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইভিএফে ওষুধ ও অস্ত্রোপচার পদ্ধতির মাধ্যমে শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়, পরে সেই নিষিক্ত হওয়া ডিম্বাণু আবার নারীর জরায়ুর ভেতরে স্থাপন করতে সাহায্য করা হয়।

সাধারণভাবে এ পদ্ধতিতে শুরুতে কিছু ওষুধ নিয়ে বেশকিছু ডিম্বাণুকে উপযুক্ত ও নিষিক্ত হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। এরপরে ডাক্তাররা সেই ডিম্বাণুকে শরীরের বাইরে বের করে আনেন এবং ল্যাবে সেটার সঙ্গে শুক্রাণুর মিশ্রণ ঘটানো হয়, তারপরে যখন ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে যায়, তখন সেটা আবার নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। জরায়ুর আস্তরণে ভ্রূণ স্থাপন করলেই কেবল গর্ভধারণ হয়।


আইভিএফের অনেকগুলো পর্ব থাকে। আর সেগুলো পূরণ করতে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টাতেই বাবা-মা হওয়ার সুযোগ মিললেও অনেককে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়। আইভিএফ গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। তার পরও শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয় বলেই মন্তব্য চিকিৎসকদের। কারণ প্রতিটি মানব শরীর আলাদা এবং আইভিএফ সবার ক্ষেত্রে একই রকম কাজ করে না।

প্রথম আইভিএফ

ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যামের রয়টনে ড. কেরশজ কটেজ হাসপাতালে প্রথম টেস্টটিউব শিশুর জন্ম হয়। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করা মানবসন্তানের নাম লুইস জয় ব্রাউন। তার মা লেসলি ও বাবা পিটার ব্রাউন। আইভিএফের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তার জন্ম হয়। তাছাড়া ওই পদ্ধতিতে কোনো উদ্দীপক ব্যবহার করা হয়নি। আইভিএফ পদ্ধতি আবিষ্কার করায় ২০১০ সালে ফিজিওলজি বা চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান রবার্ট জি এডওয়ার্ড। তিনি প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ জিন পার্ডির সঙ্গে একত্রে এ চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু তারা আর নোবেলের জন্য মনোনীত হননি, কারণ তারা দুজনেই ওই সময়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেয়ার রেওয়াজ নেই।

দশকব্যাপী গবেষণার ফলাফল ছিল লুইস ব্রাউনের জন্ম। যদিও জন্মের পর পরই তীব্র জনতদন্তের মুখে পড়তে হয় তাকে। বিকল্প পদ্ধতিতে গর্ভধারণের বিষয়টি সবার সামনে উন্মুক্ত হওয়ার পর পরই সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করে বসে লুইস। অনেক নৈতিক ও আইনি প্রশ্নও ওঠে তার জন্ম নিয়ে। পরে সেসব কাটিয়ে দুনিয়াজুড়ে এখন আইভিএফ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 

পরবর্তী সময়ে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লুইস ব্রাউন জানান, শুনেছি যেদিন আমার জন্ম, সেদিন আমার মাকে রাতের অন্ধকারে সিজারের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শুধু একটি টর্চলাইট দিয়ে পথ দেখানো হয়েছিল। অল্প কিছু হাসপাতাল কর্মী আমার মায়ের পরিচয় জানতেন। মা চাননি কেউ তার সম্পর্কে সবকিছু জানুক আর সেসব নিয়ে খবর প্রচার করুক। লুইসের জন্ম একেবারে গোপনীয়তায় আবৃত ছিল। এমনকি তার বাবাকেও পুলিশি পাহারায় সন্তানকে দেখার সুযোগ দেয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ব্রাউন দম্পতির আরো একটি কন্যাসন্তান হয়,  তারও জন্ম হয় আইভিএফের মাধ্যমেই। ১৯৯৯ সালের দিকে টেস্টটিউব শিশু হিসেবে প্রথম গর্ভধারণ করেন ব্রাউন দম্পতির কন্যা নাটাইল। কারণ অনেকের দ্বিধা ছিল, আইভিএফ শিশুরা স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানে সক্ষম হবেন কিনা! ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তার বড় বোন, প্রথম টেস্টটিউব বেবি লুইস ব্রাউন স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম দেন। এর মাধ্যমে টেস্টটিউব বেবিদের সন্তান জন্ম দেয়ার সক্ষমতা নিয়ে সব সন্দেহের অবসান হয়।

স্টেপটো এবং রবার্ট এডওয়ার্ড আইভিএফ গবেষণা করা শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। তাদের সেই গবেষণার ফলই দেখা যায় ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই লুইস ব্রাউনের জন্মের মধ্য দিয়ে। সন্তান জন্মদানে এক যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করায় এই দিনটিকে স্মরণ করে সারা বিশ্বে আইভিএফ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রথমে এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে এক অংকের সফলতার কথাই চিন্তা করা হয়েছিল। এখন সেখানে ৩৫ বছরের কম বয়সের নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে আইভিএফকে বন্ধ্যাত্বের মূলধারার চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বিশ্বে হাজারে একশ শিশু এ পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করছে।

পরিসংখ্যানে আইভিএফ

১৯৭৮ সালে প্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্মের ৪০ বছর পরে সারা বিশ্বে আইভিএফের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করা শিশুর সংখ্যা জানায় সায়েন্স ডেইলি। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি ফর মনিটরিং আর্টের সূত্রে তারা জানায় ১৯৭৮ সালের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৮০ লাখেরও বেশি শিশু আইভিএফের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে।

১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক বিভিন্ন রেজিস্ট্রি থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে এখন প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৫০ লাখ শিশু আইভিএফের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করছে।

ইউরোপের মধ্যে দেখতে গেলে অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজির (এআরটি) ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল দেশের নাম স্পেন। ১৯৯৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেখানে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৭৫টি এআরটি সাইকেল সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে রাশিয়ায় এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৭২৩ সাইকেল আর জার্মানিতে ছিল ৯৬ হাজার ৫১২ আর ফ্রান্সের ছিল ৯৩ হাজার ৯১৮ সাইকেল।

 

রেশমা জাহান