যুগে যুগে সময়ের প্রয়োজনে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা পদ্ধতির ধারাবাহিক উত্কর্ষ ঘটেছে। কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে গৃহবন্দি মানুষের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতেই উদ্ভাবিত হয়েছে নিত্যনতুন উপায়। ভারতে এডটেক বা শিক্ষাপ্রযুক্তির মতো শিল্পের যে উত্থান ঘটেছে, তা এশিয়ার অন্যান্য দেশেও পরিলক্ষিত হয়েছে। মহামারী শেষ হলেও দেশে দেশে এডটেকের চাহিদা বাড়তে থাকায় এ শিল্প বিকাশের দারুণ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এটি আবাল বৃদ্ধ বনিতা নির্বিশেষে সবার জন্য একইভাবে শেখার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। এক নজরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এডটেক খাত সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক—

ভারতে এডটেক সংস্থার অভূতপূর্ব উত্থান, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভারতীয় এডটেক সংস্থা বাইজুস বিশ্বের বৃহত্তম এডটেক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এ সংস্থার গণিত ও বিজ্ঞানের ভার্চুয়াল কোর্সগুলো ২০১১ সাল থেকেই শিক্ষার্থীদের স্কুলে ক্লাসের পরিপূরক হিসেবে অবদান রাখছিল। কিন্তু মহামারীতে ভারতজুড়ে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এডটেক সংস্থা প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যাতে পুরো শিক্ষা খাতই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে।

সামর্থ্যবান পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাইভেট অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বাইজুস এ খাতের প্রাথমিক ফার্ম হিসেবে এ সুযোগ পুরোমাত্রায় কাজে লাগিয়েছে। ২০২০ সালের জুনে এ ফার্মের মূলধন ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছে ডেকাকর্ন স্ট্যাটাসপ্রাপ্ত হয়, যার ফলে অন্যান্য সংস্থাও এডটেক খাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ইন্দোনেশিয়ান স্টার্টআপগুলো ‘বৃত্তের বাইরে’ কাজ করছে

কভিড পরিস্থিতিতে গৃহবন্দি ইন্দোনেশিয়ার ৪৩ বছর বয়সী গৃহবধূ ডেলোরেস মিয়া মনোরিকা নিজেই বড় মেয়ে ইব্রেনা মিরকায়েলা সিমানজুন্টাকের পড়াশোনায় সাহায্য করতে গত জুলাইয়ে এডটেক স্টার্টআপ রুয়াংগুরুর এক বছরের অ্যানিমেশন কোর্স শুরু করেন।

একই মাসের শুরুর দিকে আট বছর বয়সী মিরকায়েলা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার বাবা-মা চেয়েছিলেন সে চরিত্র গঠনের দিকে মনোনিবেশ করুক এবং তার প্রতিভা ও আগ্রহ অনুযায়ী পড়াশোনা করুক। পরবর্তী সময়ে ঘরে বসেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া শুরু হয় তার।

এখন প্রতিদিন সে অনলাইনে ছোট ভিডিও দেখে গণিত শেখে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ান ভাষা এবং প্রায় ১ ঘণ্টা ব্যায়ামের কোর্সও করছে সে। তার অন্যান্য কাজ পড়া, লেখা ও আঁকার অন্তর্ভুক্ত। সে এপিক নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করে ইংরেজিও শিখছে।

সিঙ্গাপুরে শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা রেখেছে বিভিন্ন অনলাইন টুল

২০২০ সালে যখন কভিড-১৯ মহামারী আঘাত হানে তখন সিঙ্গাপুরের ছাত্র ও শিক্ষকদের দ্রুত ঘরভিত্তিক শিক্ষা বা হোম-বেইজড লার্নিং (এইচবিএল) পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। এখন করোনা কমে গেলেও ডিজিটাল লার্নিং প্লাটফর্মগুলোর চাহিদা কমার সম্ভাবনা নেই।

যদিও স্কুলের অফলাইন কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে, তবু শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে লাইভ পোল ও কুইজভিত্তিক অনলাইন টুল স্লাইডোর মতো প্রযুক্তির ব্যবহারকে ধরে রেখেছেন। এমনকি তারা শিক্ষাকে আরো আকর্ষণীয় করতে ভার্চুয়াল বুলেটিন বোর্ড প্যাডলেটও ব্যবহার করছেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে সিঙ্গাপুরের শ্রেণীকক্ষগুলোকে ডিজিটাল করতে থিংকিং স্কুলস, লার্নিং নেশন উদ্যোগটি চালু হয়েছিল, যাতে শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তিকে একীভূত করার কথা বলা হয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এডটেক খাতের আকার এখন ১ হাজার কোটি ডলার

যদি একজন শিক্ষার্থী গণিতের জটিলতায় আটকে যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার এডটেক স্টার্টআপ ম্যাথপ্রেসো তাকে সাহায্য করতে পারে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা চালিত একটি লার্নিং অ্যাপ কান্দা (আক্ষরিক অর্থে কিউ অ্যান্ড আ) পরিচালনা করে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে শুধু গণিত সমস্যার একটি ছবি স্ক্যান করতে হবে এবং অ্যাপটির কাটিং-এজ প্রযুক্তি সঠিক উত্তর খুঁজে দেবে।

রিড নামে অন্য একটি স্টার্টআপ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের বৈশ্বিক যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে স্থানীয় ভাষাভাষীদের জন্য প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে এলাক্স রোবট ব্যবহার করে কোডিং শেখায়।

চীনে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে এডটেক খাত

চীনের তদারকি সংস্থার কড়াকড়িতে এক বছর বেশ কঠিন সময় গেলেও সম্প্রতি ফের ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশটির শিক্ষা প্রযুক্তি খাত। বৈষম্য কমাতে গত বছর এডটেক খাতে চীন সরকারের পদক্ষেপের ফলে ই-টিউটরিং সংস্থাগুলো হয় পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়েছে অথবা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বিক্রির মতো অন্যান্য ব্যবসায় চলে গিয়েছিল। অন্যরা পুনরায় কভিড পরিস্থিতিতে ক্রমাগত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে চুপচাপ তাদের ক্লাসগুলোর অনলাইন কার্যক্রম চালু করার ব্যাপারে ভাবছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে চীন সরকার আকস্মিকভাবে মূল স্কুলের বিষয়গুলোয় পাঠদানকারী এডটেক সংস্থাগুলোকে অলাভজনক হিসেবে পুনর্গঠন এবং এডটেক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করে নতুন নিয়ম জারি করে। চীন সরকারের দাবি, এ নীতির লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের কাজের চাপ কমানো এবং অভিভাবকদের আর্থিক বোঝা কমানো। মিথ্যা বিজ্ঞাপন, রাতারাতি ভালো ফলাফলের প্রতিশ্রুতি এবং কোর্সের অত্যধিক মূল্য নির্ধারণের মতো অসাধু চর্চার ফলে খাতটি নিয়ে চিন্তায় পড়ে তদারকি সংস্থা। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা কেন এ ধরনের প্লাটফর্মের পুরোপুরি সুবিধা নিতে পারছে না সে বিষয়টি আমলে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল তারা।