এসি এখন বিলাসিতা নয় বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে এর চাহিদা বাড়ছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
কিছুদিন আগেও দেশের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার কারণে বিদ্যুৎ সেক্টরে অভূতপূর্ব এক বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন শহরে তো বটেই প্রত্যন্ত গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বিদ্যুতের এমন সহজলভ্যতার কারণে মানুষের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের প্রতি আগ্রহ ও নির্ভরতা দুটোই বেড়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মের এ সময়ে ঢাকার মতো এমন বড় শহরগুলোয় গরমের তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। সম্প্রতি এর মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তীব্র গরমে জনজীবন প্রায় অতিষ্ঠ। এমন অসহনীয় গরম যে শুধু শহরে তা নয় গ্রামেও এর তীব্রতা লক্ষণীয়। মানুষ এমন অস্থির গরমে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে/তীব্রতা থেকে বাঁচতে এয়ারকন্ডিশনারকে প্রথম প্রায়োরিটি হিসেবে নিয়েছে। এটা এখন আর কোনো বিলাসীপণ্য নয়। এটা পরিবারের আবশ্যক পণ্য হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সবাই যার যার সাধ্য অনুযায়ী এসি কিনছে। আর দেশে এয়ারকন্ডিশনারের চাহিদা অন্য যেকোনো সময় থেকে এখন অনেক বেশি।
দেশে এসির বর্তমান বাজার কত? এক্ষেত্রে আপনাদের মার্কেট শেয়ার কত?
কিছুদিন আগেও বিদেশী পণ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস দুটোই বেশি ছিল। ইলেকট্রনিক পণ্য বলতেই আমরা বিদেশী পণ্য বুঝতাম। কিন্তু সময় পরিক্রমায় দেশের মানুষের এ ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এখন মানুষের বিদেশী ইলেকট্রনিক পণ্যের চেয়ে দেশীয় পণ্যের প্রতি আস্থা বেড়েছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার সিংহভাগ দেশীয় কোম্পানির দখলে। বর্তমানে এসির বাজার ১০-১২ লাখ ইউনিট, যেখানে মিনিস্টার এসির চাহিদা মোট বাজারের ১০-১২ শতাংশ। দিন দিন আমাদের এসির চাহিদা আরো বাড়ছে।
বর্তমানে বেশির ভাগ দেশী-বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশেই এসি তৈরি করছে। আবার কেউ কেউ আমদানিও করছে। তাতে গুণগত মানের কোনো পার্থক্য আছে কিনা?
হ্যাঁ! সম্প্রতি অনেক বিদেশী ইলেকট্রনিক কোম্পানি আমাদের দেশে তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরি স্থাপন করে দেশেই ম্যানুফ্যাকচারিং করছে। এটা একদিকে ভালো যে দেশের অর্থনীতিতে এর বড় একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আর চ্যালেঞ্জের কথা যদি বলেন তাহলে বলব আপনি যদি গুণগত মান বজায় রেখে পণ্য তৈরি করেন এবং সেটা যদি সাশ্রয়ী মূল্যে হয়, তাহলে চ্যালেঞ্জের কিছু নেই। আমি মনে করি মিনিস্টার ব্র্যান্ড বাজারের সেরা পণ্য তৈরি করে কাস্টমারের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করে ২০০২ সাল থেকে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
তবে প্রতিযোগিতার বাজারের কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে অত্যন্ত কম মূল্যে কিন্তু নিম্নমানের জিনিস দিয়ে তৈরি এসি এনে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করছে। এমনকি অনেকে এসব এসির গায়ে নামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করছে। এসব এসির গুণগত মান খুবই খারাপ এবং আমাদের এসির সঙ্গে ওইসব এসির মানের পার্থক্য আকাশ-পাতাল।
এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকেই নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা নিয়ে আশঙ্কায় থাকে। আপনারা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন। দুর্ঘটনা এড়াতে কী কী বিষয় লক্ষ রাখা উচিত?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এয়ারকন্ডিশনার বা এসির ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রায়ই এসি বিস্ফোরণের ঘটনার কথাও শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা নগরবাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকাটাই শ্রেয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এয়ারকন্ডিশনার বা এসি) থেকেও ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।
আমি নিজেও একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। এমনিতে এ যন্ত্র থেকে বিস্ফোরণের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্নি দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানসম্মত এসি ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী ব্যবহার এবং সঠিকভাবে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি বলতে চাই, এসি দুর্ঘটনার পেছনে তিন-চারটি কারণ রয়েছে। অনেকে রুমের লোড অনুপাতে এসি ব্যবহার করেন না। এসিটি অনেকক্ষণ ধরে চলতে হয়, সেসঙ্গে অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। নিম্নমানের এসি কিনলে সেগুলোর ভেতরে ফ্যান, তারের, বিদ্যুতের ব্যবস্থাগুলো ঠিক থাকে না। ফলে সেখানেও কারিগরি ত্রুটি দেখা যায়, যা অনেক সময় আগুনের সূত্রপাত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এসি দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ফলে কারিগরি ত্রুটির কারণে এসিতে আগুন ধরে যেতে পারে বা এসির গ্যাসে আগুন লেগে সেটি ঘরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এসি কেনার সময় ভালো করে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত। কেননা এসিগুলোয় যে গ্যাস ব্যবহার করা হয়, সেই গ্যাসে সহজে আগুন ধরে যায়। ফলে কোনো কারণে তা লিক হয়ে জমে থাকলে সেখানে বৈদ্যুতিক কারণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হলে বা ম্যাচের কাঠি জ্বালালে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ব্যাপারে আমার নির্দেশনা হচ্ছে, রুমের আকার অনুযায়ী সঠিক ক্ষমতার এসি ব্যবহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কম্প্রেসরের ভেতরে ময়লা আটকে যেন জ্যাম তৈরি না হয়। এসি থেকে গ্যাস লিক হওয়া এবং সেটি রুমে বা এসির ভেতরে জমে থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার। দীর্ঘক্ষণ টানা এসি চালালে এসির প্রেশার বেড়ে যায় এবং সেটিকে গরম করে তোলে। এসির ভেতর বা বাইরের বৈদ্যুতিক তার নড়বড়ে হয়ে থাকা, যা শর্টসার্কিট তৈরি করতে পারে। বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজের কারণে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি হওয়া, অনেক দিন এসির সার্ভিসিং না করানো, বজ্রপাত বা বৃষ্টির সময়ে এসি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ভালো আর্থিং ব্যবস্থা না থাকলে এটিও এসির দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের পরিবারের জন্য ব্র্যান্ডের এসি ব্যবহারের বিকল্প নেই।
বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এসি, কতটুকু জায়গার জন্য কত টন এসি লাগবে, এমন কী কী বিষয় নজরে নিয়ে এসি কেনা উচিত বলে মনে করেন?
এসির ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি বাছাই করতে হয় ঘরের মাপের ওপর। যে ঘরে এসি লাগানো হবে, তার মেঝে বা ছাদের ক্ষেত্রফলের ওপর নির্ভর করে তার ক্ষমতা। যদি আপনার ঘরের মাপ ১২০-১৪০ বর্গফুট হয়, তবে এক টন এসি লাগালেই কাজ চলে যাবে। ১৫০-১৮০ বর্গফুট হলে লাগাতে হবে ১ দশমিক ৫ টন এসি। ১৮০-২৪০ বর্গফুটের ঘরের জন্য দরকার দুই টন এসি। কিন্তু ঘর যদি টপ ফ্লোরে হয় অথবা একেবারে দক্ষিণ বা পশ্চিম দিকের ঘর হয়, তবে হিসাব বদলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে লাগাতে হতে পারে অতিরিক্ত ক্ষমতার এসি।
দিন দিন যেভাবে গরম আর বিদ্যুতের বিল পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাতে এসির বিদ্যুৎ সাশ্রয় ক্ষমতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখন সব বৈদ্যুতিক পণ্যের গায়েই এনার্জি এফিশিয়েন্সি মার্ক থাকে। এক থেকে পাঁচ স্টার দিয়ে মাপা হয় এনার্জি এফিশিয়েন্সি। এই মার্কিং ঠিক করে ব্যুরো অব এনার্জি এফিশিয়েন্সি। এসির গায়ে যত বেশি স্টার থাকবে, সেই এসির বিদ্যুৎ খরচ তত কম হবে। একটি ফাইভ স্টার এসির থেকে একটি ওয়ান স্টার এসি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। আমাদের মিনিস্টার ব্র্যান্ডের এসি সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎসাশ্রয়ী।
গ্রাহক আপনাদের এসি কেন কিনবে? আপনাদের এসিতে অন্যদের চেয়ে আলাদা কী কী বৈশিষ্ট্য আছে?
মিনিস্টার ২১ বছর ধরে দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করে ব্যবসা করে যাচ্ছে। দেশের মানুষকে বাজারের সেরা পণ্য দিয়ে আমরা তাদের পাশে থাকতে চাই। পণ্য তৈরিতে সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রাখা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের এসির বিশেষ কিছু ফিচার রয়েছে, যেমন ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎসাশ্রয়ী, ডুয়েল ইনভার্টার, যা বিদ্যুৎ খরচ কমায়, আর৪১০এ গ্যাস যা পরিবেশবান্ধব, আই ফিল টেকনোলজি, ১০০ শতাংশ বিটিউ ক্যাপাসিটি এবং ফুল কপার টিউব এবং ১২ বছরের কম্প্রেসর গ্যারান্টি। আমরা এসিতে হাই কোয়ালিটির কম্প্রেসর ব্যবহার করছি।
বিক্রয়োত্তর কী কী সেবা আপনারা দিয়ে থাকেন?
দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় মিনিস্টার-মাইওয়ানের নিজস্ব শোরুম ছাড়াও রয়েছে সার্ভির্সিং সেন্টার। গ্রাহকদের সেবায় আমাদের বিক্রয়োত্তর সেবা ২৪/৭ খোলা থাকে, যাতে গ্রাহকরা আমাদের সার্ভিস পয়েন্ট থেকে দ্রুত সার্ভিস নিতে পারেন। এছাড়া আমাদের ০৯৬০৬৭০০৭০০ নম্বরে কল করেও সেবা নিতে পারে।
আমরা এসিতে হাই কোয়ালিটির কম্প্রেসর ব্যবহার করছি। ফলে আমরাই একমাত্র ১২ বছরের গ্যারান্টি দিতে পারছি। এই ১২ বছরে কোনো রকম অভিযোগ পেলে রিটার্ন পণ্য দেয়া হয়।
আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।
‘আমার পণ্য, আমার দেশ, গড়ব বাংলাদেশ’ স্লোগানকে লালন করে মিনিস্টার-মাইওয়ান গ্রুপ দেশের অন্যতম সেরা এসি উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রতিটি প্রান্তে আমরা মিনিস্টারের পণ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা সারা বিশ্বে পৌঁছে দিতে চাই মেড ইন বাংলাদেশ।










