তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিস্তার ও সহজলভ্যতা বর্তমান বিশ্বের মানুষের জীবনধারা অভাবনীয়ভাবে বদলেছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নানা উদ্ভাবন আমাদের জীবনে এনেছে নতুন মাত্রা। তবে গত দুই দশকে মোবাইল ফোন প্রযুক্তির প্রভাবের মতো আর কোনো প্রযুক্তি সারা বিশ্বের মানুষের জীবনধারাকে এমনভাবে আমূল পাল্টে দিতে পারেনি। আজ অনেকেই একে মানুষের ইতিহাসে মোবাইল ফোনের বিপ্লব নামেও আখ্যা দিচ্ছে।

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখব, সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক বাল্ব দিয়ে আলো জ্বালানো চালু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তখন বাল্বের ব্যবহার ছিল একেবারেই সীমিত। পরবর্তী ৫০ বছরেও সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব ঘরে বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো জ্বালানো সম্ভব হয়নি। আর আমাদের দেশে বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো আসে উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। আজও দেশের সব মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ বাল্ব পৌঁছে গেছে কি? যদি পৌঁছে থাকে, কত বছর সময় লেগেছে তার জন্য? মেট্রোরেল সর্বপ্রথম চালু হয় ১৮৬৩ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। সে প্রযুক্তি আমাদের দেশে আসতে সময় লেগেছে প্রায় ১৬০ বছর। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তার বিস্তার এক গতিতে সর্বত্র হয় না। তা বিস্তার ও প্রসারের সঙ্গে নানা পরিবর্তনশীল সূচক সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রযুক্তির যেকোনো উদ্ভাবনের বিস্তার ও তার সুফল বিশ্বের সবার কাছে একসঙ্গে কখনো পৌঁছেনি, তাতে যথেষ্ট সময় লেগেছে। কখনো ভৌগোলিক দূরত্ব, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো আবার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণেও সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে নির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তির বিস্তার বা প্রসার ও ব্যবহার প্রলম্বিত হয়েছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এভারেট রজার্সের ডিফিউসন অব ইনোভেশনস তত্ত্বেও নতুন প্রযুক্তি বা চিন্তা বিস্তারে ক্রমাগত এ প্রক্রিয়াটি আলোচিত হয়েছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এসে তথ্যপ্রযুক্তিতে নানা প্রতিবন্ধকতা, কাঠামোগত দুর্বলতা পাশ কাটিয়ে আমাদের দেশ এগিয়ে চলেছে। বিশ্বে আমাদের মতো পিছিয়ে থাকা দেশগুলোয় ঘরে ঘরে কম্পিউটার হয়তো পৌঁছেনি, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অন্যান্য সুবিধা পৌঁছে গেছে। মোবাইল ফোন তথ্যপ্রযুক্তির সেসব উদ্ভাবনের মধ্যে অন্যতম একটি। এখনকার বিশ্বে কমবেশি সবার হাতেই মোবাইল ফোন পৌঁছেছে এবং তার সুবিধা সবাই ভোগ করছে। তবে মোবাইল ফোনেরই আধুনিক সংস্করণ স্মার্টফোনের প্রচলন ও তার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের বিকাশ মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে ভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করেছে। তাতে আছে যেমন ইতিবাচক দিক তেমনি আছে নেতিবাচক দিকও। মূলত গত শতকের শেষ দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সব মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসে। তখন বাটন ফোনের যুগ ছিল। সেই ফোনগুলোয় বাটন চেপে নম্বর লিখে কল করা হতো। বাটন টিপে টেক্সট মেসেজ পাঠানো যেত। নিম্নমানের দু-চারটে ছবি তোলা এবং খুব সহজ-সরল কয়েকটি গেমও খেলা যেত। কিন্তু বাটন ফোনের যুগ বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এর পর আসে স্মার্টফোনের যুগ। ১৯৯৪ সালে আইবিএম ও মিৎসুবিশি ইলেকট্রিক করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে ‘‌সিমন’ নামে বিশ্বের প্রথম স্মার্টফোন তৈরি করে। ২০০০ সালের পর থেকে ব্ল্যাকবেরি, নকিয়ার সিম্বিয়ান, উইন্ডোজ ফোন ইত্যাদি কিছুটা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তবে স্মার্টফোনের দৃশ্যপটে প্রকৃত বিপ্লব আসে ২০০৭ সালে অ্যাপল কোম্পানির আইফোন বাজারে আসার মাধ্যমে। এছাড়া আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের হাত ধরে আসে বড় টাচস্ক্রিন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, জিপিএস, ভিডিও অডিও ডাউনলোড, ছবি তোলা, ই-মেইল, অডিও-ভিডিও চ্যাটিং, ভিডিও-অডিও স্ট্রিমিং, নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসহ বিভিন্ন সুবিধা স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযোজিত হতে শুরু করে। ভারত, কোরিয়া ও চীনে বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল ফোন নির্মাণ বাজারে অংশগ্রহণ এবং স্মার্টফোনগুলোর দাম কমে আসার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সবার কাছে দ্রুত পৌঁছে যায় স্মার্টফোন ডিভাইস। এজন্যই আগের দিনের বাটন ফোন বা ফিচার ফোনের নাম হয়েছে ‘ডাম্ব’ ফোন।

বিশ্বে এখন মোবাইল ব্যবহারকারী প্রায় সাড়ে সাতশ কোটির কাছাকাছি। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের দেয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই ব্যবহার করেন স্মার্টফোন। নামিদামি স্মার্টফোনের সুবিধার কথা বলে শেষ করা যাবে না। তবে সেগুলোর সুবিধার সঙ্গে অসুবিধাও কম নেই। মুদ্রার দুই পিঠের মতো স্মার্টফোনেরও সুবিধা ও অসুবিধার উভয় দিক রয়েছে। আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে আমাদের বিপুল পরিমাণ সময় নষ্ট হওয়া, স্নায়বিক সমস্যা, লেখাপড়ার ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগ ক্ষমতা কমে যাওয়া, মানুষের মধ্যে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ কমে যাওয়া, ব্যক্তিগত জীবনে প্রাইভেসি বিনষ্ট হওয়া, সৃষ্টি ও সৃজনশীল কর্মে সময় দিতে না পারাসহ সর্বোপরি জীবনকে নেতিবাচক গুণে প্রভাবিত করছে। যদিও এ বিষয় নিয়ে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে এখনো তেমন আলোচনা না হলেও ইন্টারনেট জগতে এ বিষয় নিয়ে নানা চর্চা রয়েছে। অনেকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফেরত পেতে ঝুঁকছেন বাটন ফোনের দিকে। একে ইন্টারনেটের জগতে ডাকা হচ্ছে স্মার্টফোনের ডোপামিন ডিটক্স। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ হয়। সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মস্তিষ্কেই ডোপামিন নিঃসরণ হয়। ডোপামিন এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার। এটি মানুষের মধ্যে নতুন কিছু পাওয়া বা দেখার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। স্মার্টফোন নিয়ে সারা দিন সময় কাটানো মূলত এ আকাঙ্ক্ষা থেকেই ঘটে থাকে।

স্ট্যাটিস্টা ডটকমের জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের মানুষ দৈনিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন স্মার্টফোনে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ দৈনিক গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা ব্যয় করে থাকে। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো জরিপ করা হয়নি, তবে নিজেদের আশপাশে তাকালে আমাদের স্মার্টফোনে অযথা সময়ে ব্যয় করার সংখ্যাটা খুব কম হবে না। ২০১৮ সাল থেকে সারা বিশ্বে আবারো সেই পুরনো বাটন ফিচার ফোনের বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, যেন ফিচার ফোনের দিনগুলো ফিরে আসছে। বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে আবারো পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে বাটন ফোন। বিবিসির সে প্রতিবেদনে সফটওয়্যার সংস্থা সিমরাশের দেখাচ্ছে, ২০১৮-২১ সালের মধ্যে ফিচার বা বাটন ফোন সম্পর্কে গুগল সার্চ ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। কয়েক বছরে ফিচার ফোনের বিক্রিও বেড়েছে বহুগুণ। ২০২১ সালের এক সমীক্ষা মতে, যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০ জনে একজন বাটন ফোন ব্যবহার করেন। ইউরোপ, আমেরিকার মতো পশ্চিমের দেশগুলোয় আবার ফিচার বা বাটন ফোন আবারো জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। ফিচার বা বাটন ফোন ব্যবহার মানুষের জন্য একদিকে স্মার্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ একের পর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের ওপর কীভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সুতরাং এটি আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় নয় যে মানুষ বাটন ফোনের দিকে ফিরে যাচ্ছে। বর্তমানে শুধু অসচ্ছল মানুষ নয় বরং ধনী পরিবার, ভালো উপার্জন করা চাকরিজীবী, এমনকি ভিআইপিরাও বাটন ফোনের দিকে ফিরে আসছেন। এমনকি আজকের বিশ্বে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ হাতে রাখছে শুধু ফিচার ফোন। এর কারণ হলো নিজস্ব সময় ও জীবনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ ধরনের ফোন ব্যবহারের ফলে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে সময় আরো বেশি করে সময় দিতে পারছে। সারা দিন স্ক্রিনে সময় দেয়ার বদভ্যাস থেকে খুব বুঝে-শুনেই বেরিয়ে আসতে চাইছে নতুন প্রজন্মের অনেকেই। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিখ্যাত নকিয়াসহ বিভিন্ন কোম্পানি নতুন করে ফিচার ফোন বাজারে আবারো ছাড়ছে।

প্রযুক্তি গোটা বিশ্বকে একটি মেলবন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। পৃথিবী যেন এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। কেউ চাইলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে মুহূর্তের মধ্যে। সব তথ্য চলে এসেছে হাতের কাছে। এ প্রযুক্তিকে অস্বীকার বা অবহেলা করার সুযোগ নেই। তবে যান্ত্রিকতা ভরা এ আধুনিক সভ্যতায় প্রযুক্তির দেয়া আশীর্বাদকে আমরা নিজেদের কাজে ব্যবহার করব—এটাই তো স্বাভাবিক। তবে যন্ত্র বা প্রযুক্তি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রক না হয়ে পড়ে সে দিকেও খেয়াল রাখা দরকার। প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্মার্ট করবে। আমাদের সবার উচিত হবে এখন থেকেই স্মার্ট ফোনের ব্যবহারের দিকে সচেতনতা তৈরি করা এবং নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা। জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আসক্তি তৈরি না করে হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি সেই আত্মনিয়ন্ত্রণ নিজেদের মধ্যে জাগ্রত করতে না পারি তাহলে ফিচার ফোনের দিনগুলোয় ফিরে যাওয়াটাই বেশ হবে।  

মো. আবিদ মঈন খান : সাংবাদিক