প্রযুক্তি নগরীর কথা সামনে এলেই উঠে আসে সিলিকন ভ্যালির নাম। ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো বে এলাকার বেশ কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে সত্তরের দশকে গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত এ প্রযুক্তি কেন্দ্র। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সিলিকন ভ্যালির আদলে গড়ে উঠছে অনেক প্রযুক্তি নগরী। ইউরোপে রয়েছে সুইডেনের স্টকহোম ও আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন, এশিয়ায় চীনের সাংহাই, শেনঝেন ও বেইজিং, তাইওয়ানের তাইচুং ও তাইপে, জাপানের টোকিও কিংবা ভারতের বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে করসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে টেক্সাসের অস্টিন ও ফ্লোরিডার মিয়ামি। কিছুটা নীরবে উত্তর আমেরিকার আরেকটি প্রযুক্তি নগরী হয়ে ওঠার পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে কানাডার টরন্টো।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে টরন্টো শহরের কেন্দ্রে ৫০ তলাবিশিষ্ট গ্লাস টাওয়ারের চারটি ফ্লোর নিয়ে নতুন অফিস খোলে মাইক্রোসফট। ওই টাওয়ারে এর আগে থেকেই অফিস রয়েছে আরেক প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল ও অ্যামাজানের। এছাড়া নিকটেই নতুন ভবন নিতে যাচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগল। সোস্যাল জায়ান্ট মেটা এখনো টরন্টোয় অফিস চালু না করলেও স্থানীয় অনেক স্টার্টআপের অভিযোগ, প্রযুক্তি খাতের চাকরিজীবীদের বেতন সিলিকন ভ্যালির স্তরে নিয়ে যাচ্ছে ফেসবুকের এ প্যারেন্ট কোম্পানিটি। কারণ শহরের শীর্ষ প্রকৌশলীদের বাগিয়ে নিতে টোপ ফেলছে তারা। মহামারী চলাকালে বাড়ি থেকে কাজ করতে ইচ্ছুক যে কাউকে নিয়োগ দিয়েছিল মেটা।
শহরের উত্তর দিকে একটি তিনতলা অফিস ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করছে পিন্টারেস্ট। এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পিন্টারেস্টের নতুন অফিস হবে। সম্প্রতি এ এলাকায় কার্যালয় চালুর ঘোষণা দিয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান পেম্যান্ট প্লাটফর্ম ক্লার্না।
যেহেতু প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ ঘটছে এবং সিলিকন ভ্যালির বাইরে প্রযুক্তি খাতের চাকরির জন্য বিশ্বজুড়েই প্রতিযোগিতা বাড়ছে, তাই অনেক নির্বাহী, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা পরবর্তী বড় প্রযুক্তি হাব হিসেবে অস্টিন ও মিয়ামি এলাকার দিকে ঝুঁকছেন। তবে লেক অন্টারিও তীরবর্তী টরন্টোর চেয়ে পিছিয়ে আছেন তারা। এর পেছনে অবশ্য অবদান স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ী নেতাদের বছরের পর বছর বিনিয়োগ এবং কানাডার উদার অভিবাসন নীতি। এতে বর্তমানে টরন্টো উত্তর আমেরিকার তৃতীয় বৃহৎ প্রযুক্তি কেন্দ্র।
প্রযুক্তি খাতের নিয়োগ পর্যবেক্ষণকারী কোম্পানি সিবিআরইর তথ্য অনুসারে, প্রযুক্তি খাতে কর্মরতদের সংখ্যা বিবেচনায় টরন্টো বর্তমানে শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিয়াটল এবং ওয়াশিংটন ডিসিকে ছাড়িয়ে গেছে। সিলিকন ভ্যালি ও নিউইয়র্কের পরেই অবস্থান টরন্টোর। টরন্টোর প্রযুক্তি খাতের কর্মশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হাবের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। অনেক শহরের তুলনায় টরন্টোর এ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় রসদ রয়েছে। উত্তর আমেরিকার চতুর্থ বৃহৎ শহর এটি, যার জনসংখ্যা ৩০ লাখ। এছাড়া মেট্রো এলাকার বাসিন্দা ৬০ লাখের বেশি। যা মেক্সিকো সিটি, নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসের পরেই। তাই বলা যায় টরন্টোর প্রযুক্তি খাতের শিকড় অনেক গভীরে।
শপিফাইয়ের মতো কানাডিয়ান ই-কমার্স কোম্পানিসহ অনেক মার্কিন অ্যাংকর কোম্পানি টরন্টো এসেছে। আগে থেকেই সেখানে পর্যাপ্ত গবেষক ও প্রকৌশলীর উপস্থিতি এতে ভূমিকা রেখেছে। মেধাবীদের এ উপস্থিতি দিন দিন আরো বাড়বে বলে মনে করছেন প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টরা।
গত বছর শতাধিক প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়েছে টুইটার। এতে কানাডায় মাইক্রোব্লগিং সাইটটির কর্মী তিন গুণ বেড়েছে। এছাড়া ডোরড্যাশ, ইবে ও পিন্টারেস্টের মতো ঘরে ঘরে পরিচিত ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানিগুলো টরন্টোয় প্রযুক্তি হাব তৈরি করছে। সেরেব্রাস, গ্রোক ও রিকার্সন ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-সংক্রান্ত কোম্পানিগুলোও এখানে ঘাঁটি বাঁধছে।
টরন্টোয় প্রযুক্তি কোম্পানি ও স্টার্টআপগুলোর বিনিয়োগ এখনো সিলিকন ভ্যালির তুলনায় অত্যন্ত কম। এ খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্র্যাক্সনের তথ্য অনুসারে, ২০২১ ও ২০২২ সালে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোর বিনিয়োগ ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। বিপরীতে টরন্টোয় বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৪০ কোটি ডলার। তবে প্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে প্রযুক্তি খাতের মেধাবী প্রকৌশলীদের পর্যাপ্ত সরবরাহ। বিনিয়োগকারীদের অর্থ মেধার দিকেই ধাবিত হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
-নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে









