অ্যারিজোনার ফিনিক্সে ফ্যাব২১ নামে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে টিএসএমসি। এতে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। কংগ্রেসে চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট পাসের ফলে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর ভর্তুকি ও কর রেয়াত পাওয়ার পথ প্রশস্ত হওয়ায় তার সুযোগ নিতে চাচ্ছে টিএসএমসির মতো সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট।

পেশাজীবীদের সোশ্যাল সাইট লিংকডইনে এক ঘোষণায় টিএসএমসি জানায়, স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ফ্যাব২১-এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করতে পেরেছি। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির চিপ উৎপাদন শুরু করবে টিএসএমসি অ্যারিজোনা।

মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে টিএসএমসি। এবার ২০২৪ সালের মধ্যে চিপ উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রে ৫ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদন যখন শুরু হবে তখন তাইওয়ানভিত্তিক কারখানায় ৩ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদনে যাবে টিএসএমসি। ২০২৬ সালের মধ্যে ২ ন্যানোমিটারের চিপ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্টটির। চিপে প্রসেস নোডের সংখ্যা যত কমে ততই বাড়াতে হয় ট্রানজিস্টরের সংখ্যা। যত ট্রানজিস্টর বাড়বে তার ক্ষমতা ও জ্বালানি সক্ষমতা বাড়বে। অন্যভাবে বলতে গেলে অ্যারিজোনায় যখন চিপ উৎপাদন শুরু হবে ততদিনে অগ্রসর কারখানাগুলোর তুলনায় ২ প্রসেস নোড পিছিয়ে থাকবে ফ্যাব২১। তবে এটা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কারণ গাড়ি শিল্পে ব্যবহূত বেশির ভাগ চিপই পুরনো ও পরিক্ষিত প্রযুক্তির। গাড়ি শিল্পে ব্যবহূত হতে যাচ্ছে ৫ ন্যানোমিটার প্রসেস নোড।

চলতি বছরের শেষের দিকে ৩ ন্যানোমিটারের চিপ বাজারে আনবে বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি। কিন্তু সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ৩ ন্যানোমিটার চিপ আনার ক্ষেত্রে স্যামসাংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে গেছে টিএসএমসি। গত সপ্তাহে ৩ ন্যানোমিটারের চিপ বিক্রি শুরু করে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্টটি।

অ্যারিজোনার ফিনিক্স কারখানা নিয়ে বেশ কয়েকটি সমস্যার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তাইওয়ানের মতো কর্মী ব্যবস্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মানানসই নয়। এ নিয়ে তাইওয়ানিজ ও মার্কিন কর্মীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংঘাত দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা মিটিং নিয়ে এরই মধ্যে অভিযোগ জানিয়েছেন অ্যারিজোনা সাইটে কাজ করা এক মার্কিন কর্মী। তাইওয়ানভিত্তিক এক প্রকাশনায় ওই কর্মী জানান, কখনো কখনো কোনো মিটিং ৩ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়। 

ফিনিক্স কারখানা নির্মাণ চালু হওয়ার পর পরই শতাধিক মার্কিন কর্মীকে তাইওয়ানে পাঠিয়েছে টিএসএমসি। কীভাবে তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলোয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য তাদের পাঠানো হয়েছিল।

দ্য চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট পাসের ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভর্তুকি ও কর রেয়াত সুবিধা পাবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। স্থানীয়ভাবে অধিকতর সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারের তহবিল করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। 

বিভিন্ন গ্রাহকের চাহিদা ও ডিজাইন মোতাবেক সেমিকন্ডাক্টর তৈরি হয় টিএসএমসির ফাউন্ড্রিগুলোয়। টিএসএমসির গ্রাহক তালিকায় রয়েছে অ্যাপল (সর্ববৃহৎ গ্রাহক), কোয়ালকম (স্যামসাং ফাউন্ড্রিও ব্যবহার করে) এবং উদীয়মান তারকা মিডিয়াটেক, এনভিডিয়া, ইন্টেল, এএমডির মতো কোম্পানি। গত শুক্রবারে নিউইয়র্ক শেয়ারবাজারে টিএসএমসির বাজারমূল্য ছিল ৪৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের দশম বৃহত্তম কোম্পানি।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বৈশ্বিক চিপ বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হিস্যা ছিল ৩৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ হিস্যা এখন পূর্ব এশিয়ার। সবচেয়ে অগ্রসর চিপের ৯০ শতাংশ তৈরি হচ্ছে তাইওয়ানে। করোনা পরিস্থিতিতে সরবরাহ চেইন সংকট এবং তাইওয়ান নিয়ে চীনের পলিসি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই চিপ নির্মাণে সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন।

সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো কিছু রাজনীতিবিদ অবশ্য চিপ নির্মাতা কোম্পানিকে ভর্তুকির বিরোধিতা করছেন। তাদের যুক্তি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এমনিতেই বেশ লাভজনক। সেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজন নেই। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর মতে, এশিয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপন অনেক ব্যয়বহুল। যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনে চিপ নির্মাতাদের আকর্ষণ করতে চাইলে তাদের ভর্তুকি দিতে হবে। চিপ সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটা জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। সামরিক উপকরণ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অ্যাপ্লিকেশনের জন্য হাই-টেক চিপ প্রয়োজনীয়।