ওয়ারেন হেস্টিংস ছোট লাট ও বড় লাট— দুই-ই ছিলেন। ছোট লাট সাহেব হচ্ছেন গভর্নর বা লেফটেন্যান্ট গভর্নর আর বড় লাট অবশ্যই গভর্নর জেনারেল। পূর্বপুরুষ বেশ দাপুটে হলেও ওয়ারেন হেস্টিংসের বাবার আমলে তাদের দিন-আনা দিন-খাওয়া জীবন শুরু হয়। তার বাবা পিনাস্টন হেস্টিংস একজন অকর্মণ্য যুবক, বয়স ষোলোতে পড়ার আগেই হেস্টার নামের এক তরুণীকে বিয়ে করে ফেলেন, ৬ ডিসেম্বর ১৭১৩ ওয়ারেন হেস্টিংস জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ক’দিনের মধ্যেই মা হেস্টার মারা যান, তার বাবা ওয়েস্ট ইন্ডিজে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এতিম ওয়ারেন খুবই দরিদ্র ধর্মযাজক পিতামহের আশ্রয়ে চলে আসেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও সাত বছর বয়সেই পড়াশোনায় বিশেষ প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর রাখেন।
তার সৌভাগ্য, চাচা হাওয়ার্ড হেস্টিংস তাকে চার্চভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষার অঙ্গন থেকে বের করে উদারপন্থী শিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডনের নিউইংটন স্কুলে ভর্তি করে দেন। চার্লস বেবিংটন ম্যাকলে বলেছেন, ওয়ারেন ‘ওয়েল টট বাট ইল ফেড’-লন্ডনে ভালো পড়াশোনা শিখেছেন, কিন্তু খানাপিনা পেয়েছেন যৎসামান্য।
১০ বছর বয়সে তাকে স্থানান্তর করা হয় ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে। স্কুলটি ডক্টর নিকোলসের হাতে সেকালের ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে গড়ে উঠছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসের এখানকার সতীর্থদের অনেকেই বিখ্যাত; কেউ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কেউ কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কবি উইলিয়াম কাউপার তার তখনকার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। কাউপার ওয়ারেনকে নিয়ে একসঙ্গে খেলেছেন, টেমস নদীতে নৌকা বেয়েছেন। মিষ্টি স্বভাবের এই বন্ধুটি পরবর্তীকালে ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপ খাটিয়েছেন, দুর্নীতি করেছেন, এটা তিনি বিশ্বাসই করতে চাননি।
আরো একজন— তিনি ঠিক ক্লাসমেট নন। ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলেরই এলাইজা ইম্পের সঙ্গেও তার নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তরুণ ব্যারিস্টার এলাইজা ইম্পে ১৭৭৪ সালে চিফ জাস্টিস হিসেবে কলকাতায় চলে আসেন।
ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলের মেধাবী ছাত্রটির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি হওয়ার সিদ্ধান্ত তার সতীর্থদের অবাক ও ব্যথিত করার কথা। বয়স তখনো ১৮ পুরো হয়নি। ১৭৫০-এর আগস্টে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতায় পৌঁছলেন। মেধাবী এ তরুণের কাজ করার ও কাজ শেখার আগ্রহ তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মুগ্ধ করল। তিনি উর্দু, ফার্সি ও বাংলা শিখলেন। পদোন্নতি পেলে ১৭৫২ সালে তাকে পাঠানো হয় কোম্পানির অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র কাশিমবাজার কুঠিতে। সেখানে তিনি উইলিয়াম ওয়াটসের অধীনে কাজ করতেন। কাশিমবাজারই তাকে বাংলা এবং ভারতের রাজনীতি ও শাসন নিয়ে আগ্রহী করে তুলেছে।
কোনো আইনসম্মত বিধিবিধান প্রণীত না হওয়ায় স্থানীয় শাসকদের মর্জির ওপর নির্ভর করে কোম্পানিকে ব্যবসা করতে হতো। ততদিনে বৃদ্ধ নবাব আলীবর্দী খান তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব করতে যাচ্ছেন, এটা বেশ প্রচার হয়ে গেল। ওদিকে সিরাজ ইংরেজবিরোধী হিসেবে আগে থেকেই পরিচিত। কোম্পানি অনুমান করছিল সিরাজ ক্ষমতাসীন হলে তাদের ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়ে যাবে, এমনকি গুটিয়েও নিতে হতে পারে। তারা টিকে থাকার জন্য কৌশলী হয়ে উঠল।
১৭৫৬-র এপ্রিল আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পরই কাশিমবাজারে কোম্পানির ছোট সেনা গ্যারিসন এবং সেখানকার ব্যবসায়ীরা সত্যিই ঝুঁকির মধ্যে পড়ল। ৩ জুন কুঠি ঘেরাও এবং আক্রান্ত হলে হত্যাকাণ্ড প্রতিহত করতে ইংরেজরা আত্মসমর্পণ করল।
ওয়ারেন হেস্টিংস তখনকার রাজধানী মুর্শিদাবাদে কারাবন্দি থাকেন। ততক্ষণে নবাবের বাহিনী কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে নেয়ার পরপরই কলকাতার ব্ল্যাকহোল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলে ওয়ারেন হেস্টিংস নতুন নবাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হন এবং কোম্পানি ও নবাবের মধ্যে মধ্যবর্তীকারী সহায়ক হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এর মধ্যেই জীবনাশঙ্কা করে তিনি আরো কিছুসংখ্যক ইংরেজের সঙ্গে পালিয়ে একটি দ্বীপে চলে যান, সেখানে আগে থেকেই পলাতক ইংরেজরা অবস্থান করছিল। সেখানেই কলকাতা অবরোধের সময় ব্ল্যাক হোল ঘটনায় নিহত একজন ইংরেজের স্ত্রী মিসেস মারিয়ান বুকাননের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়; সংকট দুজনকেই আপন করে তোলে, তাদের মধ্যে ভালোবাসা হয়, তিনি তাকে বিয়ে করেন। মাদ্রাজ থেকে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে।
ওয়ারেন হেস্টিংস কিছু সময় ক্লাইভের বহিনীর ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করে ক্লাইভের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন, তিনি তাকে আবার উদ্ধারকৃত কাশিমবাজার কুঠিতে পাঠান।
কিছুকাল পর ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের বিজয় ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তন করলে ওয়ারেন হেস্টিংসকে কোম্পানির রেসিডেন্ট হিসেবে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠানো হয়। তার ভূমিকা অনেকটা রাষ্ট্রদূতের মতো হলেও তাকে ক্লাইভের পক্ষে নবাবের ওপর বিভিন্ন ধরনের ফরমান জারি করতে হয়। তিনি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। কোম্পানি মীর জাফরের কাছ থেকে কর আদায় যেভাবে তাকে নিঃস্ব করে আনছিল, তিনি তা বাড়াবাড়ি ও অন্যায় মনে করে তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতিপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি ভারতবর্ষের মানুষ ও তাদের শাসকদের সঙ্গে সৌহার্দের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে থাকেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬১ সালে তাকে কলকাতা কাউন্সিলের সদস্য নিয়োগ করে। তিনি আরো এক ধাপ এগোন। তিনি কোম্পানির মাদ্রাজ বাণিজ্য কেন্দ্রেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৭৭১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসকে ফোর্ট উইলিয়াম তথা বাংলার গভর্নর নিয়োগ করা হয়।
পলাশীর পর
মুর্শিদাবাদের পলাশী প্রান্তরে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ও নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা অপহূত হয়। তারপর সিরাজের বিশ্বাসঘাতক সিপাহসালার মীর জাফর আলী খান অনুগত নবাব হন এবং দুই দফায় ১৭৬৫ পর্যন্ত নড়বড়ে সিংহাসন দখল করে রাখেন। তারপর কালানুক্রমে নজমউদ্দৌলা (১৭৬৫-১৭৬৬) নাজির-উল মুলক (১৭৯৩-১৮১০) এবং জৈইনদ্দিন আলী খান অনুগত নবাবি গ্রহণ করেন।
১৭৭২-এ গভর্নর হলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তিনিই বিস্তৃত ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বড় লাট গভর্নর জেনারেল। ১৭৭৩ থেকে ১৭৮৫ পর্যন্ত বিভিন্ন চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি শাসন করে গেছেন। অনস্বীকার্য তার কাউন্সিলের নিরঙ্কুশ সহযোগিতা দূরে থাকুক, বারবার তাদের হাতে বাধাগ্রস্তই হয়েছেন। তিনি গভর্নর জেনারেলের পদ হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে কৃতকর্মের জন্য তার বিচার হয়েছে, মামলা চালাতে ভারতবর্ষে অর্জিত অর্থ নিঃশেষ করেছেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে নিম্নতম পদ রাইটার হিসেবে যোগ দিয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল হয়েছেন, খুঁটির জোরে নয়, মেধা ও দক্ষতায়।
ভারতের প্রথম চিফ জাস্টিস, ভয়ঙ্কর অবিচারক
স্যার এলাইজা ইম্পের কথা বলতে হয়— তিনিই চাকরি খোয়ানো প্রথম ব্রিটিশ জাস্টিস। তার জন্ম ইংল্যান্ডে ১৩ জুন ১৭৩২ সালে। পড়াশোনা করেছেন লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে। ওয়ারেন হেস্টিংস তার স্কুলমেট ও বন্ধু। বন্ধু আজীবন, বন্ধুত্ব এতই প্রগাঢ় যে, পরস্পরকে রক্ষার জন্য তারা ঘোরতর অন্যায়ের আশ্রয় নিয়েছেন।
এলাইজা ইম্পে ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলের পর ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন, ১৭৫৬ সালে চ্যান্সেলর মেডেল নিয়ে স্নাতক পরীক্ষায় পাস করেন। এ বছরই তিনি লিংকনস ইন-এ যোগ দেন।
ক্রমবর্ধমান দেওয়ানি ও ফৌজদারি— দুই ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য ১৭৭৩ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়। এদিকে ইংরেজ জনবসতিও দ্রুত বাড়তে থাকে। তত্কালীন ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জেনারেল থার্লোর সুপারিশে এলাইজা ইম্পেকে কলকাতার প্রথম চিফ জাস্টিস নিয়োগ করা হয়। তারই বন্ধু ওয়ারেন হেস্টিংস তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এলাইজা ইম্পেই একমাত্র প্রধান বিচারপতি অবিচারের প্রমাণিত অভিযোগে হাউজ অব কমন্স যাকে বরখাস্ত করেছে। আর সেই অবিচারটি হচ্ছে মহারাজ নন্দকুমারে ফাঁসি, যা পৃথিবীর অন্যতম কুখ্যাত জুডিশিয়াল কিলিং।
ভারতবর্ষে যত অবিচারই করুন না কেন নিজ দেশে ফিরে গিয়ে এলাইজা ইম্পে নির্বাচন করেছেন। হাউজ অব কমন্সে সাত বছর নিউ রমনি এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। ১ অক্টোবর ১৮০৯ তার মৃত্যু হয়।
মহারাজ নন্দকুমার
নন্দকুমারের জন্ম ১৭০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভুম জেলার ভদ্রপুর গ্রামে। রাজস্ব আদায়ে দক্ষতা তাকে প্রশাসকদের কাছে ঘনিষ্ট করে তোলে। সম্রাট দ্বিতীয় শাহআলম তাকে ‘মহারাজা’ উপাধি দেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরও কাছের মানুষ ছিলেন। দক্ষতার কারণেই কোম্পানি ইংরেজ কালেক্টর ওয়ারেন হেস্টিংসকে সরিয়ে নন্দকুমারকে বর্ধমান, নদিয়া ও হুগলি জেলার বিশাল এলাকার ট্যাক্স কালেক্টর নিয়োগ করে। তিনি সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
কিন্তু একজন ইংরেজকে সরিয়ে একজন নেটিভকে তার স্থলাভিষিক্ত করার বিষয়টি ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। তিনি নন্দকুমারকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতে শুরু করলেন।
ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর হওয়ার পর নন্দকুমার তার বিরুদ্ধে মীর জাফরের স্ত্রীর কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন, তাকে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা থেকে নন্দকুমারকে নিবৃত্ত করার জন্য তিনি তাকেও ঘুষ সাধেন।
গভর্নরের কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ফিলিপ ফ্রান্সিস নন্দকুমারকে সমর্থন করেন। কাউন্সিলের অন্য সদস্যরা ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধিতা করেন।
অপমানিত হেস্টিংস ক্ষমতা খাটিয়ে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে তহবিল তসরুপের মিথ্যে মামলা করান। মামলা হয় তার বন্ধু ও কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস এলাইজা ইম্পের কোর্টে।
সাজানো মামলায় গায়ের জোরে জুডিশিয়াল টাইর্যানি— বিচার বিভাগীয় স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে চিফ জাস্টিস তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন এবং দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করার ব্যবস্থা নেন। ৫ আগস্ট ১৭৭৫ সত্তরোর্ধ্ব মহারাজ নন্দকুমারকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে গঙ্গামুখ করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বিচার বিভাগীয় এ কেলেঙ্কারির কারণে এলাইজা ইম্পেকে ইমপিচ করা হয়, ওয়ারেন হেস্টিংসকেও গভর্নর জেনারেলের পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
হেস্টিংসকে ১৭৮৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় কিন্তু পার্লামেন্টে তার বিচার শুরু হয় ১৭৮৮ সালে, এ বিষয়ে ফয়সালা করতে হাউজকে ১৪৮ কার্যদিবস অধিবেশনে বসতে হয়। শেষ পর্যন্ত হাউজ অব লর্ডস ১৭৯৫-এর এপ্রিলে তাকে সব অভিযোগের দায় হতে খালাস দেয়।
অভিযোগ যত বড়ই হোক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন ১৪ বছর বাংলায় অবস্থান করে তার পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিত্ত ও বৈভবের মালিক তিনি হতে পারেননি, বরং পার্লামেন্টে আনীত অভিযোগের মোকাবেলায় ব্যয় মেটাতে তার দেউলিয়া হওয়ার দশা হয়ে যায়।
হলওয়েল হত্যাকাণ্ডে নিহত কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রী মিসেস বুকাননকে বিয়ে করেছিলেন হেস্টিংস। তাদের দুটি সন্তান হয়। একটি মুর্শিদাবাদে শৈশবেই মারা যায়, তার কদিন পর মৃত্যুবরণ করেন মিসেস হেস্টিংসও। তাদের একই কবর এখনো মুর্শিদাবাদে রয়েছে।
দুই.
ভি বি কুলকার্নি তার রচনায় ওয়ারেন হেস্টিংসকে ভারতে ব্রিটিশরাজ প্রতিষ্ঠায় একজন দক্ষ ও উদ্যোগী সংস্কারক হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। কুলকার্নি, ম্যাকলে ও অন্যান্য লেখকের হেস্টিংসের সংক্ষিপ্ত একটি অনুসৃতি উপস্থাপন করা হচ্ছে।
১৭৫০ সালে ১৭ বছর বয়সে যখন ভারতে আসেন, তার সময়কার খ্যাতিমান সবাই কেবল স্কুলছাত্র।
বছরে ৫ পাউন্ড, নামমাত্র বেতনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি হিসেবে চাকরি পেয়ে গেলেন। তার কাজ কোম্পানির বণিকদের সহযোগিতা করা, যেমন সিল্ক ও মসলিনের গুণগত মান নির্ধারণ করা, চালান তৈরি করা এবং হিসাবপত্র ঠিক রাখা। তার যে বুদ্ধিমত্তা, অনুসন্ধিৎসা ও পাণ্ডিত্যপ্রবণ মন, তা কোনোভাবেই মালের গুদামের একঘেয়ে রুটিন কাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
সংসারের নির্মম প্রয়োজনীয়তা যদি তার পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটাত, ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াশোনায় তার যে রেকর্ড, তাতে কবি উইলিয়াম কাউপার কিংবা প্রধানমন্ত্রী লর্ড শেলবোর্নের চেয়ে তার পিছিয়ে পড়ার কথা নয়। তিনি যখন ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে, এই দুজনও তখন এ স্কুলে।
কলকাতায় তার ভারতীয় কর্মজীবনের প্রথম তিন বছর কাটে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের দুই মাইলের মধ্যে অবস্থিত কাশিমবাজারে।
কোম্পানির কাজের পর হাতে তার প্রচুর অবসর। বাংলার ছোট শহরে বসে বাংলা ও ভারতের বিপুল ঐশ্বর্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব নিয়ে ভাবার অবকাশ মিলে তার। হেস্টিংসের ভারতমুগ্ধতা বাড়তে থাকে।
তার ঠিক বিপরীত চরিত্রের ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষে আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন বর্ণবাদী ঔদ্ধত্য।
ক্লাইভের মতো মানুষ এ দেশকে মনে করেছে নির্মম লুণ্ঠনের দেশ। ভারত ও ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের আচরণে প্রকাশ পেয়েছে যেন তাদের জন্ম হয়েছে স্বর্গে। এসব ‘বিগ ইংল্যান্ডার’-এর সম্পর্কে জে বি প্রিস্টলির বর্ণনা, ‘এরা ছিল লালমুখো চড়া স্বরের মানুষ, যাদের কাজ দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো আর মানুষের কাছ থেকে প্রভুত্ব আদায় করা।’
দুরাচার ও বিশ্বাসঘাতক নবাব, যার পক্ষ পরিবর্তনই বাংলায় ব্রিটিশদের সার্বভৌম রাজত্ব কায়েম করিয়েছে, সেই মীর জাফরকেও তারা ছাড় দেয়নি। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাশিমকে ১৭৬০-এর অক্টোবরে তার পদে বসিয়ে দেয়।
নতুন নবাবের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ আদায় করা হয়। তিনিও অকাতরে তাদের দিয়ে যান এ প্রত্যাশায় যে, তার উদার দান এক সময় তার পক্ষে কথা বলবে। কিন্তু কোম্পানির লোলুপ হস্ত তাকে এমনভাবে রুদ্ধ করে রাখে, এখান থেকে মুক্তিলাভ তার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
এক পর্যায়ে নবাব কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা সংকোচনের জন্য কলমের এক খোঁচায় সব অভ্যন্তরীণ শুল্ক প্রত্যাহার করে তার এলাকাকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য এলাকায় পরিণত করেন। সাম্য প্রতিষ্ঠায় তার এ উদ্যোগই কোম্পানির সঙ্গে তার শত্রুতাকে প্ররোচিত করে যায়, পরিণতি মীর কাশিমের ক্ষমতাচ্যুতি ও পতন।
স্বদেশী ইংরেজদের এ স্বৈরাচার ও বর্বরতা তাকে একই সঙ্গে বিরক্ত ও আতঙ্কিত করে তোলে। তিনি মানসম্মান নিয়ে বাংলায় আর কোম্পানির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না— এ বিবেচনায় ১৭৬৪-র ডিসেম্বরে হেস্টিংস স্বদেশের উদ্দেশে জাহাজে চড়লেন। ভারতবর্ষে তার কর্মজীবনের প্রথম ১৪ বছরের এখানেই সমাপ্তি।
তিন.
১৭৭২ সালের এপ্রিলে হেস্টিংস এবার গভর্নর হিসেবে বাংলায় ফিরে আসেন। তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত অর্থ এ দেশে একটি দক্ষ ও উদার সরকার প্রতিষ্ঠা করা। হেস্টিংস কার্যত বাংলাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটা অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। প্রশাসনে ভারতীয় কর্মকর্তা অপসারণ করে কোম্পানির একক আধিপত্য স্থাপন করাতে তিনি আদেশপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি যে সার্বভৌমত্বের কথা বলতেন, তা ছিল বাংলায় ব্রিটিশদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কথা।
১৭৬৯-৭০-এর দুর্ভিক্ষে বাংলার দেড় কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়। স্যার উইলিয়াম হান্টার লিখেছেন, গৃহকর্তারা প্রথমে তাদের গবাদিপশু বিক্রয় করল, তারপর কৃষি যন্ত্রপাতি, তারা সঞ্চিত শস্যবীজ খেয়ে ফেলল, তারপর ছেলেমেয়েদের বিক্রয় করল, যখন ছেলেমেয়ে কেনার মতো লোক আর রইল না তারা গাছের পাতা ও মাঠের ঘাস খেতে শুরু করল। ১৭৭০-এর জুনে দরবারের রেসিডেন্ট নিশ্চিত করলেন, জীবিতরা মৃতদেহ ভক্ষণ করছে।
মানুষের দুর্দৈবের এমন অকল্পনীয় মাত্রার ট্র্যাজিক ঘটনাও কোম্পানির কর্মকর্তা এবং তাদের দোসর, ফটকাবাজারি ও কালোবাজারিদের অন্তরে নাড়া দিল না। বরং পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মানুষকে জিম্মি করে তারা ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি করেই চলল!
জনগণের প্রধান খাবার চালের দাম ঠেকল অবিশ্বাস্য উচ্চতায়। আর ভয়াবহ নির্দয়তায় চলল উঁচু হারে খাজনা আদায়। মানুষ ও প্রকৃতির যৌথ নির্মমতা হাজার হাজার মানুষকে কৃষি ও শিল্প ছেড়ে নিরাপত্তার সন্ধানে জঙ্গলে ঠেলে দিল।
ভারতে কী ঘটছে এবং ইংরেজরা কী করছে, তা ১৭৭২-এ গঠিত সংসদীয় সিলেক্ট ও সিক্রেট কমিটির প্রতিবেদনে প্রকাশিত হলে, তা সভ্য ব্রিটিশ নাগরিকের বিবেকে ঘা দেয়।
হোরেস ওয়ালপোল বলেন, স্পেনিয়ার্ডরা পেরুতে যা করেছে, আমরা তা ছাড়িয়ে গেছি। তাদের উদ্যম যত নারকীয়ই হোক না কেন, তাদের কসাইবৃত্তির একটি ধর্মীয় আদর্শ ছিল! আমরা হত্যা করেছি, সিংহাসনচ্যুত করেছি, লুণ্ঠন করেছি, জবর দখল করেছি।
হেস্টিংসকে প্রদেশ শাসনের জন্য যে অবস্থায় ডাকা হলো, তা ছিল পুরোপুরি নৈরাজ্যকর। হেস্টিংসকে দিকনির্দেশনা দেবেন কিংবা হেস্টিংস অনুসরণ করবেন, এমন কিছু তার সামনে বা পেছনে ছিল না। কুলকার্নি মনে করেন, তার অবলম্বন ছিল নিজের আলোকিত মানস ও দৃঢ় চরিত্র। তার প্রজ্ঞা ও ধ্রুপদ সমাজের উদাহরণ ও সতর্কবাণী। হেস্টিংস নিজেকে ক্ষণিকের অতিথি বা সম্পদের দস্যু মনে করেননি। তিনি বাস্তব অবস্থাটি অনুধাবন করেছেন। তিনি লন্ডনে তার কোম্পানির প্রভুদের জানালেন শাসন করতে চাইলে ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে!
ভারতে কোম্পানির অধিকারভুক্ত যে অঞ্চল, তা আকৃতি ও জনসংখ্যায় ব্রিটেনের চেয়েও বড়। এখানে কেবল তাদের ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনার যে বিধিবিধান, তা দিয়ে ভারতশাসন যে অসম্ভব, এ সতর্কবার্তা তিনি লন্ডনে পাঠালেন। বেসরকারি পর্যায়ের সহিংসতা ও সম্পদ তসরুপ প্রতিহত করাসহ এ বিশাল রাজত্বের প্রশাসনে কোম্পানির বিধিবিধান অকার্যকর হতে বাধ্য।
কলকাতা-লন্ডন-কলকাতা ছয় মাসের সমুদ্রপথ যেখানে পাড়ি দিতে হয়, সেখানে লন্ডনে কোম্পানির সদর দপ্তরে বসে ব্রিটিশ ভারতের বিষয়-আশয় দেখাশোনা ও নিয়ন্ত্রণ করার ঝুঁকি ও বিপদাপন্নতায় তিনি আশঙ্কিত ছিলেন। এত দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব।
হেস্টিংস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে জানালেন গভর্নরই হবেন প্রধান ব্যক্তি, যিনি শাসন করবেন, যার কর্তৃত্ব থাকবে এবং সহকর্মীদের সিদ্ধান্ত মনঃপূত না হলে যিনি পাল্টে দিতে পারবেন। নতুবা তিনি অকার্যকর হয়ে পড়বেন।
তিনি আরো বললেন, গভর্নরকে সাহসের সঙ্গে অবিরাম কাজ করার জন্য এবং কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে তিন বছরের বেশি সময় তাকে নিয়োগ দিতে হবে।
হেস্টিংসের সব প্রার্থনা কবুল হয়নি। তার বার্তা লন্ডনে কোম্পানির সদর দপ্তরে পৌঁছার আগে কোম্পানি বোর্ডের দেওয়ানি গ্রহণ ও সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা হস্তগত করার সিদ্ধান্ত ৬ আগস্ট ১৭৭২ কলকাতায় পৌঁছল।
এটা ছিল একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তার মানে এখন কোম্পানি খোদ ভারত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণে আর দ্বিধান্বিত কিংবা ভীত নয়। বলা যায়, সেদিন অর্থাৎ ৬ আগস্ট ১৭৭২ থেকেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শুরু। হেস্টিংসের প্রধান সাফল্য দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলোপ ও শাসন ব্যবস্থা কোম্পানির তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এটি মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তর করেন।
কোম্পানির পূর্ণ আস্থায় হেস্টিংস গভর্নর হলেন। তার বয়স তখন কেবল ৪০ ছুঁয়েছে। তিনি প্রশাসনের পূর্ণ সংস্কার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন। বাংলার প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চ্যালেঞ্জ তাকে আরো দৃঢ়চেতা করে তুলল। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্থবহ সময় এটিই।
কোম্পানি সরকারের ওপর জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠার বিশাল দায়িত্ব তার কাঁধে। শক্ত হাতে অপরাধ দমন করতে থাকলেন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশার রাশ টেনে ধরলেন।
কোম্পানির ব্যয়সংকোচন করতে তিনি দিল্লির মোগল বাদশাহ এবং বাংলার নবাবের বার্ষিক ভাতা বেশ কাটছাঁট করেন। এতে তাদের অস্তিত্ব অনেকটাই অর্থহীন হয়ে ওঠে।
তিনি লুটেরা ভুটানি পাহাড়িদের, বিশেষ করে কোচবিহারে অভিযান ও লুণ্ঠন প্রতিহত করলেন। সন্ত্রস্ত ও ভেঙে পড়া মানুষ আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠল এবং বনজঙ্গলের সম্পদনির্ভর জীবনযাপন ও চাষাবাদে মনোযোগ দিল। যারা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তারা আবার কাজে ফিরে এল।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচার
হেস্টিংস ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে শুল্ক বিভাগের অনেক দুর্নীতি দমন করলেন এবং শুল্কহার শতকরা আড়াই ভাগ কমিয়ে দিলেন। কুখ্যাত ‘দুস্তক’ পদ্ধতি বাতিল করে দিলেন, এতে কোম্পানি কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ মুক্ত বাণিজ্য বন্ধ করে নিজেদের ব্যবসা বাড়িয়ে যেভাবে বিপুল বৈভবের মালিক হয়েছে, সে সুযোগ রহিত করলেন। তবে লবণ ও আফিমের ওপর কোম্পানির একচেটিয়া কর্তৃত্ব রেখেই দেন, যা পরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
হেস্টিংস অপচয় ও দুর্নীতি হ্রাসের জন্য খুব চেষ্টা করলেন, কিন্তু তখন দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহল এত শক্তিশালী যে, তিনি খুব একটা সফল হলেন না। কোম্পানির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে তিনি এত ক্রুদ্ধ ছিলেন যে, বিলেতের বোর্ডকে তার লিখতে হলো কোম্পানির ছেলেরা সুপারভাইজার কিংবা রাজস্ব কালেক্টর হয়ে জনগণের ওপর প্রবল শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।
তিনি নবাবের ভাতা কমিয়ে দিলেন। নবাবের গার্হস্থ্য বিষয় দেখার দায়িত্ব দিলেন মহারাজ নরেন্দ্রকুমারের পুত্র রাজা গুরুদাসকে। রবার্ট ক্লাইভ মনোনীত নবাবের মুখ্যমন্ত্রী রেজা খান এবং তার ডেপুটি সিতাব রায়কে চাকরিচ্যুত করলেন।
বাংলার সমৃদ্ধি ফিরে পেতে হলে পতিত জমি পুনরুদ্ধার করে চাষের আওতায় আনতে হবে এবং মাটি পুনরায় উর্বর করে তুলতে হবে। হেস্টিংস জানতেন ভূমি রাজস্বে সাম্য সৃষ্টি করে জমির পত্তন দেয়া সম্ভব না হলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
তিনি চাইলেন জমিদার ও প্রজার মধ্যে একটি ন্যায্য সম্পর্ক স্থাপন করতে। উৎপাদনশীলতার ওপর ভিত্তি করে জমিদার তার ন্যায্য ভাগ পাবে, কৃষকও বঞ্চিত হবে না। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত অর্থেই সৎ এবং কষ্টসহিষ্ণু যে কর্মিবাহিনী প্রয়োজন, তা হেস্টিংসের ছিল না। তাকেই প্রেসিডেন্ট করে ১৭৭২ সালে একটি কমিটি অব সার্কিট গঠিত হলো, যে কমিটির কাজ ঘুরে ঘুরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমিদারদের কাছে জমি ইজারা দেয়া।
কিন্তু সব জমিদার ভালো ছিল না। অধিকাংশই ছিল তার ভাষায় ‘অলস, মূর্খ, জরাজীর্ণ এবং সাধারণত দুষ্টপ্রকৃতির কর্মচারীদের হাতে বন্দি’। বাংলার ভূমি রাজস্বের জটিলতা সম্পর্কে হেস্টিংসেরও কোনো ধারণা ছিল না, তার কমিটি কেবল অনুমাননির্ভর হয়ে যেসব জমির পত্তন দিয়েছে, তা কৃষকদের অবস্থা আরো শোচনীয় করে তুলেছে। একই সঙ্গে রাজস্বের বকেয়া কেবল বেড়েই চলেছে। এসব সংকট উত্তরণের পদক্ষেপ তিনি পরে নিয়েছেন। কমিটি অব সার্কিট প্রদেশে কোর্ট অব জাস্টিস প্রতিষ্ঠা করে। এতে প্রতিটি জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। দেওয়ানি আদালতে কালেক্টরকে সহায়তা করে হিন্দু আইন জানা রাজস্ব কর্মকর্তা আর ফৌজদারি আদালতে তার সহায়তায় এগিয়ে আসে ইসলামী আইন জানা ব্যক্তি।
হেস্টিংস যখন বাংলায় বিভিন্ন ধরনের সংস্কারকাজে লিপ্ত, উদ্দেশপ্রণোদিত না হয়েও তার দেশে তখন আয়োজন চলছে ব্রিটিশ ভারতীয় ভূখণ্ডে একটি নতুন সংবিধান চাপিয়ে গভর্নরের ক্ষমতা কমানোর।
হেস্টিংস চেয়েছিলেন গভর্নর জেনারেলের জন্য বিশেষ ক্ষমতা। দায়িত্বের বোঝা বাড়ল, কিন্তু দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা বাড়ল না। কাউন্সিলররা শত্রুভাবাপন্ন হলে গভর্নর জেনারেলকে সম্পূর্ণ নির্বীর্য করে ফেলতে পারে, কারণ সিদ্ধান্ত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে।
১৭৭৪-এর ১৯ অক্টোবরে রাজার মনোনীত তিনজন অনিবাসী কাউন্সিলর বিলেত থেকে ভারতে এলেন, সমস্যা শুরু হলো তখনই। নতুন কাউন্সিলররা হেস্টিংসের প্রায় সব কাজে অবিরাম বিরোধিতা চালিq েযেতে থাকেন। একজন সদস্য জেনারেল ক্লাভারিং রুক্ষ ও বদমেজাজি বুড়ো। সৈনিক সদস্যদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হওয়ায় তার মূল আগ্রহ কত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেস্টিংসকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া। তাহলে ক্লাভারিংই হয়ে যাবেন বছরে ২৫ হাজার পাউন্ড বেতনের গভর্নর জেনারেল। দ্বিতীয় সদস্য কর্নেল মনসন একজন বিবর্ণ ব্যক্তিত্ব। তৃতীয় সদস্য ফিলিপ ফ্রান্সিস এ তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চাভিলাষী ও বুদ্ধিমান। তিনি কৌশলে হেস্টিংসের বিরোধিতা করে যেতে থাকলেন। চিঠি লিখে ঘোষণাও দিলেন ওই পদটি তিনি অচিরেই পেতে যাচ্ছেন।
১৭৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর কলকাতা পৌঁছার পর থেকেই বিলেত থেকে আসা তারা ছিলেন ঐক্যবদ্ধ এবং কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা মনে করেন হেস্টিংসের কার্যকলাপ দুর্নীতিগ্রস্ত। হেস্টিংস বাংলার সম্পদ লুটপাট প্রতিরোধের অযোগ্য। কাউন্সিলররা রোহিলা যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেন। হেস্টিংসের রাজস্ব নীতি ধিক্কৃত হলো এবং তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অসাধুতার অভিযোগ আনা হয়।
কারওয়েল— কোম্পানি পুরনো অফিসারই হলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দৃঢ়তার সঙ্গে হেস্টিংসের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তিন সদস্যের ক্রমাগত বিরোধিতা গভর্নর জেনারেলকে তিক্ত করে তোলে। কেবল শক্ত স্নায়ুর লোক হওয়ায় হেস্টিংস টিকে গেছেন। অন্য যে কেউ হলে ভেঙে পড়তেন, পদত্যাগ করতেন কিংবা তাদের খেয়ালি বাসনার কাছে আত্মসমর্পণ করতেন। পুরো দুই বছর তাকে তিনজনের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ঠেকিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে। ১৭৭৬-এর সেপ্টেম্বরে কর্নেল মনসনের মৃত্যুর পর এ ত্রয়ীশক্তি ভেঙে পড়ে।
১৭৭৩-এর রেগুলেটিং অ্যাক্ট যে সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি করে, তাতে জোটের অধিক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট করে না দেয়ায় সুপ্রিম কাউন্সিলের সঙ্গে ভয়াবহ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। কোর্ট কাউন্সিলের প্রায় সব কাজে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ১৭৮১-এর একটি দলিলে উল্লেখ করা হয়, তারা দেশের সব জমিদারকে নিজেদের অধিক্ষেত্রে ঢুকিয়ে নিয়েছে। গভর্নর জেনারেল ও কাউন্সিলের উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে রিট মঞ্জুর করছে।
পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটে যে হেস্টিংস ও প্রধান বিচারপতি এলাইজা ইম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বও হুমকির সম্মুখীন হয়।
হেস্টিংস পুরোদস্তুর শান্তিকামী ছিলেন না আবার যুদ্ধবাজও ছিলেন না। তিনি কোম্পানির রাজত্বের ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধির পক্ষে ছিলেন না। কোম্পানির দখলে আসা ভারতবর্ষের অংশবিশেষ এমনিতেই ইংল্যান্ডের বড় এবং অধিক জনঅধ্যুষিত— কাজেই যেকোনো বিজয়ীর অহঙ্কার এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করতে এটাই যথেষ্ট বলে তিনি মনে করতেন।
যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ এবং কোম্পানির অপশাসন এমনিতেই বাংলাকে সমস্যাসঙ্কুল করে রেখেছে। এদিকে তার কোম্পানি সদর দপ্তরের প্রভুরা কেবল লাভ-ক্ষতি নিয়ে চিন্তিত, কোম্পানির যুদ্ধে ও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে বেরিয়ে গেছে, এতে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই রাজত্ব বাড়িয়ে সংকটের আহ্বান অসমীচীন বলে তিনি মনে করেন এবং নতুন জায়গা দখল, সেখানকার মানুষের সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাদের উপবাস ও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াকে বাধা দিতে চেষ্টা করেন।
হেস্টিংস গভর্নর হওয়ার সময় ভারতবর্ষের যেটুকু কোম্পানির রাজত্ব হিসাবে পেয়েছেন, তার বাইরে যেতে তিনি সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক ছিলেন। কোম্পানির দখলে থাকা বাংলা ও বিহারের প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করেছেন অযোধ্যার নবাব উজির। নবাব একটা বিষয় ভালোই বুঝেছিলেন, ১৭৬৫ সালে কোম্পানির সঙ্গে তার সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা এবং সহযোগিতার হাত না বাড়ালে তার পক্ষেও টিকে থাকা সম্ভব হবে না। জন ম্যাকফার্সনকে লেখা হেস্টিংসের পত্রে নবাবের করুণ অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ন্যূনতম কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো রাজা উপাধি নিয়ে তাদের অনেকে অসম্মানের জীবনই যাপন করে সন্তুষ্ট থেকেছেন। তাদের অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না।
মোগল সাম্রাজ্যের কার্যত পতনের পরও সম্রাটদের প্রেতাত্মা হিসেবে রয়ে যাওয়া সম্রাট শাহ আলমকে ১৭৭১ সালে লর্ড ক্লাইভ করুণার বশবর্তী হয়ে দুটো জেলার মালিকানা এবং বার্ষিক পেনসন দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলেন। শাহ আলম যখন মারাঠা সেনাপতি সিন্ধিয়ার ছত্রচ্ছায়ায় রাজধানীতে ফিরে যেতে চাইলেন, হেস্টিংস তাতে স্বাগত জানালেন। তিনি ভাবলেন একজন ব্যয়বহুল মানুষ পোষণের দায় থেকে কোম্পানিকে রেহাই দেয়া যাবে। সম্রাট শাহ আলমের বিদায়ের সঙ্গে তিনি বার্ষিক ২৬ লাখ রুপি সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন এবং দুই জেলা এলাহাবাদ ও কোরায় অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে জেলা দুটোর পূর্বতম মালিক অযোধ্যার নবাবের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। নবাব কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার দখল নিলেন, কিন্তু বিনিময়ে কোম্পানিকে ৫০ লাখ রুপি দিতে হলো।
কার্যত কোম্পানির অনুগ্রহভাজন হওয়ার পরও অযোধ্যার নবাব সুজা উদ্দৌলার বিজয় ও অধিকার বিস্তারের নেশা কাটেনি। তার চোখে পড়ল রোহিলাখণ্ড। প্রায় আট লাখ মানুষের বাসভূমি রোহিলাখণ্ড একই সঙ্গে আফগান ও মারাঠা বর্গিদের হামলার শিকার। কিন্তু রোহিলার মানুষ সম্পর্কে কোম্পানি শাসকদের ধারণা অত্যন্ত খারাপ, তারা এক হাত তুলে ঈশ্বরকে ডাকে, অন্য হাতে ডাকাতি করে। প্রকৃতিগতভাবে বেপরোয়া, বিশ্বাসঘাতক, নির্মম ও যুদ্ধংদেহী। মারাঠার আক্রমণ ঠেকাতে রোহিলা নেতা হাফিজ রহমত খান ৪০ লাখ রুপির বিনিময়ে অযোধ্যার নবাবের সঙ্গে সামরিক সহায়তার চুক্তি করলেন। ১৭৭৩-এ মারাঠা সশস্ত্র বাহিনী যখন রোহিলাখণ্ডের দিকে এগোচ্ছে, ব্রিটিশ সৈন্যদের সহায়তা নিয়ে নবাবের বাহিনীও অগ্রসর হলো। এদিকে পুনাতে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়ায় মারাঠা বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়া হলো, ফলে কোনো যুদ্ধ হলো না।
নবাব প্রতিশ্রুত টাকা চাইলে রহমত খান যুদ্ধ না হওয়ার কারণে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলেন। ক্ষুব্ধ নবাব হেস্টিংসের কাছে নালিশ করলেন এবং রহমত খানকে শায়েস্তা করতে সামরিক সহায়তা চাইলেন। বিনিময়ে ৪০ লাখ রুপি উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। দুজন মুসলমান প্রিন্সের নিজেদের মধ্যকার বিবাদে কোম্পানি জড়াতে না চাইলেও ৪০ লাখ রুপি আয়ের সুযোগটি ছিল দুর্দমনীয়। হেস্টিংস বিবেকের সঙ্গে লড়াই করে অযোধ্যার নবাবের মাধ্যমে রোহিলাখণ্ড বিজয়কে এই বলে যৌক্তিকীকরণ করলেন যে, যদি এলাকাটি নবাবের দখলে চলে আসে, তাহলে কোম্পানি অধিকৃত ভূখণ্ডের বাইরে একটি বিশাল সীমানা দেয়াল তৈরি হয়ে যাবে এবং বহিঃশত্রু হতে কোম্পানির এলাকা আক্রান্ত হওয়ার আর আশঙ্কা থাকবে না।
কোম্পানি সামরিক বাহিনী হেস্টিংসের নির্দেশে নবাবের বাহিনীর সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হলো এবং রক্তাক্ত যুদ্ধে দুর্বল পক্ষ রোহিলাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটল। রহমত খান ও তার দুই হাজার সাহসী যোদ্ধা রোহিলাখণ্ডের যুদ্ধে নিহত হন।
সুপ্রিম কাউন্সিলে হেস্টিংসের প্রতিপক্ষ এ ঘটনাটিকে হেস্টিংসকে উচ্ছেদে কাজে লাগাতে অযোধ্যায় ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ন্যাথানেইল মিডলটনকে ডেকে পাঠায় এবং তার সঙ্গে গভর্নর জেনারেলের যে চিঠিপত্র বিনিময় হয়েছে, তা দাখিল করার জন্য দুজনকেই নির্দেশ দেয়। হেস্টিংস সরাসরি অস্বীকার করেন। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ন্যাথানেইল মিডলটনের ‘দ্য ট্রায়াল অব মহারাজা নন্দকুমার’ গ্রন্থে তা উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে এটাই মনে করা হয়েছে যে, মিডলটনের সঙ্গে পত্রালাপ দাখিল করা হলে ওয়ারেন হেস্টিংস ঘুষ নেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হতেন।
মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি ওয়ারেন হেস্টিংসের জীবন ও কর্মকালের একটি বিতর্কিত অধ্যায়। মীর জাফর আলী খানের ঘনিষ্ঠ ও ঊর্ধ্বতন নায়েবদের একজন নন্দকুমারের সঙ্গে হেস্টিংসের বিবাদের কিংবা উভয়কে উভয়ের অপছন্দের প্রাথমিক কারণ অজ্ঞত। তবে গভর্নর হওয়ার আগে থেকেই তিনি নন্দকুমারকে অপছন্দ করতেন। নন্দকুমারও সুপ্রিম কাউন্সিলের তিন সদস্যকে হেস্টিংসের বিভিন্ন দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের তথ্য ও প্রমাণপত্র সরবরাহ করেছেন। ব্যাবিংটন ম্যাকলে লিখেছেন হেস্টিংস ও নন্দকুমার দুজনই ক্ষমাহীন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।
নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ এনে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হেস্টিংস তার বন্ধু প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পেকে দিয়ে ফাঁসির রায় জারি করান। ৬ মে ১৭৭৫ সালে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। নন্দকুমার মামলায় গভর্নর জেনারেল তার ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার করেন, যা তার চরিত্রে কলঙ্কের স্থায়ী দাগ রেখে গেছে। এটি হেস্টিংসের স্বীকারোক্তি “I was never the personal enemy of any man but Nanda Kumar whom from my soul I detested, even when I was compelled to countenance him.”
জালিয়াতির অপরাধে ফাঁসি হওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই। একই নির্মমতায় তিনি গোয়ালিয়রের রাজা চৈত সিংহকে কার্যত ধ্বংস করে দেন। অযোধ্যার নবাব সুজা উদ্দৌলা কোম্পানির সেনাবাহিনী পুষতে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে চলে আসেন। তার পুত্র আসফ উদ্দৌলা কার্যত দেউলিয়াই হয়ে পড়েন।
হেস্টিংস জানতেন, অযোধ্যার সার্বিক আর্থিক অবস্থা যত খারাপই হোক প্রয়াত নবাবের ব্যক্তিগত ২০ লাখ পাউন্ড ফয়জাবাদ প্রাসাদেই বর্তমান রাজার মা ও দাদির হেফাজতে রয়েছে। নিজের আর্থিক শোচনীয় অবস্থার মধ্যে নবাব এ অর্থের দিকে হাত বাড়াননি, পাছে নারীদের ক্রোধ ও অভিশাপ তার ওপর পতিত হয়।
১৭৮১ সালে নবাবের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে হেস্টিংস প্রতিশ্রুতি দিলেন বেগমদের অর্থের দিকে হাত বাড়াবেন না। আগের বছর ঠিক একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজা চৈত সিংহের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। হেস্টিংসের সমালোচকরা মনে করেন, যদি সাহসে কুলাত এই অর্থের পুরোটাই হেস্টিংস নিজের পকেটে ভরতেন। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির ডিরেক্টররা টাকা-পয়সার হিসাবে বিস্ময়কর গরমিল দেখতে পান। শেষদিকে সম্মান ও মর্যাদা লুটিয়ে দিয়ে তিনি বোর্ডকে অনুরোধ করেন তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ অর্থ তাকেই প্রদান করা হোক। ততদিনে হেস্টিংসের সার্বিক বেতন-ভাতা প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড।
অধ্যাপক এ বি কিথ বলেন, ক্লাইভের মতোই হেস্টিংসের সততা প্রমিত মানের নিচে অবস্থান।
১৮৭৪ হ্যালহেড ও উইকিনস বেঙ্গল এশিয়াটিক সোসাইটি স্থাপন করেন। লর্ড কার্জনের ভাষায়, ব্রিটিশ শাসকদের লম্বা তালিকায় একমাত্র ওয়ারেন হেস্টিংসই সাহিত্য, শিক্ষা ও শিল্পে সত্যিকার অর্মে আগ্রহী হয়ে নজর দিয়েছেন।
তিনি ১৭৭২-৭৪ গভর্নর এবং ১৭৭৪-৮৫ গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এলিটদের অনেকের অপছন্দের পাত্র হলেও ভারতের সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবাসত, এটাই তার বড় বিজয়। ভারত শাসনে তার কৃতিত্বই বেশি।
হেস্টিংসের দীর্ঘ ট্রায়াল হলেও শেষ পর্যন্ত হাউস অব লর্ডস তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।
লাট সাহেব বাংলা জানতেন
ওয়ারেন হেস্টিংসের একটি স্মরণীয় উক্তি: I Love India a little more than my own country; যার বাংলা— আাামি ভারতকে আমার নিজের দেশের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাসি।
জহির মাসানি (‘ম্যাকলে: পাইওনিয়ার অব ইন্ডিয়া’স মর্ডানাইজেশন’ গ্রন্থের লেখক) লিখেছেন ওয়ারেন হেস্টিংস ভালো বাংলা জানতেন এবং উর্দু ও ফার্সিতে দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো দক্ষতা তার ছিল। তিনি সংস্কৃত ভাষার পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছেন। দুর্নীতিপরায়ণ ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের হাত থেকে এ সমৃদ্ধ ভাষাটিকে তিনি বের করে আনতে চেষ্টা করেছেন। তার উদ্যোগেই ১৭৮৫ সালে ভগবদ গীতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি একটি ইংরেজি ভূমিকাও সংযুক্ত করেছেন। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তারই। অনেকেরই অজানা ভারতে আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাও হেস্টিংস।
ওয়ারেন হেস্টিংস কবিতাও লিখেছেন। তিনি ফার্সি কবি ফেরদৌসি ও হাফিজের লেখা পড়েছেন এবং পাশ্চাত্যের শিক্ষিত জনের ফেরদৌসি ও হাফিজ পাঠের ওপর জোর দিয়েছেন।
ইংল্যান্ডে অর্জিত অর্থের উল্লেখযোগ্য কিছু তিনি ব্রিটেনে নিয়ে আসতে পারেননি। ম্যাকলে মনে করেন, হেস্টিংস তার টাকা ভারতে বিভিন্ন ব্যবসায়ে খাটিয়ে ছিলেন। মূলধনসহ তার বিনিয়োগের ১ কানা কড়িও উদ্ধার করতে পারেননি। হাতে যা টাকা ছিল ট্রায়াল মোকাবেলা করে খুইয়েছেন, তার পরও যা সামান্য ছিল বিখ্যাত শিল্পীদের দিয়ে নিজের পোর্ট্রেট করিয়ে, শিল্পী-সাহিত্যিকদের খাইয়ে শেষ করেছেন।
হাউজ অব কমন্সে যখন ওয়ারেন হেস্টিংস ট্রায়াল চলছিল, কবি উইলিয়াম কাউপার বিস্মিত হয়েছেন। ঔপন্যাসিক জেইন অস্টিন গভীর আগ্রহ নিয়ে তা অনুসরণ করেছেন।
তার স্ত্রীর জন্য শোকগাথা
ওয়ারেন হেস্টিংসের Ode to His Wife কবিতাটি যারা পড়েছেন, তাদের মধ্যে যারা কবিতার প্রকৃত সমঝদার, তাদের স্বীকার করতে হয়েছে বাংলার লাট সাহেব ওয়ারেন হেস্টিংসের কবিতার হাত যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।
হেস্টিংসের স্ত্রী ম্যারিকে মৃত্যুর পর বাংলাতেই সমাহিত করা হয়। ১৭৮৪ সালে হেস্টিংস পাটনায় প্রয়াত স্ত্রীকে স্মরণ করে একটি কবিতা লিখেন।
কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত অনূদিত হলো:
আমার ম্যারিয়ান তুমি এখন সকল বাঁধন থেকে মুক্ত
আমার অদ্ভুত খায়েশ স্বস্তির জন্য তোমার দিকে ফিরে চায়...
তোমার প্রণয়ী চিত্রকল্প তুলে আনি, তোমাতেই সুন্দরের বসবাস
মহিমা যাকে সাজায়, তা কোনো কণ্ঠের বর্ণনার অতীত
প্রিয় ভালোবাসা দিয়ে তোমার যে সৃষ্টি আমি দেখেছি
শুনেছি তোমার ভালোবাসায় সিক্ত যে কণ্ঠস্বর
আমার স্মৃতির বিশ্বস্ত গুদামে রেখেছি গুণাগুণ তোমার
আমার আত্মার সব সম্পদ আমি ধরে রেখেছি, হারিয়েছি...
নিয়তি এবং নীরবতা জীবনের প্রশান্ত ছবিতে পর্দা টেনেছে
এত অতীত হয়ে গেছে, যেন তা কখনো ঘটেনি
ব্যথিত কিছু স্মরণ এখন শুধু টিকে আছে
আর আমার যন্ত্রণাকে উসকে দিচ্ছে।
আমি যে স্ত্রীকে ভালোবাসতাম, তাকে ফিরে পেতে
আমার জীবনের অর্ধেকের বেশি তাকে দিয়ে দেব
আমার নিভৃত ভাবনা আর শোকগ্রস্ত না হোক
আমার মধুর সঙ্গী আমার উপস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন না হোক
আমার নিয়তি নিদির্ষ্ট কাল যত কমই হোক, তাকে দেব
আমি যতক্ষণ বেঁচে থাকি, হোক তা প্রশান্তির জীবন।






