অনুবাদ: শওকত হোসেন

[ইসাবেল আয়েন্দে একজন চিলিয়ান লেখক, এবং চিলির বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক সালবাদর আয়েন্দে (১৯৭০-১৯৭৩) সম্পর্কে তার চাচা ছিলেন।

ইসাবেল আয়েন্দেকে জাদু বাস্তবতার রানীও বলা হয়। তার বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে হাউজ অব স্পিরিটস, সিটি অব দ্য বিস্টস, ইভালুনা। তাকে বিশ্বে স্প্যানিশ ভাষার সর্বাধিক পঠিত ঔপন্যাসিকও বলা হয়।]

আমাদের প্রথম সাক্ষাতের পাঁচ বছর পর বিখ্যাত লেখক ইসাবেল আয়েন্দে তার সদ্য বেরোনো বই ইন দ্য মিডস্ট অব উইন্টারের প্রতি নিবেদিত সফরের পর পরই আরেক দফা বিশেষ সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছেন। এ জাদুবাস্তবতার রানী তার লেখালেখির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে কেমন বোধ করেন, সাফল্য, বিসর্জন ও নতুন সূচনা নিয়ে কথা বলেছেন।

আয়েন্দের নতুন বইয়ের সূচনা উপলক্ষে গত ৮ জানুয়ারি সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে এই তারিখেই দাদার কাছে এক দীর্ঘ চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। সেই চিঠিই তার প্রথম উপন্যাসে পরিণত হয়েছিল: দ্য হাউজ অব স্পিরিট। সেই থেকে আয়েন্দে জানুয়ারির ৮ তারিখেই তার সব বই লেখা শুরু করেন।

 

ইসাবেল আয়েন্দের সাক্ষাৎকার

প্রতিবার গ্রন্থ-সফর শেষে আপনার মনে কী রকম অনুভূতি রয়ে যায়?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৩টি শহর সফর করেছি আমি। তার আগে ইউরোপের একটা অংশ ঘুরেছি। দক্ষিণ আমেরিকায়ও ছিলাম আমি। তো এটা বছরের উন্মত্ত সমাপ্তি ছিল! তবে স্বস্তি বোধ করছি। কারণ আমি স্বাস্থ্যবান, শক্তিতে ভরপুর, সফরের সময় অসুখে পড়িনি। আমি ক্লান্ত, তবে ভালো আছি আর বইটাও ভালো চলছে। এখন সময় আসছে, জানুয়ারিতে পিছু হটব, কারো সাথে কথা বলব না, স্রেফ লিখে যাব। এটাই আমার পছন্দের সময়।

কী নিয়ে লিখতে যাচ্ছেন, সেটা কি এখনই জানেন?

কী লিখতে চাইছি, তার কোনো ধারণাই নেই আমার। আমি কোনো একটা সময় নিয়ে গবেষণা করি, সেটাকে মাথায় রাখি। শুরু করার জন্য সেটা আমাকে কিছুটা তথ্য জোগায়, কিন্তু এখনো গল্প বা চরিত্র কিছু জানি না। সেটা আমার কম্পিউটারের সামনে হাজির হওয়ার পরই ধীরে ধীরে দেখা দেয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন চরিত্র দেখা দেবে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই ওরা।

আপনাকে সম্প্রতি আটলান্টার এক অনুষ্ঠানে দেখার কথা মনে আছে। ওখানে ছয় শতাধিক মানুষ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছিল। মানুষের ভক্তি আর নিজের সাফল্য সম্পর্কে কেমন বোধ করেন?

কী জানেন, সাফল্য এমন কিছু, যা অনেকটা বাইরের বৃত্তে ঘটে। আমার সাফল্য থাকা বা না থাকা থেকে স্বাধীন আমার একান্ত ব্যক্তিজীবন একই। এটা ঠিক যে আমি আমার পাঠকদের সাথে সংযুক্ত, প্রচুর ই-মেইল পাই, কিন্তু দিনে অনেক ঘণ্টা কাজ করি, আমার ফাউন্ডেশন চালাই, আমার একান্ত জীবন আছে এবং খুব অল্প কয়েকজন, কিন্তু খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে। আমার পরিবার আছে, সেটাই অনেক। আমি আদৌ সেলিব্রিটি বিশ্বে বাস করি না। আমার পাঠকদের কাছ থেকে উদারতা আর ভালোবাসা পেয়ে আমি নিজেকে আশীর্বাদপুষ্ট মনে করি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেবল সফরের সময়ই সেটা দেখতে পাই।

সিয়াটলে একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম আমি। আড়াই হাজার মানুষ হাজির হয়েছিল সেখানে। সিম্ফোনি হল কানায় কানায় ভর্তি ছিল। প্রাণশক্তি আর আমাদের জোরালো সম্পর্ক টের পেয়েছি আমি এবং বুঝতে পেরেছি যে আমি যা করছি, সেটা কিছু মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লেখালেখি খুবই নিঃসঙ্গ কাজ। নিজের বাড়ির একটা ছোট কামরায় লিখি আমি, তারপর বইটা বের হয়, পাঠকদের সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত ওটা তুলে রাখি। এটাই সফরের একমাত্র ভালো দিক: ওদের সাথে সাক্ষাৎ!

তাহলে আপনি কতটা সফল, সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করেন না।

না, করি না! (হাসি) আমি ব্যস্ত মানুষ। তাছাড়া আমার যথেষ্ট প্রকল্প আছে, যেগুলো নিয়ে ভাবি! পেছনে তাকানোর সময় আমার নেই! অনেক সময় লোকে দ্য হাউজ অব স্পিরিট নিয়ে প্রশ্ন করে। ৩৫ বছর আগে ওই বইটি লিখেছি আমি, তারপর আর পড়িনি, বইটা যে কী নিয়ে, তা-ই জানা নেই! বেমালুম ভুলে গেছি!

তাহলে সাফল্য নিয়ে তেমন ভাবি না আমি। নিশ্চিত করেই এই এখতিয়ার রাখি বলে ভাবি না। আমি আনন্দিত এবং সবসময় ভীষণ কৃতজ্ঞ। আপনি জানেন, অনেকেই চমৎকার সব কাজ করেন, কিন্তু তারা আমার মতো স্বীকৃতি পান না! আমি খুবই ভাগ্যবান, আমার কপাল খুব ভালো।

আপনি কি মনে করেন যে আপনি যেভাবে কাজ করেন, তারই একটা কিছু এই স্বীকৃতি এনে দিয়েছে? কোনো রণকৌশল, গোপন কোনো কথা?

না, কোনো কৌশল কি গোপন কথা নেই। থাকলে লোকে সেটাকে কাজে লাগাত। কোনো কোনো বই মানুষের হূদয় ছুঁয়ে যায় আর কিছু বই স্রেফ...ছোঁয় না। কিছু বইয়ের বিছুটা বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক ভাব থাকে আর পাঠকও সেভাবেই সাড়া দেন। আমার ক্ষেত্রে সাড়াটুকু খুবই আবেগীয়। কারণ আমার বইগুলো মানুষের আবেগীয় অংশের সাথে সংযুক্ত।

লেখালেখির প্রক্রিয়ায় এমন কোনো বৈশিষ্ট্য আছে, আপনার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও যেটা অর্জন এখনো বেশ কঠিন আবিষ্কার করেছেন?

আমার কাছে এটা খুব বেশি কঠিন ঠেকে না। তবে অনায়াসে পড়ার জন্য বইকে একটা কাঠামো দেয়া কঠিন মনে হয়। আমার নতুন বইটিতে একটা মূল গল্প আছে: তুষার ঝড়, তিনটি চরিত্র, একটা গাড়ির ট্রাংকের ভেতর পাওয়া একটা লাশ এবং তিনদিনের অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিটি চরিত্রের পেছনের কাহিনীই আসল। বর্ণনার ধারাকে বিঘ্নিত না করেই এসব পেছনের কাহিনীকে মূলটির সাথে বুনতে পারার সাফল্য—এটাই আসলে কঠিন।

প্রতিটি বইয়ের ভিন্ন চাহিদা, ভিন্ন প্রয়োজন থাকে। কোনো সফল বইয়ের ফর্মূলা অন্য আরেকটি বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন না আপনি। যদি না বিশেষ কোনো জনরার বই লেখেন। যেমন ধরুন, ক্রাইম বা রোমান্টিক উপন্যাসে আপনি ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন। কিন্তু আমি যে ধরনের বই লিখি, সুর, সঠিক কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হবে আপনাকে। কারণ প্রতিটি বইই আলাদা। এ প্রক্রিয়া সত্যি সত্যি কাজ শুরুর আগে কয়েকটা সপ্তাহ নিয়ে নেয় আমার।

আপনি কি মনে করেন যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে একজন লেখক সময়ের ধারায় আরো ভালো হয়ে ওঠেন কিংবা কিছু পরিমাণ শক্তি হারাতে শুরু করেন?

অন্য লেখকদের বেলায় ব্যাপারটা কেমন জানি না, তবে আমি ঢের বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করছি। ৮ জানুয়ারি ফাঁকা পৃষ্ঠার মোকাবেলা করতে গিয়ে এখন আর আগের মতো সন্ত্রস্ত হই না। আমি জানি, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে একটা গল্প লিখতে পারব। কখনই ভালো কোনো গল্প বাদ দিইনি আমি। শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্রেফ চালিয়ে যাই। কিন্তু জানি, এখনো ভুল করি আমি। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেই চেষ্টা করি, কিন্তু নতুন নতুন ভুল দেখা দেয়!

যেমন বললাম, প্রতিটি গল্প নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ বয়ে আনবে। সেসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করব আমি জানি না, কিন্তু ৩৫ বছর ধরে লেখালেখির পর এখন অন্তত আমার এটা বলার মতো অভিজ্ঞতা আছে: ‘ঠিক আছে, শান্ত হও। দম নাও, দম ছাড়ো, বইটা হয়ে যাবে।’

তবে কিছু কৌশলও শিখেছি। যেমন—কোনো একটা দৃশ্য কাজ না করলে সেটা নিয়ে যুঝতে থাকি যদি, বেশ কয়েকবার লেখার পরও অসম্ভব ঠেকলে তার মানে ওটার থাকা উচিত না। সেরা সামাধান হলো স্রেফ বাদ দেয়া, কম্পিউটারের ডিলিট করতে পারা কিন্তু বিশাল ব্যাপার; আমি ছেঁটে ফেলা জিনিস সেভ করে রাখি না, অদরকারী সবকিছুই ডিলিট করে দিই। কারণ ওটা আবার ফিরিয়ে আনতে চাই না। আমি নতুন কিছু চাই, সবসময় টাটকা ধারণা।

আপনার নিজের জীবনেও কি এই একই কৌশল প্রয়োগ করেছেন?

ওহ হ্যাঁ, মাই ডিয়ার, কিন্তু জীবনের ক্ষেত্রে অনেক লম্বা সময় লাগে তাতে! অনেক বছর লেগেছে আমার, দুবার ডিভোর্স হয়েছে আমার। আমার প্রথম স্বামী, খুবই ভালো মানুষ ছিল সে, এখনো আমরা বন্ধু—আরো নয় বছর আগেই ওকে তালাক দেয়া উচিত ছিল আমার। সিদ্ধান্ত নিতে এবং ‘বাছা, যথেষ্ট হয়েছে!’ এ কথাটা বলতে অনেক লম্বা সময় লেগেছে। তারপর আমার দ্বিতীয় স্বামী উইলি আর আমি বছর দুই আগে তালাক নিয়েছি, কিন্তু অবশ্যই ঢের আগেই বিয়ের অবসান ঘটেছিল। তালাকের দিনই বিয়ের সমাপ্তি ঘটে না। আরো আগেই শেষ হয়ে যায়! আমি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। থেরাপির আশ্রয় নিয়েছি আমরা। আমি আমার সাধ্যমতো করেছি, সত্যি। কিন্তু বুঝতে পারি যে আগ্রহী নয় বলে ও কোনো চেষ্টা করছে না। তো, হ্যাঁ, ছাড়ার চেষ্টা করেছি আমি, কিন্তু তাতে সময় লেগে গেছে। কিন্তু একবার ছাড়ার পর সেটা চিরকালের জন্যই! আমি পুনরাবৃত্তি ঘটাই না।

বিয়ের অবসান ঘটেছে কিনা কীভাবে জানতে পারেন?

হাড়ে হাড়ে টের পাবেন আপনি! শক্তির ঘাটতি অনুভব করবেন। সবকিছু সাদামাটা। লক্ষ করবেন, অন্য মানুষটার কোনো উৎসাহ নেই, কোনো কিছু ঠিক করার আকাঙ্ক্ষা নেই। আমরা থেরাপিতে যেতাম। তখন ও স্রেফ বসে টেলিফোন পরখ করত! এমনকি অংশও নিত না। অবশ্যই আগ্রহী ছিল না ও, সেটা না বুঝতে নির্বোধ হওয়ার দরকার ছিল আমার।

আপনার সাম্প্রতিক বইটি অভিবাসনের ধারণা নিয়ে প্রচুর কাজ করেছে। বেশ কয়েকবার আপনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আপনি সবসময়ই অভিবাসী থেকে যাবেন। এত বছর পরও কি নিজেকে অভিবাসীই মনে করেন?

হ্যাঁ, আমি প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী, একজন বিদেশী। কিন্তু স্থানীয় আমেরিকান আর অবশ্যই এখানে দাসত্বের জন্য নিয়ে আসা আফ্রিকান-আমেরিকানরা ছাড়া এ দেশের বেশির ভাগ লোকই অভিবাসীদের উত্তরসূরি। কিন্তু আমরা বাকি সবাই অভিবাসী, সেটা আমরা ভুলে যেতে চাই না। এখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের অভিবাসীরা এটা ভুলে যেতে চাইছে। নিজেদের ওরা এখানকার লোকই ভাবতে চায়। কারণ এখানেই জন্মেছে ওরা। আমি তা নই, আমি এখানে এসেছি ৪৫ বছর বয়সে। আমাকে ইংরেজি শিখতে হয়েছে, খাপ খাওয়াতে হয়েছে। তাই নিজেকে সবসময়ই ভিনদেশী মনে হয়েছে। তবে লেখকের পক্ষে এটা খারাপ না। লেখকের পক্ষে এটা ভালো। এটা আমাকে ভালো করে সবকিছু লক্ষ করতে, মনোযোগ দিতে বাধ্য করছে, যাতে অন্যরা যাকে নিশ্চিত ধরে নেয়, সেসব ব্যাপার বুঝতে পারি।

তাহলে আপনি যে একজন অভিবাসী, এ বাস্তবতা আপনাকে আর কষ্ট দেয় না?

না, কষ্ট দেয় না, স্রেফ সবকিছু অন্য রকম করে দেয়। কিন্তু আমি খুবই ভাগ্যবান অভিবাসী: আমি একজন নাগরিক। আমাকে বিতাড়িত করা হবে না। অবৈধ অভিবাসীদের সাথে কাজ করেছি আমি। জানি, ওরা ভীতির ভেতর বাস করে। আমি যেখানে থাকি, ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্প্রতি কিছু ভয়ংকর আগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের বেশির ভাগই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিভিন্ন মদের কারখানায় কাজ করতে আসা গরিব কৃষক। সমস্ত কৃষিকাজ মধ্য আমেরিকা বা মেক্সিকো থেকে আসা লাতিন আমেরিকানরা করে। সর্বস্ব হারিয়েছে ওরা, কিন্তু দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে ভেবে ভীত বলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবে না। ফলে ওরা কোনো সাহায্যও পায়নি। এ থেকেই ওদের পক্ষে অবস্থা কতটা খারাপ হতে পারে আন্দাজ করা যায়।

সরকার যেভাবে অভিবাসীদের সাথে সম্পর্কিত সংকট মোকাবেলায় কাজ করছে, সে সম্পর্কে আপনি কী মনে করেন?

আমার মনে হয়, ট্রাম্প ঘৃণা, জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবাদ, অভিবাসীবিরোধী আবেগ উসকে দিয়েছেন। কারণ তার সমর্থকদের ধারণাও তাই। তিনি একে লালন করেছেন। এর হাতে মেগাফোন তুলে দিয়েছেন। ফলে এটা এখন এ দেশের আনুষ্ঠানিক আইনে পরিণত হয়েছে। যা হোক, সরকার চলে যায়, মানুষ থাকে। আমি মনে করি, আমরা এই সংকট থেকেও উতরে যাব। আশা করি, ট্রাম্প আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের ভব্যতার বোধ ধ্বংস করে দেবেন না।&dquote;&dquote;

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আপনার জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটা ছিল?

সবে এসে যখন পৌঁছেছি, এ দেশ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। দেশটা কীভাবে চলে, জানা ছিল না আমার। ভেনিজুয়েলা থেকে এসেছি আমি। আপনাকে ছোটখাটো একটা উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, ভেনিজুয়েলায় ডাক ব্যবস্থা কাজ করে না, কোনোদিনই ঠিকমতো কাজ করেনি। তো বিল পরিশোধের জন্য ডাকে চেক পাঠানোর কথা ছিল অশ্রুতপূর্ব! মনে আছে, আমার তখনকার স্বামী বলেছিল, ‘এটার জন্য আমরা ডাকে একটা চেক পাঠিয়ে দেব।’ তখন আমি বলেছিলাম, ‘কী? কিসের কথা বলছ তুমি?’ আমার কাছে সবই ছিল নতুন, সবকিছু অন্য রকম। সেই সাথে আমার ইংরেজি ছিল ভীষণ খারাপ। কাজ করতে পারছিলাম না, টিভি দেখতে পারতাম না। সিনেমা দেখতে যেতে পারতাম না বা কোনো ধরনের নির্দেশনা ধরতে পারতাম না। দেশের সাথে পরিচিত হতে, খেলার নিয়মকানুন জানতে এবং ভাষা শিখতে বেশ সময় লেগেছে আমার।

তারপর আমি এখানে এসেছিলাম, তার কারণ উইলির প্রেমে পড়েছিলাম আমি। উইলির ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অকার্যকর পরিবার: তিনটে জৈবিক সন্তান এবং তিনজনই মাদকাসক্ত। সেটা ছিল দুঃস্বপ্ন। আমার সাথে আমার পরিবারের কেউ ছিল না। আমার শিশুদের নিয়ে আসতে পারিনি। কারণ ওদের স্পন্সর করার জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার দরকার ছিল আমার। সেজন্য পাঁচ বছর লেগেছে!

এই নতুন দেশ এবং এই নতুন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার বেলায় কোন জিনিসটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে?

মানুষ। মানুষের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার চেষ্টা করুন। কোনো একটা গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার চেষ্টা করুন। অন্যদের সাথে কাজ করার জন্য কাজে লাগার চেষ্টা করুন। মানবীয় সংযোগ আমাকে প্রথম বছর কাটাতে সাহায্য করে; বিশেষ করে এখানে আমার পরিবার ছিল না বলে ওটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন, একটা বর্ধিত পরিবারে অভ্যস্ত ছিলাম আমি।

আপনি যেমন বলতে পছন্দ করেন, একটা ‘গোত্র’।

ঠিক, একটা গোত্র! এখানে ওরা ছিল না, তাই অন্য মানুষের ওপর নির্ভর করেছি।

কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি আপনার জীবনে ঘটেছে?

সাফল্য। আমি তো দূরের কথা, কেউই সেটা আশা করেনি! আমি একটা বই লিখলাম আর সেটা সফল হলো—একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল!

এমন কোনো স্বপ্ন আছে, যা সবসময় অধরা রয়ে গেছে?

ঠিক তা না, তবে এমন কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলোর জন্য লড়ে যাচ্ছি আমি। ছোট থাকতে, সত্যি বলতে শিশুকালেই নারীবাদী হয়ে গিয়েছিলাম। সমতার স্বপ্ন, মুক্তি ও নারীর প্রতি মর্যাদার স্বপ্ন বরাবর আমার সঙ্গী ছিল। আমি জানি, আমার জীবৎকালে আমরা অনেক কিছু লাভ করেছি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। এই একটা স্বপ্ন ফাঁকি দিয়ে যায়নি আমাকে। তবে আমি এর পেছনে লেগে আছি।

অর্জন করার জন্য কি অন্তত একটি স্বপ্ন থাকা জরুরি?

হ্যাঁ, আমার একটা ফাউন্ডেশন থাকায় ধাওয়া করার মতো বেশকিছু স্বপ্ন আছে। আমার এই ফাউন্ডেশন প্রত্যক্ষভাবে নারীবাদী হিসেবে আমার ধ্যানধারণার সাথে সম্পর্কিত: নারীর ক্ষমতায়ন। আমি শান্তির পক্ষে, পারিবারিক সহিংসতা রোধের লক্ষ্যে, প্রজনন অধিকার আদায় ও মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে ওঠার মতো শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এসবই আমাকে সচল ও যথেষ্ট অনুপ্রাণিত রেখেছে। যেমন—শেষ বই ইন দ্য মিডস্ট অব উইন্টারে গুয়াতেমালান মেয়ে ইভলিন ওর্তেগা আমার ফাউন্ডেশনেরই অলিখিত ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত।

এ ধরনের চরিত্র বাস্তব জীবনে আছে কল্পনা করাই কঠিন...

‘হ্যাঁ, আছে বৈকি। কিছু বিষয় বাদ দিতে হয়েছে আমাকে। কারণ সেগুলো এতই ভয়াবহ যে পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আপনার লেখার একটা সীমা আছে। গল্প-কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়, কিন্তু বাস্তবতাকে কদাচিৎ।

আপনার জানামতে সুস্থ জীবনের গোপন বিষয় কোনটা?

ভয় না পাওয়া। দুঃখ-কষ্ট, চাপ, কাজ, সম্পর্ক নিয়ে ভীত না হওয়া। এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার আর কৌতূহলী মনোভাব নিয়ে আমি সবকিছুরই মোকাবেলা করি। অনেক সময় অবশ্যই মারাত্মক ভুল করে বসি এবং আমার জীবনে এমন কিছু ঘটে, যেগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে চাই না। কিন্তু নিজেকে নিরাপদ জীবনে বন্দি করার চেয়ে সেটা ভালো।

আমার নতুন বইয়ের চরিত্র রিচার্ডের একেবারে নিখুঁত নিরাপদ সামান্য জীবন। সবকিছু মাপা, সবকিছু এমনভাবে গোছানো যে তার কিছু হতে পারবে না। সুতরাং সে অর্ধমৃত। মন উন্মুক্ত করে ঝুঁকি নেয়ার পরই ঘটনা কীভাবে শুরু হচ্ছে বুঝতে পারে সে: বন্ধুত্ব, সংহতি, রসিকতা, অ্যাডভেঞ্চার এবং শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা! আমার মনে হয়, আমি এভাবেই জীবন কাটিয়েছি, এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের মনোভাব নিয়ে। ঝুঁকির ভয় করিনি!

আমার মনে হচ্ছে, আপনি এমনকি এখনো আপনার নতুন সঙ্গীর সাথে ভালোবাসার সন্ধান করছেন।

হ্যাঁ। সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে? আমি কষ্ট পাব, কিন্তু তাতে কী? ও কষ্ট পাবে। বেশ, এটাও ওর ঝুঁকি। নানা ধরনের কারণে আমরা আমাদের জীবনযাপন থামাব না: ওহ, আমরা বেশি বুড়িয়ে গেছি! ও এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ! মোটেই না! যতদিন টিকে থাকে, ততদিনই নিবিড়ভাবে জীবন কাটাব আমরা!

আপনার সর্বশেষ বইটির মূল সুর হচ্ছে আলবার্ট কাম্যুর বিখ্যাত উদ্ধৃতি: ‘ইন দ্য মিডস্ট অব উইন্টার, আই ফাউন্ড দেয়ার ওয়াজ উইদিন মি, অ্যান ইনভিনসিবল সামার।’ কোন জিনিসটা অপনার অজেয় গ্রীষ্মকে জীবিত রেখেছে?’

খোলামনে জীবন কাটানোর ইচ্ছা। আমি ভালোবাসার ঝুঁকি নিয়েছিলাম বলেই আজ আমার গ্রীষ্মকাল কাটাচ্ছি।