সন্ধ্যা নেমে গেছে তখন। তবে ভরা পূর্ণিমা। ঝাপসা আলোয় মাথার ওপর চাঁদ ক্রমশ বড় হচ্ছে। পূর্ণিমার আলো দেয়ার অপেক্ষায়।
ধলেশ্বরী ঘাটের গোডায় গাড়ি থেমে যায়। পাশের দরজা খুলে নামে অধরা। রাস্তা থেকে অনেকটা নিচে ঘাট। ঘাটে এপাড়-ওপাড়ের নৌকা। কিছুটা দূরে আধেক হয়ে থাকা সেতু। ইট-কংক্রিটের ছায়া প্রকৃতির নিয়মিত ছন্দে যেন এক বড় ছেদরেখা টেনে দিয়েছে। কিংবা অপূর্ণ কাঠামোয় তৈরি হয়েছে রহস্য। সেতুটার কাজ শেষ হলে ঘাটটা আর থাকবে না। থাকবে না এপাড়-ওপাড় পারাপারও।
অধরাকে নিয়ে নামতে যাই। ও ইশারা করে নদীর এপাড়ে অনেকটা দূরে থাকা ঘরবাড়িগুলোর দিকে। ঢাকা থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। ইঙ্গিত বুঝতে পারি।
জরুরি প্রয়োজনে আমাদের রাস্তাঘাটে গাছের আড়ালে, দেয়ালের পাশে দাঁড়ানোর সুবিধা আছে। মেয়েদের তা নেই। তাই বলি—
চলো। পারবে তো? এসব বাড়ির বাথরুমের অবস্থা কিন্তু ভালো না।
—আরে চলো তো। আমার গ্রামে ঘোরার অভ্যাস আছে।
মাটির রাস্তায় ও চলেছে মাটির ঢেলা, ইটের টুকরো এড়িয়ে। অল্প হিলের স্যান্ডেল আর শাড়ির পাড় সামলে সামলে। আমি পিছু পিছু।
একটা বাড়ির সামনে এসে দিব্যি অধরা ঢুকে গেল। ভেতরের উঠোন থেকে সেই বাড়ির বউও সাড়া দিল। বাইরে থেকে শোনা যায় তাদের কথা। মনেই হয় না এদের মাত্র পরিচয় হয়েছে। মেয়েদের এই এক বৈশিষ্ট্য, সহজ হতে সময় নেয় না।
অধরা আসাদ। বিবাহিত। স্বামী, সংসার, নিজের টুকটাক কাজ—কোনোটাতেই সুখের কমতি নেই।
অধরা আমার বন্ধু।
পরিচয় হঠাৎ করেই। খোলাসা করে বলতে গেলে অধরা আমার ভার্চুয়াল বন্ধু। ফেসবুকে পরিচয়। মধ্য চল্লিশের এপাশ-ওপাশ। আমি চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। প্রোফাইলে অবশ্য বয়সের উল্লেখ নেই। অন্য এক অধরাকে খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যাই এই অধরার প্রোফাইল। প্রোফাইলে তাঁর নিজের কথাগুলো মনে ধরে। তাই একদিন পাঠিয়ে দিই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট।
অধরা চাঁদের খুব ভক্ত। প্রোফাইলেও তার নামের ব্র্যাকেটে ছিল ‘মুন’। চন্দ্রাহত হতেও তার সুখ। চাঁদে চাঁদেই যেন তার জীবন কাটে। চেহারার পুরোটা জুড়েও চাঁদের কমনীয়তা।
বন্ধুত্বের অনুরোধ গৃহীত হয় দ্রুতই। শুরু হয় লেখালেখি। ইনবক্সে কুলোয় না, মেসেঞ্জারে কেটে যায় সারাবেলা।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে আমরা তুমিতে নেমেছি।
একদিন বলেই ফেলি, আমি একজন অধরাকে চিনি। যিনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আবৃত্তি করেন।
—ওই অধরাকে তোমার কেমন লাগে?
খুব ভালো। দূর থেকে তাকে দেখেছি অনেকবার। সে তো সেলিব্রিটি।
—আমি সেলিব্রিটি নই। তবে আমি সেই অধরাই। তুমি যার কথা বলছ। আবৃত্তি করে এমন অধরা আর নেই।
আমি তোতলাতে থাকি। আমি যে অধরাকে চিনি সে তো সেলিব্রিটিই। রেডিও-টিভিতে প্রায়ই থাকে তার উপস্থিতি।
কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে আমরা বন্ধু হয়ে গেছি, কিংবা হতে যাচ্ছি। সম্বোধন তুমিতে এসে গেছে। অভ্যাসও হয়ে গেছে। তখন আর আপনিতে ফেরা যায় না।
তাই আমি বলেই ফেলি, না জেনে না বুঝে আপনাকে তুমি তুমি করছি।
—আমার কোনো সমস্যা নেই। তুমি তো আমার বন্ধু।
ঠিক আছে বন্ধু।
অধরা আসাদের সঙ্গে আমার চ্যাটিং চলতে থাকে।
সকাল, দুপুর, রাত—সুযোগ যখন পাওয়া যায় তখনই।
ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুরই আদান-প্রদান।
কিন্তু অধরা তখনো বাস্তবে আমার কাছে অধরা। কিবোর্ড থেকে কথোপকথন ফোনে গড়িয়েছে অবশ্য।
ধীরে ধীরে আমরা আমাদের মন মেলে ধরি। এই নারীর অতলান্তে যে গাঢ় নীল রঙের ছোঁয়া, তা আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। সেই নীলটাও যেন চাঁদের আলোর মতো মায়াবী।
অধরার মনজুড়ে চন্দ্রালোক। চাঁদের আলোয় ভাসতে চায় সবসময়। দিক হারিয়ে ঘুরতে চায়। সাদামাটা চপ্পল আর সুতি শাড়ি পরে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়তে নাকি তার মন চায়। কেউ তাকে চিনবে না যে অঞ্চলে, সেই অঞ্চলে মাসের পর মাস এভাবে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে অধরার। কিন্তু তা তার হয়ে ওঠে না। কেউ একজন সঙ্গী হলেও হয়। কিন্তু সঙ্গী কোথায়?
স্বামীর সেই সময় নেই। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। এখন তো আর ভেসে যাওয়ার মতো কোনো কিছু মানায় না।
—এখন রাত কয়টা?
১০টা।
—বাইরে যাও। আজ ফুল মুন। আকাশ দেখো।
এই ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি অ্যাপার্টমেন্টের ঘরে বসে জানালা দিয়ে নানা কসরত করে আকাশ দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না।
জানালা দিয়ে তো পূর্ণিমা দেখা যাচ্ছে না।
—তোমাকে না বললাম বাইরে গিয়ে পূর্ণিমা দেখতে। ঘরে থেকে আকাশ দেখবে কীভাবে?
তুমি কই?
আমি তো ছাদে। দেখছি পূর্ণিমা। জ্যোত্স্না মাখছি শরীরে।
অধরা এভাবে আমাকে পূর্ণিমা দেখা শেখায়। পূর্ণিমার আলোয় স্নান করতে শেখায়।
মনে পড়ে হাছন রাজার দৌহিত্র মুমিনুল মউজদ্দিনের কথা। তিনি যখন সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান, তখন পূর্ণিমার রাতে পুরো শহরের স্ট্রিট লাইট নিভিয়ে দিতেন। বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করে দিতেন। পূর্ণিমার রাতে তার শহরবাসী যেন মন ভরে জ্যোত্স্না দেখতে পারে।
অধরার কাছেই আমি জ্যোত্স্নাকে ভালোবাসতে শিখতে থাকি। এভাবেই কাটতে থাকে আমাদের সময়। রাতের আকাশে চাঁদ দেখলেই মনে পড়ে অধরার কথা। তখনই ফেসবুকে নক! নক!
এই লেখালেখি, ফোনাফুনি তো আর বেশি ভালো লাগে না। অধরাকে ধরতে, অধরাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝেই।
আমারও ইচ্ছা করে ভরা পূর্ণিমায় হারিয়ে যেতে। একদিন কথা হয়। আমি বলি—
চলো একদিন দেখা করি।
—কোথায় যাবে?
ঢাকার আশপাশে কোথাও।
—পূর্ণিমা কবে?
জানি না। পঞ্জিকা কিনে দেখে বলতে হবে।
আরেকদিন—
—পঞ্জিকা কিনেছ?
হুম।
—কবে পূর্ণিমা? ফুল মুন!
দাঁড়াও দেখে বলি।...
এই তো সামনের মাসের শুরুতেই...।
—এগ্জ্যাক্টলি বলো।
২ তারিখ।
—চলো সেদিন দেখা করি। নদী পাবে?
পাব। যেতে পারবে আমার সাথে?
—পারব। তুমি নদী বের করো। আমরা জোছনা মেখে মেখে নদীতে ঘুরব।
তুমি পারবে তো?
—বউকে ছেড়ে আমার সাথে ঘুরতে ভালো লাগবে?
বন্ধুর সঙ্গে জোছনা রাতে ঘুরলে সমস্যা কী! রিলেশন ক্লিয়ার।
—হুম ক্লিয়ার। বন্ধুত্বে রোমান্টিকতা থাকতেই পারে...। এতে বন্ধুত্ব বাড়ে, গাঢ় হয়।
তাহলে ২ তারিখ। লক?
—লক।
সেই ২ তারিখ আজ। ইটের খোয়া, মাটির ঢেলা বিছানো ঢালু পথ বেয়ে নামতে থাকি আমরা। অধরা বয়স ধরে রেখেছে। দীর্ঘাঙ্গী। নীল পাড়ের সাদা শাড়িতে দারুণ মায়াবী। পূর্ণিমার আলোয় যেন অপার্থিব এক নারী। এক মাথা কালো চুল।
পৌঁছে যাই নদীর কাছে। চাঁদ তখন বড়সড় থালা। আলো বাড়ছে। দুইটা নৌকা ঘাটে বাঁধা। এক মাঝির সঙ্গে কথা হয়। বৈঠার নৌকা।
—কতক্ষণ ঘুরবেন?
এই ১ ঘণ্টাও হতে পারে, ২ ঘণ্টাও হতে পারে।
—ওপার যাবেন, না নদীর মধ্যে ঘুরতে থাকবেন।
আগে তো নৌকা ছাড়ো।
উঠে যাই নৌকায়। অধরার হাত ধরে তাকে তুলে নিই নৌকায়। আমরা বসি। গলুইয়ের সামনে বসার জায়গায় পা ছড়িয়ে বসে অধরা। শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে দেয়। আমি নৌকার একদিকের কিনারায়। মাঝি নৌকা ছেড়ে দেয়। অধরা ছেড়ে দেয় তার চুল।
বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ। নদীর পানিতে যে পূর্ণিমার চাঁদ, সেটি ভেঙে ভেঙে যায়। নৌকা এগিয়ে চলে। অধরা বলে ওঠে কি দারুণ!
কিছুটা দূরে নদীর পাড়ে কিসের যেন ইন্ডাস্ট্রি। সেটার আলো দেখা যাচ্ছে।
অধরা বলে ওঠে, ওই লাইটটা নেভাতে বলো না। পূর্ণিমার আলোটাই মাটি হয়ে যাচ্ছে। সত্যিই তো বীভৎস দেখাচ্ছে লাইটগুলো। কিন্তু নেভানোর ক্ষমতা তো আমার নেই।
মাঝিকে বলি, এমন দিকে যান, যেখানে চাঁদের আলো ছাড়া অন্য কোনো আলো দেখা যায় না। কোনো শব্দ শোনা যায় না।
মাঝি নৌকা ঘোরায়। আমরা ক্রমে ক্রমে সরে যেতে থাকি সভ্যতার পরিচিত চিহ্ন, শব্দগুলো থেকে। অধরার চোখ বন্ধ। সে পূর্ণিমা উপভোগ করছে। নৌকা ধীরে ধীরে একটা চরের মতো জায়গার দিকে যাচ্ছে। খুব হালকা বাতাস। পূর্ণিমার আলোয় ঘাসে ভরা চরটা আরো মায়াবী। নৌকা ভেড়ে। আমি নামি।
—হাত ধরে নামাও।
অধরাকে নামিয়ে নিই। মাঝিকে আমরা বলি নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করতে।
নদী থেকে হাত ধরে চরের উঁচু জমিতে উঠিয়ে নিই অধরাকে।
অধরা বলে ওঠে, ‘ওয়াও।’ বসে পড়ে ঘাসে। আঁচল ছড়িয়ে দেয়। খোলা চুল আলতো বাতাসে উড়তে থাকে। আমার সামনে সে যেন কোনো মানবী নয়। পূর্ণিমা তখন পুরোটা মেলে ধরেছে নিজেকে। অধরার চুলের মতো।
—অনেক অনেক থ্যাঙ্কস।
কেন?
—আমার জীবনের একটা শখ পূরণ হলো আজ। তোমার জন্য।
অধরার চুল হাওয়ায় উড়ছে। আমার মুখে এসে লাগছে।
আমি বলি, আমারও কিন্তু পূর্ণিমা খুব ভালো লাগে। তাও আবার তোমার সঙ্গে। মনে হচ্ছে অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি।
অধরা চাঁদের আলোয় হারিয়ে যেতে যেতে কত কী বলতে থাকে। আশ্চর্য মনের খোঁজ পাই। ভরা পূর্ণিমার আলো অপার্থিব ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয়।
আমি হাত বাড়াই। অধরাও হাত বাড়ায়। হাত ধরাধরি করে প্রকৃতিকেই উপভোগ করি।
সময় বয়ে যায়।
চলো ওঠা যাক—আমি বলি।
—চলো। বেশি রাত হয়ে যাবে।
আমরা এগোই নদীর দিকে। নৌকার কাছে।
নৌকা খুটায় বাধা। দুলছে। কিন্তু মাঝি নেই।
—এই মাঝি কই গেল?
আশপাশেই আছে হয়তো।
আমি এদিক-ওদিক দেখি। চাঁদের আলোয় পুরো নদীটাই তো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাঝি কই। জোরে ডাকি, সাড়াশব্দ নেই। বৈঠা আছে, নৌকা আছে, মাঝি শুধু নেই।
অধরাকে বলি, নৌকায় ওঠো, আমি বৈঠা বেয়ে ওপাড়ে নিয়ে যাব।
—পারবে?
না পেরে উপায় কী!
সাবধানে অধরা উঠে যায় নৌকায়। খুটার রশি খুলে আমিও উঠে পড়ি নৌকায়। বৈঠা চালাতে থাকি ধীরে ধীরে। উল্টো দিকে খোলা চুল, নীল পাড়, সাদা শাড়ি। বসে অধরা। ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে সে। তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে। তার আঁচল পানিতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
আমি বৈঠা ফেলে দিই।
চন্দ্রালোকে নারীর পাশে শুয়ে পড়ি। চাঁদের আলোয় আমিও ডুবে যাই। চাঁদের আলোয় ডুবতে ডুবতেই যেন আমাদের হাত মিলেমিশে যায়।
একটু সামনে তাকিয়ে দেখি ধলেশ্বরীর সেই আধা সেতুটাও নেই। যে কারখানা দেখেছিলাম খানিকটা আগে, সেটাও নেই। নেই ঘাট, নেই পার, নেই অন্য কোনো নৌকা। আছে শুধু আকাশ ভরা চন্দ্র-তারা, ধলেশ্বরী—আর ভেসে যাচ্ছি আমরা দুই মানব-মানবী।
আমাদের নৌকা ধলেশ্বরীর স্রোতের টানে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে চন্দ্রাহত হয়ে।






