প্রিয়জনরা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে জুলফি নামেই ডাকতেন।

১৯৫৪-এর একদিন বন্ধু আকবর বুগতিকে অভ্যর্থনা জানাতে করাচি এয়ারপোর্ট এসেছেন আগামী দিনের বালুচ নেতা শেরবাজ খান মাজারি। তার চোখ পড়ল হুইলচেয়ারে বসা এক বৃদ্ধকে ঠেলে সামনে এগোচ্ছেন এ সুদর্শন তরুণ; কয়েক মুহূর্ত পরই সেই তরুণ এসে বললেন, তিনি যদি শেরবাজ খান হয়ে থাকেন, তাহলে তার পিতাজি তার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে দেখলেন হুইলচেয়ারে বসা মানুষটি স্যার শাহ নওয়াজ ভুট্টো। চিকিৎসার জন্য ছেলে জুলফিকে নিয়ে বিদেশ যাচ্ছেন। ফেরামাত্রই স্যার শাহ নওয়াজ শেরবাজকে ডিনারে ডাকবেন, তাকে আসতেই হবে। এ কথাই তিনি বললেন।

সত্যিই তিনি কয়েক দিন পর জুলফির ফোন পেলেন। তার বাবা খেতে ও গল্প করতে ডেকেছেন। গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে তিনি যেন জুলফিকে ঠিকভাবে গাইড করেন।

শেরবাজ খান সে সুযোগ পাননি। ভুট্টো তার পরামর্শ শোনার জন্য জন্মগ্রহণ করেননি। ভুট্টোর শাসনকালে তার কেটেছে জেলখানায়, ভুট্টোর ইঙ্গিতে দায়ের করা মামলা-মোকদ্দমায়। এসব কাহিনীর জন্য শেরবাজ খান মাজারির ‘এ জার্নি টু ডিজইলুশনমেন্ট’ একটি চমত্কার বই। তাছাড়া সেই স্টেশন সাক্ষাতের চর বছরের মধ্যেই জুলফি একজন পুরোদস্তুর কেবিনেট মন্ত্রী। ১৯৯৩-এর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ম্যারি অ্যান উইভার একটি দীর্ঘ রচনা লিখলেন ‘ভুট্টো’জ ফেইটফুল মোমেন্ট’। তিনি জানালেন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভুট্টোকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়। তার মৃত্যুর নিশ্চিত সংবাদটি যখন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের কাছে পৌঁছল, তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে অন্য জেনারেলদের বললেন ‘দ্য বাস্টার্ড ইজ ডেড।’

অথচ বেশ কয়েকজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে ভুট্টো তার অতি অনুগত জিয়াউল হককে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন। এ জিয়াউল হক পবিত্র মক্কা শরিফে গিয়ে ‘কসম’ করে বলেছিলেন, ভুট্টোকে ফাঁসিতে হত্যা করা হবে না। জিয়াউল হক ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, কারাবন্দি করেছেন, বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন।

বিশেষ করে বাংলাদেশে গণহত্যার অন্যতম প্রধান প্ররোচক হওয়ার অপরাধে ভুট্টোর বিরুদ্ধে শত ফাঁসির আদেশ হলেও বিস্মিত হওয়ার কারণ থাকত না, কিন্তু যে উপলক্ষ সামনে এনে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল তা হাস্যকর। বিচার বিভাগের হাত দিয়ে হলেও এটি একটি নির্বাহী আদেশের হত্যাকাণ্ড, এটা সচেতনজনের বুঝতে বাকি ছিল না।

নিজের সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে ভুট্টো নিজেই বলেছেন, ‘তারা আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনি কিংবা অন্য কেউ কী সাক্ষ্য নিয়ে হাজির হচ্ছেন তা মোটেও বিবেচনা করার বিষয় নয়। তারা আমাকে এমন একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য হত্যা করতে যাচ্ছে, যে অপরাধ আমি করিনি।’

পাকিস্তান সেনাবাহিনীই ১৯৭১-এ সামরিক-বেসামরিক-ভূমি অভিজাততন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করতে ভুট্টোকে ব্যবহার করেছে, ভুট্টোকে তার স্বপ্নপূরণ করাতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। আবার দেশটির সেনাবাহিনীই তাকে ছুড়ে ফেলেছে। কেবল ছুড়ে ফেলেনি, বিভিন্ন আঁতাত সৃষ্টি করে তিনি আবার যেন ফিরে আসতে না পারেন, সেজন্য তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।

ভুট্টো নিজের অবস্থান সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন বলে মৃত্যুর আগে লিখে যেতে পেরেছেন—ইতিহাস আমাকে যত না ধ্বংস করবে তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।

ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তার চড়াই-উতরাই জীবনের আমৃত্যু সঙ্গী নুসরাত ভুট্টো ১৯৯৫ সালে হামিদ মীরকে বলেছেন, ‘আমি জানি আমার স্বামীর ফাঁসি হয়নি, তারা জেলখানায় তাকে হত্যা করেছে আর আমার ভয় হয় তারা (আমাদের সন্তান) মুর্তাজা ও বেনজিরকেও হত্যা করবে, কারণ তারা ভুট্টো পরিবারকে শেষ করে দিতে চায়।’ তার আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হয়নি। আলী মুর্তজা ভুট্টো ও বেনজির ভুট্টো দুজনই আততায়ীর হাতে নিহত হন।

লারকানার নবাবনন্দন

সিন্ধুর লারকানার রাজপুত পরিবারে স্যার শাহ নওয়াজ ভুট্টো এবং খুরশিদ বেগমের তিন পুত্রের সবচেয়ে ছোট জুলফিকার আলী ভুট্টো; প্রথম সন্তান সিকান্দার আলী সাত বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন, দ্বিতীয় পুত্র এমদাদ আলী ১৯৫৩ সালে ৩৯ বছর বয়সে সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। শাহ নওয়াজ ভুট্টো জুনাগড়ের দেওয়ান হিসেবে যথেষ্ট বিত্তশালী ছিলেন, ক্ষমতাসীন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য বজায় রেখেছিলেন, ফলে নাইটহুডও পেয়ে যান। পুত্রের শিক্ষা ও শখ মেটাতে স্যার শাহ নওয়াজ টাকা খরচে কার্পণ্য করেননি। জুলফি ভর্তি হন বোম্বের ক্যাথিড্রাল অ্যান্ড জন কোনেন স্কুলে; পাকিস্তান কায়েম করার আন্দোলনে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে পারিবারিক পছন্দে শিরিন আমির বেগমকে বিয়ে করেন, তবে এ সংসারটি তার শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।

১৯৪৭-এ চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া অবস্থায় চলে আসেন বার্কলিতে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়; ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী হন এবং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সমাজতন্ত্রের সমন্বয় করার সম্ভাবনা নিয়ে কিছুদিন বক্তৃতা করে বেড়ান। ১৯৫০ সালে অক্সফোর্ড ক্রাইস্টচার্চ কলেজ থেকে আইন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ১৯৫৩ সালে লিঙ্কন’স ইন থেকে ব্যারিস্টার হন।

১৯৫১ সালে ইরানীয়-কুর্দি বংশোদ্ভূত নুসরাত ইস্পাহানিকে বিয়ে করেন। ভুট্টোর বোন মুনাওয়ারের বান্ধবী ছিলেন নুসরাত। ১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম জুলফিকারকে দেখেন। নয় বছর পর আবার দেখা জুলফি ও নুসরাতের—মুনাওয়ারের বিয়েতে। নুসরাত তখন ন্যাশনাল গার্ডের ক্যাপ্টেন। সেনাপোশাকের নুসরাত তাকে মুগ্ধ করেন। ১৯৫১ সালে জুলফি যখন তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন এক স্ত্রী থাকার করণে নুসরাত তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তার পরও বিয়ে হয়ে যায়, আমির বেগম বিয়েতে সম্মতি দেন এবং আমির বেগমের বাবা নবদম্পতিকে ডিনারে অ্যাপ্যায়িত করেন। ভুট্টো তার স্ত্রীকে ডাকতেন নুসরাতাম—আমার নুসরাত। গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার স্ত্রী নাহিদ মির্জা ছিলেন নুসরাতের বন্ধবী। তার মাধ্যমেই তিনি ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে পরিচিত হন এবং মেধাবী ভুট্টো তাকে জয় করতে সময় নেননি। ১৯৫৮ সালে তিনি যখন তাকে বাণিজ্যমন্ত্রীর পদ দিলেন তিনি তখন এবং এখনো পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সী মন্ত্রী। মির্জা ক্ষমতাচ্যুত ও দেশান্তরী হন। ভুট্টো নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসনিক আইয়ুব খানকেও মোহিত করেন। তিনি আইয়ুব সরকারের পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩-তে তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। তার নিজের সমাজতান্ত্রিক ‘ইনডক্ট্রিনেশন’ (যদিও ব্যক্তিগত জীবনে ধনতান্ত্রিক ও আয়েশি জীবনের এতটুকু বদল ঘটাননি) তাকে একদিকে চীন ও অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সহজাত সুবিধে দেয়। ১৯৬২-তে ভারতকে চীন সীমান্তে নাস্তানাবুদ করার পর চীন ‘শক্রর শক্র—বন্ধু’ যুক্তিতে পাকিস্তানকে পাশে পেয়ে যায়। তাইওয়ান প্রশ্নে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যেখানে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, পাকিস্তান স্রোতের বাইরে পিকিং (এখন নামান্তরে বেইজিং)-কে সমর্থন করে। ভুট্টোর চীনপ্রীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এতটাই বিরক্ত করে যে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জুলফিকার আলী ভুট্টোকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত ও অনুগ্রহপুষ্ট। অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৬২-এর ভারত-চীন যুদ্ধে ভারতকে সামরিক সহায়তা দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সমালোচনা করেন। সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় অবস্থানের ভিন্নমুখী ব্যাখ্যা দেয়ায় তা সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে। আইয়ুব খান তাকে নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েন, কিন্তু তাকে বাদ দিলেন না। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যর্থ অভিযান অপারেশন জিব্রাল্টার থেকে ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ১৭ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উজবেকিস্তানের তাসখন্দে দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী আর পাকিস্তানের পক্ষে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এ চুক্তির মুসাবিদা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়ার সঙ্গেই ভুট্টো যুক্ত ছিলেন। শান্তি চুক্তি পাকিস্তানে ভীষণ সমালোচিত হয়। এ চুক্তির প্রণেতাদের একজন হলেও ভুট্টো নিজে সমালোচকদের দলে যোগ দেন এবং আইয়ুব বিরোধিতার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পদত্যাগ করলেন এবং বিরুদ্ধ স্রোতকে নিজের দিকে টেনে এনে গঠন করলেন নতুন রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তখন পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশে; ১৯৬৮-তে সরকার উদযাপন করল আইয়ুব শাসনের দশক পূর্তির উৎসব। কিন্তু ততদিনে জন অসন্তোষ শুরু হয়ে গেছে, এমনকি সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আইয়ুব বিরোধিতায় উসকানি দিয়ে চলেছেন। আইয়ুবের প্রতি জনসমর্থনে যতটা ধস নামছে, ততটাই সমর্থন বাড়ছে পাকিস্তান পিপলস পার্টির। ভুট্টো পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।

১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ অভ্যুত্থান—আইয়ুব অপসারিত, সেনা জেনারেল ইয়াহিয়া খান একই কায়দায় ক্ষমতা দখল করলেন, তবে তিনি আইয়ুবকে দেশ থেকে বের করে দেননি। যেমনটা আইয়ুব করেছিলেন ইস্কান্দার মির্জার বেলায়।

ইয়াহিয়া খানের হাতে লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার হলো, দুই ইউনিট ভেঙে পাঁচ প্রদেশ হলো: পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বালুচিস্তান আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার আর জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের আইনে ৩০০ আসনের ১৬২টি পূর্ব পাকিস্তানের এবং ১৩৮টি পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশের। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক শক্তিরই প্রকাশ ঘটল—পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২ আসনের ১৬০টিই পেল আওয়ামী লীগ আর পশ্চিমের চার প্রদেশে পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুটল ৮১ আসন। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে ভুট্টোই নতুন আওয়াজ তুললেন, এধার হাম, ওধার তুম—আমি শাসন করব পশ্চিম পাকিস্তান, তুমি পূর্ব। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত ভুট্টোর ভূমিকা অগণতান্ত্রিক, মূলত তার অসহযোগিতা থেকে সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অস্ত্র ধরতে হয় এবং বাংলাদেশও আশ্রয় ও সমর সাহায্যে ভারতকে পাশে পেয়ে যায়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গৌরব ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে ধুলোতে মিশে যায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।

সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তার ডায়েরিতে লিখলেন: এটি পাকিস্তানের জন্য একটি কালো দিন, কেবল যে সাড়ে ছয় কোটি মুসলমানের (আইয়ুব খান অমুসলমানদের এ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেননি) একটি প্রদেশ ভারতীয় প্রভাব-বলয়ে চলে গেল তা নয়, আমাদের অত্যন্ত চমত্কার সেনা ডিভিশন, কিছু বিমান ও নৌশক্তি হাতছাড়া হয়ে গেল। তাদের কেমন করে ভারতের কাছ থেকে মুক্ত করা হবে সেটাই বড় চিন্তা। এ জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে ভারত বড় একটা বিনিময়মূল্য চেয়ে বসবে।

পাকিস্তানের পুরো বিপর্যয়ের অন্যতম একটি কারণ জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজেই, আইয়ুব খান লিখেছেন, ‘ভুট্টো যতদিন থাকবেন, পাকিস্তানে শান্তি আসবে না।’ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ জুলফিকার আলী ভুট্টো নিউইয়র্কের পাঁচ তারকা হোটেলে আয়েশ করে কাটিয়েছেন বলে পাকিস্তানিদের অনেকের অভিযোগ।

জেনারেলরা নিজেদের ব্যর্থতার দায় ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পিআইএর বিশেষ উড়োজাহাজ ভুট্টোকে আনতে নিউইয়র্ক পাঠানো হলো। তিনি ১৮ ডিসেম্বর ফিরলেন। ২০ ডিসেম্বর জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বেসামরিক সিএমএলএ (চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। ১৬ তারিখেই পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। জিন্নাহর ‘মথ-ইটেন’ পাকিস্তানের দায়িত্ব ভুট্টোর ওপর বর্তাল। ইয়াহিয়া গৃহবন্দি হলেন।

ভুট্টো পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল গুল হাসানকে টেনে আনলেন, কিন্তু অল্পদিন পরই তাকে অপসারণ করে বালুচিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের কসাই নামে পরিচিত টিক্কা খানকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন। নতুন সংবিধান প্রণয়ন করালেন। ফজলে এলাহিকে প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক ও ক্ষমতাহীন পদে বসিয়ে নিজে ১৯৭৩-এ প্রধানমন্ত্রী হলেন। ভুট্টোর অন্যতম সাফল্য যুদ্ধবন্দি ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ফেরত আনা এবং পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতের দখলে আসা পাঁচ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ড উদ্ধার করা, সিমলা চুক্তির আলোকে তা সম্ভব হয়েছিল।

পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্বও তার প্রাপ্য। পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন ও সাংবিধানিক সংস্কারের কাজটিও তার। ভুট্টো পাকিস্তানের জনপ্রশাসন এবং ভূমি প্রশাসনে যুগান্তকারী সংস্কার করেন। বালুচিস্তানে সামরিক অভিযান তার কলঙ্কজনক অধ্যায়ের একটি। পররাষ্ট্র নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। সেন্টো ও সিয়াটো ত্যাগ করে আরব দেশগুলো ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করেন।

তার দলের দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী আচরণ জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৯৭৭ নির্বাচনে ভুট্টো ও তার দলের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডসহ নির্বাচন জালিয়াতির অভিযোগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াউল হক ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ৫ জুলাই ১৯৭৭ ভুট্টো ও তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা গ্রেফতার হন। ভুট্টো ছাড়া পেয়ে পুনরায় গ্রেফতার হন। তারপর আর মুক্ত পৃথিবী দেখার সুযোগ পাননি। ১৯৭৭ সালের একটি মামলা সামনে চলে আসে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আহমদ রাজা কাসুরিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করলে গাড়িতে তার বাবা নবাব মোহাম্মদ আহমদ খান কাসুরি গুলিবিদ্ধ ও নিহত হন। ভুট্টো হন হুকুমের আসামি। ভুট্টোর সময়ের ফেডারেল সিকিউরিটি ফোর্সের প্রধান মাসুদ মাহমুদ সাক্ষ্য দেন যে ভুট্টোর নির্দেশেই গুলি করা হয়েছিল। বিচারকদের মধ্যে চিহ্নিত ভুট্টোবিরোধীও ছিলেন, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতি। ১৮ মার্চ ১৯৭৮ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সুপ্রিম কোর্টে আপিল হলে রায়ে বলা হয় প্রেসিডেন্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বদলে দিতে পারেন। কিন্তু তা হওয়ার নয়। প্রেসিডেন্ট তা চাইতে পারেন না। দণ্ডের আয়োজকও তিনি। ৪ এপ্রিল ১৯৭৯ ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়।

ভুট্টোও তার পরিণতি কী হবে জানতেন। তিনি বলেছেন, হয় আমাকেই মরতে হবে অথবা আমাকে হত্যা করা হবে। ভুট্টোকে নিয়ে লেখা গ্রন্থের নামই বর্ন টু বি হ্যাংগড। তিনি দ্রুত ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন, পতনও ছিল তেমনি দ্রুত। ভুট্টোরই কথা: প্রয়োজনে সব দেশ ও সরকারের বলপূর্বক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার থাকবে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সরকার তার ওপর সেই ক্ষমতাই প্রয়োগ করেছেন।

নুসরাত ভুট্টো জানিয়েছেন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফি প্রস্তাব দিয়েছিলেন কারাগারে কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে ভুট্টোকে তুলে নিয়ে যাবেন। গোটা পৃথিবীই ফাঁসির দিন পর্যন্ত ভেবেছে একটা নাটকীয় কিছু ঘটে যেতে পারে। ভুট্টোর নাটকীয় জীবনের শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কিছু ঘটেনি।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা