ষাটের দশক থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা জুলফিকার আলী ভুট্টো (১৯২৮-৭৯) একাত্তর-পূর্ববর্তী সময়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন; তত্কালীন ইতিহাসের পাতায় নজর রাখলে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায়। রাজনীতির মাঠে খেলুড়ে এ ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি ঘটনাবহুল তার ব্যক্তিগত জীবন, এমনকি পারিবারিক ইতিহাস।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর পূর্বপুরুষ পাকিস্তানের সিন্ধের লারকানায় এসে জুটেছিলেন প্রায় দুই শতাব্দী আগে। মূলত রাজপুতানার কিছু অধিবাসী সুপেয় পানির খোঁজে সিন্ধু উপত্যকায় পৌঁছেছিল। সেই দলগুলোর মধ্য থেকে কেউ কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টোর পূর্বপুরুষও তেমনি হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দলপতি হওয়ার কারণে তত্কালীন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সিন্ধুর সংলগ্ন এলাকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে নামের সঙ্গে ‘খান’ জুড়ে নেন। শেতো খান নামে জুলফির এ পূর্বপুরুষ মোগল আমিরদের সহায়তায় লারকানা থেকে উত্তরে রাতোদেরো অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ভূমির মালিক হয়ে ওঠেন এবং সেই থেকেই বলা চলে এ বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সিন্ধু নদের পানি এবং নদীবাহিত পলির কারণে উর্বর ভূমিতে প্রচুর ফসল উত্পন্ন হতো। উত্পন্ন ধান এবং আখের প্রাচুর্য এমন ছিল যে সমগ্র গোত্রের প্রয়োজন মিটিয়েও প্রচুর উদ্বৃত্ত থাকত। পাশাপাশি সেখানে তুলাও উত্পন্ন হতো এবং একইভাবে প্রচুর তুলাও উদ্বৃত্ত থাকত। সেই সময়ে মোগল মনসবদার এবং স্থানীয় শাসকরা বাণিজ্য তদারক করতেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল শাসন ভেঙে পড়তে থাকলে একসময় এসব অঞ্চলে ইউরোপীয় বণিকদের পা পড়ে, কিন্তু নানা কারণে গোত্রযুদ্ধ লেগে থাকার কারণে এখানে বাণিজ্য জমিয়ে তোলা কঠিন হয়েছিল। যেমন শেতো খানের প্রপৌত্র পীর বখশ খান নিজেই বহু উপজাতির সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনিই লারকানার একটি গোত্রের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে সেই গোত্র থেকে স্ত্রী গ্রহণ করে সেই অঞ্চলে ভুট্টোদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অর্থাৎ কোনো অঞ্চলে কিংবা অবস্থায় নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ভুট্টোরা বরাবরই দক্ষ।

পূর্বপুরুষের এ দক্ষতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যেও ছিল। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেমন প্রতিভা দেখিয়েছেন, পূর্বপুরুষের বংশ গৌরব ধরে রেখেছেন, বৃদ্ধি করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেকে রাজনীতির অঙ্গনে একজন দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে তৈরি করেছেন। কিন্তু পূর্বপুরুষের আরেকটি বৈশিষ্ট্যও তার মাঝে ছিল—প্রেমিক মানস। এক্ষেত্রে জুলফিকার আলী ভুট্টোর জীবনে যাওয়ার আগে তার অন্তত দুজন পূর্বপুরুষের জীবনের দিকে লক্ষ করলে বিষয়টির হদিস করা যাবে।

পীর বখশের পুত্র দাদো খান ভুট্টো, সিন্ধুর ব্রিটিশ শাসকের অধীনে লেফটেন্যান্ট হয়েছিলেন। তারই পৌত্র মীর গোলাম মোর্তজা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিতামহ, অর্থাৎ দাদা। সুদর্শন এ তরুণ তুর্কি লারকানার তত্কালীন কালেক্টর কর্নেল ম্যাথিউর একজন রক্ষিতার প্রেমে পড়েন। ‘বৃদ্ধ’ কর্নেলের প্রতি মোর্তজার কোনো সম্মান ছিল না এবং সেই সঙ্গে তিনি প্রেমে এমনই আবিষ্ট ছিলেন যে কর্নেলের ক্ষণিকের অনুপস্থিতির সুযোগে সেই মেয়েটির সঙ্গ লাভের চেষ্টা করেন এবং কর্নেলের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে যান। এ ঘটনার পর বহুদিন তাকে নির্বাসনে থাকতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নানা উপায়ে তিনি আফগানিস্তানের আমিরের সহায়তায় একসময় ভারতে ফেরেন এবং বহু ঘাত-প্রতিঘাতের পর নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।


সেদিক দিয়ে ভুট্টোর পিতা অনেক বেশি সংযত ছিলেন। তিনি প্রথম থেকেই নিজেকে উচ্চমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু ‘প্রথম দর্শনে প্রেম’ বিষয়টি ভুট্টোদের মধ্যে কাজ করে। কেননা জুলফিকার আলীর পিতা শাহ নওয়াজ ভুট্টোও একদম হঠাৎ এক মেয়ের প্রেমে পড়লেন। ১৯২৪ সালে শাহ নওয়াজ তার বোন-ভগ্নিপতির বাড়িতে একটি নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছিলেন। তার ভগ্নিপতি মীর মকবুল ছিলেন সুক্করের একজন পুলিশ কর্তা। সেই নিমন্ত্রণে লাখি বাঈ নামে এক হিন্দু রাজপুত তরুণীর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে। প্রথম দর্শনে প্রেম এবং এক বছরের মধ্যেই পরিণয়।

লাখি বাঈ মূলত শাহ নওয়াজ ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং শাহ নওয়াজ যখন তাকে বিয়ে করেন, লাখির বয়স ১৬-১৭ ছিল বলেই ধারণা করা হয়। এ অনুষ্ঠান সরাসরি ভুট্টো পরিবারের তত্ত্বাবধানে হয়নি। বিয়ে হয়েছিল কোয়েটার কালাত অঞ্চলে, শাহ নওয়াজের বন্ধু কালাতের ‘খান’-এর তত্ত্বাবধানে। লাখি ধর্মান্তরিত হন এবং তার নতুন নাম হয়েছিল খুরশীদ বেগম। বলা হয়ে থাকে লাখি একজন বাঈজী (নাচনেওয়ালি) ছিলেন। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো শেতো খানের বহু বছর পর তার উত্তরসূরি শাহ নওয়াজ সরাসরি একজন হিন্দু রাজপুত নারীকে বিয়ে করেন এবং সেই নারীর কনিষ্ঠ সন্তান জুলফিকার আলী ভুট্টো, পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

উত্তরাধিকার সূত্রে শিকারের নেশা পেয়েছিলেন জুলফি। শিকারের জন্য লারকানায় তার জমিদারিতে নিমন্ত্রিত হয়ে আসতেন দুবাইয়ের শেখ, ইরানের শাহ্, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান। লারকানায় ভুট্টোদের জমিদারিতে প্রচুর বুনো শুয়োর পাওয়া যেত, যেগুলো ছিল শিকারের মূল আকর্ষণ। বলা হয় সে সময় শিকারের বন্দুক ও গোলাবারুদের সেরা ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল জুলফি ভুট্টোর।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক