জুলফি ভুট্টোর স্কুল-কলেজ জীবন কেটেছে এখনকার ভারতের মুম্বাইতে। এরপর ১৯৪৭ সালে পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়তে হাজির হলেন যুক্তরাষ্ট্রে, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায়। লস অ্যাঞ্জেলেসে নেমে ভুট্টো প্রথমেই তার বাড়ির চাকরদের অভাব বোধ করতে শুরু করেন। লারকানার বিলাসী জীবনের সুযোগ সেখানে ছিল না। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই এক বাড়িতে আরেক পাকিস্তানি তরুণের সঙ্গে তাকে রুম শেয়ার করতে হলো। পাকিস্তানি সমাজে উচ্চবংশীয় জুলফিকার হঠাৎই নিজেকে আবিষ্কার করলেন ‘নিগার’ হিসেবে। ক্রিকেট খেলার সুযোগ ছিল না বলে জুলফি ও তার রুমমেট ওমর কুরেশি নাম লেখালেন টেনিসে। মুম্বাইয়ের ম্যাড়ম্যাড়ে ক্লাবগুলোর তুলনায় লস অ্যাঞ্জেলেসের নাইট ক্লাব তাদের অনেক বেশি বিনোদিত করেছিল।



ক্যালিফোর্নিয়ায় জুলফি অনেক তরুণীর সঙ্গে ডেট করেছিলেন। এখানে পরিবার, সমাজের বাধামুক্ত অবস্থায় জুলফির জীবন ছিল উদ্দাম। তার বন্ধুদের কেউই কখনো ধারণা করতে পারেননি যে জুলফি তখন বিবাহিত। ১৯৪৩ সালেই শিরিন আমির বেগমের সঙ্গে ভুট্টোর বিয়ে হয়েছিল। পোশাক-আশাক, আর চালচলনে জুলফি তখন রোমান্টিক তরুণ। এ সময় মেরি এলেন নামে ত্রিশের কোটার এক সদ্য বিধবা, দুই সন্তানের মায়ের সঙ্গেও জুলফি রোম্যান্স করেছেন। অ্যানি রেনল্ডস ছিলেন এ সময় তার আরেক প্রেমিকা। আরো ছিলেন লিলি বখতিয়ার। লিলিকে নিয়ে জুলফি সান্তা মনিকা সৈকতে হাঁটতে যেতেন। এই লিলি পরবর্তী সময়ে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. বখতিয়ার। লিলি জানিয়েছেন, হঠাৎই জুলফি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু এটা লিলিকে অবাক করেছিল কারণ তাদের মধ্যে সম্পর্ক তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না। নিজের কথার গুরুত্ব বাড়াতে লিলিকে একটা ঘড়ি আর শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন জুলফি। বখতিয়ার ছিলেন পারস্যের মেয়ে, এটাও জুলফিকে আকর্ষণ করেছিল। এখানে লিলি বখতিয়ার একটি তথ্য দিয়েছেন, যা পরে জুলফির রাজনৈতিক বিকাশ অনুসরণে সহায়ক হয়। তিনি বলেছেন, তখনই জুলফি প্যান-ইসলামিজমের কথা বলতেন। তার স্বপ্ন ছিল ইসলামী জাতিগুলোকে একত্রিত করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি হওয়া। লিলির বয়স তখন ১৮। ভুট্টোর এসব কথা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেল। তার কথায়, ‘তার এসব ধারণা আমার খুব উগ্র মনে হয়েছিল।’

রুমমেটদের সবসময় জুলফি বলতেন, পাকিস্তানে ফিরেই তিনি প্যান-ইসলামিক লিগ নামে একটি দল প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি যে ক্ষমতার পিয়াসী ছিলেন সেটা তখন তার রুমমেটরাও টের পেয়েছিলেন। বন্ধুদের বলতে জিন্নাহ তার আদর্শ। অবশ্য শুধু ওমর কুরেশি ছাড়া তার বন্ধুদের আর কেউই সেভাবে এসব কথা নিয়ে আগ্রহ দেখাননি।

বন্ধু চেকভালা ও জো ফিলিপকে নিয়ে একদিন গাড়িয়ে চালিয়ে ট্রাফিক আইন ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ শোরগোল ফেলেছিলেন জুলফি। গ্রীষ্মের ছুটিগুলোতে তিনি ওয়াশিংটনে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাসে কাজ করেছিলেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে।

১৯৪৯ সালে নিজের ২১তম জন্মদিনে জুলফি তার বাবার কাছ থেকে দুটো বই উপহার পেয়েছিলেন। লারকানা থেকে আসা সেই


উপহারের মধ্যে ছিল চামড়ায় বাঁধাই করা উইলিয়াম স্লোনের লেখা পাঁচ খণ্ডে নেপোলিয়ান বোনাপার্টের জীবনী এবং কার্ল মার্ক্সের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। নেপোলিয়ান ছিলেন ভুট্টোর চিরদিনের আদর্শ। জুলফি একসময় বলেছিলেন, ‘নেপোলিয়ানের কাছ থেকে আমি ক্ষমতার রাজনীতি শিখেছি। আর কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো থেকে দারিদ্র্যের রাজনীতি।’ নিজে প্যান-ইসলামিজম নিয়ে আগ্রহী হলেও এ সময় বিয়ার ছিল তার খুব প্রিয় পানীয়।

ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষকরা জুলফিকে নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। তারা অনেকে তার মধ্যে ভালো ছাত্রের সম্ভাবনা দেখেছেন। তখনকার পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের প্রধান উইলবার্ট হিন্ডম্যান অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে তার ভর্তির আবেদনে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু জুলফির ফলাফল তখন বি গ্রেডের নিচে। দুই বছর ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় কাটিয়ে ১৯৪৯ সালের জুনে তিনি চলে যান বার্কলি ক্যাম্পাসে। শেষমেশ ১৯৫০ সালের জুনে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলি ক্যাম্পাস থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স ডিগ্রি পাওয়ার পর সে বছরই লন্ডনে অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। বার্কলিতে তার সহপাঠী লিও রোজ স্মরণ করেছেন এখানেও তিনি অনেক মেয়েদের সঙ্গে ডেট করতেন। এখানে তিনি অধ্যাপক হ্যান্স কেলসেনের বিশেষ ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জীবনে পরবর্তী সময়ে বহু ভাষণ, বিতর্কে তিনি এ হ্যান্স থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। বার্কলিতে জুলফি নিজেকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতেন। এ সময় পড়েছিলেন হ্যারল্ড লাস্কির গ্রামার অব পলিটিকস সঙ্গে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের রচনা। এ সময়ই পাকিস্তানের নেতা হওয়ার বাসনা তার মধ্যে দৃঢ় হয়ে ওঠে। সহপাঠীদের স্মৃতিচারণে তা স্পষ্ট।

বার্কলি থেকে অক্সফোর্ডে যাত্রা করার আগে ভুট্টো তার শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, সফল রাজনীতিবিদ হতে হলে আমাদের তাই করতে হবে, যা অন্যরা আমাদের সঙ্গে করতে চাই এবং সেটা করতে হবে অন্যেরা কিছু করার আগেই। কিছুদিন পরেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রবেশ করে জুলফি এ ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতি অনুসারেই কাজ করেছিলেন।

১৯৫১ সালে ফিরলেন করাচিতে। উদ্দেশ্য এবার নুসরাত ইস্পাহানিকে বিয়ে করা। বিয়ের কথা পাড়তেই বিরোধিতা আসে জুলফি ও


নুসরাতের পিতার পক্ষ থেকে। পরিস্থিতি মানাতে না পেরে জুলফি সিদ্ধান্ত নিলেন নুসরাতকে নিয়ে লন্ডনে চলে যাবেন। জুলফির এক বন্ধু এগিয়ে এসে তাদের দুজনকে বিয়ে করতে উৎসাহ দিলেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে তাদের বিয়ে হয়ে যায়। জুলফির মা তাদের সমর্থন দিয়েছিলেন।

নবদম্পতি অক্সফোর্ডে ফিরলেন। ক্রাইস্ট চার্চ কলেজের কাছেই এক হোটেলে নুসরাতের থাকার ব্যবস্থা করলেন জুলফি। প্রতি রাতে ১১টার মধ্যে জুলফিকে কলেজে ফিরতে হতো, কারণ এর পর গেট বন্ধ করে দেয়া হতো।

অক্সফোর্ড থেকে আইনের ডিগ্রি নিয়ে জুলফি ১৯৫৩ সালে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার হলেন। এ বছরই করাচিতে জন্ম হয় জুলফি-নুসরাত দম্পতির প্রথম সন্তান বেনজির ভুট্টো, যিনি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের দুবারের প্রধানমন্ত্রী। জুলফি করাচিতে ফিরলের বেশ কয়েক মাস পরে। সন্তানের মুখ থেকে কিছুদিন পর ভুট্টো ফিরলেন লারকানায় তার প্রথম স্ত্রী ও জমিজমার খোঁজ নিতে। বছরে শীতকালটা জুলফি কাটাতেন এ লারকানায়। এখানে পাকিস্তানি ও বিদেশী বন্ধুদের দাওয়াত দিতেন শিকার করতে। এভাবে অক্সফোর্ড জীবন শেষ করে জুলফি ভুট্টো শুরু করলেন তার করাচির জীবন।

 

সূত্র: স্ট্যানলি ওলপার্টের জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্তান: হিজ লাইফ অ্যান্ড টাইম