সিকিউরিটি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.)
রফি উদ
দীন ভুট্টোর শেষ মুহূর্তের সবচেয়ে কাছাকাছি মানুষ। তার
রচনা থেকে
নির্বাচিত অনূদিত অংশ তুলে
নিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর জীবনের শেষ
কোলাজ চিত্রটি নির্মাণ করা
হয়েছে:
৩-৪
এপ্রিল ১৯৭৯
রাতে ভুট্টোকে
ফাঁসিতে ঝোলানো
হবে। বিষয়টি
তাকে জানানোর
জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত
হয়েছেন চারজন:
১. জেল
সুপারিনটেনডেন্ট চৌধুরী
ইয়ার মোহাম্মদ
২. সিকিউরিটি
ব্যাটালিয়ন কমান্ডার
লেফটেন্যান্ট কর্নেল
রফি উদ
দীন
৩. ম্যাজিস্ট্রেট
ফার্স্ট ক্লাস
বশির আহমদ
খান
৪. জেলখানার
ডাক্তার সগীর
হোসেন শাহ
এ
চারজনের দলটি
৩ এপ্রিল
১৯৭৯ সন্ধ্যা
৬টা ৫
মিনিটে জেলখানার
ডেথ সেলে
প্রবেশ করে।
দলের সদস্যরা
দেখলেন ভুট্টো
মেঝেতে বিছানো
তোশকের ওপর
শুয়ে।
জেল সুপারিনটেনডেন্ট
ইয়ার মোহাম্মদ
ফাঁসি কার্যকর
করার আদেশটি
ভুট্টোকে পড়ে
শোনালেন:
লাহোর হাইকোর্টের ১৮ মার্চ
১৯৭৮-এর
আদেশ মোতাবেক নওয়াব মোহাম্মদ আহমদ খানকে
হত্যার অপরাধে
আপনি—জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে
মৃত্যু নিশ্চিত করে আদালতের আদেশ তামিল
করা হবে।
সুপ্রিম কোর্টে
দায়ের করা
আপনার আপিল
৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ খারিজ
হয়ে গেছে।
আপনার দায়ের
করা দণ্ডাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আদেশ
২৪ মার্চ
১৯৭৯ নাকচ
হয়ে যায়।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা
থেকে বিরত
থাকতে চেয়েছেন। আপনাকে আদেশ
মোতাবেক ফাঁসিতে ঝোলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেল সুপারিনটেনডেন্ট
যখন আদেশ
পাঠ করছিলেন
আমি ভুট্টোর
চেহারায় আতঙ্কের
কোনো চিহ্ন
দেখিনি। বরং
তাকে মনে
হয়েছে শান্ত
ও আয়েশি
এবং মুখে
ঈষৎ হাসি।
সংবাদটি ভুট্টো
যেভাবে গ্রহণ
করলেন আমি
সত্যিই বিস্মিত
হয়েছি। আমার
নিজের ভেতরে
যে কথা
শুনতে পাই
তা হচ্ছে:
এ নেতার
মৃত্যু আমাদের
জাতি ও
রাষ্ট্রের জন্য
ভয়ংকর একটি
ব্যাপার হবে।
সম্ভবত জীবনে
এ প্রথম
আমার মনে
হলো আমি
নিজের ওপর
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে
ফেলছি।
ভুট্টো সাহেব
জেল সুপারিনটেনডেন্টের
চোখের দিকে
তাকিয়ে বললেন
(এ কথাগুলো
ভুট্টোর জবানিতে):
‘আমাকে ফাঁসি
দেওয়ার ২৪
ঘণ্টা আগে
যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের বিষয়টি আমাকে
জানাবার কথা,
কিন্তু তা
করা হয়নি।
বরং আজ
সকাল সাড়ে
এগারোটায় আমার
মেয়ে ও
স্ত্রী আমার
সঙ্গে দেখা
করতে আসে,
তারাও এ
সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না।
আমি জেল
সুপারিনটেনডেন্টকে ডেকে
এর ব্যাখ্যা চাইলাম। তিনি
অস্পষ্টভাবে বললেন
ফাঁসি কার্যকরের আদেশ দেওয়া
হয়েছে, আদেশটি
তার কাছেই
রয়েছে। তিনি
আমাকে আরো
বলেছেন, আমার
আত্মীয়রা—আমার বোন
মুনাওয়ার উল
ইসলাম, আমার
কাজিন মমতাজ
আলী ভুট্টো
আমার মেয়ে
ও স্ত্রী
বিদায় হলে
আমার সঙ্গে
সাক্ষাৎ করবে।
তিনি আরো
বলেছেন, সবাই
চলে যাওয়ার
পর ১টা
৫০ মিনিটে
তিনি নিজে
এসে আমার
উইল ইত্যাদি আমার কাছ
থেকে গ্রহণ
করবেন। আমার
ফাঁসি কার্যকর করার কোনো
লিখিত আদেশ
এখন পর্যন্ত আমাকে দেখানো
হয়নি। যত
শিগগির সম্ভব
আমি আমার
আইনজীবীর সঙ্গে
সাক্ষাৎ করতে
চাই। আমাকে
দেখার জন্য
আমার অন্যান্য আত্মীয়দের অনুমতি
দেওয়া উচিত।
আমার দাঁতের
অবস্থা খারাপ,
জরুরি ভিত্তিতে আমার ডেন্টিস্ট জাফর নিয়াজির সঙ্গে দেখা
হওয়া দরকার।
ভুট্টোর কথা
শেষ হলে
প্রথম শ্রেণীর
ম্যাজিস্ট্রেট বশির
আহমদ খান
তাকে নিজের
পরিচয় দিলেন
এবং বললেন,
তিনি যদি
তার উইল
লিখতে চান
লিখতে পারেন।
এজন্য তাকে
কাগজ ইত্যাদি
সরবরাহ করা
হবে। এরপর
সরকার পক্ষ
থেকে দেয়া
সব বার্তা
শেষ হলো
এবং কর্মকর্তারা
ফিরে যেতে
শুরু করলেন।
আমি তখনো
হতবুদ্ধি অবস্থায়।
মনে হলো
আমি পাথরের
মতো জমে
যাচ্ছি। ভুট্টো
সাহেব উঠে
দাঁড়াতে চেষ্টা
করলেন, কিন্তু
হুমড়ি খেয়ে
পড়লেন। আমার
বাহু বাড়িয়ে
তাকে ধরতে
দিলাম। তিনি
বললেন, তার
পাকস্থলীতে সমস্যা
হচ্ছে।
ভুট্টো সাহেব
তার হেলপার
আবদুর রেহমানকে
ডেকে গরম
পানি আনতে
বললেন, শেভ
করবেন। তারপর
তিনি আমার
দিকে তাকিয়ে
জিজ্ঞেস করলেন,
রফি, এখন
কোন নাটকটি
মঞ্চস্থ হচ্ছে?
আমি কিছুটা
সময় চুপ
থাকি। তিনি
প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি
করলেন।
সবিনয়ে বললাম,
স্যার, আমি
কি কখনো
আপনার সঙ্গে
কৌতুক করেছি?
তিনি তত্ক্ষণাৎ
জবাব দিলেন,
তুমি কী
বলতে চাও?
তারপর আবার
সেই প্রশ্নের
পুনরাবৃত্তি করলেন।
আমি বললাম,
স্যার, আদেশ
জারি হয়ে
গেছে। আজই
আপনাকে ফাঁসিতে
ঝোলানো হবে।
এ প্রথম
তার অবাক
হওয়া চেহারা
দেখলাম। তিনি
হাত নেড়ে
চড়া স্বরে
বললেন, ঠিক
আছে...সব
শেষ হয়ে
গেছে...ঠিক
আছে...সব
শেষ হয়ে
গেছে।
আমি বললাম,
জি স্যার।
আমার মনে
হলো আতঙ্কে
ভুট্টো সাহেবের
চোখ ফেটে
বের হয়ে
আসতে চাইছে।
তার মুখমণ্ডল
হলদে এবং
শুকনো হয়ে
উঠছে। সে
সময়কার প্রকৃত
অবস্থা সঠিকভাবে
বর্ণনা করা
আমার পক্ষে
সম্ভব নয়।
তারপর তিনি
জিজ্ঞেস করলেন,
আজই? কোন
সময়?
জাম্প-মাস্টার
লাফ দেয়ার
আগে আঙুলে
যেমন সময়
দেখায় আমি
তাকে হাতের
আঙুল দেখালাম।
তিনি বললেন,
সাতদিন পর?
আমি তার
কাছে গিয়ে
বললাম, স্যার,
ঘণ্টা।
তিনি বললেন,
আজই! ৭
ঘণ্টা পর?
আমি মাথা
নেড়ে হ্যাঁ-সূচক
জবাব দিলাম।
ভুট্টো সাহেবকে
যখন পিন্ডি
জেলে আনা
হয়, তিনি
ছিলেন পাথরের
মতো শক্ত,
এখন মনে
হয় তিনি
বাষ্পীভূত হয়ে
যাচ্ছেন। সে
সময় আমি
জীবনের বাস্তবতা
অনুভব করেছি।
একটু বিরতি
দিয়ে তিনি
যেন নিজেকেই
শোনাতে থাকেন,
আমার উকিলরা
সব লণ্ডভণ্ড
করে দিয়েছে।
আমার ফাঁসির
জন্য ইয়াহিয়া
দায়ী (ইয়াহিয়া
বখতিয়ার, ভুট্টোর
একজন আইনজীবী)।
সে আমাদের
ভুল কথা
শুনিয়ে গেছে,
সবকিছুর বারোটা
বাজিয়ে দিয়ে
গেছে। তারপর
তিনি বললেন,
তার দলের
দরকার একজন
মৃত ভুট্টো,
জীবিত ভুট্টো
নয়।
আমি চলে যাওয়ার পর ৭টা ৫ মিনিটে পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট খাজা গোলাম রসুলের উপস্থিতিতে তিনি শেভ করেন। যে সেন্ট্রি সেলের বাইরে পাহারা দিত, তিনি তাকে ডাকলেন এবং ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্টকে বললেন, মৃত্যুর পর তার হাতঘড়িটা যেন সেন্ট্রিকে দিয়ে দেয়া হয়। ভুট্টো সাহেবের চোখে অশ্রু নামল। তিনি তার হেলপার আবদুর রেহমানকে বললেন এক কাপ কফি আনতে। কফি আনা হলো। ভুট্টো সাহেব তাকে বললেন, রেহমান, আমি যদি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে থাকি তাহলে আমাকে ক্ষমা করো। আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে, আজ রাতই তোমার সঙ্গে আমার শেষ রাত। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য আমি তোমার অতিথি হয়ে থাকব। ভুট্টো সাহেব পৌনে ৯টা থেকে পৌনে ১০টা পর্যন্ত তার উইল নিয়ে কাজ করলেন। তারপর প্রায় ১০ মিনিট ধরে তার আয়না, চিরুনি, হেয়ার ব্রাশ, জায়নামাজ গোছগাছ করে টেবিলে রাখলেন। ৯টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত দাঁত ব্রাশ করলেন, মুখ ধুলেন, মাথা আঁচড়ালেন। তারপর প্রায় ৫ মিনিট ধরে তার সিগারেটের ছাই ও পোড়া কাগজের ছাই পরিষ্কার করলেন। আবার রাত ১০টা ১০ থেকে ১১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত লিখলেন। তারপর এতক্ষণ যা লিখলেন তার সবই পুড়িয়ে ফেললেন। গোটা সেলজুড়ে ছাই ছড়িয়ে পড়ল। তিনি আবদুর রেহমানকে ডেকে সেল পরিষ্কার করতে বললেন।
রাত ১১টা
২৫ মিনিটে
তিনি বললেন,
কিছুক্ষণ ঘুমোতে
চেষ্টা করবেন,
গত রাতে
ঠিকভাবে ঘুমোতে
পারেননি। তাকে
রাত ১২টার
সময় ডেকে
তুলতে বললেন।
ঘুম ঘোরে
তিনি কয়েকবার
তার মেয়ে
সনমের নাম
ধরে ডাকলেন।
রাত ১১টা
৫৫ মিনিটে
অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট
মাজিদ আহমদ
কোরেশি ও
কাজিম হোসেন
বালুচ হাজির
হলেন। তারা
সেলের বাইরে
থেকে ভুট্টো
সাহেবকে জাগাতে
চেষ্টা করলেন,
কিন্তু তিনি
সাড়া দিলেন
না। কোরেশি
জেল অফিসে
ফোন করে
তাদের এ
অবস্থায় কী
করণীয় জানতে
চান। তাকে
সেলের ভেতর
ঢুকে ভুট্টো
সাহেবকে জাগাতে
বলা হলো।
কোরেশি ভেতরে
ঢোকার পরও
তিনি জাগলেন
না।
১২টা বাজার
১ মিনিট
আগে আমি
জেল সুপারিনটেনডেন্ট,
জেলখানার ডাক্তার
ও ম্যাজিস্ট্রেটকে
নিয়ে সিকিউরিটি
ওয়ার্ডে ঢুকলাম।
সেলের ভেতরে
ভুট্টো সাহেব
তোশকের ওপর
পড়ে আছেন,
তার মুখ
সেলের দিকেই।
জেল সুপারিনটেনডেন্ট
চৌধুরী ইয়ার
মোহাম্মদ ও
জেলখানার ডাক্তার
দেখেছেন ভুট্টো
সাহেব তার
এক চোখ
খুলেছেন, কিন্তু
আমাদের দেখে
তিনি তত্ক্ষণাৎ
চোখ বন্ধ
করে ফেলেন।
চৌধুরী ইয়ার
মোহাম্মদ ও
আমি ভুট্টো
সাহেবকে নাম
ধরে ডাকি,
কিন্তু তাতে
কোনো কাজ
হয় না।
ভুট্টো সাহেবকে
পরীক্ষা করার
জন্য ডাক্তারকে
নির্দেশ দিই।
ডাক্তার তার
পালস পরীক্ষা
করলেন, তারপর
স্টেথোস্কোপে হূত্স্পন্দন
শুনে ফিসফিস
করে আমাকে
বললেন, তিনি
ভালোই আছেন।
আমি ডাক্তারকে
আমার সঙ্গে
সেলের বাইরে
আসতে বললাম।
জিজ্ঞেস করলাম,
ভুট্টো সাহেব
জবাব দিচ্ছেন
না কেন?
ডাক্তার আমাকে
আশ্বস্ত করলেন,
তিনি সম্পূর্ণ
সুস্থ, তাকে
নিয়ে দুশ্চিন্তার
কারণ নেই;
তিনি ভান
করছেন।
আমি ডাক্তারকে
আবার বললাম,
যদি তার
কিছু হয়
তাহলে ডাক্তারকেই
তার দায়িত্ব
নিতে হবে।
তাকে আবার
পরীক্ষা করার
নির্দেশ দিলাম।
ডাক্তার তৃতীয়বারের
মতো পরীক্ষা
করে বললেন,
সবই ঠিক
আছে, ভুট্টো
সাহেব ভান
করছেন।
রাত ১টা
১০ মিনিটে
ভুট্টো সাহেব
নিজেই উঠলেন।
মাজিদ আহমদ
কোরেশি বললেন,
তার গোসলের
জন্য গরম
পানি রাখা
আছে। কিন্তু
তিনি জানালেন,
তিনি আর
গোসল করবেন
না।
ফাঁসি
আদেশ
অনুযায়ী ১৯৭৯
সালের ৩-৪
এপ্রিল রাতে
ইন্সপেক্টর অব
জেল চৌধুরী
নাজির আখতারের
উপস্থিতিতে তার
ফাঁসি কার্যকর
করার কথা।
ইন্সপেক্টর ৩
এপ্রিল সকাল
থেকে জেলখানায়
অবস্থান করছেন।
তিনি অনশন
ধর্মঘট চালিয়ে
যাচ্ছিলেন বলে
তার শারীরিক
অবস্থা বিবেচনা
করে একটি
স্ট্রেচার এনে
রাখা হয়েছে।
রাতটা গভীর
অন্ধকার এবং
আকাশে পুরো
ঘন কালো
মেঘ, সেজন্য
কয়েকটি পেট্রোম্যাক্সও
আনা হয়েছে।
রাত ১টা
৩৫ মিনিটে
নিচের কর্মকর্তারা
জেলখানার সিকিউরিটি
ওয়ার্ডে প্রবেশ
করলেন:
১. জেল
সুপারিনটেনডেন্ট চৌধুরী
ইয়ার মোহাম্মদ,
২. সিকিউরিটি
ব্যাটালিয়ন কমান্ডার
লেফটেন্যান্ট কর্নেল
রফি উদ
দীন, ৩.
ম্যাজিস্ট্রেট ফার্স্ট
ক্লাস বশির
আহমদ খান,
৪. জেল
ডাক্তার খাজা
সগীর হোসেন
শাহ, ৫.
ডেপুটি জেল
সুপারিনটেনডেন্ট গোলাম
রসুল।
কর্মকর্তারা ভুট্টো
সাহেবের সেলে
ঢুকলেন। তিনি
জাগ্রত, তোশকের
ওপর শুয়ে
আছেন। ম্যাজিস্ট্রেট
বশির আহমদ
খান তাকে
জিজ্ঞেস করলেন
তিনি কোনো
উইল রেখে
যেতে চান
কিনা? ভুট্টো
সাহেব চুপ
করে রইলেন।
তিনি হলদে
ও পাণ্ডুর
হয়ে গেছেন,
শরীরও খুব
দুর্বল মনে
হলো। তার
স্বর একটু
কেবল শোনা
যায়, দুর্বলতা
থেকে এ
অবস্থা। তারপর
প্রশ্নের জবাবে
তিনি বললেন,
আমি লিখতে
চেষ্টা করেছি,
কিন্তু আমার
ভাবনা এতই
এলোমেলো হয়ে
গেছে যে
আমি কাজটা
করতে পারিনি,
আমি এটা
পুড়িয়ে ফেলেছি।
ম্যাজিস্ট্রেট আবার
এগিয়ে এসে
তিনি একটি
উইল লিখতে
আগ্রহী কিনা
জানাতে বললেন।
কিন্তু তিনি
নীরব রইলেন।
ম্যাজিস্ট্রেট আবার
একই কথা
জিজ্ঞেস করলেন।
ভুট্টো সাহেব
বললেন, হ্যাঁ,
আমি ডিকটেশন
দিতে চাই।
ততক্ষণে সময়
শেষ হয়ে
গেছে। জেল
সুপারিনটেনডেন্ট প্রধান
ওয়ার্ডারকে আদেশ
করলেন সিকিউরিটি
ওয়ার্ডের ভেতরে
অবস্থানরত তার
লোকজন যেন
ভুট্টো সাহেবকে
উঠিয়ে নিয়ে
আসে। চারজন
ওয়ার্ডার ভেতরে
ঢুকলেন। দুজন
তার দুই
পায়ে এবং
দুজন দুই
বাহুতে ধরে
ভুট্টো সাহেবকে
উঠিয়ে ফেললেন।
যখন তাকে
উঠানো হচ্ছিল
তিনি বললেন,
আমাকে ছেড়ে
দাও।
আমি অবাক
হই। জেলখানার
দেয়ালের ওপারেই
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন।
ভুট্টো সাহেব
তখন যা
চাইতেন পৃথিবীর
যে প্রান্ত
থেকেই হোক
তা তিনি
পেয়ে যেতেন।
আর আজ
তার এক
কাপ চা
খাওয়ার সাধারণ
ইচ্ছেটিও পূর্ণ
হচ্ছে না।
চারজন ওয়ার্ডার
চারদিক থেকে
স্ট্রেচার তুলল।
ভুট্টো সাহেব
কেবল মাথা
তুললেন, স্থির
রইল তার
শরীর। তার
পা হলুদ
রঙ ধরেছে—যেন
শুষে তার
রক্ত বের
করে নেয়া
হয়েছে। ফাঁসিকাষ্ঠ
পর্যন্ত আসতে
তিনি নিথর
হয়েই পড়ে
ছিলেন। ফাঁসিকাষ্ঠের
কাছে মাটিতে
স্ট্রেচার নামানো
হলো। তখন
আমিই ভুট্টো
সাহেবের সবচেয়ে
কাছে। দুজন
ওয়ার্ডার ভুট্টো
সাহেবের বগলতলায়
হাত ঢুকিয়ে
তাকে তক্তার
ওপর দাঁড়
করাতে চেষ্টা
করলেন। তার
মুখমণ্ডল থেকে
সামান্য দূরে
আমার কান।
তার হ্যান্ডকাফ
খুলে দুই
হাত ও
দুই বাহু
সজোরে ঝাঁকি
দিয়ে পেছনে
নিয়ে আবার
হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে
দেয়া হলো।
এরই মধ্যে
জল্লাদ তারা
মশিহ চলে
এল। ভুট্টো
সাহেবকে মুখোশ
পরিয়ে দিল।
মুখোশের কারণে
হয়তো তার
শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল
কিংবা যেভাবে
তার হাত
বাঁকিয়ে পেছনে
নিয়ে হ্যান্ডকাফ
লাগানো হয়েছে,
তাতে যে
ব্যথা পেয়েছেন
সেই ব্যথায়
কাতরাচ্ছেন।
তিনি সম্ভবত
বলতে চেয়েছেন,
এগুলোয় আমার
ব্যথা লাগছে।
আমি তার
খুবই কাছাকাছি।
আমি তার
এত কাছাকাছি
এসে গেছি
তক্তাটিকে উপেক্ষা
করে তার
মুখ ও
আমার কানের
দূরত্ব দেড়
ফুটের বেশি
নয়। কিন্তু
তার শেষ
বাক্যটি আমি
শুনতে পাইনি।
মধ্যরাত পেরিয়ে
৪ এপ্রিল
১৯৭৯, ২টা
০৪ মিনিট
জল্লাদ লিভার
চাপ দিল,
ভুট্টো সাহেব
ঝুলে পড়লেন।
আমি সিঁড়ি
বেয়ে নিচে
নামলাম—ভুট্টো
সাহেব ঝুলে
আছেন। আমি
দেখলাম তার
শরীর আলতো
করে দুলছে—এটা
শরীরের নিম্নমুখী
ভরবেগের কারণেই।
ততক্ষণে নিশ্চয়ই
তার দম
বেরিয়ে গেছে।
ভুট্টো সাহেবের
ঝুলন্ত শরীরের
একপাশে রাখা
চেয়ারে আমি
জেল সুপারিনটেনটেন্টের
পাশে বসলাম।
ফাঁসিতে ঝুলে
থাকা ভুট্টো
সাহেবকে যেমন
দেখেছি তা
কখনো ভুলতে
পারিনি, সে
সময়ের কথা
মনে হলে
এখনো গা
কেঁপে ওঠে।
কয়েক মিনিট
পরে দেখলাম,
কে-একজন
ভুট্টোর শরীর
নাড়াচাড়া করছে।
আমি চৌধুরী
ইয়ার মোহাম্মদকে
জিজ্ঞেস করলাম,
লোকটি কে?
তার পরিবর্তে
ইন্সপেক্টর জেনারেল
অব প্রিজন
জবাব দিলেন।
বললেন, লোকটা
তারা মশিহ।
সে ভুট্টো
সাহেবের পা
ও হাত
টেনে সোজা
করছে, যাতে
খিঁচুনির কারণে
তার শরীর
বেঁকে না
যায়।
ফাঁসিতে ঝোলানোর
আধঘণ্টা পর
ডাক্তার তার
ডেথ সার্টিফিকেট
জারি করলে
তার ঝুলন্ত
দেহ ২টা
৩৫ মিনিটে
নামানো হয়।
তার মরদেহ
গোসল করানো
হয়, ওখানেই
গোসলের আয়োজন
করা হয়।
একটি গোয়েন্দা
সংস্থা প্রেরিত
একজন ফটোগ্রাফার
ভুট্টো সাহেবের
বেশ কয়েকটি
ছবি তোলে,
এমনকি তার
গোপনাঙ্গের ছবিও।
কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত
হতে চাচ্ছিল—তাকে
ইসলামী পদ্ধতিতে
খতনা করানো
হয়েছিল কিনা।
ছবি তোলা
হলে নিশ্চিত
হওয়া যায়
যে তাকে
ইসলামী পদ্ধতি
অনুসরণ করে
খতনা করানো
হয়েছিল।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





