‘আমরা রাস্তায় পা রাখলাম। বন্ধু ডেভিড শাহারের বুক বেশ প্রশস্ত, সে গভীরভাবে শ্বাস টানল। আমাকেও একই কাজ করার পরামর্শ দিল। এ বাতাস জেরুজালেমের, এ বাতাস চিন্তা উদ্রেককারী, সন্তরাও এমনটা বলে গেছেন। এখন আমি এ কথা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত। আমি জানি এ বাতাসে নিশ্চয় কোনো বিশেষ উপাদান আছে। আলোর কোমলতাও আমাকে আক্রান্ত করেছিল। ভাঙা পাথর আর ছোট ছোট বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে ডেড সির দিকে তাকালাম। এগুলোর রঙ এখানকার ভূমির মতোই। অদ্ভুত এক প্রাণহীন পরিবেশ চারপাশে; বাতাস যেন গলে গেছে, মানুষের মতো ভর নিয়ে সে চেপে ধরতে চাইছে। বোধগম্য নয়, কিছুটা মেটাফিজিকাল যেন এ রঙের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। সামনে পাথুরে উপত্যকা শেষ হয়েছে ডেড সিতে। এ উপত্যকার উন্মুক্ত প্রান্তরে মহাবিশ্ব যেন নিজেকে ব্যাখ্যা করছে আপনার চোখের সামনে। দুনিয়ার অন্যখানে আপনি মারা গেলে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবেন। কিন্তু এখানে মরে আপনি মিশে যাবেন।’

১৯৭০ সালের মাঝামাঝি জেরুজালেম সফর করেন নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক সল বেলো। তার সেই সফরকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন টু জেরুজালেম অ্যান্ড ব্যাক গ্রন্থে। জেরুজালেম যে দুনিয়ার আর দশটা শহরের মতো নয় তা টের পেয়েছিলেন এ লেখক। ওপরে উল্লেখ করা তার বইয়ের কয়েকটি লাইন সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে।

সেদিন সল বেলোকে জেরুজালেম ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন তার বন্ধু ডেভিড শাহার। একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি হঠাৎ সল বেলোকে বললেন, ‘তুমি শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পারো যে আমার যে প্রফেট জেরেমিয়াহ এ পথ দিয়ে হেঁটে গেছেন। ঠিক যেখানটায় এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি।’

সল বেলো জেরুজালেম দর্শন থেকে আরো লিখেছেন, জোসাফাট উপত্যকায় অনেক সমাধি আছে। একটা সরু রাস্তা আর ঢালে একরের পর একর জুড়ে পাথর। গুহা, কবর, ময়লা, স্থানচ্যুত পাথর; ছোট একটা শ্রেণীকক্ষে আরব শিশুরা তাদের পড়া শিখছে। এমনকি এ নভেম্বরেও এ জায়গাটা খুব গরম। ইহুদিদের কবরের ওপর দিয়ে জর্ডানিয়ানরা রাস্তা তৈরি করেছে। জেরুজালেমের পৌরসভা এখন নতুন রাস্তার পরিকল্পনা করছে, যেটা জর্ডানিয়ানদের রাস্তাকে চিরে দেবে। সবদিকে মৃতদের সমাবেশ। এটা একটা দারুণ ব্যাপার, আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে—সমাধি, বিলাপ, জেরুজালেমের দেয়ালের তলায় আশ্রয় আর মাসিহার তুরি বেজে ওঠার অপেক্ষা। কয়েকটা আরব মুরগি ধুলোর মধ্যে নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছিল আর ঠুকরে খাচ্ছিল। সকালে নাশতার টেবিলে যে ডিম আসে তাও মৃত্যুগন্ধী। আমেরিকান মেয়েদের দল ঢাল বেয়ে নেমে আসে। ওপরে বাঁ দিকে মুসলিমদের কবরস্থান। ত্রাণকর্তা এলে যে গ্রেট গোল্ডেন গেট খুলে যাবে তা এখন বন্ধ। এর পরেই গার্ডেন অব জেথসিমানে। এর নামটা যেমনটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জায়গাটা একসময় জলপাইয়ের বাগান ছিল। এখন আছে পাইন, সাইপ্রাস আর ইউক্যালিপটাস। এগুলো জন্মেছে রুশ অর্থডক্স চার্চের গম্বুজের তলায়। বিপরীত দিকে অবশ্য এখনো জলপাই গাছ আছে। লম্বা লাঠি দিয়ে আরবরা জলপাই পাড়ছে। লাঠি দিয়ে গাছের শাখায় বাড়ি দেয়া হয়, তারপর পাতা থেঁতলে দিলে একসময় জলপাই মাটিরে পড়ে।

আমরা ভিয়া ডোলোরোসাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে দারুণ উত্তেজনাকর জিঙ্গেল কানে এল। আরব বালকরা তাদের গাধাগুলোকে পাহাড় থেকে দৌড়ে নামাচ্ছে। এ রকম জিঙ্গেল শুনলে আপনি চারপাশে বরফ আর স্লেজ গাড়ি খুঁজবেন। বরং এখানে আছে শক্তসমর্থ, হাসিখুশি বালকরা, তারা তাদের গাধাগুলোকে লায়ন’স গেটের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শোলেম কনের সঙ্গে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি দেখতে বেরিয়েছিলেন সল বেলো। শোলেম তাকে নিয়ে যান ক্রিশ্চিয়ান কোয়ার্টারের গ্রিক অংশে। সেখানে ছিল এক পুরনো ফ্রান্সিসকান বইয়ের দোকান। সে বইয়ের এক কর্মচারী ছিলেন এক খ্রিস্টান আরব। তিনি ৫০ বছর আগে কাজ করতেন তুর্কি সেনাবাহিনীতে।

এবার ফেরা যাক উনবিংশ শতাব্দীতে। বিশ্বখ্যাত ক্ল্যাসিক মবিডিকের স্রষ্টা হারম্যান মেলভিল জেরুজালেম সফর করেছিলেন ১৮৫৭ সালে। সে বছর ৬-২৪ জানুয়ারি তিনি অবস্থান করেছিলেন জেরুজালেম ও সংলগ্ন এলাকায়। সফরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থকড়ি মেলভিলের কাছে ছিল না। তাকে তখন আর্থিক সহায়তা করেছিলেন তার শ্বশুর। সফরের অগে মেলভিলের জীবন সংকটে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল শারীরিক অসুস্থতা, ক্যারিয়ার কোনোটাই ভালো যাচ্ছিল না। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিল সফরে বের হওয়ার। সেটা করতে গিয়েই তিনি হাজির হলেন এশিয়ার পবিত্র ভূমিতে। এ সফর তাকে মানসিক শক্তি দিয়েছিল।

নিজের জার্নালে মেলভিল তার জেরুজালেম দর্শন লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। প্রথম দেখায় এ নগরকে তার মনে হয়েছিল ‘প্রাণহীন পাথরের মতো’। পাথর হয়ে উঠেছিল মেলভিলের চোখে অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জুডিয়া হচ্ছে পাথরের সঞ্চয়। পাথরের স্রোত, পাথরের রাস্তা, পাথুরে দেয়াল-মাঠ, পাথুরে বাড়ি, পাথরে নির্মিত সমাধি, পাথুরে চোখ আর হূদয়। আপনার সামনে ও পেছনে কেবলই পাথর।’ সঙ্গে বলেছিলেন, ‘এ শহর দখল করে রেখেছে মৃতদের সেনাদল—চারদিকে কেবল সমাধি।’

মেলভিল জাফার কাছে খ্রিস্টানদের একটি কৃষি ব্যবস্থাপনা দেখেছিলেন। এরা স্থানীয় ইহুদিদের কৃষক বানানোর চেষ্টা করছিল। এ ঘটনা মেলভিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তার কাছে এটাকে ফলহীন এক উদ্যোগ মনে হয়েছিল—‘ইহুদিদের কৃষক বানানোর পরিকল্পনা একেবারে অর্থহীন। প্রথম কথা হলো জুডিয়া সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া একেবারে মরুভূমি। দ্বিতীয়ত, ইহুদিরা কৃষিকাজ পছন্দ করে না। ফিলিস্তিনে যারা মাটি চষে তার সবাই আরব। সুরক্ষিত দেয়ালের বাইরে ইহুদিরা যেতে চায় না আরব ও তুর্কিদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে। এছাড়া ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।’

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক