কথাটা পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাতের—জেরুজালেমের এক ইঞ্চি জায়গা যিনি ছেড়ে দেবেন তিনি আরবও নন মুসলমানও নন।

তারই কথা, বিজয়ের কুচকাওয়াজ চলতে থাকবে যতক্ষণ না জেরুজালেম ও সমগ্র ফিলিস্তিনে বিজয়ের পতাকা ওড়ে।

আরো খোলামেলা বলেছেন, আমরা ইসরায়েলকে উৎপাটিত করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা বিশুদ্ধ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন করব। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও জনবিস্ফোরণে আমরা ইহুদিদের জীবন দুুর্বিষহ করে ফেলব। আমরা ফিলিস্তিনিরা জেরুজালেমসহ সবটাই দখলে নিয়ে নেব।

এবার শুনুন ইয়াসির আরাফাতের প্রতিপক্ষ কী বলেন।

এলহানান লিয়েব লেভিনস্কির উদ্ধৃতিটি বহুল ব্যবহূত: জেরুজালেম ছাড়া ইসরায়েল আত্মাহীন দেহের মতো।

বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বললেন, আরাফাত ভুল করেছেন। ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেম কখনো ভাগ হবে না, ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানীই থাকবে চিরদিন, ইহুদিদের চিরকালের রাজধানী। নেতানিয়াহুর আর একটি উক্তি ইসরায়েলের ইচ্ছেটাকে স্পষ্ট করে করে দিয়েছে: প্রায়ই শুনি তারা জেরুজালেমকে ইহুদিকরণ করা হচ্ছে বলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। এটা তো ওয়াশিংটনকে আমেরিকান করার জন্য আমেরিকানদের কিংবা লন্ডনকে অ্যাংলিসাইজ করার জন্য ব্রিটিশদের অভিযুক্ত করার মতো।

আর আরব ভূখণ্ডে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশরা বলছে, জেরুজালেম ইহুদিদের। উইনস্টন চার্চিল বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ইহুদিদের জন্য জেরুজালেম ছেড়ে দেবে। ইহুদিরাই এটাকে বিখ্যাত করেছে।

জেরুজালেমে যে নিধনযজ্ঞ ইসরায়েল চালাচ্ছে এবং পৃথিবী নির্বাক হয়ে তা দেখছে আর মৃত ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুর রক্তাক্ত মরদেহ গুনছে তা জেরুজালেমে কখনো ফিলিস্তিনি পতাকা উঠবে, সে স্বপ্ন অনেকটাই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ রচনাটিতে জেরুজালেমের এ পর্যন্ত একটি কালানুক্রমিক সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেলি বলেছিলেন, জেরুজালেম দেখা মানে বিশ্বের ইতিহাস দেখা। অধিকন্তু পৃথিবী ও স্বর্গের ইতিহাস দেখা। বাইবেলে যেভাবে এ শহরটির উল্লেখ রয়েছে এন টি রাইট যথার্থ বলেছেন, বাইবেলের পাতা খোলা মানে জেরুজালেমের দিকে একটি জানালা খোলা, যেমনটা করেছিলেন ড্যানিয়েল, বাতাস আমাদের যেখানে নিয়ে যায় যাক।

ইতিহাসের প্রটো ক্যানানাইট কাল থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত এ শহরের জন্য ১৬টি বড় লড়াই হয়েছে। একবার শহরটি ধ্বংস করে দেয়া হয়, শহরটি অবরুদ্ধ থাকে ২৩ মাস। আক্রান্ত হয়েছে ৫২ বার এবং দখল ও পুনর্দখলের ঘটনা ঘটেছে ৪৪ বার। এ ইতিহাস ছয় হাজার বছরের অধিককাল ধরে ব্যাপৃত।

খ্রিস্ট জন্মের সাড়ে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জেরুজালেমের গিহন স্প্রিঙ্গ এলাকায় প্রথম মানববসতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। বাইবেলের বুক অব জেনেসিসে উল্লেখিত ল্যান্ড অব মোরিয়া পর্বত জেরুজালেমেই ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০-এর মধ্যে মিসরের পঞ্চদশ রাজবংশ হাই শহর আক্রমণ করে। তারপর তা মিসরের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। খ্রিস্টজন্মের এক হাজার বছর আগে বাইবেলে বর্ণিত জেবুসদের বসবাস ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ১০১০ অব্দে বাদশাহ দাউদ জেরুজালেম দখল করে নেন এবং সেখানে ইসরায়েল যুক্তরাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৯২৫ অব্দে মিসরীয়রা জেরুজালেম লুণ্ঠন ও তছনছ করে। খ্রিস্ট জন্মের ৫৮৬ বছর আগে ব্যাবিলনিয়ানরা জেরুজালেম দখল করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে জেরুজালেম আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের দখলে চলে আসে। তারপর রোমান, পার্শিয়ান, আরব, ফাতেমি, সেলজুক, তুর্কি, ক্রুসেডার, মিসরীয়, মামলুক শাসনাধীন ছিল।

আনুমানিক ৩০ সালে এখানেই যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হন, ৭০ সালে রোমানরা ইহুদি মন্দির ধ্বংস করে, ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.) এখান থেকেই মেরাজ গমন করেন। ৬১০-১৭ সালে হেরাক্লিয়াসের বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। ৬৩৬-৩৭ এ খলিফা ওমর (রা.) জেরুজালেম দখল করেন এবং শহরের পবিত্রতার প্রতি সম্মান জানিয়ে হেঁটে হেঁটে শহরে প্রবেশ করেন। ১০৯৯-১১৮৭ পর্যন্ত শহরটি খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের দখলে থাকে এবং খ্রিস্টধর্মের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

খলিফা আলী (রা.) আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর জেরুজালেম ক্ষমতাসীন মুয়াবিয়ার অধিকারে থাকে। ১৫১৬ সালে মামলুকদের হটিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সূচনা, ১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় জেরুজালেম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। খলিফা ওমরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ব্রিটিশ সেনা জেনারেল অ্যালনবি হেঁটে জেরুজালেম প্রবেশ করেন। ঠিক তার এক মাস আগে ঘোষিত হয় ব্যালফোর ডিক্লারেশন, যা ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রের সৃষ্টির ভিত্তি নির্মাণ করে।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোর ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা লর্ড রথচাইল্যান্ডকে ২ নভেম্বর ১৯১৭ একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন ইহুদিদের স্বদেশ সৃষ্টি করতে ব্রিটেন সাহায্য করবে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটিশ দখলাধীন ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত ফিলিস্তিনিদের অপসারণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে আসা ইহুদিদের বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেয় ব্রিটেন। ১৯৪৮-১৯৬৭ তে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়, ফলাফল আরবদের বিরুদ্ধে যায়। কালক্রমে ফিলিস্তিনিরাই হয়ে ওঠে নিজ গৃহে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন বন্দি। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদা তেমন সাফল্য আনতে পারেনি। সম্ভবত পরিস্থিতি এখন তৃতীয় ইন্তিফাদার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু জেরুজালেমের আকাশে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলনের স্বপ্ন দূর ভবিষ্যতেও পূরণের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। শাবরা-শাতিলা-গাজায় রক্তান্ত ক্ষতচিহ্ন ইতিহাস আরো বহুদিন বয়ে বেড়াবে।

আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে জেরুজালেমের মর্যাদা

এখনো বিতর্কিত অবস্থান এ শহরের। ১৯৮০ সালে ইসরায়েলের জাতীয় পরিষদ নেসেট ‘বেসিক জেরুজালেম ল’ পাস করে। তাতে ঘোষণা করা হয় সম্পূর্ণ ও অখণ্ড জেরুজালেম হচ্ছে ইসরায়েলের রাজধানী। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৭৮ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী এ আইন বেআইনি এবং বাতিল ঘোষিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বেশ ক’টি প্রস্তাবে বেসিক জেরুজালেম আইন নাকচ হয়ে যায়, কারণ তা ১৯৪৭ এর ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৮১(২) নং প্রস্তাবে ‘করপাস সেপারেটাম’ অনুসরণে জেরুজালেম শহরকে প্রদত্ত সুযোগের পরিপন্থী। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকৃতি অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমের স্বত্ব ফিলিস্তিনিদের। ১৯৪৭ এর জাতিসংঘ প্রস্তাব ইহুদি নেতৃত্ব মেনে নিলেও মুসলমানরা তা প্রত্যাখ্যান করে।

ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে এতদিন তেল আবিবই পরিচিত ছিল, বিদেশী দূতাবাসগুলোও এখানে। কিন্তু ইহুদি লবির অনুগত ট্রাম্প প্রশাসন বরং বলা যায় স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে তেল আবিব থেকে দূতাবাস স্থানান্তরের নির্দেশ নেন।

করপাস সেপারেটাম বা পৃথক অস্তিত্ব অস্বীকার করার প্রক্রিয়াটি ১৯৪৮ থেকেই শুরু হয়। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় সব আইন অমান্য করে। দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম সব আন্তর্জাতিক দলিলে এবং ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের রায়ে ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ইসরায়েল একে অনন্ত এবং অবিচ্ছেদ্য জেরুজালেম, যা ইসরায়েলের সম্পত্তি বলে জবরদখল অব্যাহত রেখেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের সমিতি ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক স্টেট) পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সংস্থাটির প্রধান চাঁদা প্রধানকারী সৌদি আরবের সঙ্গে টেবিল তলার ইসরায়েলের সমঝোতা কার্যত ফিলিস্তিনিদের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। খ্রিস্টীয় প্রধান ধর্মগুরু পোপ এবং তার রাষ্ট্র ১৯৪৯ থেকে তার স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে। পোপ মনে করেন যেহেতু মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পবিত্র ভূমি জেরুজালেম, পবিত্রতাই এ শহরের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচিতি; এটি হবে একটি আন্তর্জাতিক শহর—আন্তর্জাতিকভাবে গ্যারান্টি দেয়া একটি বিশেষ আইন শহরটিকে রক্ষা করবে। যুক্তরাষ্ট্র যখন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিল পোপ ফ্রান্সিস বিশ্ববাসীর কাছে একান্ত নিবেদন রাখলেন জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী জেরুজালেমের স্থিতবস্থা (স্ট্যাটাস কুয়ো) বজায় রাখা হোক।

যে জেরুজালেম ১৯৪৭ সালেও পুরোটাই ফিলিস্তিনিদের ছিল, সেখানে সংকুচিত হতে হতে এখন তারা নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এখন জেরুজালেমের সাড়ে সাত লাখ অধিবাসীর ৬১ ভাগের বেশি ইহুদি, ৩৭ ভাগ আরব মুসলমান, এক ভাগ আরব খ্রিস্টান। ইহুদিদের মধ্যে দুই লাখ অতিগোঁড়া ইহুদি, বাকিরা জায়োনিস্ট ও অন্যরা সেকুলার।

প্যালেস্টাইনের ঘোষিত রাজধানী পূর্ব জেরুজালেম ১৯৬৭ সালের কুখ্যাত ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল দখল করে নেয়। এ অবৈধ দখল অব্যাহত রয়েছে এবং পদ্ধতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের মূলোৎপাটন এবং নিশ্চিহ্নকরণের প্রক্রিয়াটিও ইসরায়েল রুটিন ডিউটি হিসেবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের রাজধানী ঘোষণার গুরুত্ব কতটুকু?

তাত্ত্বিকভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন সামান্যই। মার্কিন দূতাবাসও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কম চিহ্নিত নয়। (বাংলাদেশেই তত্কালীন পিজি হাসপাতালসংলগ্ন একটি বিশাল ভূখণ্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে দূতাবাস নির্মাণের জন্য শনাক্ত করা ছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় ছাত্র আন্দোলনের বলি হতে পারে এ আশঙ্কায় তারা সরকারের সঙ্গে জায়গা অদল বদল করে বর্তমান অবস্থানে যায়) এক সময় বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ডমিনিকান রিপাবলিক, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়েতামালা, হাইতি, নেদারল্যান্ডস, পানামা, উরুগুয়ে ও ভেনেজুয়েলার দূতাবাসও জেরুজালেমেই ছিল কিন্তু তারা সেগুলো তেল আবিবে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখন অনেক দেশই জেরুজালেমে কনসুলার অফিস স্থাপন করেছে। ট্রাম্পের ঘোষণা যতটা না বাস্তবায়নের জন্য তার চেয়ে বেশি ছিল তার নির্বাচনের আগে ইহুদি লবির আস্থা অর্জনের জন্য।

নির্বাচনে ট্রাম্প পরাস্ত হয়েছিল। নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে মুসলমানদের যে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস তা অনেকাংশেই মলিন হয়ে এসেছে। কারণ শক্তিশালী ইহুদি লবির প্রভাবের বাইরে তিনি নন। আর ট্র্যাম্পের জেরুজালেম ঘোষণার দায় তার সামান্যই। ১৯৯৫ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রাজত্বকালেই পাস হয় জেরুজালেম এমব্যাসি অ্যাক্ট—তাতে বলা হয় জেরুজালেমই ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃত হবে। ইসরায়েলের রাজধানী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইন পাসের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে—মুসলমানদের অতিপ্রিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গলা আরো চড়িয়ে বলেছেন, রাজধানী তো হবেই, সেই সঙ্গে জেরুজালেম থাকবে অখণ্ড। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের ১৪ রাষ্ট্রই ট্র্যাম্পের সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছে। জাপান, ফ্রান্স, ইতালি ও সুইডেন তো আছেই এমনকি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মূল সৃষ্টিকারী ব্রিটেন কিছুটা পাপ স্খলনের জন্য হলেও নিন্দা করেছে।

পূর্ব জেরুজালেম একীভূত করায় ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের পক্ষে ১৫১টি রাষ্ট্র ভোট দেয়, বিপক্ষে দেয় ছয়টি এবং ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে নয়টি রাষ্ট্র। বিরোধিতা ও নিন্দা জ্ঞাপনের বাস্তবিক মূল্য যে অতি সামান্য, ইসরায়েলের অমানবিক নিপীড়ন তা প্রমাণ করে। ইসরায়েল প্রশ্নে শক্ত অবস্থান নিতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যেমন একতাবদ্ধ নয়, ফিলিস্তিনেও বিবদমান দলগুলোর অনৈক্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সংহত করতে অনেক ক্ষেত্রে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েল মিথ চলে যত উড়িয়েই দিক এবারের সংকটের চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য:

ক. ইসরায়েলি পুলিশ আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করে প্রার্থনারত মুসল্লিদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়েছে।

খ. আল আকসা মসজিদে এ আক্রমণ ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ।

গ. শেখ জারাহ থেকে ফিলিস্তিনি পরিবার উচ্ছেদ জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণের একটি উদ্যোগ।

ঘ.   ইসরায়েলি সহিংসতা ১৯৪৮ থেকে শুরু করে গত ৭৩ বছরের সহিংসতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

অখণ্ড জেরুজালেম চাই

জেরুজালেম পুরোটাই ইসরায়েলের চাই, সুতরাং অজুহাত তৈরি করারও প্রয়োজন নেই। রমজানের শেষ শুক্রবার ৭ মে আল আকসা মসজিদে ৭০ হাজার মুসলমান জুমাতুল বিদার নামাজে অংশগ্রহণ করছে—এ অবস্থায় ইসরায়েলি পুলিশ মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ চালায়। ঠিক আগের দিন ৬ মে পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহ থেকে ছয়টি পরিবারকে উচ্ছেদ করার প্রতিবাদ জানাতে গেলে অল্প সময়েই ইসরায়েলি পুলিশের মারমুখী ও বেপরোয়া আচরণে তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। শুক্রবার পুলিশ সশস্ত্র অবস্থায় দলবল নিয়ে মসজিদে আক্রমণ করে। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল সেনা, বিমান বাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষা বাহিনী সম্মিলিতভাবে প্যালেস্টাইনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেবল গাজা এলাকায় নিহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে; পশ্চিম তীরে নিহত ১৭ জন, লেবানন সীমান্তে নিহত একজন। ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণে ১৬ মে পর্যন্ত ৯৫০টি স্থাপনা ধ্বংস করে এবং মধ্যে রয়েছে চারটি ছিল হাই-রাইজ বিল্ডিং, ৪০টি স্কুল, চারটি হাসপাতাল এমনকি শরণার্থী শিবিরেও বোমা বর্ষণ করে নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন করেছে। ১৬ মে পর্যন্ত অন্তত ৩৪ হাজার ফিলিস্তানি বাস্তচ্যুত হয়েছে। এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু আক্রমণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি পুলিশ ও সৈন্যদের অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিবেকবান প্রবাসী ইহুদিদের একটি অংশ বলতে শুরু করেছে ইহুদি হিসেবে এবং ইসরায়েলি হিসেবে আমরা লজ্জিত। কণ্ঠনালিতে সাদা পুলিশের হাঁটুর চাপে ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’ বলতে বলতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে একজন কালো মানুষ আর কণ্ঠনালিতে ইসরায়েলি পুলিশের হাঁটুর চাপে দম বন্ধ হয়ে আসা পূর্ব জেরুজালেমের মুসলমান কিশোর তার ধর্মীয় কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করতে করতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা