সময়টা ত্রয়োদশ শতাব্দীর একদম গোড়ার দিকে। সুলতান সালাহউদ্দিনের প্রায় এক যুগ আগেই, ১১৮৭ সালে পবিত্র নগরী জেরুজালেম নিজের অধিকারে নিয়েছেন। তখন তার গৃহীত অন্যতম উদ্যোগ ছিল এই, সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা মুসলিম ধর্মসাধক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের জেরুজালেমে আমন্ত্রণ জানানো। মহামহিম সালাহউদ্দিন ১১৯৩-তে গত হলেও তার প্রাজ্ঞ ভাবনার পরম্পরা এর পরেও জারি থেকেছিল। ঐতিহাসিকদের ধারণা, আনুমানিক ১২০০ সালেই সেকালের ভারত থেকে জেরুজালেমে এসেছিলেন পাঞ্জাবের সুফি ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জেশাকর। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির সাক্ষাৎ শিষ্য, চিশতিয়া তরিকার এ সুফি সাধক জনপরিসরে ও ভক্তদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘বাবা ফরিদ’ নামে। বাবা ফরিদ ঠিক কতদিন জেরুজালেমে ছিলেন, তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। তবে পবিত্র এ নগরীতে এসে তিনি যে জায়গায় ছিলেন তা আজও বহু যুদ্ধ ও ক্ষয়ের ঝড়-ঝাপটা পার করেও টিকে আছে।

জেরুজালেমের পুরনো শহরের পূর্ব অংশের দিকে গেলে পাওয়া যাবে নগরীর আদিতম প্রবেশদ্বারগুলোর একটি, ‘বাব আল জাহেরা’। বাব আল জাহেরার পাশেই কিছু ফল-সবজির অস্থায়ী দোকানের আড়ালে খানিক ঢাকা পড়ে আছে একটি সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে নজরে আসে একটি সবুজরঙা লোহার গেট। গেটের ওপরে শ্বেতপাথরের গায়ে আরবিতে লেখা, ‘জাওইয়া আল-হিন্দিয়া’। আর ইংরেজিতে লেখা ‘ইন্ডিয়ান হস্পেস’ বা ভারতীয় ধর্মশালা। এখন গোটা বিশ্বের জটিলতম ও বহু হিংসা-ক্রোধে দীর্ণ সংঘাত চলছে যে ভূমিতে, সেখানে এ ‘লিটল ইন্ডিয়া’তুল্য সরাইখানার ভবনটি যেন নিস্পন্দ জলাধারের মতো বিরাজমান।

বাবা ফরিদ জেরুজালেমে এসে এমন একটি জায়গায় থাকতেন, যা ছিল ওয়াকফ সম্পত্তি। জায়গাটি আদতে একটা নিচু পাহাড় বা টিলা কিসিমের। সেখানে ছিল একটি মসজিদ ও দুটি আবাসযোগ্য ঘর। বাবা ফরিদ ওই পাহাড়ের একটি গুহায় ৪০ দিন নির্জনবাসে থেকে প্রার্থনা করেছিলেন বলেও শোনা যায়। বাবা ফরিদ পরে ভারতে ফিরে গেলেও ওই বিশেষ জায়গাটি ক্রমে একটি নীরব অথচ জীবন্ত পুণ্যস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তখন অবশ্য জায়গাটিকে ডাকা হতো ‘জাওইয়া আল ফরিদিয়া’ বলে। মধ্যযুগ থেকে হাল আমল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের যেসব মুসলমান জেরুজালেমে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই বাবা ফরিদের স্মৃতিধন্য ওই পাহাড় ও পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত ঘরগুলো দেখে এসেছেন, তা অবশ্য বলা যায় না। কারণ জায়গাটি অনেকটাই ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। আবার ভারতীয় নন এমন অনেক সুফি সাধকও জেরুজালেমে এ বিশেষ জায়গাটি দেখে আসতে চাইতেন। এখানে উল্লেখ্য যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত জেরুজালেম সুফি ও দরবেশদের পদচারণায় মুখর ছিল। সতের শতকের এক তুর্কি পর্যটক এভলিয়া সেলেবি লিখে গেছেন, খোদ এক জেরুজালেম শহরেই তিনি সুফি সাধকদের কমপক্ষে ৭০টি আস্তানা দেখেছিলেন।

লেবু-কমলা বৃক্ষে আচ্ছাদিত শান্ত সরাইখানাটির প্রাঙ্গণ ঘিরে তৈরি একাধিক ঘর আছে, প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদে নামাজ আদায় করা সম্ভব। বাবা ফরিদ যে গুহায় বসে একান্তে টানা ৪০ দিন প্রার্থনা করেছিলেন, তার প্রবেশমুখটি আজো দেখা যাবে। বস্তুত এ বিশেষ সরাইখানার অবস্থান করা মানে যেন বাবা ফরিদের আশীর্বাদে ধন্য হওয়া—কারো কারো এটাই ধারণা।


আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো বাবা ফরিদের স্মৃতিময় এ সরাইখানার দেখভালের দায়িত্ব এখনো রয়েছে এক ভারতীয়র হাতেই। এবার তার গল্পটাই বলা যাক। কাহিনীর শুরু বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর জেলার এক যুবকের গল্প দিয়ে। তার নাম শেখ নাজির হোসেন আনসারি। নাজির ছিলেন অল ইন্ডিয়া খিলাফত কমিটির একজন সদস্য। ১৯২৪ সালে ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতির অনুরোধে তিনি জেরুজালেমে আসেন। জেরুজালেমে এসে থিতু হওয়ার পর বাবা ফরিদের স্মৃতিধন্য এ সরাইখানা ও সংযুক্ত স্থাপনাগুলোর ট্রাস্টি হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। এর পরের ২৭ বছর নাজিরের জীবনের এক বিপুল পরিশ্রম ও কর্মময় সময়পর্ব। শুধু বাবা ফরিদের স্মৃতিধন্য সরাইখানা ও সংলগ্ন মসজিদ নবরূপে পুনর্নির্মাণ করাই নয়, পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে ভারতের সাধারণ মুসলমানদের কাছে নতুনভাবে এক তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেয়ার দায়ও চেপেছিল তার ওপর। সরাইখানা মেরামত ও অংশত পুনর্নির্মাণের জন্য দরকার ছিল প্রচুর অর্থের। কিন্তু ফিলিস্তিনের পক্ষে সেই অর্থের জোগান দেয়াটা ছিল দুষ্কর। অতএব, নাজির ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে একাধিকবার জেরুজালেম থেকে ভারতে আসেন। উদ্দেশ্য, বাবা ফরিদের সেই সরাইখানা মেরামতের জন্য ভারত থেকে সাহায্যস্বরূপ অর্থ সংগ্রহ। বহু সাধারণ মানুষ নির্দ্বিধায় নাজিরের হাতে এজন্য অর্থ তুলে দিয়েছিলেন, এগিয়ে এসেছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হায়দরাবাদের শেষ নিজাম মীর ওসমান আলী খান—যাকে কিনা ১৯৩৭ সালে টাইম ম্যাগাজিন বিশ্বের সেরা ধনী বলে অভিহিত করেছিল। প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ের পর নাজির জেরুজালেমেই সরাইখানার দেখভালের জন্য থিতু হলেন। বিয়ে করলেন এক ফিলিস্তিনি নারীকে, তার নাম ছিল মুশসারা। ১৯২৮ সালে জন্ম নেন তাদের পুত্র সন্তান, শেখ মুহাম্মদ মুনির আনসারি।


কিন্তু এর পরের দিনগুলো সুখের ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সরাইখানাটি পরিণত হয়েছিল ইন্ডিয়ান ফোর্থ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের একটি ক্যাম্পে। ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তে তারা সরাইখানা ত্যাগ করেছিল। এর মাঝে ১৯৫২ সালে পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে মুনির সরাইখানার প্রধান খিদমতগার হিসেবে নিয়োজিত হন। যদিও সরাইখানাটি তখন যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অন্যতম আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

যদিও এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা—যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি দুঃস্বপ্ন-হাজির হলো ১৯৬৭ সালে। জেরুজালেমের ছয়দিনের যুদ্ধ বলে পরিচিত সেই লড়াইয়ের কারণে বাবা ফরিদের সরাইখানা পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। ঘটনার শুরু ওই বছরের ৫ জুনে। যুদ্ধের সেটা দ্বিতীয় দিবস। রাতের বেলা মুনির হঠাৎ দেখতে পেলেন ৫০-৬০ জন জর্ডানি সেনা সরাইখানার গেটে দাঁড়িয়ে। তারা ক্লান্তই শুধু নয়, রীতিমতো আহত ও বিধ্বস্ত। তারা পানি খেতে চাইছিল। দিনটা ছিল মঙ্গলবার। বুধবার সকালে সরাইখানার গেটে গিয়ে দেখা গেল সেই সেনাদের একজনও আর সেখানে নেই। তারা ফিরে যাওয়ার আগে নিজেদের সেনা-পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্রও সরাইখানার দোরগোড়ায় রেখে গিয়েছে। ওইদিনই আবার ইসরায়েলি সেনাদল জেরুজালেমের পুরনো শহরপ্রান্তে প্রবেশ করে। ফলে স্থানীয় সাধারণ ফিলিস্তিনিরা জর্ডানি বাহিনীর রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র হাত তুলে নিয়ে খানিক আনাড়িভাবেই প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। এতেই হলো কাল। ইসরায়েলি বাহিনী অতঃপর সোজাসুজি সরাইখানাতেই বোমা নিক্ষেপ শুরু করল। মুনির তার পুরো পরিবার নিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছোটাছুটি করেও রেহাই পেলেন না। বোমার আঘাতে পুরো ভবন ছারখার। তার মা, বোন ও দুই বছর বয়সী ভাগ্নে ইসরায়েলি বাহিনীর এ নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। গুরুতর আহত হন মুনিরও। একটি হাসপাতালে থেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি যখন সরাইখানায় ফিরলেন তখন তার নিজের জীবন ও ওই পুণ্যস্মৃতির ভবন—সবই বিধ্বস্ত।


তবু মুনির থেমে থাকলেন না। মা, বোন ও ভাগ্নেকে দাফন করে তিনি নতুনভাবে বাবা ফরিদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ শুরু করলেন। বোমা ও বারুদধস্ত সরাইখানার ঘরগুলোয় নতুনভাবে তৈরি করলেন এবং ভবনের চারিধারে বুনে দিলেন লেবু ও কমলাবৃক্ষের বীজ—যারা এখন বড় হয়ে পুরো এলাকাটিকেই ছায়া দিচ্ছে।

জেরুজালেম এখন সংঘাতে দীর্ণ। তবু বাবা ফরিদের স্মৃতিধন্য সরাইখানাটি টিকে রয়েছে। যার ছাদ থেকে এখনো একটি ভারতীয় পতাকা উড়তে দেখা যায়। এ সরাইখানার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শেখ মুনিরকে প্রশ্ন করেছিলেন বিবিসির সাংবাদিক ড্যানিয়েল সাইলাস অ্যাডামসন। উত্তরে আত্মবিশ্বাসে দীপ্ত হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভীত নই। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি সন্তুষ্টই থাকি। কারণ আমাদের এ আনসারি পরিবার জায়গাটাকে দেখেশুনেই রাখবে। আমার বড় ছেলে নাজির উত্তরাধিকার সূত্রে এ সরাইখানার খিদমতগার হবে নিশ্চয়।’

 

শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক