মধ্যযুগীয় আরব ভূগোলবিদ আল-মুকাদ্দাসী এক সময় জেরুজালেমকে ‘বিচ্ছুতে পরিপূর্ণ একটি সোনার বাটি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। দুনিয়ার পবিত্র শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে বেশি রক্তপ্লাবিত এ জেরুজালেম এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত শহর হিসেবে রয়ে গেছে। এ শহরকে ঘিরে আছে বিশ্বের বৃহৎ তিনটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্ব। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পবিত্র শহর’ বিষয়ে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নীতি পাল্টে দিলে তার বক্তব্য আবারো বছরের পর বছর ধরে চলমান ধর্মীয় ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে, যা শুরু হওয়ার এত বছর পরও সমাধান করা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখানে যে মূল বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা হলো ১৯৬৭ সালের জুনে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক পূর্ব জেরুজালেমকে জোরপূর্বক দখল করা, যার মাধ্যমে ইসরায়েল সমগ্র জেরুজালেমকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করেছিল। যদিও বিশ্ববাসী তাদের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। ছয়দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ অবধি এ পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। এরপর পূর্ব জেরুজালেম ইসরায়েল দখল করে নেয় এবং সেখান থেকে আরবদের উচ্ছেদ করে তাতে দুই লাখ ইহুদি বসতি স্থাপন করে। কিন্তু জেরুজালেম বিষয়ে বিরোধের বীজ লুকিয়ে আছে আরো গভীরে।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন পণ্ডিত ক্যারেন আর্মস্ট্রং তার রচনায় উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বের যে স্থানে ধর্মগুলোর বিশ্বাসের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছিল তাকে ‘পবিত্র ভূখণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন কারণে জেরুজালেম ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মূল ‘পবিত্র ভূখণ্ড’। ফলে তাদের পক্ষে শহরটিকে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা খুব কঠিন। কারণ এটি তাদের বিশ্বাস ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এজন্য ক্যারেন তার বইতে লিখেছেন, ‘জেরুজালেম: এক শহর , তিন বিশ্বাস।’

এ তিন ধর্মের প্রত্যেকটির সঙ্গে জেরুজালেমের যে পবিত্র সম্পর্ক রয়েছে তা সবার ধর্মীয় শাস্ত্রেই উল্লেখিত আছে। বাইবেলের ঐতিহাসিকতা দাবি করে যে জেরুজালেম সেই জায়গা, যেখানে আব্রাহাম তার পুত্রকে উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং যেখানে যিশু তার শিষ্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে জেরুজালেম সেই জায়গা হিসেবেও পরিচিত, যেখানে মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজ যাত্রা সংঘটিত হয়েছিল।

অধ্যাপক সাইমন গোল্ডহিল লিখেছেন, ‘‘জেরুজালেম যে অনুভূতিটা উসকে দেয় তা আসলে এভাবে শুরু হয় যে, ‘এটি সেই জায়গা যেখানে...।’’

ইহুদিদের পবিত্র শহর

বর্তমান জেরুজালেম শহরটি প্রাচীন কেনান শহরের কাছে অবস্থিত ছিল, যা বর্তমানে দক্ষিণ সিরিয়ায় পড়েছে। বাইবেলের বর্ণনা মতে, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১২৫০ সালে মোজেসের নেতৃত্বে ১২টি গোষ্ঠী মিসর থেকে এসে সিনাই উপদ্বীপের কাছে যাযাবর জীবনযাপন করছিল। তাদের এ বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে ঈশ্বর তাদের কেনানের উর্বর ভূমির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এরপর তারা মোজেসের পুত্র যশুয়ার নেতৃত্বে কেনান আক্রমণ করেছিল এবং ঈশ্বরের কথা বলে অঞ্চলটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারা জিবুসীয়দের পুরোপুরি নির্মূল করতে সক্ষম হয়নি। জিবুসীয়দের জেরুজালেমের আদি বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ডেভিডের শাসনাধীনে ছিল। এ সময় জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী এবং ইহুদি ঐতিহ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। কিন্তু ডেভিড সেখানকার স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করেননি এবং ধর্মবিষয়ক ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন যে জেরুজালেমের বহুসংখ্যক পৌত্তলিক আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে ইহুদি ধর্মীয় রীতির অংশে পরিণত হয়েছিল।

বাইবেলের অনেক চরিত্র ইসরায়েলের পূর্বপুরুষ। তাদের জীবনালেখ্য কালক্রমে ইহুদি পরিচয়ের শক্তিশালী দিক হয়ে উঠেছিল। এ বিষয়ে আর্মস্ট্রং লিখেছেন, ‘বাইবেলের আখ্যানগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর থেকে জানা যায় যে ইসরায়েলিরা কীভাবে নিজেদের জন্য আলাদা পরিচয় তৈরি করতে শুরু করেছিল।’


খ্রিস্টানদের পবিত্র শহর

নিউ টেস্টামেন্ট অনুসারে জেরুজালেম সেই শহর, যেখানে যিশু বেড়ে উঠেছেন এবং যেখানে তিনি ধর্মের বাণী প্রচার করেছিলেন, অসুস্থদের সুস্থ করেছিলেন এবং পরে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক ড্যান মাজার তার রচিত ‘জেরুজালেম ক্রিশ্চিয়ান রিভিউ’তে বলেছেন, জেরুজালেমে একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে এ স্থানটির সম্পর্ক প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে প্রমাণিত হয়েছিল।

যাই হোক, ভূরাজনৈতিক কারণে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে জেরুজালেমের পূর্বনির্ধারিত সম্পর্কটি প্রথম শতাব্দী থেকেই প্রমাণিত হওয়া দরকার ছিল। ৩২৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যান্টিন রোমান সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী একমাত্র সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন চার্চের একজন কট্টর বিশ্বাসী। তিনি আশা করেছিলেন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্ম তার সুবিস্তৃত সাম্রাজ্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক হয়ে উঠবে। এ সময় ফিলিস্তিনে অল্পসংখ্যক খ্রিস্টান থাকলেও ধর্মটি স্পষ্টতই একটি আকর্ষণীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। কনস্ট্যান্টিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের ওপর ধর্মকে চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ধর্মের প্রতীকগুলোকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। তিনি এ বিষয়েও সচেতন ছিলেন, কোনো সাম্রাজ্যকে ধর্মীয় পবিত্রতা দেয়ার জন্য অতীতে এর শক্তিশালী শিকড় থাকতে হয়। সে অনুযায়ী তার সমর্থকরা খ্রিস্টধর্ম এবং মোজেস ও তার বংশধরদের ধর্মের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজতে শুরু করেছিল। ফলে একই অঞ্চলে তাদেরও ধর্মীয় পবিত্রতার প্রলেপ দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য প্রদানের জন্য প্রতীক ও স্মৃতিসৌধের প্রয়োজন অনুধাবন করে কনস্ট্যান্টিন জেরুজালেমে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। শিগগিরই পুরনো মন্দিরের বেদির নিচে একটি পাথরের সমাধির সন্ধান পাওয়া গেল, যাকে অবিলম্বে খ্রিস্টের সেপালকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। খ্রিস্টান বিশ্বাসের জন্য এ দুর্দান্ত আবিষ্কারটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ বিশ্বাস করা হয়েছিল যে খ্রিস্ট সেই সমাধিসৌধ থেকে পুনরুত্থিত হয়েছিলেন। সমাধিটির সন্ধান খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে যেকোনো কিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা জেরুজালেমকে তাদের ধর্মতত্ত্বীয় বিশ্বাস ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় স্থান দিয়েছে।

মুসলমানদের পবিত্র শহর

জেরুজালেম শহরটি ইসলামী বিশ্বাসে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার অধিকারী। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মক্কার কাবাকে কিবলা হিসেবে নির্ধারণের আগে জেরুজালেম ছিল মুসলমানদের কিবলা।

জেরুজালেম শিগগিরই মুসলমানদের জন্য ইসলামিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে আর্মস্ট্রং বলেন, ‘শহরটি একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা তাদের একটি পৃথক ইসলামী পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এটি তাদের পূর্বপুরুষদের পৌত্তলিক ঐতিহ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে একটি নতুন ধর্মীয় পরিবার তৈরিতে সহায়তা করেছিল।’

একইভাবে মুসলমানদের সময়েও জেরুজালেম ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনুসরণ করে একেশ্বরবাদী ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। এ শহরে প্রথম মুসলিম বসতি স্থাপনকারীরা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে জেরুজালেমে এসে পৌঁছায় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে শহরটি বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা শহরটি দখল করার আগ পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ক্রুসেডের একটি কালপর্ব বাদে। এরপর ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনটি সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূচনা হয় এবং তিন ধর্মের রীতি অনুযায়ী শহরটি বিভক্ত হয়ে পড়ে।

 

সূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস