কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বালিভাস্কর্য দেখতে গিয়ে

আমার একটি অজ্ঞাতনামা কবিতা হারিয়ে গেছে।

 

আমার মাথার জলাশয়ে বাড়ন্ত রুই’র ঘাই’র চেয়ে

দুরন্ত দ্যুতির লাফে কবিতাটি নাড়াচাড়া দিয়েছিল খুব।

রিকশা যখন লাবণী পয়েন্টে—সিটে সে আমার পাশে বসা,

সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে যখন পৌঁছতে থাকি প্রদর্শনীস্থানে,

তখনও সে আমার আঙুলে ঝুলে নাচতে নাচতে ওড়াচ্ছিল খুশি;

তার পরই আমি আমাকে হারিয়ে ফেলি বালিভাস্কর্যের তুমুল জাদুতে।

 

গ্রন্থপাঠে মগ্নচুর গ্রিসের জ্ঞানের রাজা সক্রেটিস,

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ট্রয়ের হেলেন আর বিপ্লবী লেনিন,

একপাশে মাদার তেরেসা অন্যপাশে ক্রুশগাঁথা যিশু;

মাঝে আউলাঝাউলা আইনস্টাইন আর অদ্ভুত গোঁফের দালি।

 

একেকটি ভাস্কর্য মানে একেকটি ইতিহাস—পুনঃপাঠ ও পিছুটান,

প্রতিটি মূর্তিদর্শনেই মূর্ত হচ্ছে সেইসব আলোর মহিমা।

ঘোরের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে দাঁড়াই যখন রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি—

গীতবিতানের শীতল আবেশে হঠাৎ গীতল হলো আশপাশ।

তারপর সেই তর্জনী উঁচানো বঙ্গবন্ধুর সামনাসামনি পৌঁছতেই

আমি মিশে যাই সাতই মার্চের রেসকোর্সের অগ্নিল জনসমুদ্রে,

আর আমার কানে বাজতে থাকে সেই মেঘবাণী—

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

 

হঠাৎ ঘোর কাটতেই দেখি, আমার কবিতা আর আমার সাথে নেই!

সামনে-পেছনে-ডানে-বাঁয়ে কোথাও নেই সেই মায়ার প্রতিমা!

আমি ‘কবিতা...কবিতা...’ ডাকচিৎকারে প্রাণপণে গলা ফাটিয়ে

উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিকেই জারি করি আমার তালাশ।

কিন্তু কী আশ্চর্য—কেউই দেখেনি তা’কে! কোথাও নেই সে?

 

ও আনমনা সৈকত, ও মুখর বালিয়াড়ি, ঋষি ঝাউগাছ—

ও চঞ্চল তটরেখা, ও ঢেউয়ের ফেনা, পাহাড়ি গহিন ছায়া—

ও মোহনার দিশারি গাংচিল আর যে যেখানে আছ,

সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই অধীনের আকুল আবেদন—

কবিতাকে দেখামাত্র যেভাবেই হোক, আমাকে খবর পাঠাও,

কোথায় আছে কেমন আছে—দয়া করে সবিস্তারে জানাও;

যত দ্রুত সম্ভব, আমাকে আমার ধন ফিরে পেতে দাও।

 

কবিতার পরনে ছিল দুঃখরঙিন নীল ফ্রক এবং

সকলের সদয় অবগতির জন্য আরও জানাচ্ছি যে,

তার প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো সে বোবা;

যদিও হাসিঝরনার চোখের ভাষায় সে কথা বলে অনর্গল

আর দু’হাতের ইশারায় গাইতে পারে, আঁকতে জানে সব।