‘ইতিহাসবিদ হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশেষত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমার কাজের ক্ষেত্র। এজন্য লন্ডনস্থ ব্রিটিশ লাইব্রেরির পঞ্চম তলায় এশিয়ান অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের রিডিং রুমে সময় কাটিয়েছি। সেখানকার দেয়ালে কিছু অসাধারণ চিত্রকর্ম ঝোলানো আছে, এগুলোর বেশ কয়েকটি একসময় শোভা পেত লন্ডনের লিডেনহল স্ট্রিটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদরদপ্তরে। এসব চিত্রকর্ম দেখে আমার মাথায় একটি ধারণা আসে, লিখিত দলিলের পাশাপাশি এসব ভিজুয়াল রেকর্ডও ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে’—এভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ব্রিটিশ চিত্রকররা যেভাবে ভারতকে তাদের তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, সেগুলো নিয়ে নিজের কাজের শুরুর কথা বর্ণনা করেন ইতিহাসবিদ জন ম্যাকঅলিন। ব্রিটিশ লাইব্রেরির দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকর্ম ছাড়াও সে আমলের এক তরুণ শিল্পীর কিছু চিঠি জনকে আরো আগ্রহী করে তোলে—‘আমাকে আরো আকর্ষণ করে লন্ডনের রয়াল একাডেমিতে থাকা বেশকিছু চিঠি। চিঠিগুলো ছিল এক তরুণ ব্রিটিশ শিল্পী ওজায়েস হামফ্রির। তিনি ১৮ শতকের শেষভাগে ভাগ্যান্বেষণে ভারতে যান। তার চিঠিগুলো থেকে সেসময়ে ভারতে যাওয়া তরুণ ব্রিটিশ শিল্পীদের আশা, প্রেরণা, ভয়, সন্দেহ সম্পর্কে বিশদ জানা যায়।’

সেসময় ভারতে এসেছিলেন এমন শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ড্যানিয়েলগণ, উইলিয়াম হজেস, রবার্ট স্মিথ, হেনরি সল্ট, স্যামুয়েল ডেভিস, টিলি কেটল, জোহান জোফানি, জেমস ওয়েলস। তাদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন ভারতেই বাস করেছেন। তারা ভারতবর্ষে ভ্রমণ করেছেন এবং ছবি এঁকেছেন। লন্ডনে ফিরে গিয়ে তাদের এসব ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। ইংল্যান্ডের শিল্পীরা আবার এসব ছবি দেখে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে ভারতকে এঁকেছেন, যদিও এ দলের শিল্পীরা নিজেরা কখনো ভারত সফর করেননি।

ব্রিটেনের মানুষের সংস্কৃতির ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। ব্রিটদের খাবার, পানীয়, পোশাক, ভাষা সবকিছুই কোম্পানির প্রভাবে বদলে গিয়েছিল। অন্য দেশ, মানুষ সম্পর্কে ব্রিটিশদের ধারণা, মনোভাবকেও প্রভাবিত করেছিল কোম্পানি।

ভারতবর্ষের সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কে মধ্যস্থতাকারী সূত্র ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এ সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছিল চিত্রায়ণের মাধ্যমে। ১৮ ও ১৯ শতকের ব্রিটিশ শিল্পী ও ভ্রমণকারীদের আঁকা চিত্রকর্ম, স্কেচ থেকে দেখা যায় সে আমলে কোম্পানি কীভাবে স্থানীয় জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তি হয়ে উঠেছিল। ভারত নিয়ে ব্রিটিশ নীতি ও মনোভাবের পরিবর্তনও এসব চিত্রকর্মে ফুটে ওঠে। উইলিয়াম হজেসের কথায়, ‘ভারত ব্রিটেনের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নানা দৃশ্যের উৎস।’ চিত্রকর্মগুলো লক্ষ করলে আমরা এ বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাই। জন ম্যাকঅলিন দৃশ্যের সঙ্গে সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার সম্পর্ককে অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। ‘ভারতের ঔপনিবেশিক আমলের বিপুল দলিল আছে, যেগুলো নিয়ে গবেষণা, অধ্যয়ন করা যায়। একই সঙ্গে অনেক চিত্রকর্ম আছে যেগুলোকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লষণ করা প্রয়োজন। দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিখুঁতভাবে তাদের দলিলাদি সংরক্ষণ করত এবং সেগুলোর পরিমাণ বিপুল! লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে শেলফ আছে, যেগুলোতে শতবর্ষের ইতিহাসের বিবরণীসহ লেজার এবং চিঠিপত্র সংরক্ষিত আছে। এসব দলিলকে যারা এত বছর ধরে যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছেন, সেই গ্রন্থাগারিক ও আর্কাইভিস্টদের প্রতি ইতিহাসবিদদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।’

কয়েক কিলোমিটারজুড়ে অফিশিয়াল ডকুমেন্ট, চিঠিপত্র এবং জার্নাল ছাড়াও ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে ভিজুয়াল ম্যাটেরিয়ালের অসাধারণ সংগ্রহ। এসব ভিজুয়াল ম্যাটেরিয়াল ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।&dquote;&dquote;

বাণিজ্য ও যুদ্ধের পরিপ্রক্ষিতে ১৮ শতকের মধ্যভাগে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক জীবনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে এ সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল আর এর মূলে ছিল লন্ডনভিত্তিক একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি—দি কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব লন্ডন, ট্রেডিং টু দি ইস্ট ইন্ডিজ—যা সাধারণত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে পরিচিত। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৬ শতকে, সেই সময় থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত কোম্পানিটি এশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একসময় বলা হতো ‘প্রাচীন দুনিয়া থেকে আধুনিককালের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান বাণিজ্যিক করপোরেশন’। ভারতের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে এ অনন্য কোম্পানিটিকে বিবেচনায় না নিয়ে উপায় নেই। হজেস যখন ভারতে এসেছিলেন, ততদিনে কোম্পানি এখানে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কোম্পানির প্রভাবের ব্যাপ্তি শুধু এশিয়াজুড়ে নয় বরং এর বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ড ব্রিটেনের রাজনীতিবিদ ও বণিকদের পুরো পৃথিবী নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোম্পানি ভারতে ব্রিটিশ রাজের ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল। আমেরিকান কলোনি এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ একসময় ব্রিটিশদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। তারপর ১৮ শতক শেষ হতে হতে ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, বণিক ও ভ্রমণকারীদের ক্রমেই আকর্ষণ করতে থাকে। তবে ভারতের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছে অহরহ। ইতিহাসবিদ পিজে মার্শাল আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশদের যোগাযোগ ছিল দীর্ঘ সময়ের জন্য এবং ঘনিষ্ঠ, ১৮ শতক নাগাদ হাজারো ইংলিশম্যান ভারতে পৌঁছে গিয়েছিলেন, বাণিজ্য বিস্তৃত আকারে বিকশিত হয়ে ওঠে, এর মধ্যে উচ্চ শিল্প মানসম্পন্ন শিল্পকর্ম আমদানিও ছিল। ভারত বিষয়ে ব্রিটেনে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছিল, ভারত এবং ভারতীয়দের চিত্রায়িত করে এমন ভিজুয়াল কন্টেন্ট প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে থাকে। 

১৮ শতকের ভারত ছিল ব্রিটেনের জন্য ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব দৃশ্যের উৎস’, এমনটাই মনে করতেন শিল্পী ও ভ্রমণকারী উইলিয়াম হজেস। হজেসের পক্ষে বিবেচনা করাটা সহজ ছিল। যেসব পেশাদার ব্রিটিশ ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকর প্রথমদিকে ঔপনিবেশিক ভারতে এসেছিলেন, হজেস তাদের মধ্যে অন্যতম। সরাসরি ওয়ারেন হেস্টিংসের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ছয় বছর ভারতে অবস্থান করেন । হেস্টিংস তখন উপমহাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ কর্মকর্তা। হেস্টিংসের জন্য পোর্ট্রেট আঁকা এবং আরো অনেক কাজ করে দেয়ার পাশাপাশি হজেস ভারতজুড়ে প্রচুর ভ্রমণ করেন। তিনি তার এ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা স্কেচ, ড্রইংয়ের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করেন এবং পরবর্তীতে এর অনেকগুলো পূর্ণাঙ্গ তেলচিত্র হয়ে ওঠে কিংবা প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হয়।&dquote;&dquote;

মোগল সম্রাট শাহ আলম ব্রিটিশ কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে একটি দলিল হস্তান্তর করছেন, এমন একটি চিত্রকর্মের সঙ্গে অনেকেরই পরিচয় আছে। ১৮১৮ সালে এটি এঁকেছিলেন ব্রিটিশ চিত্রকর বেঞ্জামিন ওয়েস্ট। জন ম্যাকঅলিন মনে করেন, ওয়েস্টের আঁকা চিত্রকর্মটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের কিংবদন্তিকে উপস্থাপন করেছে। ওয়েস্টের আঁকা চিত্রকর্মে শাহ আলম ক্লাইভকে যে দলিল হস্তান্তর করেছিলেন, সেটা ছিল বাংলার রাজস্ব আদায় এবং প্রশাসন পরিচালনার অধিকার কোম্পানির হাতে হস্তান্তর করার। এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বন্দর নগরীগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, এসব বন্দর দিয়েই তাদের বাণিজ্য পরিচালিত হতো। কোম্পানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বন্দর নগরী ছিল— কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই। ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানি প্রথম দুর্গটি তৈরি করে মাদ্রাজে—ফোর্ট সেন্ট জর্জ। মাদ্রাজবিষয়ক ব্রিটিশ চিত্রকরদের আঁকা বেশির ভাগ চিত্রকর্মেই প্রাধান্য পেয়েছে এ দুর্গ। এ দুর্গ নিয়ে উইলিয়াম হজেস বলেছিলেন, ‘ফোর্ট সেন্ট জর্জকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ইংলিশ নগরী উপকূল থেকে দেখতে খুব সুন্দর।’

১৯ শতকের শুরুর দিকে বোম্বাই কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। ম্যাকঅলিন লিখেছেন, ‘জর্জ ল্যাম্বার্ট ও স্যামুয়েল স্কটের আঁকা বোম্বাইয়ের চিত্র কোম্পানির আমলের প্রথম ৬০ বছরে এ নগরীর বিকাশকে উপস্থাপন করে।...ছবিগুলোয় মূল মনোযোগ দেখা যায় দুর্গ (গুদাম) ও জাহাজের ওপর; এ দুটোই তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মূল মনোযোগের বিষয়।’

মাদ্রাজ ও বোম্বাই এ সময়কার অনেক চিত্রকরের কাজে ফুটে উঠলেও ব্রিটিশ শিল্পীদের মূল মনোযোগ ছিল তখনকার ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা। এ শহর কোম্পানির কর্মকর্তা, শিল্পী—সবাইকেই চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত বলে লিখেছেন ম্যাকঅলিন। ‘ক্যারিয়ার তৈরি করতে চাওয়া অনেক শিল্পী সরাসরি কলকাতা নিয়ে কাজ করেন। এ কারণে কোম্পানি আমলের চিত্রকর্মে কলকাতার দৃশ্যাবলির প্রাধান্য দেখা যায়। শিল্পীরা শহরের নদী, দৃশ্য, ভবন এবং নাগরিকদের বিভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে উপস্থাপন করেছেন।’ কলকাতা উইলিয়াম হজেসকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি শহরটির মোট পাঁচটি ছবি এঁকেছিলেন।&dquote;&dquote;

অসংখ্যবার পুনর্মুদ্রিত হওয়া জেমস রেনেলের মেমোয়ার অব আ ম্যাপ অব হিন্দুস্তান প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৮৩ সালে। এ বই ব্রিটেনবাসীকে ভারতের একটি চিত্র উপহার দিয়েছিল, যাতে তারা সেই পুবের দেশটি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিষ্কার একটি ধারণা পেয়ে গিয়েছিল। এ সময় ইউরোপীয়রা ভারত সম্পর্কে তাদের ভাষাতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও ভিজুয়াল জ্ঞানের ঘাটতি পূরণ করতে খুব চেষ্টা চালাচ্ছিল। ছবি বা চিত্র এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। উপমহাদেশের প্রাকৃতিক ও দৃশ্যের বৈচিত্র্য চিত্রকরদের প্রচুর মূল্যবান ‘সাবজেক্ট’ সরবরাহ করেছিল। এসব দেখে আরো বেশি শিল্পী ও ভ্রমণকারী এসব নিদর্শনের সাক্ষী হতে ভারতে আসতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ শিল্পীরা ভারতের সেসময়ের সংস্কৃতির সমৃদ্ধ চেহারাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। চিত্রশিল্পীরা ভারতবিষয়ক ব্রিটিশ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ভূমিকা রেখেছিলেন মানচিত্রকর, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও টপোগ্রাফিক জরিপকারীদের মতোই।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভ্রমণকারী ও ভাষ্যকারদের মতো ব্রিটিশ শিল্পীরা যখন ভারতবর্ষকে এঁকেছেন, তখন তারাও তাদের নিজস্ব ধারণা, প্রত্যাশা, সংস্কার দিয়ে চালিত হয়েছেন আর তাদের কাজের ভিত্তি ছিল পেশাগত প্রশিক্ষণ, রুচির জনপ্রিয় অভিমুখ এবং ইউরোপে আধিপত্যকারী রাজনৈতিক আবেগ। এসব সত্ত্বেও ১৮ শতকের শেষভাগে তৈরি হওয়া এসব চিত্রকর্ম ভারতীয় ও ব্রিটিশদের ওপর কোম্পানির প্রভাব ও তাত্পর্যকে প্রতিফলিত করে।

কোম্পানি আমলে যে চিত্রকররা ভারতীয় উপকূলে পা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে হজেস অন্যতম প্রভাবশালী। ১৭৭২-৭৫ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে জেমস কুকের দ্বিতীয় অভিযানে অফিশিয়াল এক্সপেডিশন আর্টিস্ট ছিলেন হজেস। লন্ডনে ফ্রি সোসাইটি অব আর্টিস্ট এবং রয়াল একাডেমিতে নিয়মিতভাবে তার প্রদর্শনী হতো। ব্রিটিশ শিল্পীরা কীভাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, তার গভীর চিত্র দেখা যায় তার কাজের বিশ্লেষণে।

ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন কাজ নিয়ে ইতিহাসবিদরা প্রচুর আলোচনা করলেও অল্প কয়েকজনই সেসময়ে কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হওয়া শিল্পকর্মগুলো নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। সেই চিত্রকর্মগুলো সঙ্গে ক্ষমতা এবং সাম্রাজ্যের কী সম্পর্ক, সেটাও গভীরভাবে আলোচিত হয়নি।

টমাস ড্যানিয়েল ও তার ভাইপো উইলিয়ামের কাহিনী আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং চিত্রকর্মে ভারতের উপস্থাপনা কতটা গভীরভাবে একটি অন্যটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। উইলিয়াম হজেসের মতো ড্যানিয়েলরাও ব্রিটিশ দর্শকদের সামনে ভারতকে উপস্থাপন এবং ব্রিটিশ শিল্পচর্চায় ভারতকে একটি বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। টমাস ড্যানিয়েলের সমকালে একজন তার কাজের গুরুত্ব উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘দূরত্বের কারণে আমাদের পক্ষে ভ্রমণ করা সম্ভব নয় এবং অসম্ভব বৈচিত্র্যময় যা কল্পনায় ধারণ করা সম্ভব না— সেই ভারতের দৃশ্যাবলি টমাস আমাদের চোখের সামনে এনে দিয়েছেন।’ 

এ শিল্পীদের কাজের প্রভাব ছিল বিস্তৃত ও স্থায়ী। ১৯ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইউরোপের মানুষের কাছে ভারতের উপস্থাপনা করতে এ চিত্রকরদের কাজগুলো আবশ্যিক ভূমিকা পালন করেছে। টমাস ড্যানিয়েল ১৭৪৯ সালে লন্ডনের কাছে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক সরাইখানার মালিকের ছেলে। কোচ নির্মাতার কাছে নবিশি করে তার কর্মজীবন শুরু হয়। তার শিল্পী প্রতিভা প্রকাশিত হয়েছিল কোচ পেইন্টার চার্লস ক্যাটোর কাছে কাজ করার সময়। এটা ১৭৭০-৭৩ সালের ঘটনা। ১৭৭৩ সালে টমাস রয়াল একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তী এক দশকে এখানে তার অনেক ছবি প্রদর্শিত হয়। তার জীবনে সন্ধিক্ষণটি আসে ১৭৮৪ সালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে ভারতে ‘এনগ্রেভার’ হিসেবে কাজ করতে আমন্ত্রণ জানায়। ভাইপো উইলিয়াম সহকারী এবং শিক্ষানবিশ হিসেবে তার সঙ্গে ভারতে আসে।

ড্যানিয়েল প্রাথমিকভাবে কলকাতায় কাজ করেছেন। সেসময় কলকাতা ভারতে ব্রিটিশদের প্রধান বাণিজ্যিক শহর। এ শহরই তখন ভারতে ব্রিটিশদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র।

কলকাতায় কাউন্সিল হাউজ ও ওল্ড কোর্ট হাউজে তারা অনেক চিত্রকর্ম যুক্ত করেন। তারা দ্রুতগতিতে বিকাশমান কলকাতা মেট্রোপলিটানের প্রথম বিভিন্ন দৃশ্য ও প্রেক্ষিতকে লিপিবদ্ধ করে, এমন টপোগ্রাফিক্যাল প্রিন্ট সিরিজ তৈরি করেন। ভিউজ অব কলকাতা বিটুইন ১৭৮৬ অ্যান্ড ১৭৮৮ শিরোনামে প্রকাশিত এ সিরিজে ছিল ১২টি এনগ্রেভিং, যেগুলোকে ভারতীয় শিল্পীদের সহায়তায় রঙ করা হয়।

সেসময়ের বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় এ সিরিজ ভারতীয় এবং ইউরোপীয় দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। ক্লদ মার্টিন লেখেন, ‘সবাই যেন কলকাতাকে দেখতে পাচ্ছিলেন।’ উইলিয়াম হজেস মনে করেছিলেন এসব কাজ ‘কলকাতায় ইউরোপীয় ও এশিয়াটিক পদ্ধতির মিলনের একটি’ চমৎকার নিদর্শন। ‘দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্যও ছিল: কোচগাড়ি, এক ঘোড়ায় টানা হালকা গাড়ি, স্থানীয় পালকি—হিন্দুদের শেষকৃত্য— ফকিরদের বিভিন্ন বেশবাস—একজন বিদেশীর কাছে এর চেয়ে অভিনব, অসাধারণ চেহারা নিয়ে আর কোনো নগর হাজির হতে পারে না।’

ড্যানিয়েলরা বিকাশমান মেট্রোপলিসের ব্যস্ততাকে তাদের শিল্পকর্মে ধরতে পেরেছিলেন; ভ্রমণকারীদের বিবরণীকে তারা ভিজুয়াল দৃশ্যে রূপান্তর করেন।

‘পুরানো দুর্গের উত্তর-পশ্চিম কোণে এক প্রশস্ত ঘাটে আমি নৌকা থেকে নামলাম। ঘাট ঢালু হয়ে নদীর পানিতে নেমে গেছে। ঘাটে অসংখ্য নারী-পুরুষ গোসল করছিল।’

ড্যানিয়েলরা প্রচুর ভ্রমণ করেছেন, তাই গঙ্গার তীরের সৌন্দর্য, স্থানের অনাবিল আলো আর স্থাপত্যের বিবরণ তারা তাদের চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। সিম্পসন এঁকেছিলেন অ্যাম্বার দুর্গ আর ড্যানিয়েলরা বিহারে অবস্থিত শের শাহ সুরির সমাধি।

ড্যানিয়েলদের ‘কলকাতা ফ্রম দ্য রিভার হুগলি’তে মানুষের নানা কাজের ভিড়ে ব্যস্ত নদীতীরকে দেখা যায়। ছবির কেন্দ্রে আছে একটা বড় পাল তোলা নৌকা, যেমনটা ড্যানিয়েলরা নিজেরাও ব্যবহার করতেন। আর তাতে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। বাঁশের তৈরি স্থানীয় নৌকাও দেখা যাবে চারপাশে, ঘোড়ার মাথাওয়ালা প্রমোদতরীও আছে। নদীর তীরজুড়ে সারি সারি বাড়ি আর কারখানা। এসব কারখানার ওপরই নগরের সাফল্য নির্ভর করত। ব্রিটেনের মানুষের কাছে ভারতের দূরত্ব প্রায় অর্ধেক পৃথিবী। সেই দূরে থাকা মানুষদের জন্য এই শিল্পীদের তৈরি করা এসব চিত্রকর্ম ভারতে কোম্পানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তাদের চোখে বাস্তব করে তুলত।