বিনু আন্টির চেহারা এখনো মনে আছে বুবলির। সে তো এঁকেছিল ছোট্টবেলায়, একটা গোল্লা মাথা, তাতে গোল্লা গোল্লা চোখ, ঠোঁটটাও গোলালো, গলাটা খাটো তথা গোল্লা, গলার পরে বিশাল দুই গোল্লা...বুবলির আম্মু আর ফুপ্পি সেই ছবি নিয়ে গা-টেপাটিপি করে হেসেছিল। মনে আছে তার। গলা নামিয়ে বলেছিল, এজন্য পেট মোটা কিনা সেটা বোঝা যায় না। ওইসব বীক্ষণিক বাটখারা নিয়ে জ্ঞান বুবলির হয়নি। সে তখন বুঝতে পারেনি। মোটের ওপর শুধু বুঝেছিল, ওই যে রঙিন জর্জেটের শাড়ি পরা বিনু আন্টি, ডাগর চোখ, ফুলো ঠোঁট, আদুরে গা...ওকে আম্মু-খালাম্মু আর ফুপ্পিরা বেশ হিংসেই করে। বিনু আন্টি কিন্তু সেসব কিছু জানত বলে মনে হয় না, সেও তো সবসময় কেমন হেসে হেসে গল্প করত আম্মুদের সাথে, তেলাপিয়া চাষে লাভ নিয়ে আব্বুরা আলাপ শুরু করলে আম্মুর সাথে হাত ধরাধরি করে রান্নাঘরে চলে যেত নিমকপারা আর গোস্তপুলি বানাতে, আব্বু-আম্মু-বিনু আন্টি-নিজাম আংকেল মিলে ক্যারমবোর্ড খেলত ওদের শুতে পাঠিয়ে দিয়ে, এক শীতকালে সাবুদানা প্যাটার্নের সোয়েটার বুনে দিয়েছিল বুবলিকে নরম ভ্যালিকা উল দিয়ে (উল অবশ্য আম্মু জোর করে কিনে দিয়েছিল, দিয়ে আবার ফুপ্পিকে বলেছিল, উলটুকুও কিনে দিতে হলো, নইলে নিজের পছন্দসই মোটা মোটা গলায় দড়ি দেয়ার মতো উল কিনে নেবে, কী দরকার!)। বুবলির চোখে বিনু আন্টির কোনো খুঁত ছিল না। সে বিনু আন্টির একচিলতে রোদের মতো ভয়েল কাপড়ের ব্লাউজের ছাঁট ভালোবাসত, শুকোতে দেয়া জবা-লাল অন্তর্বাস ভালোবাসত, বড় হয়ে বুবলি কতবার খুঁজেছে বিনু আন্টির একটা ফিরোজা ফুল ফুল জর্জেটটার মতো প্রিন্টের শাড়ি। যেন ওই রকম হয় নারীবেলা।
তখন থেকে বিনু আন্টি-বিনু আন্টি করে যাচ্ছে বুবলি, বুবলির প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু সায়মার মা হচ্ছে বিনু আন্টি। নিজাম আংকেল কেমন শিশি-বোতলের মতো গাট্টাগোট্টা, একটু রাগী, একটু শ্লেষ করে কথা বলা লোক...তার পাশে হাসিখুশি দিলদরিয়া বিনু আন্টি কেমন বেমানান। বরং শিপার ভাইয়ার সাথে বিনু আন্টিকে মানাত। সায়মাদের বাসার বাড়িওয়ালার ছেলে। শিপার ভাইয়ার সাথে বিনু আন্টি মাঝে মাঝে ম্যাটিনি শো সিনেমা দেখতে যেত বলে বুবলির আম্মু চোখ ছোট ছোট করে খালাম্মুকে কী সব বলছিল একদিন, বুবলি ঘরে ঢুকতেই সবাই চুপ করে গেল। বিনু আন্টির বিয়ের সাদা-কালো ফটোর পেছনে কে যেন প্যাঁচানো হাতের লেখায় লিখে রেখেছে, ‘বসন্তপ্রেরিতা’, কী সুন্দর না শব্দটা? সেসব ছবিতে বিনু আন্টি জরির চাকা বসানো বেনারসি আর হাই হিল পরে ডোরাকাটা স্যুট পরা নিজাম আংকেলের পাশে দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে হাসছে।
সেকালে রাতের বাতাসে খবর ভেসে আসত টিভি থেকে, এরশাদ আর তার মন্ত্রীদের নিয়ে অনেক কথা থাকত, সব বাক্যের শেষে থাকত ‘করতে হবে’, ‘আহ্বান জানান’ আর ‘জোর দেন’। সার্কভুক্ত দেশের সিনেমায় দেখাত মুহম্মদ আলী-জেবা নয় উত্তম-সুচিত্রার বই। বুবলির এখনো মনে আছে, বিরলে দুপুরবেলার শোয়ার ঘরে দাঁড়িয়ে বিনু আন্টি ওদের ববিতার নকল করে দেখাচ্ছে, কেমন করে নখ কামড়াতে কামড়াতে সিনেমার ববিতা হেসে গাইত, ‘ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না’। ইশারায় ডাকলে কী হবে? কে জানে। কিন্তু বিনু আন্টিকে কী সুন্দর দেখাত ওই রকম ববিতার মতো করে হাত ছড়িয়ে নিজেকে কেন্দ্র করে ঘুরলে, কড়ে আঙুলে জড়ানো জর্জেট শাড়ির আঁচলের খুঁট। দুপুরে বিনু আন্টি ঘুমাত না, ঠিক দুপুরবেলা এসব ভূতে ঢেলা মারত তো! আর অন্য সময় দুপুরে ওদের চোখ যখন জড়িয়ে আসত, ওরা শুয়ে পড়ত বিকালে উঠবে বলে, বিনু আন্টি পশমের গোলা আর কাঁটা নিয়ে শিয়রে এসে বসে যেত, উল বুনত লাগাতার। কত রকম নাম ফোঁড়ের, বিচি-ফোঁড়, আলুবোখারা ফোঁড়, বেড়াবেনী ফোঁড়, কড়ি ফোঁড়...বুবলির মনে হতো, বিনু আন্টি আসলে সারাক্ষণই উল বোনে আর কখনোসখনো অন্যান্য জাগতিক কাজ করে।
মাঝে মাঝে যখন খেয়াল চাপত, বিনু আন্টি ওদের পাশাপাশি বসিয়ে কাঠির ডগায় তুলো পেঁচিয়ে সেই তুলিতে আলতা পরিয়ে দিত পায়ে আর ওরা সুড়সুড়ি পেয়ে খিলখিল করে হাসত। তারপর বিনু আন্টি ওদের পায়ে পরাত রুপার মল, গলায় দিত লাল মখমলের ওপর সরু সরু কাজ করা সোনার চিক, কপালে লিপস্টিকের টিপ। গাছকোমর করে পরিয়ে দিত শাড়ি, বড়দের দশহাত শাড়ি পরলেও অজস্র কুঁচির দাপটে ওদের ছোট ছোট পেট ফুলে থাকত আর তখন বিনু আন্টি বলত, ‘মায়েরা যাও তো, দেয়ালে গিয়া পেটের সাথে গুঁতা দেও, সমান হইয়া যাইব গা!’ সত্যি সমান হয়ে যেত না একেবারে, তবে ফোলা ভাবটা কমে যেত। সায়মার আরেক বন্ধু আফসানাকে বিনু আন্টি ছেলে বানাত। তারপর ঘরের দরজা এঁটে নিজের আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে বিনু আন্টি ঘরময় নেচে নেচে ওদের নাচ শেখাত। গানের কথাগুলো বুবলির মনে আছে। মেয়েটা গাইবে, ‘ফিরিয়ে নে তোর রুপোর বাজু, পরবওওও না কথা বলব না রে’। ছেলেটা গাইবে, ‘পয়সা দিয়ে কিনেছি তো পরবি না তো কী, এমন ধারা করিস যদি মজা দেখাচ্ছি’। মেয়েটা ছেলেটার নাকের সামনে হাত ঘুরিয়ে বলবে, ‘ভয় করি না ভয় করি না ভয় করি না তোকে, কী মজা দেখাবি তুই বল আমাকে। দিস যদি কাচের চুড়ি চলে যাব বাপের বাড়ি, আসব না আর আসব না রে’। এ ওষুধে কাজ হয়, ছেলেটি গানটান গেয়ে বলে, ‘তোরে ছাড়া একলা ঘরে, ক্যামনে থাকি অন্ধকারে’...মেয়েটি তখন সুযোগ বুঝে বলে, ‘দিস যদি সোনার চুড়ি চলে আসব তোর বাড়ি, যাব না আর যাব না রে’। ক্রয়ক্ষমতা-পণ্য ইত্যাদির সাথে এবংবিধ প্রেম ও অসংগতির সম্পর্ক নিয়ে গান আর এসব মান-অভিমান তাদের কার্বাইড দিয়ে পাকানো সবুজ কলার মতো কী একটা করত, বুবলিরা একেবারে সজাগ হয়ে বাড়ি ফিরত। চুরি করে করে আম্মুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবত, আম্মু এমন হাত খেলিয়ে সোনার চুড়ি চাইতে সাহস করবে কি? ‘চলে যাব’ বললেই কি সবাই পরাস্ত হয়? আম্মু তো ভীষণ ভয় পায় আব্বুকে। বিনু আন্টিও নিজাম আংকেলকে।
কখনো সায়মার সাথে ধুন্ধুমার ঝগড়া হতো, বিনু আন্টি এসে ভাব করিয়ে দিতেন আর গলা জড়িয়ে ধরে গান গাইবার মতো সুর করে বলতেন, ঝগড়া ছাড়া কি আর প্রেমের আশ মিটে গো মা! ‘প্রেম’ শব্দটা বুবলিদের সামনে এমন অবলীলায় আর কেউ বলত না। বললেই ওদের হাসি পেত। বুবলি আর আফসানা গানের স্কুলে গান শিখছিল, ‘দোল ফাগুনের দোল লেগেছে’, সেখানে শেষ লাইনে ছিল ‘মন ছুটে যায় দূর গোকুলে বৃন্দাবনের প্রেমযমুনায়’, এই প্রেমযমুনায় বলতে গিয়ে কী কষ্ট করে যে হাসি চাপতে হতো ওদের। বাঁশরী বিশ্বাস ম্যাডাম খোঁনা গলায় গাইতেন ‘প্রেমে জল হয়ে যাও গলে’, এই গানের সময়ও ওরা খুক খুক করে হাসত। এসব বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছা কোনো ব্যাপার? এই যে সায়মার একটা কালোকুলো ফুপাতো ভাই ছিল যে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে ফিরে হাপুসহুপুস করে ভাত খেত এবং ভাতের পাতে হাত ধুত, যার নাম সে লিখত ‘মুছা’, সেই মুছা ভাইকে আড়ালে পাছামুছা ভাই বা ঘর মুছা ভাই ডাকতে ঐক্যের অভাব ঘটেছিল নাকি ওদের?
শিপার ভাইয়া যখন টের পেল, ওরা সামান্য বড় হতে শুরু করেছে, তখন সে সায়মাদের জিনের গল্প বলা শুরু করল। সহিস ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছে, অন্ধকার রাত, ঘোড়ার পায়ের ক্লপ ক্লপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঠিকানায় পৌঁছার আগে বিশাল একটা মাঠ আর দীঘি, গোলকধাঁধার মতো সেই মাঠে বারবার ঘুরায়ে এনে সাবেক জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি থামল, চালক এসে ভাড়া চাইল, তার হাতের বদলে খুর। ভয়ে সিঁটিয়ে উঠে ওরা শিপার ভাইয়ার হাত জড়িয়ে ধরে চেঁচাত, ভাইয়া!!! শিপার ভাইয়া তখন আবার বলত, হোস্টেলে থাকতে সে একবার তার রুমমেটের জ্বর বলে কাঁথা উঠিয়ে দেখে এদিকে তার পা, মাথার কাছে গিয়ে কাঁথা উঠিয়ে দেখে ওইদিকেও তার পা। ভয় সবচেয়ে কাবু করত বুবলিকে। কেউ নিশ্চয়ই পায়ে ধরে টান দেবে পুকুরের কালো জলে, কিংবা খাট থেকে নামতে গেলেই খাটের ছায়াময় নিচ থেকে কেউ দেবে টান। টান দেয়ার পর কী ঘটবে তা সে জানে না, শুধু জানে সেটা হবে ভয়ানক। যেদিন সে একেবারে দ্রবীভূত হয়ে গেল ভয়ে, কাঁদতে শুরু করল, সেদিন বিনু আন্টি বোনার কাজ রেখে এসে খুব ধমকাল শিপার ভাইয়াকে। বুবলিকে আড়কোলা করে নিয়ে গেল জাম গাছে আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়ে থাকা ঘেরা বারান্দায়, আদর করে চোখের পানি মুছিয়ে বলল, “এখন বুঝবা না গো বেটি। ভয়ের স্বরূপ আছে অন্য রকম। বড় হইয়া যখন ‘শ্রীকান্ত’ পড়বা, তখন দেখবা সে অন্ধকারে বইস্যা দেখছিল আন্ধারের রূপ। তার মনে হইছিল যারে চিনি না, সে অন্ধকার। যেমন মৃত্যু অন্ধকার। পরকাল অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই একটা তরঙ্গের মতো আনন্দ আইস্যা তারে ছাইয়া ফেলছিল।” আচ্ছা এখানে বলে নেয়া ভালো, বড় হয়ে বুবলি শুধু সেই ফিরোজা জর্জেটই খোঁজেনি, শরৎ রচনাবলিও খুঁজে পড়েছে, পড়েছে অন্তহীন আকাশের তলে বসে দেখা ধ্যানমগ্ন পৃথিবীর অটল শান্তিময় রূপের কথা, যে রূপ একান্তই পৃথক, যে রূপ স্বতন্ত্র।
একদিন যেভাবে ঋতু ফুরায়, সেভাবে সায়মার আম্মুর সাথে বুবলির আম্মুর মনান্তর ঘটে গেল। বুবলি বুঝতে পারল না বড়রা কী কারণে এত সাংঘাতিক কষ্টদায়ক সব সিদ্ধান্ত নেয়। কাঁটা কম্পাস ধরে কেমন করে সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ মাপতে হয় সেটা দেখে আসার ছলে বুবলি শেষবারের মতো সায়মাদের বাড়িতে এল। এসে দেখল জাম গাছটার নিরিবিলি ছায়া আর দুপুরের রোদ খেলছে বিনু আন্টির ভেজা চুলে, বিনু আন্টি বেদম বেগে উল বুনছে। এ দৃশ্য এত পুরনো, বুবলির জীবনের আর অনেক কিছু থেকে এত পৃথক আর এত স্বতন্ত্র। বুবলির ভেতর কে যেন সবকিছু ছিঁড়ে দিচ্ছিল। বিনু আন্টি তাকিয়ে হাত বাড়াল, বিনু আন্টির চোখের পাতা পুরু কান্নার পরে। কিন্তু আর সব দিনের মতোই বিনু আন্টি হাসিমুখে ওকে আদর করল, বুবলির নতুন কেনা উলের কাঁটাটা বুবলির হাত থেকে নিয়ে নিজের নাকের তলায় ঠোঁট ভেটকে তার ওপর ধরল, মোচের জায়গায় রেখে ওজন নেয়া যায় কাঁটার, বোঝা যায় এই কাঁটা ধরে উল বুনলে কিছুক্ষণ পর হাত বা কাঁধ ভারের ব্যথায় ধরে আসবে কিনা। মজার না?
বুবলিদের স্কুলে সেলাইশিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল, সেলাই দিদিমণি ডোরা গোমেজকে সবাই সমঝে চলত, একশ নম্বর সেলাইয়ে। বিনু আন্টির কাছে সেলাই দেখিয়ে নেয়ার অছিলায় বুবলি কখনো কখনো সায়মাদের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি পেল। আম্মু না গেলেও সে যেতে পারবে। ততদিনে বাঁশের চটায় উলের ক্রসস্টিচ দিতে শেখা থেকে বাচ্চাদের টুপি-মোজা হয়ে ওরা সোয়েটার সেলাই অবধি পৌঁছে গেছে, এইটুকু টুকু সব মেয়েরা রঙিন পশমে ঘর তুলছে আর ঘর ফেলছে। উলের ঘর পড়ে গেলে সেই দৃশ্য গলাকাটা পশুর জখমে রক্তনালি-তন্তু বেরিয়ে আসার মতো। সেবারের প্যাটার্নের নাম মৌচাক প্যাটার্ন। মনে আছে বুবলির। উলের নাম পাউডার-ব্লু ডি-কে। নরম গোলাটাকে টিপে দেখত বুবলি বারবার, সেদিন নিজাম আংকেল দেরিতে অফিসে যাবে বলে তখনো চা খাচ্ছিল আর পেপার পড়ছিল। বিনু আন্টি বুবলির জন্য খাবার তৈরি করতে গেলে নিজাম আংকেল দেখতে এল বুবলি কী সেলাই করছে।
বিনু আন্টি ট্রে হাতে ফিরে এলে নিজাম আংকেল উঠে চলে গেল ভেতরে। বিনু আন্টির চোখের পাতা আবারো পুরু, কেঁদেছে। তার মানে জানে? তার মানে দেখেছে? নিজাম আংকেল অফিসে চলে যাওয়ার পর বিনু আন্টি বুবলিকে জড়িয়ে ধরল একবার। চুল আঁচড়ে দুই বেনী করে দিল আর চামচে করে পুডিং খাইয়ে দিল। পরে নিজেই নিয়ে গেল বুবলিকে তার বাড়িতে। আর কখনো দেখা হয়নি বিনু আন্টির সাথে।
ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার আগে অনেকদিন সায়মা স্কুলে এল না, ওর মা মারা গেছে। বুবলিরা তখনো স্তন ক্যান্সারের কথা ভালো করে জানে না, জানলেও শব্দটা বলতে লজ্জা পায় (তখনো ‘সানন্দা’ বের হই, বের হই করছে কেবল, অপর্ণা সেন একটা রঙিন ছবিতে পদ্মাসনে বসে বলছেন, জীবনে আর সবই করেছি, বাকি আছে আপনাদের সাথে কথা বলা ইত্যাদি)। সাদা কাগজের বাক্সবোঝাই কড়কড়ে নেটে মোড়া স্যানিটারি ন্যাপকিন, তার গায়ে লেখা ‘সফটেক্স’ অথচ শুকিয়ে গেলে চামড়ার সাথে সেঁটে বসে, বদলাতে গেলে চামড়া ছিলে যায়, এসব যন্ত্রণার কথা আম্মুকে বুবলি বলতে পারে যদিও। কয়েক মাস পর একদিন গোসলখানার পিচ্ছিল অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুবলির শুধু মনে হলো, এতদিনে রক্তমাংসের গ্রন্থি-ভয়েলের ব্লাউজ সবকিছু থেকে বের হয়ে বিনু আন্টি মাটির সাথে মিশে ঘাসেদের খাদ্য হয়ে গেছে। আলো না জ্বলা সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরটাতেই তার মনে হলো, তার শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে, অন্ধকার বোঝাই হয়ে আছে টনটনে হয়ে আছে ক্ষমায়। সে ক্ষমা করে দিচ্ছে যেন কাউকে, তেমন করে স্পর্শের জন্য হাত বাড়াল, যেন হাত বাড়ালেই হাতে এসে ঠেকবে খসখসে জরির বেনারসি, সোনার চিক আর নৃত্যপর শরীর। তারপর বাক্সবন্দি করার মতো করে সে বিনু আন্টির সমস্ত স্মৃতি ভুলে গেল বা নিজেকে ভুলতে দিল। যতটা ভুলে গেলে ওই কখনো কখনো জর্জেট শাড়ি বা শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ খোঁজা যায়।
বিনু আন্টির কথা মনে পড়ল অনেক বছর পরে। বুবলি যখন মা (যখন সে ‘প্রেম’ শব্দটা শুনলে হেসে গড়ায় না কিংবা ‘স্তন’ শব্দটা বলতে পারে, যখন ছোট্ট মেয়ের বুক টিপে দেয়ার ইতরতার বর্ণনা দিতে পারে নিজের বর্ষীয়সী মাকে, তার মাও সখীত্বের সুবাদে বলতে পারে কোনার্কের যক্ষিণীর বর্ণনা দিতে দিতে কোনো বন্ধুর স্বামী তার ওপর ঝাঁপ দিতে গেছিল)। আম্মুর আলমারি ঘেঁটে সে বের করেছে বহুকাল আগে ভ্যালিকা উলে বোনা সোয়েটারটা, আসছে শীতে তার নিজের বাচ্চার গায়ে মাপসই হবে। আর আরেকটা টুপি, সেটাও বিনু আন্টির দেয়া, মাল্টিকালারড লাক্সারি ইয়ার্নে বোনা, এই ইয়া মোটা উল কিনেছিল বিনু আন্টি, যেমনটা আম্মু হলে বাছত না, যেমনটা কত ফ্যাশনেবল তা আম্মু-খালাম্মুরা জানতই না। কী সব নাম বলত আম্মুরা উলের রঙের, ফুটি কালার, সুপারি কালার, পেস্ট কালার, না কমলা না গোলাপি একটা রঙকে বলত শরবতি কালার। উলে হাত দিতেই এক রকমের মনোরম আরাম পেয়ে বসল তাকে। যেন সুইচ টিপে কেউ জ্বালিয়ে দিল একটি দৃশ্য দেখার আলো, বিনু আন্টি বারান্দায় রোদে বসে উল বুনছে আর বিচ্ছেদবেদনায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে বুবলি। সোয়েটারটার ডাবল-রিব হাতা নেড়েচেড়ে দেখল সে, যদি কোথাও থাকে কর্কটরোগিণীর হাতের ছোঁয়াচ, বুবলি অকুণ্ঠ মনে অনেককাল আগে ঘাস হয়ে যাওয়া সেই রোগিণীর জন্য চাইল অফুরন্ত শান্ত অন্ধকার, ব্যথাহারী অন্ধকার। সোয়েটারটা শুঁকল সে, ন্যাফথালিনের গন্ধ পেরিয়ে যদি পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া সেই ছোট্ট বুবলির গায়ের ঘ্রাণ। যাকে বিনু আন্টি বলেছিল একদিন, ‘দ্যাখো আমরাও সব আলো জ্বালাইন্যা ঘর। ঘরের আলো হইল প্রেম। ওই যে গাইছিলাম না, ঝগড়া ছাড়া প্রেমের আশ মেটে না, সেই প্রেম। যতক্ষণ প্রেম আছে, সবকিছু জ্বলজ্বল করতাছে। প্রেম গেলে গিয়া ঘরের আলো নিভা গেল গিয়া...তখন যার হাতের রান্না মজা সে আর রানতে পারে না, যে ঘুমাইয়া কূল পাইত না, সে আর ঘুমায় না, যে গলা খুইল্যা গান গাইত, সে আর গাইতে পারে না। তখন শুধু কলের পুতুলের মতো হাত-পা নড়ে মানুষের। কলের মতো হাত-পা নাড়ায়া বড়জোর উল বুনতে পারে।’ বলে নিজেই যেন চমকে গেছিল বিনু আন্টি, তারপর সংবিত ফিরে পেয়ে আবার শুধরে নিল, ‘উল বুনতে তো মা খালি দুই জিনিস জানা লাগে, একটা হইল সোজা বুনানি, আরেকটা উল্টা বুনানি, উল্টাপিঠ বুনলে অটোমেটিক পিছে সোজা দিক বুনা হইয়া গেল, কী তামশা।’






